কুসুমপুর গ্রামটা যেন মানচিত্রে থাকলেও পৃথিবীর বাকি অংশ থেকে আলাদা। গ্রামের চারদিকে ধানখেত, বাঁশঝাড়, পুকুর আর তালগাছের সারি। দিনের বেলায় সবকিছুই স্বাভাবিক মনে হয়-শিশুদের খেলাধুলা, গাড়ির শব্দ, মাঠে কৃষকদের হাঁকডাক।
তবু গ্রামের উত্তর প্রান্তে পা রাখলেই পরিবেশটা হঠাৎ বদলে যায়। সেখানে বাতাস যেন ভারী হয়ে ওঠে। পাখির ডাক থেমে যায়। দুপুরের রোদও কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে আসে। গ্রামের মানুষ বলে, ওই জায়গায় সূর্যের আলোও বেশিক্ষণ থাকতে চায় না।
সেই নির্জন জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে এক জরাজীর্ণ, পরিত্যক্ত সাধারণ বাড়ি।
দেয়ালের পলেস্তারা বহু আগেই খসে পড়েছে। কোথাও কোথাও লাল ইট বেরিয়ে এসেছে। ভাঙা জানালাগুলো অন্ধকার চোখের মতো তাকিয়ে থাকে পথচারীদের দিকে। রাতের বেলা মাঝে মাঝে নাকি জানালার ভেতর ক্ষীণ আলো জ্বলে ওঠে, আবার মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়েও যায়।
আর বাড়িটার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে সেই আমগাছ।
শুধু আমগাছ বললে ভুল হবে।
ওটা যেন একটা জীবন্ত পাহারাদার।
বিরাট মোটা কাণ্ড, চারজন মানুষ হাত ধরাধরি করেও যার গুঁড়ি জড়িয়ে ধরতে পারবে না। ডালপালাগুলো চারদিকে এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যেন বিশাল কোনো দানব তার হাত মেলে পুরো বাড়িটাকে আঁকড়ে ধরে আছে।
পাতাগুলো এত ঘন যে দুপুরের তীব্র রোদও মাটিতে পৌঁছাতে পারে না।
গাছটার নিচে সব সময় একটা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ ভাসে।
পচা মাটি…
শুকনো রক্ত…
আর পুরোনো আতরের গন্ধ।
কেউ জানে না গন্ধটা কোথা থেকে আসে।
গ্রামের মানুষ ওই গাছটার দিকে তাকিয়েও কথা বলে না।
বাচ্চারা খেলতে খেলতে যদি ভুল করে সেদিকে চলে যায়, মায়েরা ছুটে এসে টেনে নিয়ে আসে।
কারণ, কুসুমপুরের বৃদ্ধদের মুখে একটা কথা আজও শোনা যায়—
“ওই গাছের ছায়া মানুষরে ধরে রাখে…”
আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে…
এই গ্রামেরই এক দরিদ্র কৃষকের মেয়ে ছিল মনিকা।
মেয়েটা ছিল শান্ত, ভদ্র আর অপূর্ব সুন্দরী।
হাসলে গালে টোল পড়ত।
গ্রামের বুড়িরা বলত,
— “এই মাইয়ার কপালে রাজরানির সুখ আছে।”
কিন্তু ভাগ্য যেন মানুষের কথায় হাসে।
মনিকার বিয়ে হয় পাশের গ্রামের রমেনের সঙ্গে।
শুরুর কয়েকটা দিন সব ঠিকই ছিল।
তারপর শুরু হলো আসল চেহারা।
যৌতুক।
আরও টাকা।
আরও সোনা।
আরও দাবি।
রমেন আর তার মা প্রায় প্রতিদিনই মনিকার ওপর অত্যাচার চালাত।
কখনো খেতে দিত না।
কখনো চুলের মুঠি ধরে টেনে উঠোনে ফেলে মারত।
কখনো সারারাত বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখত।
পাশের বাড়ির লোকজন কান্নার শব্দ শুনত।
কিন্তু কেউ প্রতিবাদ করত না।
কারণ তখন গ্রামের নিয়ম ছিল—
“স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপারে অন্য কেউ কথা বলে না।”
দিনের পর দিন নির্যাতন সহ্য করতে করতে মনিকার চোখের নিচে কালো দাগ পড়ে গেল।
হাসিটা হারিয়ে গেল।
মেয়েটা যেন ধীরে ধীরে জীবন্ত মানুষ থেকে ছায়ায় পরিণত হচ্ছিল।
সেই রাতটা ছিল অমাবস্যা।
আকাশে চাঁদ ছিল না।
চারদিক ঘন কালো অন্ধকার।
রাত যত গভীর হচ্ছিল, বাতাস তত ঠান্ডা হয়ে উঠছিল।
মাঝরাতে আচমকা গ্রামের সব কুকুর একসঙ্গে ডেকে উঠল।
তারপর…
হঠাৎ সব চুপ।
একেবারে নিস্তব্ধ।
সেই নীরবতার মধ্যে মনিকা ধীরে ধীরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল।
তার পরনে ছিল লাল শাড়ি।
খোলা চুল কোমর ছাড়িয়ে নেমে এসেছে।
চোখ দুটো কান্নায় ফুলে গেছে।
সে একবারও পেছনে ফিরে তাকাল না।
নিঃশব্দে হেঁটে গেল আমগাছটার নিচে।
গাছটার মোটা ডালের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।
তারপর কাঁপা হাতে দড়িটা বাঁধল।
ঠিক সেই সময়…
বাতাস একবার হঠাৎ ঘূর্ণির মতো বইতে শুরু করল।
গাছের পাতাগুলো অদ্ভুত শব্দ করতে লাগল।
মনে হচ্ছিল…
কেউ যেন শত শত গলায় ফিসফিস করে কথা বলছে।
মনিকা ধীরে ধীরে আকাশের দিকে তাকাল।
তার চোখে তখন আর জল ছিল না।
ছিল শুধু অভিশাপ।
সে কাঁপা গলায় বলল—
“হে আল্লা… যদি আমার কষ্টের বিচার কোথাও থাকে… যারা আমারে এই মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিল… আমি যেন তাদের শান্তিতে বাইচা থাকতে না দিই…”
কথাগুলো শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দূরে কোথাও বজ্রপাত হলো।
আকাশে কোনো মেঘ ছিল না।
তবু সেই বজ্রধ্বনিতে পুরো কুসুমপুর কেঁপে উঠল।
তারপর…
আমগাছের মোটা ডালটা আস্তে আস্তে দুলে উঠল।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়…
চারপাশে বাতাস ছিল না।
কে দোলাচ্ছিল সেই ডাল?
কেউ জানে না।
সেই রাতেই মনিকার নিথর দেহ ঝুলে রইল গাছের ডালে।
ভোরে গ্রামের মানুষ ছুটে এলো।
চারদিকে কান্না।
চিৎকার।
একদল যুবক দড়ি কেটে মরদেহ নামাল।
কিন্তু সবাই লক্ষ্য করল এক অদ্ভুত বিষয়।
মনিকার মুখে মৃত্যুর কোনো ভয় নেই।
বরং…
তার ঠোঁটের কোণে যেন ক্ষীণ একটা হাসি।
তার কয়েকদিন পরে সকালবেলা রমেনের বাড়ি থেকে ভেসে এল আর্তচিৎকার।
গ্রামের মানুষ ছুটে গিয়ে যা দেখল, তা আজও কেউ ভুলতে পারেনি।
রমেন আর তার মা মেঝেতে পড়ে আছে।
দুজনের শরীর অস্বাভাবিক নীল হয়ে গেছে।
চোখ দুটো বিস্ফারিত।
মুখে জমে আছে চরম আতঙ্ক।
ঘরের কোণে কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে আছে একটি বিশাল ওলন্দাজ সাপ।
কিন্তু গ্রামের বৃদ্ধ কবিরাজ মৃতদেহ পরীক্ষা করে শুধু একটা কথাই বলেছিলেন—
“এই মুখ সাপের কামড়ে মরা মানুষের মুখ না… এরা মরার আগে অন্য কিছু দেখছে…”
তার সেই কথার অর্থ কেউ বুঝতে পারেনি।
শুধু সেই দিন থেকেই কুসুমপুর বদলে যেতে শুরু করল।
সন্ধ্যা নামার পর কেউ আর উত্তর দিকের রাস্তা দিয়ে যেত না।
রাত হলে মাঝেমধ্যে আমগাছের দিক থেকে শোনা যেত…
খুব ক্ষীণ…
একটা মেয়ের কান্না।
আবার কখনো…
কারও খিলখিল হাসি।
মনিকার মৃত্যুর পর কেটে গেল সাতটি দিন।
সাত দিন ধরে কুসুমপুরের মানুষ যেন নিশ্বাস আটকে বেঁচে ছিল।
সন্ধ্যা নামলেই গ্রামের উত্তর দিকটা জনশূন্য হয়ে যেত। গরু-বাছুর পর্যন্ত যেন অকারণে সেদিকে যেতে চাইত না। কুকুরগুলো আমগাছটার দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে গর্জন করত, কিন্তু কাছে যাওয়ার সাহস পেত না। মাঝে মাঝে গভীর রাতে শোনা যেত এক নারীর কান্না। আবার কোনো কোনো রাতে ভেসে আসত খিলখিল হাসি—এমন এক হাসি, যা মানুষের বুকের ভেতর বরফ ঢেলে দিতে পারে।
গ্রামের সবাই বিশ্বাস করতে শুরু করল—
মনিকা ফিরে এসেছে।
কিন্তু একজন মানুষ এসব কথায় একটুও বিশ্বাস করত না।
তার নাম রহমত আলী।
বয়স পঞ্চান্ন। পেশায় কাঠুরে, শখে শিকারি। বাঘ, শিয়াল, বনবিড়াল—কোনো কিছুকেই সে ভয় পেত না।
চায়ের দোকানে বসে সে প্রায়ই বলত,
— “ভূত-টুত কিচ্ছু নাই। মানুষের মনই সবচেয়ে বড় ভূত।”
গ্রামের লোকেরা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করত।
— “রহমত ভাই, রাতের বেলা ওই রাস্তা এড়াইয়া চলেন।”
সে হেসে উড়িয়ে দিত।
— “যদি ভূত থাকে, আমারে একবার দেখা দিক। আমি তার লগেই গল্প করমু।”
বৃদ্ধরা তখন মুখ নামিয়ে ফেলতেন।
কারণ তারা জানতেন—
কিছু কথা অহংকার করে বলা যায় না।
সেদিন ছিল পৌষ মাসের শেষ দিক।
শীত এতটাই বেশি ছিল যে সন্ধ্যার পর থেকেই পুরো গ্রাম ঘন কুয়াশার চাদরে ঢেকে গিয়েছিল।
রহমত পাশের হাটে কাঠ বিক্রি করতে গিয়েছিল।
ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গেল।
হাট থেকে বেরোনোর সময় এক দোকানদার বলেছিল,
— “আজ আর ওই রাস্তা দিয়া যাইয়েন না রহমত ভাই। অন্য রাস্তা ধরেন।”