ঢাকামঙ্গলবার , ৭ জুলাই ২০২৬
  1. Bangla
  2. chomoknews
  3. English
  4. অপরাধ
  5. অভিনন্দন
  6. আমাদের তথ্য
  7. কবিতা
  8. কর্পরেট
  9. কাব্য বিলাস
  10. কৃষি সংবাদ
  11. খুলনা
  12. খোলামত
  13. গল্প
  14. গাইড
  15. গ্রামবাংলার খবর
আজকের সর্বশেষ

কালো প্রতিশোধ

admin
জুলাই ৭, ২০২৬ ৮:৪৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

কালো প্রতিশোধ

রাহুল রাজ ।। শ্রাবণ মাস মানেই আকাশ জুড়ে মেঘের ঘনঘটা আর সময়-অসময়ের ঝুম বৃষ্টি। বৃষ্টির জল পেয়ে দোলাকান্দা গ্রামের চারপাশের ঝোপঝাড়, অশোক-শিমুল আর আগাছাগুলো যেন রাক্ষুসে চেহারায় বেড়ে উঠেছে। গ্রামটি আর দশটি গাঁয়ের মতোই শান্ত হতে পারত, যদি না সেখানে থাকত সাপের উপদ্রব। চোর-ডাকাতের ভয় এ গ্রামে নেই, কিন্তু সাপের ভয়ে প্রতিটি মানুষ তটস্থ। গোয়ালঘর, রান্নাঘর, এমনকি শোবার ঘরের চাল থেকেও মাঝেমধ্যে খসে পড়ে সাপের খোলস। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে মহেশের বউ আর হরেন কাকা সাপের কামড়ে নীল হয়ে মারা যাওয়ার পর থেকে গ্রামের মানুষের বুকের ভেতর আতঙ্ক স্থায়ী বাসা বেঁধেছে।

বাইরে তখন টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। থমথমে অন্ধকার। ঘরের ভেতর কাঠের চৌকির ওপর কাঁথা গায়ে দিয়ে ঝিমোচ্ছিল হারাধন। হঠাৎ রান্নাঘর থেকে তার বউ মালতির এক তীব্র, বুকফাটা আর্তনাদ ভেসে এল।

চমকে উঠে হুড়মুড় করে খাঁটিয়া থেকে নামল হারাধন। ছুটে রান্নাঘরে গিয়ে দেখে মালতি দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে থরথর করে কাঁপছে, ভয়ে তার মুখ শুকিয়ে চুন। আঙুল উঁচিয়ে মালতি ভাঙা গলায় বলল, “রান্নাঘরের মাচায়… মস্ত বড় একটা কাল কেউটে!”

হারাধন আর দেরি করল না। হাতের কাছে থাকা মোটা লাঠিটা শক্ত করে চেপে ধরে সে মাচার দিকে এগোল। ঘুটঘুটে অন্ধকারে টর্চের আলো ফেলতেই দেখা গেল—কালো কুচকুচে, চকচকে চামড়ার এক বিশাল কাল কেউটে ফণা তুলে হিসহিস করছে। রাগে আর আতঙ্কে হারাধনের রগ ফুলে উঠল। চোখের পলকে সে লাঠি দিয়ে সজোরে আঘাত করল সাপের মাথায়। কয়েকটা মরণকামড় আর ছটফটানির পর সাপটা নিস্তেজ হয়ে মাটিতে পড়ে রইল। মস্ত বড় কেউটেটাকে মেরে হারাধন হাঁফ ছাড়ল।

কিন্তু স্বস্তি বেশিদিন স্থায়ী হলো না।

ঠিক তিনদিন পর, সন্ধ্যাবেলায় গোয়ালঘরের পাশে ঠিক একই রকম, আরও একটা কাল কেউটে ফণা তুলে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল মালতি। চিৎকার করে সে হারাধনকে ডাকল। গ্রামের বুড়োরা বলে, কেউটে সাপ জোড়ায় থাকে। একটাকে মারলে অন্যটা প্রতিশোধ নিতে আসে। গ্রামের সবাই রটিয়ে দিল—ওটা আগের সাপের জোড়া, প্রতিশোধ নিতে ফিরে এসেছে।

শুরু হলো এক ভয়ঙ্কর লুকোচুরি খেলা। হারাধন আর গ্রামের জোয়ান ছেলেরা লাঠিসোঁটা নিয়ে সাপটাকে মারার জন্য মরিয়া হয়ে উঠল। কিন্তু সাপটা যেন কোনো এক অশুভ মায়াবলে বারবার ফস্কে যেতে লাগল। কখনো কাঠ কাটার স্তূপের ভেতর ঢুকে সে অদৃশ্য হয়ে যায়, কখনো খড়ের পালার ভেতর মিলিয়ে যায়। তন্ন তন্ন করে খুঁজেও তার আর কোনো সন্ধান মেলে না।

অথচ, সাপটা কিন্তু বাড়ি ছেড়ে যায়নি। গভীর রাতে যখন চারদিক নিঝুম হয়ে যেত, তখন ঘরের টিনের চালে বা জানালার খড়খড়িতে খসখস শব্দ হতো। মেঝের ওপর দিয়ে ভারী কিছু টেনে নিয়ে যাওয়ার চ্যাটচ্যাটে আওয়াজ পেয়ে মালতির ঘুম ভেঙে যেত। টর্চের আলো ফেলতেই দেখা যেত, ঘরের কোণ দিয়ে একটা কালো চাবুকের মতো লেজ মিলিয়ে যাচ্ছে। আতঙ্কে হারাধনের বাড়ির লোক খাওয়া-দাওয়া ভুলে গেল। প্রতিটা মুহূর্ত কাটতে লাগল শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে যাওয়া এক হিমশীতল ভয়ে।

অবশেষে, এক সপ্তাহ পর বৃষ্টিভেজা এক দুপুরে সাপটিকে বাগে পেল হারাধন। খড়ের পালার তলা থেকে বের হতেই সে লাঠির এক নিপুণ ঘায়ে সাপটার কোমর ভেঙে দিল। তারপর পিটিয়ে পিটিয়ে নিথর করে দিল জোড়া সাপের দ্বিতীয়টিকেও।

দীর্ঘদিনের চোর-পুলিশ খেলার অবসান ঘটল। জোড়া সাপকেই খতম করতে পেরে হারাধন আর মালতির বুকে যেন পাথর নামল। পাড়ার দু-তিনজন প্রতিবেশীও জড়ো হলো। উঠোনে মরা সাপটাকে ফেলে সবাই যখন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছে, মারণ-আতঙ্ক কেটে যাওয়ার আনন্দে মেতে উঠেছে, ঠিক তখনই ঘরের ভেতর থেকে একটা অদ্ভুত শব্দ ভেসে এল।

টিক… টিক… কট… কট…

খুব হালকা, কিন্তু অজস্র ভাঙনের শব্দ। যেন একসঙ্গে অনেকগুলো শুকনো পাতার মচমচানি।

শব্দটা আসছিল হারাধনের শোবার ঘরের ঠিক মাঝখানের মাচাটা থেকে। ঘরের ভেতর ঢুকতেই এক গমগমে বোটকা গন্ধ হারাধনের নাকে এসে লাগল। টর্চের হলদে আলোটা ঘরের উঁচুতে থাকা অন্ধকার মাচার ওপর ফেলতেই হারাধন আর মালতির হাত-পা জমে বরফ হয়ে গেল।

মাচার ওপরে স্তূপ করে রাখা পুরনো কাপড়ের জটলার ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে সাদা ধবধবে, একসঙ্গে দলা পাকিয়ে থাকা অন্তত গোটা তিরিশেক সাপের ডিম! আর চোখের সামনেই, সেই ডিমের খোলসগুলো একে একে ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে।

ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে সুতোর মতো লিকলিকে, কুচকুচে কালো, বিষাক্ত কাল কেউটের অজস্র বাচ্চা। ডিম থেকে বেরুতেই জাত সাপের স্বভাব অনুযায়ী সেগুলো চারদিকে হিসহিস শব্দে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। কয়েকটা বাচ্চা মাচার ওপর থেকে সরাসরি নিচের বিছানার ওপর টুপটাপ করে পড়তে শুরু করেছে।

ঠিক তখনই হারাধনের পায়ের পাতায় কী যেন একটা কামড়ে ধরল। নিচে আলো ফেলতেই সে দেখল, মেঝেতে অজস্র কালো সুতোর মতো বাচ্চার মেলা বসেছে। রক্তের ভেতর বিষের তীব্র নীল জ্বালা অনুভব করার আগেই হারাধন বুঝতে পারল—মা সাপের প্রতিশোধ শেষ হয়নি, সে তার পুরো বংশকে রেখে গেছে এই ঘরের দখল নিতে।