ঢাকামঙ্গলবার , ৭ জুলাই ২০২৬
  1. Bangla
  2. chomoknews
  3. English
  4. অপরাধ
  5. অভিনন্দন
  6. আমাদের তথ্য
  7. কবিতা
  8. কর্পরেট
  9. কাব্য বিলাস
  10. কৃষি সংবাদ
  11. খুলনা
  12. খোলামত
  13. গল্প
  14. গাইড
  15. গ্রামবাংলার খবর
আজকের সর্বশেষ

কুসুমপুরের সেই আমগাছ

admin
জুলাই ৭, ২০২৬ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

কুসুমপুরের সেই আমগাছ

— রাহুল রাজ

কুসুমপুর গ্রামটা যেন মানচিত্রে থাকলেও পৃথিবীর বাকি অংশ থেকে আলাদা। গ্রামের চারদিকে ধানখেত, বাঁশঝাড়, পুকুর আর তালগাছের সারি। দিনের বেলায় সবকিছুই স্বাভাবিক মনে হয়-শিশুদের খেলাধুলা, গাড়ির শব্দ, মাঠে কৃষকদের হাঁকডাক।

তবু গ্রামের উত্তর প্রান্তে পা রাখলেই পরিবেশটা হঠাৎ বদলে যায়। সেখানে বাতাস যেন ভারী হয়ে ওঠে। পাখির ডাক থেমে যায়। দুপুরের রোদও কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে আসে। গ্রামের মানুষ বলে, ওই জায়গায় সূর্যের আলোও বেশিক্ষণ থাকতে চায় না।

সেই নির্জন জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে এক জরাজীর্ণ, পরিত্যক্ত সাধারণ বাড়ি।

দেয়ালের পলেস্তারা বহু আগেই খসে পড়েছে। কোথাও কোথাও লাল ইট বেরিয়ে এসেছে। ভাঙা জানালাগুলো অন্ধকার চোখের মতো তাকিয়ে থাকে পথচারীদের দিকে। রাতের বেলা মাঝে মাঝে নাকি জানালার ভেতর ক্ষীণ আলো জ্বলে ওঠে, আবার মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়েও যায়।

আর বাড়িটার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে সেই আমগাছ।

শুধু আমগাছ বললে ভুল হবে।

ওটা যেন একটা জীবন্ত পাহারাদার।

বিরাট মোটা কাণ্ড, চারজন মানুষ হাত ধরাধরি করেও যার গুঁড়ি জড়িয়ে ধরতে পারবে না। ডালপালাগুলো চারদিকে এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যেন বিশাল কোনো দানব তার হাত মেলে পুরো বাড়িটাকে আঁকড়ে ধরে আছে।

পাতাগুলো এত ঘন যে দুপুরের তীব্র রোদও মাটিতে পৌঁছাতে পারে না।

গাছটার নিচে সব সময় একটা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ ভাসে।

পচা মাটি…

শুকনো রক্ত…

আর পুরোনো আতরের গন্ধ।

কেউ জানে না গন্ধটা কোথা থেকে আসে।

গ্রামের মানুষ ওই গাছটার দিকে তাকিয়েও কথা বলে না।

বাচ্চারা খেলতে খেলতে যদি ভুল করে সেদিকে চলে যায়, মায়েরা ছুটে এসে টেনে নিয়ে আসে।

কারণ, কুসুমপুরের বৃদ্ধদের মুখে একটা কথা আজও শোনা যায়—

“ওই গাছের ছায়া মানুষরে ধরে রাখে…”

আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে…

এই গ্রামেরই এক দরিদ্র কৃষকের মেয়ে ছিল মনিকা।

মেয়েটা ছিল শান্ত, ভদ্র আর অপূর্ব সুন্দরী।

হাসলে গালে টোল পড়ত।

গ্রামের বুড়িরা বলত,

— “এই মাইয়ার কপালে রাজরানির সুখ আছে।”

কিন্তু ভাগ্য যেন মানুষের কথায় হাসে।

মনিকার বিয়ে হয় পাশের গ্রামের রমেনের সঙ্গে।

শুরুর কয়েকটা দিন সব ঠিকই ছিল।

তারপর শুরু হলো আসল চেহারা।

যৌতুক।

আরও টাকা।

আরও সোনা।

আরও দাবি।

রমেন আর তার মা প্রায় প্রতিদিনই মনিকার ওপর অত্যাচার চালাত।

কখনো খেতে দিত না।

কখনো চুলের মুঠি ধরে টেনে উঠোনে ফেলে মারত।

কখনো সারারাত বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখত।

পাশের বাড়ির লোকজন কান্নার শব্দ শুনত।

কিন্তু কেউ প্রতিবাদ করত না।

কারণ তখন গ্রামের নিয়ম ছিল—

“স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপারে অন্য কেউ কথা বলে না।”

দিনের পর দিন নির্যাতন সহ্য করতে করতে মনিকার চোখের নিচে কালো দাগ পড়ে গেল।

হাসিটা হারিয়ে গেল।

মেয়েটা যেন ধীরে ধীরে জীবন্ত মানুষ থেকে ছায়ায় পরিণত হচ্ছিল।

সেই রাতটা ছিল অমাবস্যা।

আকাশে চাঁদ ছিল না।

চারদিক ঘন কালো অন্ধকার।

রাত যত গভীর হচ্ছিল, বাতাস তত ঠান্ডা হয়ে উঠছিল।

মাঝরাতে আচমকা গ্রামের সব কুকুর একসঙ্গে ডেকে উঠল।

তারপর…

হঠাৎ সব চুপ।

একেবারে নিস্তব্ধ।

সেই নীরবতার মধ্যে মনিকা ধীরে ধীরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল।

তার পরনে ছিল লাল শাড়ি।

খোলা চুল কোমর ছাড়িয়ে নেমে এসেছে।

চোখ দুটো কান্নায় ফুলে গেছে।

সে একবারও পেছনে ফিরে তাকাল না।

নিঃশব্দে হেঁটে গেল আমগাছটার নিচে।

গাছটার মোটা ডালের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।

তারপর কাঁপা হাতে দড়িটা বাঁধল।

ঠিক সেই সময়…

বাতাস একবার হঠাৎ ঘূর্ণির মতো বইতে শুরু করল।

গাছের পাতাগুলো অদ্ভুত শব্দ করতে লাগল।

মনে হচ্ছিল…

কেউ যেন শত শত গলায় ফিসফিস করে কথা বলছে।

মনিকা ধীরে ধীরে আকাশের দিকে তাকাল।

তার চোখে তখন আর জল ছিল না।

ছিল শুধু অভিশাপ।

সে কাঁপা গলায় বলল—

“হে আল্লা… যদি আমার কষ্টের বিচার কোথাও থাকে… যারা আমারে এই মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিল… আমি যেন তাদের শান্তিতে বাইচা থাকতে না দিই…”

কথাগুলো শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দূরে কোথাও বজ্রপাত হলো।

আকাশে কোনো মেঘ ছিল না।

তবু সেই বজ্রধ্বনিতে পুরো কুসুমপুর কেঁপে উঠল।

তারপর…

আমগাছের মোটা ডালটা আস্তে আস্তে দুলে উঠল।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়…

চারপাশে বাতাস ছিল না।

কে দোলাচ্ছিল সেই ডাল?

কেউ জানে না।

সেই রাতেই মনিকার নিথর দেহ ঝুলে রইল গাছের ডালে।

ভোরে গ্রামের মানুষ ছুটে এলো।

চারদিকে কান্না।

চিৎকার।

একদল যুবক দড়ি কেটে মরদেহ নামাল।

কিন্তু সবাই লক্ষ্য করল এক অদ্ভুত বিষয়।

মনিকার মুখে মৃত্যুর কোনো ভয় নেই।

বরং…

তার ঠোঁটের কোণে যেন ক্ষীণ একটা হাসি।

তার কয়েকদিন পরে সকালবেলা রমেনের বাড়ি থেকে ভেসে এল আর্তচিৎকার।

গ্রামের মানুষ ছুটে গিয়ে যা দেখল, তা আজও কেউ ভুলতে পারেনি।

রমেন আর তার মা মেঝেতে পড়ে আছে।

দুজনের শরীর অস্বাভাবিক নীল হয়ে গেছে।

চোখ দুটো বিস্ফারিত।

মুখে জমে আছে চরম আতঙ্ক।

ঘরের কোণে কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে আছে একটি বিশাল ওলন্দাজ সাপ।

কিন্তু গ্রামের বৃদ্ধ কবিরাজ মৃতদেহ পরীক্ষা করে শুধু একটা কথাই বলেছিলেন—

“এই মুখ সাপের কামড়ে মরা মানুষের মুখ না… এরা মরার আগে অন্য কিছু দেখছে…”

তার সেই কথার অর্থ কেউ বুঝতে পারেনি।

শুধু সেই দিন থেকেই কুসুমপুর বদলে যেতে শুরু করল।

সন্ধ্যা নামার পর কেউ আর উত্তর দিকের রাস্তা দিয়ে যেত না।

রাত হলে মাঝেমধ্যে আমগাছের দিক থেকে শোনা যেত…

খুব ক্ষীণ…

একটা মেয়ের কান্না।

আবার কখনো…

কারও খিলখিল হাসি।

মনিকার মৃত্যুর পর কেটে গেছে সাতটি দিন।

সাত দিন ধরে কুসুমপুরের মানুষ যেন নিশ্বাস আটকে বেঁচে ছিল।

সন্ধ্যা নামলেই গ্রামের উত্তর দিকটা জনশূন্য হয়ে যেত। গরু-বাছুর পর্যন্ত যেন অকারণে সেদিকে যেতে চাইত না। কুকুরগুলো আমগাছটার দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে গর্জন করত, কিন্তু কাছে যাওয়ার সাহস পেত না। মাঝে মাঝে গভীর রাতে শোনা যেত এক নারীর কান্না। আবার কোনো কোনো রাতে ভেসে আসত খিলখিল হাসি—এমন এক হাসি, যা মানুষের বুকের ভেতর বরফ ঢেলে দিতে পারে।

গ্রামের সবাই বিশ্বাস করতে শুরু করল—

মনিকা ফিরে এসেছে।

কিন্তু একজন মানুষ এসব কথায় একটুও বিশ্বাস করত না।

তার নাম রহমত আলী।

বয়স পঞ্চান্ন। পেশায় কাঠুরে, শখে শিকারি। বাঘ, শিয়াল, বনবিড়াল—কোনো কিছুকেই সে ভয় পেত না।

চায়ের দোকানে বসে সে প্রায়ই বলত,

— “ভূত-টুত কিচ্ছু নাই। মানুষের মনই সবচেয়ে বড় ভূত।”

গ্রামের লোকেরা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করত।

— “রহমত ভাই, রাতের বেলা ওই রাস্তা এড়াইয়া চলেন।”

সে হেসে উড়িয়ে দিত।

— “যদি ভূত থাকে, আমারে একবার দেখা দিক। আমি তার লগেই গল্প করমু।”

বৃদ্ধরা তখন মুখ নামিয়ে ফেলতেন।

কারণ তারা জানতেন—

কিছু কথা অহংকার করে বলা যায় না।

সেদিন ছিল পৌষ মাসের শেষ দিক।

শীত এতটাই বেশি ছিল যে সন্ধ্যার পর থেকেই পুরো গ্রাম ঘন কুয়াশার চাদরে ঢেকে গিয়েছিল।

রহমত পাশের হাটে কাঠ বিক্রি করতে গিয়েছিল।

ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গেল।

হাট থেকে বেরোনোর সময় এক দোকানদার বলেছিল,

— “আজ আর ওই রাস্তা দিয়া যাইয়েন না রহমত ভাই। অন্য রাস্তা ধরেন।”

রহমত হেসে বলেছিল,

— “দুই মাইল ঘুইরা যামু? ভূতের ভয়ে? যাও যাও, এসব বুড়িদের গল্প আমারে কইও না।”

সে হাতে বাঁশের লাঠি, কাঁধে কাঠের বোঝা আর অন্য হাতে টর্চ নিয়ে হাঁটতে লাগল।

রাত তখন প্রায় বারোটা।

চাঁদ ছিল না।

শুধু কুয়াশার সাদা দেয়াল।

নিজের নিঃশ্বাসও ঠিকমতো দেখা যাচ্ছিল।

হাঁটতে হাঁটতে রহমত লক্ষ্য করল—

আজ ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক নেই।

ব্যাঙের ডাক নেই।

এমনকি দূরের শিয়ালের হুক্কাহুয়াও নেই।

চারপাশে এমন এক নিস্তব্ধতা, যেন পুরো পৃথিবী হঠাৎ মরে গেছে।

তার বুকের ভেতর অজানা একটা অস্বস্তি জমতে শুরু করল।

সে নিজেকে বোঝাল—

“শীতের রাত… তাই এমন লাগতাসে।”

আরও কয়েক পা এগোতেই সে থেমে গেল।

তার টর্চের আলোয় ভেসে উঠল—

সেই আমগাছ।

কুয়াশার মধ্যে গাছটাকে মানুষের মতো লাগছিল।

মনে হচ্ছিল, কেউ দু’হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

ঠিক তখনই…

তার নাকে এল এক অদ্ভুত গন্ধ।

পচা মাংস…

ভেজা মাটি…

আর পুরোনো আতরের মিষ্টি গন্ধ।

রহমত ভ্রু কুঁচকাল।

“এই গন্ধ আবার কই থেইকা আসতাসে?”

সে টর্চটা গাছের দিকে ফেলতেই আলোটা অদ্ভুতভাবে কাঁপতে শুরু করল।

তারপর…

আলো নিভে গেল।

চারপাশ অন্ধকার।

রহমত তাড়াতাড়ি টর্চে চাপ দিল।

একবার…

দু’বার…

তিনবার…

হঠাৎ আলো জ্বলে উঠল।

কিন্তু সেই আলোয় গাছটার নিচে কাউকে দেখা গেল না।

রহমত হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।

ঠিক তখনই—

তার কানের একেবারে কাছে কেউ খুব আস্তে বলল—

“রহমত ভাই…”

সে জমে গেল।

তারপর আবার—

“…আমারে একটু নামাইয়া দিবা?”

গলাটা ছিল ঠান্ডা।

অস্বাভাবিক ঠান্ডা।

যেন কোনো বরফশীতল মৃতদেহ তার কানের পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলছে।

রহমতের হাত থেকে লাঠিটা পড়ে গেল।

ধীরে ধীরে সে টর্চটা উপরে তুলল।

হলুদ আলো গিয়ে পড়ল আমগাছের মোটা ডালের ওপর।

আর তারপর…

তার বুকের ভেতরকার সমস্ত সাহস এক মুহূর্তে গুঁড়িয়ে গেল।

ডাল থেকে একটা নারী ঝুলছে।

লাল শাড়ি।

গলায় দড়ি।

খোলা চুল।

কিন্তু সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ছিল—

তার ঘাড়।

পুরো উল্টো দিকে ঘুরে গেছে।

আর সেই উল্টো মুখ নিয়েই সে রহমতের দিকে তাকিয়ে আছে।

চোখ দুটো সম্পূর্ণ সাদা।

এক ফোঁটা মণিও নেই।

তারপর…

সেই সাদা চোখের ভেতর ধীরে ধীরে রক্ত জমতে শুরু করল।

টপ…

টপ…

টপ…

রক্ত ঝরছে।

কিন্তু মাটিতে পড়ছে না।

মাঝ আকাশেই মিলিয়ে যাচ্ছে।

রহমতের বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

সে দৌড়াতে চাইছিল।

কিন্তু পা যেন মাটির সঙ্গে আটকে গেছে।

হঠাৎ…

ঝুলন্ত দেহটা আস্তে আস্তে দুলতে শুরু করল।

কেউ দোলাচ্ছে না।

তবুও দুলছে।

আর দোলার সঙ্গে সঙ্গে…

তার মুখে ফুটে উঠল একটা হাসি।

একটা অস্বাভাবিক, মানুষের চেয়ে অনেক বড় হাসি।

ঠোঁট দুটো ছিঁড়ে কান পর্যন্ত উঠে গেল।

তারপর—

“হি… হি… হি… হি…”

সেই হাসি যেন চারদিক থেকে একসঙ্গে ভেসে এল।

গাছের ডাল থেকে।

মাটির নিচ থেকে।

কুয়াশার ভেতর থেকে।

এমনকি রহমতের নিজের পেছন থেকেও।

সে আতঙ্কে ঘুরে দাঁড়াল।

আর ঠিক তখনই তার বুকের রক্ত যেন হিম হয়ে গেল।

তার পেছনে…

আরও পাঁচজন মনিকা দাঁড়িয়ে।

একই মুখ।

একই লাল শাড়ি।

একই দড়ি।

সবাই একসঙ্গে হাসছে।

রহমত আর্তনাদ করে দৌড় দিল।

তার পেছনে তখন ভেসে আসছে নূপুরের শব্দ।

ছম… ছম… ছম…

আর সেই সঙ্গে—

“রহমত ভাই… দৌড়াইতাছো ক্যান? আমারে নামাইয়া দাও না…”

সে প্রাণপণে ছুটছে।

কিন্তু যতই দৌড়ায়, মনে হচ্ছে আমগাছটা ঠিক তার পাশেই রয়েছে।

হঠাৎ সে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল।

মুখ থুবড়ে।

তার টর্চ অনেক দূরে গিয়ে পড়ল।

টর্চের আলো ঘুরে এসে পড়ল আমগাছের দিকে।

সেই আলোয় রহমত শেষবার যা দেখেছিল—

মনিকা আর গাছে ঝুলছে না।

সে মাটিতে দাঁড়িয়ে।

হাতে একটা পানের বাটা।

মুখে অদ্ভুত মায়াবী হাসি।

সে শুধু বলল—

“আজ না… তোর সময় এখনো হয় নাই…”

তারপর…

সব অন্ধকার।

পরদিন ভোরে গ্রামের মানুষ রহমতকে রাস্তার ধারে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখল।

তার চুলের অর্ধেক এক রাতেই সাদা হয়ে গেছে।

প্রচণ্ড জ্বরে সে তিন দিন অজ্ঞান ছিল।

জ্ঞান ফিরলেও সে আগের রহমত ছিল না।

আগে যে মানুষ ভূতের কথা শুনে হাসত, সে এখন সন্ধ্যা নামলেই ঘরের দরজা বন্ধ করে দিত।

কেউ যদি আমগাছটার কথা তুলত, রহমত কাঁপতে কাঁপতে শুধু একটাই কথা বলত—

“এ আমি কি দেখলা”

কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে সে ফিসফিস করে যোগ করত—

“আমারে ধরতে ও আসছে।”

তারপর থেকে কুসুমপুরে আর কেউ রাতের বেলা উত্তর দিকের রাস্তা ব্যবহার করার সাহস করেনি।

রহমত আলীর সেই ঘটনার পর কেটে গেছে প্রায় পঁচিশ বছর।

সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলেছে।

কাঁচা রাস্তার জায়গায় পিচের রাস্তা হয়েছে। গ্রামের অনেকেই শহরে চলে গেছে। মোবাইল ফোন এসেছে, ইন্টারনেট এসেছে, মানুষ চাঁদে যাওয়ার গল্প করছে।

কিন্তু একটা জিনিস বদলায়নি।

কুসুমপুরের উত্তর প্রান্তের সেই আমগাছ।

আজও সূর্য ডোবার পর কেউ ওদিক দিয়ে হাঁটে না।

গ্রামের মানুষ এখনও বিশ্বাস করে—রাত বারোটার পর গাছটার ছায়া আর ছায়া থাকে না।

সেটা হাঁটতে শুরু করে।

শীতের ছুটিতে শহর থেকে কুসুমপুরে বেড়াতে এল তিন বন্ধু।

আরিফ, সায়ম আর রাতুল।

তিনজনই কলেজের ছাত্র।

তিনজনের স্বভাবও একেবারে আলাদা।

আরিফ সাহসী, কিন্তু ভয়ংকর রকমের একগুঁয়ে।

সায়ম যুক্তিবাদী। কোনো কিছু না দেখে বিশ্বাস করে না, তবে অকারণে ঝুঁকিও নেয় না।

রাতুল একটু ভীতু। তবু বন্ধুদের সঙ্গে থাকলে সাহস দেখানোর চেষ্টা করে।

আরিফদের গ্রামের বাড়িতে পৌঁছেই তারা শুনতে পেল সেই আমগাছের গল্প।

প্রথমে আরিফ হেসে উঠল।

— “এখনো মানুষ এসব বিশ্বাস করে?”

রাতুল বলল,

— “গল্পটা কিন্তু অদ্ভুত লাগছে।”

সায়ম শান্ত গলায় বলল,

— “গল্প না সত্যি, সেটা না দেখে বলা যায় না।”

সেদিন বিকেলে তিন বন্ধু গ্রামের বাজারে গেল।

চায়ের দোকানে বসে আড্ডা চলছে।

গরম চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে।

হঠাৎ আরিফ জোরে বলল,

— “আজ রাতে আমরা ওই আমগাছের কাছে যাব। ভিডিও করে ইউটিউবে ছাড়ব। গ্রামের ভূতের রহস্য ফাঁস!”

দোকানের সব কথা এক মুহূর্তে থেমে গেল।

চায়ের কাপে চুমুক দিতে থাকা লোকগুলো ধীরে ধীরে তাদের দিকে তাকাল।

কারও মুখে হাসি নেই।

শুধু অস্বস্তি।

চায়ের দোকানদার নিচু গলায় বলল,

— “বাবা… ওই কথা জোরে কইয়ো না।”

আরিফ হেসে বলল,

— “কেন? ভূত শুনে ফেলবে?”

কেউ উত্তর দিল না।

ঠিক তখনই দোকানের এক কোণে বসে থাকা এক বৃদ্ধ ধীরে ধীরে মাথা তুললেন।

সাদা দাড়ি।

কুঁচকে যাওয়া মুখ।

ঘোলাটে চোখ।

ডান হাতে তামাকের হুঁকো।

তিনি ছিলেন গ্রামের প্রবীণ মাতব্বর—

কাসেম আলী।

বৃদ্ধ একদৃষ্টে আরিফের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

এমন দৃষ্টি…

যেন তিনি আরিফকে নয়, তার ভবিষ্যৎ দেখছেন।

ধীরে ধীরে তিনি বললেন,

— “তোমরা শহরের পোলা?”

— “জি।”

— “ভূত বিশ্বাস করো না?”

আরিফ হাসল।

— “একদম না।”

বৃদ্ধও হালকা হাসলেন।

কিন্তু সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না।

ছিল এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা।

তিনি খুব ধীরে বললেন,

— “যাও… গাছে যাইতে পারো। কিন্তু একটা কথা মনে রাখবা।”

তিন বন্ধু চুপ করে রইল।

বৃদ্ধের গলা আরও নিচু হয়ে গেল।

— “যদি কোনো সুন্দর মাইয়া তোমাগো পান খাইতে দেয়…”

তিনি থামলেন।

চোখ দুটো হঠাৎ অস্বাভাবিক স্থির হয়ে গেল।

তারপর বললেন—

“কোনো অবস্থাতেই খাইবা না।”

দোকানের ভেতর যেন বাতাসও থেমে গেল।

রাতুলের বুকের ভেতর কেমন যেন কেঁপে উঠল।

কিন্তু আরিফ হো হো করে হেসে ফেলল।

— “ভূত আবার পানও খাওয়ায় নাকি?”

কাসেম আলী কোনো উত্তর দিলেন না।

বরং ধীরে ধীরে নিজের ডান হাতটা তুললেন।

তার তর্জনী আঙুল গলার ওপর রাখলেন।

তারপর…

এক টানে গলার ওপর দিয়ে আড়াআড়ি টেনে দিলেন।

যেন ধারালো ছুরি দিয়ে নিজের গলা কেটে ফেললেন।

তার চোখের দৃষ্টি তখনও আরিফের ওপর স্থির।

ফিসফিস করে বললেন—

“পান মুখে গেলে… আর মানুষ ফিরা আসে না…”

দোকান থেকে বের হওয়ার পরও কেউ কিছু বলছিল না।

শুধু আরিফ হেসেই যাচ্ছিল।

— “দেখলি? গ্রামের মানুষ কী সুন্দর গল্প বানায়!”

কিন্তু সায়মের হাসি পাচ্ছিল না।

সে একবার পেছনে তাকাল।

দেখল—

কাসেম আলী এখনও দোকানের ভেতর বসে আছেন।

কিন্তু…

তার চোখ দুটো যেন তাদের অনুসরণ করছে।

অস্বাভাবিক স্থির।

পলকহীন।

রাতুল ধীরে বলল,

— “আমার ভালো লাগতেছে না। চল, রাতে না যাই।”

আরিফ বিরক্ত হয়ে বলল,

— “ভয় পাইছিস?”

— “ভয় না… কেমন যেন লাগতেছে।”

— “আমি আজ রাতেই যামু। তোরা না গেলে আমি একলাই যামু।”

বন্ধুকে একা ছাড়তে পারল না কেউ।

অগত্যা দুজনই রাজি হয়ে গেল।

রাতের খাওয়ার সময় আরিফের দাদী খবরটা শুনে চুপ করে গেলেন।

তারপর কাঁপা হাতে ভাতের থালা নামিয়ে রেখে বললেন,

— “বাবা… যাইও না।”

— “কেন ঠাম্মা?”

বৃদ্ধা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— “যারা ওই গাছের ডাকে গেছে… কেউ আর আগের মানুষ হইয়া ফেরে নাই।”

আরিফ হেসে বলল,

— “আপনিও এসব বিশ্বাস করেন?”

দাদী কোনো উত্তর দিলেন না।

শুধু ধীরে ধীরে উঠে ঘরের কোণ থেকে একটা ছোট কাপড়ের থলি এনে আরিফের হাতে দিলেন।

ভেতরে একটা পুরোনো তাবিজ।

— “যদি যাইতেই চাস… এটা সঙ্গে রাখিস।”

আরিফ তাবিজটা হাতে নিয়ে আবার হেসে ফেলল।

কিন্তু সে খেয়াল করল না—

দাদীর চোখে তখন জল।

রাত বাড়তে লাগল।

ঘড়ির কাঁটা বারোটার দিকে এগোচ্ছে।

বাইরে অমাবস্যার ঘন অন্ধকার।

হঠাৎ…

দূরে কোথাও একটা কুকুর অস্বাভাবিকভাবে চিৎকার করে উঠল।

তারপর আরেকটা।

তারপর পুরো গ্রামজুড়ে কুকুরের কান্না।

ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের বাতিটা একবার…

দু’বার…

তিনবার…

দপদপ করে জ্বলে নিভে উঠল।

আরিফ ব্যাগে টর্চ, মোবাইল আর ক্যামেরা গুছিয়ে নিল।

সায়ম ও রাতুলও প্রস্তুত।

ঘড়িতে তখন রাত একটা।

তিন বন্ধু দরজা খুলে বাইরে পা রাখল।

দূরে…

কুসুমপুরের উত্তর প্রান্তে…

ঘন অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে সেই আমগাছ।

আর ঠিক তখনই—

হিমেল বাতাস ভেদ করে খুব ক্ষীণ একটা শব্দ ভেসে এল…

ছম… ছম… ছম…

নূপুরের শব্দ।

তিন বন্ধু একসঙ্গে থেমে গেল।

আরিফ মুচকি হেসে বলল—

“চল… দেখি আজ কে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।”

অন্ধকার যেন নিঃশব্দে তাদের গিলে ফেলল…

রহমত আলীর সেই ঘটনার পর কেটে গেছে প্রায় পঁচিশ বছর।

সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলেছে।

কাঁচা রাস্তার জায়গায় পিচের রাস্তা হয়েছে। গ্রামের অনেকেই শহরে চলে গেছে। মোবাইল ফোন এসেছে, ইন্টারনেট এসেছে, মানুষ চাঁদে যাওয়ার গল্প করছে।

কিন্তু একটা জিনিস বদলায়নি।

কুসুমপুরের উত্তর প্রান্তের সেই আমগাছ।

আজও সূর্য ডোবার পর কেউ ওদিক দিয়ে হাঁটে না।

গ্রামের মানুষ এখনও বিশ্বাস করে—রাত বারোটার পর গাছটার ছায়া আর ছায়া থাকে না।

সেটা হাঁটতে শুরু করে।

শীতের ছুটিতে শহর থেকে কুসুমপুরে বেড়াতে এল তিন বন্ধু।

আরিফ, সায়ম আর রাতুল।

তিনজনই কলেজের ছাত্র।

তিনজনের স্বভাবও একেবারে আলাদা।

আরিফ সাহসী, কিন্তু ভয়ংকর রকমের একগুঁয়ে।

সায়ম যুক্তিবাদী। কোনো কিছু না দেখে বিশ্বাস করে না, তবে অকারণে ঝুঁকিও নেয় না।

রাতুল একটু ভীতু। তবু বন্ধুদের সঙ্গে থাকলে সাহস দেখানোর চেষ্টা করে।

আরিফদের গ্রামের বাড়িতে পৌঁছেই তারা শুনতে পেল সেই আমগাছের গল্প।

প্রথমে আরিফ হেসে উঠল।

— “এখনো মানুষ এসব বিশ্বাস করে?”

রাতুল বলল,

— “গল্পটা কিন্তু অদ্ভুত লাগছে।”

সায়ম শান্ত গলায় বলল,

— “গল্প না সত্যি, সেটা না দেখে বলা যায় না।”

সেদিন বিকেলে তিন বন্ধু গ্রামের বাজারে গেল।

চায়ের দোকানে বসে আড্ডা চলছে।

গরম চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে।

হঠাৎ আরিফ জোরে বলল,

— “আজ রাতে আমরা ওই আমগাছের কাছে যাব। ভিডিও করে ইউটিউবে ছাড়ব। গ্রামের ভূতের রহস্য ফাঁস!”

দোকানের সব কথা এক মুহূর্তে থেমে গেল।

চায়ের কাপে চুমুক দিতে থাকা লোকগুলো ধীরে ধীরে তাদের দিকে তাকাল।

কারও মুখে হাসি নেই।

শুধু অস্বস্তি।

চায়ের দোকানদার নিচু গলায় বলল,

— “বাবা… ওই কথা জোরে কইয়ো না।”

আরিফ হেসে বলল,

— “কেন? ভূত শুনে ফেলবে?”

কেউ উত্তর দিল না।

ঠিক তখনই দোকানের এক কোণে বসে থাকা এক বৃদ্ধ ধীরে ধীরে মাথা তুললেন।

সাদা দাড়ি।

কুঁচকে যাওয়া মুখ।

ঘোলাটে চোখ।

ডান হাতে তামাকের হুঁকো।

তিনি ছিলেন গ্রামের প্রবীণ মাতব্বর—

কাসেম আলী।

বৃদ্ধ একদৃষ্টে আরিফের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

এমন দৃষ্টি…

যেন তিনি আরিফকে নয়, তার ভবিষ্যৎ দেখছেন।

ধীরে ধীরে তিনি বললেন,

— “তোমরা শহরের পোলা?”

— “জি।”

— “ভূত বিশ্বাস করো না?”

আরিফ হাসল।

— “একদম না।”

বৃদ্ধও হালকা হাসলেন।

কিন্তু সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না।

ছিল এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা।

তিনি খুব ধীরে বললেন,

— “যাও… গাছে যাইতে পারো। কিন্তু একটা কথা মনে রাখবা।”

তিন বন্ধু চুপ করে রইল।

বৃদ্ধের গলা আরও নিচু হয়ে গেল।

— “যদি কোনো সুন্দর মাইয়া তোমাগো পান খাইতে দেয়…”

তিনি থামলেন।

চোখ দুটো হঠাৎ অস্বাভাবিক স্থির হয়ে গেল।

তারপর বললেন—

“কোনো অবস্থাতেই খাইবা না।”

দোকানের ভেতর যেন বাতাসও থেমে গেল।

রাতুলের বুকের ভেতর কেমন যেন কেঁপে উঠল।

কিন্তু আরিফ হো হো করে হেসে ফেলল।

— “ভূত আবার পানও খাওয়ায় নাকি?”

কাসেম আলী কোনো উত্তর দিলেন না।

বরং ধীরে ধীরে নিজের ডান হাতটা তুললেন।

তার তর্জনী আঙুল গলার ওপর রাখলেন।

তারপর…

এক টানে গলার ওপর দিয়ে আড়াআড়ি টেনে দিলেন।

যেন ধারালো ছুরি দিয়ে নিজের গলা কেটে ফেললেন।

তার চোখের দৃষ্টি তখনও আরিফের ওপর স্থির।

ফিসফিস করে বললেন—

“পান মুখে গেলে… আর মানুষ ফিরা আসে না…”

দোকান থেকে বের হওয়ার পরও কেউ কিছু বলছিল না।

শুধু আরিফ হেসেই যাচ্ছিল।

— “দেখলি? গ্রামের মানুষ কী সুন্দর গল্প বানায়!”

কিন্তু সায়মের হাসি পাচ্ছিল না।

সে একবার পেছনে তাকাল।

দেখল—

কাসেম আলী এখনও দোকানের ভেতর বসে আছেন।

কিন্তু…

তার চোখ দুটো যেন তাদের অনুসরণ করছে।

অস্বাভাবিক স্থির।

পলকহীন।

রাতুল ধীরে বলল,

— “আমার ভালো লাগতেছে না। চল, রাতে না যাই।”

আরিফ বিরক্ত হয়ে বলল,

— “ভয় পাইছিস?”

— “ভয় না… কেমন যেন লাগতেছে।”

— “আমি আজ রাতেই যামু। তোরা না গেলে আমি একলাই যামু।”

বন্ধুকে একা ছাড়তে পারল না কেউ।

অগত্যা দুজনই রাজি হয়ে গেল।

রাতের খাওয়ার সময় আরিফের দাদী খবরটা শুনে চুপ করে গেলেন।

তারপর কাঁপা হাতে ভাতের থালা নামিয়ে রেখে বললেন,

— “বাবা… যাইও না।”

— “কেন ঠাম্মা?”

বৃদ্ধা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— “যারা ওই গাছের ডাকে গেছে… কেউ আর আগের মানুষ হইয়া ফেরে নাই।”

আরিফ হেসে বলল,

— “আপনিও এসব বিশ্বাস করেন?”

দাদী কোনো উত্তর দিলেন না।

শুধু ধীরে ধীরে উঠে ঘরের কোণ থেকে একটা ছোট কাপড়ের থলি এনে আরিফের হাতে দিলেন।

ভেতরে একটা পুরোনো তাবিজ।

— “যদি যাইতেই চাস… এটা সঙ্গে রাখিস।”

আরিফ তাবিজটা হাতে নিয়ে আবার হেসে ফেলল।

কিন্তু সে খেয়াল করল না—

দাদীর চোখে তখন জল।

রাত বাড়তে লাগল।

ঘড়ির কাঁটা বারোটার দিকে এগোচ্ছে।

বাইরে অমাবস্যার ঘন অন্ধকার।

হঠাৎ…

দূরে কোথাও একটা কুকুর অস্বাভাবিকভাবে চিৎকার করে উঠল।

তারপর আরেকটা।

তারপর পুরো গ্রামজুড়ে কুকুরের কান্না।

ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের বাতিটা একবার…

দু’বার…

তিনবার…

দপদপ করে জ্বলে নিভে উঠল।

আরিফ ব্যাগে টর্চ, মোবাইল আর ক্যামেরা গুছিয়ে নিল।

সায়ম ও রাতুলও প্রস্তুত।

ঘড়িতে তখন রাত একটা।

তিন বন্ধু দরজা খুলে বাইরে পা রাখল।

দূরে…

কুসুমপুরের উত্তর প্রান্তে…

ঘন অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে সেই আমগাছ।

আর ঠিক তখনই—

হিমেল বাতাস ভেদ করে খুব ক্ষীণ একটা শব্দ ভেসে এল…

ছম… ছম… ছম…

নূপুরের শব্দ।

তিন বন্ধু একসঙ্গে থেমে গেল।

আরিফ মুচকি হেসে বলল—

“চল… দেখি আজ কে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।”

রাত তখন একটা পেরিয়ে গেছে।

কুসুমপুর গ্রামটা যেন মৃত।

কোথাও কোনো মানুষের শব্দ নেই। দূরের বাঁশঝাড়ও আজ অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ। কুকুরের কান্নাও থেমে গেছে।

শুধু তিনটি টর্চের আলো অন্ধকার চিরে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে গ্রামের উত্তর প্রান্তের দিকে।

আরিফ সামনে।

তার ঠিক পেছনে সায়ম।

সবশেষে রাতুল।

যতই তারা আমগাছটার দিকে এগোচ্ছে, বাতাস ততই ঠান্ডা হয়ে উঠছে।

সায়ম কাঁপা গলায় বলল,

— “এত ঠান্ডা কেন লাগতেছে?”

আরিফ হেসে বলল,

— “মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার। ভয় পেলে শরীর এমনই লাগে।”

রাতুল কোনো কথা বলল না।

তার বুকের ভেতরটা অকারণ ধড়ফড় করছিল।

হঠাৎ…

তাদের তিনজনের মোবাইলের নেটওয়ার্ক একসঙ্গে উধাও হয়ে গেল।

মোবাইলের স্ক্রিনে লেখা উঠল—

No Service

ঠিক সেই মুহূর্তেই তিনটি টর্চের আলো একসঙ্গে ম্লান হয়ে গেল।

বাতাসে ভেসে এল এক অদ্ভুত গন্ধ।

আতর…

পচা মাংস…

আর ভেজা মাটির গন্ধ।

গন্ধটা যেন নাকে নয়, সরাসরি মাথার ভেতর ঢুকে যাচ্ছে।

কয়েক কদম এগোতেই সামনে দেখা গেল সেই আমগাছ।

দিনের বেলায় যত বড় মনে হয়, রাতে যেন তার দ্বিগুণ।

ডালগুলো অন্ধকারে এমনভাবে নড়ছে, যেন অসংখ্য হাত ধীরে ধীরে তাদের দিকে বাড়িয়ে দিচ্ছে।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—

বাতাস একেবারেই নেই।

তবুও পাতাগুলো কাঁপছে।

সায়ম ফিসফিস করে বলল,

— “চল ফিরে যাই…”

আরিফ উত্তর দিল না।

সে মোবাইলের ক্যামেরা অন করল।

ফ্ল্যাশ জ্বলে উঠতেই গাছের গায়ে মুহূর্তের জন্য একটা ছায়া দেখা গেল।

মানুষের মতো।

আবার মিলিয়ে গেল।

রাতুল গিলল।

তার মনে হলো—

কেউ যেন তাদের দেখছে।

খুব কাছ থেকে।

ঠিক তখনই…

ছম… ছম… ছম…

নূপুরের শব্দ।

এত স্পষ্ট, যেন তাদের পাশ দিয়েই কেউ হাঁটছে।

তিনজনই চারদিকে আলো ফেলল।

কেউ নেই।

কিন্তু শব্দটা থামছে না।

বরং ধীরে ধীরে কাছে আসছে।

ছম… ছম… ছম…

তারপর…

অন্ধকারের ভেতর থেকে একটি মেয়ে বেরিয়ে এল।

তাকে দেখে তিনজনই হতভম্ব।

এত সুন্দর মানুষ তারা আগে কখনও দেখেনি।

সাদা পাড় লাল শাড়ি।

কোমর ছাপানো কালো চুল।

কপালে বড় লাল টিপ।

পায়ে রুপোর নূপুর।

তার ঠোঁটে এক অপার্থিব হাসি।

চাঁদের আলো না থাকলেও তাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

যেন অন্ধকার নিজেই তাকে আলো দিয়ে ঘিরে রেখেছে।

সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।

তার চোখে ছিল এক অদ্ভুত মায়া।

মেয়েটি মিষ্টি গলায় বলল,

— “এত রাতে আমার বাড়িতে আইছো?”

তিন বন্ধু কোনো উত্তর দিতে পারল না।

মেয়েটি আবার বলল,

— “অতিথি আইলে খালি মুখে ফিরানো পাপ…”

তার দুই হাতে তখন একটি পিতলের পানের বাটা।

সেখানে সুন্দর করে সাজানো একটি খিলি পান।

সুগন্ধে চারপাশ ভরে গেল।

হঠাৎ সায়মের মনে পড়ে গেল কাসেম আলীর কথা।

“যদি কোনো সুন্দর মাইয়া পান খাইতে দেয়… কোনো অবস্থাতেই খাইবা না।”

তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

সে চিৎকার করে উঠল—

— “আরিফ! হাত দিবি না!”

রাতুলও কাঁপা গলায় বলল—

— “চল… চল এখান থেইকা যাই!”

কিন্তু আরিফ যেন তাদের কথা শুনতেই পেল না।

তার চোখ দুটো স্থির হয়ে গেছে।

সে শুধু সেই মেয়েটির দিকেই তাকিয়ে আছে।

মেয়েটি ধীরে ধীরে পানের খিলিটা তার দিকে বাড়িয়ে দিল।

মৃদু হেসে বলল—

— “খাও… অনেক ভালোবাসা দিয়া সাজাইছি…”

আরিফ যেন সম্মোহিত হয়ে গেল।

সে ধীরে ধীরে হাত বাড়াল।

সায়ম ছুটে এসে তাকে টেনে ধরল।

কিন্তু যেন পাথরের মূর্তি।

নড়ল না।

রাতুল তার কাঁধ ঝাঁকাতে লাগল।

কোনো লাভ হলো না।

মেয়েটি এবার ফিসফিস করে বলল—

— “খাও…”

আরিফ পানের খিলিটা মুখে পুরে দিল।

ঠিক সেই মুহূর্তে…

পুরো পৃথিবী যেন থেমে গেল।

নূপুরের শব্দ থেমে গেল।

ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক নেই।

বাতাস নেই।

কিছুই নেই।

শুধু…

চিবানোর শব্দ।

কচ…

কচ…

কচ…

আরিফ মুখ বিকৃত করল।

তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

সে যেন কিছু একটা বুঝতে পারল।

ধীরে ধীরে নিচের দিকে তাকাল।

তার হাতে ধরা পানের পাতাটা নেই।

সেখানে নড়ছে সাদা সাদা অসংখ্য পোকা।

তার মুখের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে কালচে রক্ত।

সে বমি করতে শুরু করল।

মাটিতে পড়ল…

পচা মাংস…

চুল…

আর অসংখ্য কিলবিল করা কীট।

সায়ম কাঁপতে কাঁপতে আলো ফেলল সেই মেয়েটির মুখে।

তারপর…

তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না।

মেয়েটির সুন্দর মুখটা ধীরে ধীরে গলতে শুরু করেছে।

চামড়া খসে পড়ছে।

চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে এসেছে।

ঠোঁট ছিঁড়ে কান পর্যন্ত উঠে গেছে।

গলায় এখনও ঝুলছে পুরোনো দড়ির ফাঁস।

মুখের ভেতর দাঁত নয়—

শুধু ধারালো কালো কাঁটা।

সে হাসছে।

খুব আস্তে।

খুব ধীরে।

“হি… হি… হি…”

তারপর সেই হাসি মুহূর্তের মধ্যে বিকট অট্টহাসিতে পরিণত হলো।

আমগাছের প্রতিটি ডাল থেকে যেন একই হাসি ফিরে আসতে লাগল।

“হি… হি… হি… হি…”

পুরো কুসুমপুর কেঁপে উঠল।

সায়ম আর রাতুল আতঙ্কে পিছিয়ে গেল।

আরিফ তখন মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে কাঁপছে।

সে ফিসফিস করে বলল—

— “আমারে… বাঁচা…”

মনিকা ধীরে ধীরে তার সামনে ঝুঁকে এল।

তার বরফঠান্ডা আঙুল আরিফের থুতনিতে ছুঁইয়ে মৃদু হেসে বলল—

“আমার বাড়ির পান… কেমন লাগল?”

ঠিক তখনই…

আমগাছের ওপর থেকে একসঙ্গে শত শত নূপুরের শব্দ ভেসে এল।

ছম… ছম… ছম…

মনে হলো—

গাছের প্রতিটি ডালে আরেকজন করে মনিকা দাঁড়িয়ে আছে।

তাদের সবার চোখ জ্বলছে।

আর সবাই একসঙ্গে তাকিয়ে আছে…

আরিফের দিকে।

মনিকার মুখ থেকে বের হওয়া সেই বিকট হাসি যেন পুরো কুসুমপুর গ্রামকে কাঁপিয়ে দিল।

“হি… হি… হি… হি…”

সেই হাসির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমগাছের প্রতিটি ডাল দুলতে শুরু করল।

কিন্তু বাতাস ছিল না।

একটুও না।

তবুও গাছটা এমনভাবে কাঁপছিল, যেন তার ভেতরে শত শত মানুষ একসঙ্গে নড়াচড়া করছে।

আরিফ তখন মাটিতে পড়ে ছটফট করছে।

তার চোখ দুটো রক্তবর্ণ হয়ে উঠেছে।

মুখ দিয়ে কালো রক্ত বেরিয়ে এসে মাটিতে পড়ছে।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—

রক্তের এক ফোঁটাও মাটিতে ছড়িয়ে পড়ছে না।

আমগাছের শিকড়গুলো যেন জীবন্ত সাপের মতো নড়ে উঠল।

ধীরে ধীরে কালো রক্তগুলো শুষে নিতে লাগল।

মনে হচ্ছিল…

গাছটা রক্ত পান করছে।

সায়ম কাঁপা গলায় চিৎকার করে উঠল,

— “আরিফ! উঠ! পালা!”

সে বন্ধুর হাত ধরতে গেল।

কিন্তু তার হাত মাঝপথেই থেমে গেল।

কারণ…

আরিফের দুই পা মাটির নিচে ঢুকে যাচ্ছে।

মাটি নয়…

শিকড়।

মোটা, কালো শিকড়গুলো তার পা জড়িয়ে ধরে ধীরে ধীরে টেনে নিচ্ছে।

আরিফ প্রাণপণে চিৎকার করল,

— “বাঁচা… আমাকে বাঁচা…”

রাতুল ছুটে গিয়ে তাকে টেনে ধরল।

সায়মও সাহায্য করল।

দু’জনে মিলে সমস্ত শক্তি দিয়ে টানছে।

কিন্তু যেন উল্টো দিক থেকে দশজন মানুষ আরিফকে টানছে।

ঠিক তখন…

মনিকা ধীরে ধীরে তাদের সামনে এসে দাঁড়াল।

তার গলায় ঝুলে থাকা দড়িটা বাতাস ছাড়াই দুলছে।

সে মিষ্টি গলায় বলল—

— “যারে আমি ডাকি… তারে কেউ নিয়া যাইতে পারে না…”

তারপর সে এক আঙুল তুলে আরিফের কপালে স্পর্শ করল।

মুহূর্তের মধ্যে আরিফের চিৎকার থেমে গেল।

তার পুরো শরীর শক্ত হয়ে গেল।

চোখ দুটো বিস্ফারিত।

মুখ খোলা।

যেন মৃত্যুর আগের মুহূর্তে সে এমন কিছু দেখেছে, যা ভাষায় বলা যায় না।

হঠাৎ…

মট…!

একটা হাড় ভাঙার শব্দ।

তারপর আরেকটা।

মট…!

মট…!

মট…!

আরিফের হাত-পা একে একে উল্টো দিকে মুচড়ে যেতে লাগল।

হাতের হাড় ভেঙে কনুই পেছনের দিকে ঘুরে গেল।

ঘাড়টা ধীরে ধীরে ঘুরতে ঘুরতে প্রায় পুরো উল্টো হয়ে গেল।

তার চোখ থেকে টপ… টপ… করে রক্ত ঝরতে লাগল।

সায়ম আর রাতুল আর দেখতে পারল না।

তারা প্রাণপণে দৌড় দিল।

কিন্তু যতই দৌড়ায়…

তারা যেন একই জায়গায় ফিরে আসছে।

আবার সেই আমগাছ।

আবার সেই বাড়ি।

আবার সেই হাসি।

চারদিক থেকে ভেসে আসছে—

“পালাইয়া কই যাইবা…?”

হঠাৎ তাদের সামনে এসে দাঁড়াল…

কাসেম আলী।

সেই বৃদ্ধ মাতব্বর।

হাতে হুঁকো।

মুখে শান্ত হাসি।

রাতুল হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

— “চাচা! আমাদের বাঁচান!”

বৃদ্ধ কোনো কথা বললেন না।

শুধু ধীরে ধীরে বললেন—

— “আমি তো আগেই কইছিলাম… পান খাইতে নাই…”

তারপর তিনি মুখ তুলে আমগাছটার দিকে তাকালেন।

নরম গলায় বললেন—

— “মনিকা… এই দুইডারে ছাড়।”

কয়েক সেকেন্ড…

সব নিস্তব্ধ।

তারপর আমগাছের ওপর থেকে ভেসে এল সেই ভয়ংকর কণ্ঠ—

— “আপনের কথা আমি কখনো ফেলি নাই…”

মনিকার কণ্ঠে যেন এক অদ্ভুত শ্রদ্ধা।

পরমুহূর্তেই কাসেম আলী নিজের চোখ বন্ধ করলেন।

ধীরে ধীরে ডান হাতের তর্জনীটা গলার ওপর বুলিয়ে দিলেন।

যেমনটা তিনি চায়ের দোকানে করেছিলেন।

হঠাৎ…

তার গলার ওপর নিজে থেকেই একটা গভীর কাটা দাগ ফুটে উঠল।

রক্ত বের হতে লাগল।

বৃদ্ধ মাটিতে পড়ে গেলেন।

শেষ নিঃশ্বাস ছাড়ার আগে শুধু বললেন—

— “আজ… আমার পালা শেষ…”

ঠিক সেই মুহূর্তে চারপাশের সব শব্দ ফিরে এল।

ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক।

বাতাস।

দূরের কুকুরের ঘেউ-ঘেউ।

সায়ম আর রাতুল বুঝতে পারল—

তারা মুক্ত।

পেছনে না তাকিয়েই প্রাণপণে দৌড়ে গ্রামে ফিরে গেল।

পরদিন সকাল।

সূর্যের আলোয় গ্রামের মানুষ জড়ো হলো সেই পরিত্যক্ত বাড়ির উঠোনে।

সেখানে পড়ে আছে আরিফের নিথর দেহ।

তার শরীরের প্রতিটি হাড় উল্টো দিকে মুচড়ে গেছে।

ঘাড় সম্পূর্ণ পেছনের দিকে ঘুরে আছে।

ঠোঁটের কোণ দিয়ে কালচে রক্ত শুকিয়ে আছে।

কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়…

তার ডান হাতে এখনও শক্ত করে ধরা একটি পানের খিলি।

গ্রামের একজন সাহস করে সেটি তুলতে গেল।

কিন্তু হাতে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটা শুকনো বটপাতায় পরিণত হয়ে ধুলো হয়ে উড়ে গেল।

লোকজন তখন কাসেম আলীর বাড়িতে ছুটে গেল।

দরজা ভেতর থেকে বন্ধ।

ভেঙে ঢুকে সবাই স্তব্ধ।

বৃদ্ধ নিজের খাটে শুয়ে আছেন।

মুখে শান্ত হাসি।

কিন্তু…

তার গলার ওপর সেই একই কাটা দাগ।

ঠিক যেমনটা তিনি আগের রাতে নিজের হাতে দেখিয়েছিলেন।

গ্রামের সবচেয়ে বয়স্ক মানুষটি তখন কাঁপা গলায় বললেন,

— “কাসেম একা মানুষ ছিল না…”

সবাই অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।

বৃদ্ধ বললেন,

— “মনিকার মৃত্যুর রাতে ও বাঁচাইতে গেছিল। পারে নাই। সেই থেইকা প্রতি বছর অমাবস্যায় নিজের জীবন দিয়া গ্রামের আরেকটা জীবন বাঁচাইত। গতরাতে ওর দায় শেষ হইছে…”

সেই কথার পর আর কেউ কিছু বলতে পারেনি।

বহু বছর কেটে গেছে।

আজও কুসুমপুরের উত্তর প্রান্তে সেই আমগাছ দাঁড়িয়ে আছে।

বাড়িটাও আছে।

আগের মতোই পরিত্যক্ত।

অমাবস্যার রাতে এখনও কেউ সেই পথে যায় না।

তবু মাঝেমধ্যে দূর থেকে ভেসে আসে…

ছম… ছম… ছম…

নূপুরের শব্দ।

আর কোনো সাহসী মানুষ যদি কৌতূহলবশত সেই শব্দ অনুসরণ করে…

তাহলে সে দেখতে পায়—

সাদা পাড় লাল শাড়ি পরা এক অপরূপ সুন্দরী তরুণী।

তার হাতে রুপোর পানের বাটা।

সে মিষ্টি হেসে বলে—

“অতিথি আইছেন…? একটা পান খাইয়া যান…”

গ্রামের মানুষ বলে—

যে সেই ডাকে সাড়া দেয়…

সে আর কোনোদিন নিজের ঘরে ফিরে আসে না।

কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর কথাটা খুব কম মানুষই জানে।

প্রতি অমাবস্যায় আমগাছটার গায়ে নতুন করে একটা দড়ির দাগ দেখা যায়।

যেন…

গাছটা এখনও কাউকে ঝুলিয়ে রাখার জন্য অপেক্ষা করছে।

দূরে কোথাও আবার নূপুর বেজে ওঠে—

ছম… ছম… ছম…

তারপর…

নিস্তব্ধতা।

এমন এক নিস্তব্ধতা…

যেখানে মনে হয়, ঠিক আপনার পেছনে দাঁড়িয়ে কেউ খুব আস্তে ফিসফিস করে বলছে—

“আমারে… একটু নামাইয়া দিবেন…?”