ঢাকাবুধবার , ১৫ এপ্রিল ২০২৬
  1. Bangla
  2. chomoknews
  3. English
  4. অপরাধ
  5. অভিনন্দন
  6. আমাদের তথ্য
  7. কবিতা
  8. কর্পরেট
  9. কাব্য বিলাস
  10. কৃষি সংবাদ
  11. খুলনা
  12. খোলামত
  13. গল্প
  14. গাইড
  15. গ্রামবাংলার খবর

আতা গাছে কারা কথা কয়

admin
এপ্রিল ১৫, ২০২৬ ৮:৩৯ অপরাহ্ণ
Link Copied!

আতা গাছে কারা কথা কয়

– রাহুল রাজ

স্রোতেরকোলা গ্রামের একদম দক্ষিণ প্রান্তে, যেখানে বাওড়ের একটা সরু খাঁড়ি এসে মরা খালের মতো মিশেছে, সেখানেই নিবারণ চক্কোত্তির পুরনো ভিটে। ভিটে এখন জঙ্গল। সেই জঙ্গলের ঠিক মাঝখানে এক বিশাল আতা গাছ। আতা ফলে ভারি হয়ে ঝুলে থাকে ডালগুলো, কিন্তু সেই আতা গ্রামের কেউ ছোঁয় না। গ্রামের বুড়োরা বলে, “ও গাছে আতা ফলে না রে পাগলা, ওগুলো সব অভিশপ্ত আত্মা।”

স্রোতেরকোলা গ্রামের ছেলে মহেশ এসব বিশ্বাস করে না। সে শহরে পড়াশোনা করে, যুক্তিবাদ আর বিজ্ঞানে তার অগাধ আস্থা। এবার ছুটিতে বাড়ি এসে তার জেদ চাপল—এই ‘আতা গাছের রহস্য’ তাকে ভেদ করতেই হবে। তার সঙ্গে জুটেছে গ্রামের দুই ছোটবেলার বন্ধু—পরেশ আর রতন। পরেশ একটু ভীতু স্বভাবের, কিন্তু রতনের গায়ে অসুরের শক্তি। রতন আবার কুঠার চালাতে ওস্তাদ, সে পণ করেছে ওই বুড়ো গাছটা সে কেটেই ছাড়বে।

রাত তখন এগারোটা। কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী। স্রোতেরকোলা গ্রাম যেন ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে আছে। মহেশের হাতে একটা শক্তিশালী ফ্ল্যাশলাইট। তিন বন্ধু নিঃশব্দে নিবারণ চক্কোত্তির ভিটের দিকে এগোচ্ছে।

রতনের কাঁধে একটা চকচকে কুঠার। সে ফিসফিস করে বলল, “মহেশ, কাজটা কি ভালো হচ্ছে? দাদু বলত, ওই আতা গাছে রাতে নাকি কারা কথা কয়।”

মহেশ তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল, “আরে ওগুলো বাতাসের শব্দ। তোরা তো বিজ্ঞানের যুগকেও মানিস না। আজ এই গাছ কাটলে অন্তত গ্রামের মানুষের ভয়টা কাটবে।”

ভিটের কাছাকাছি আসতেই বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে গেল। পচা পাতার গন্ধ ছাপিয়ে এক অদ্ভুত মিষ্টি গন্ধ নাকে আসছে। ঠিক যেন পাকা আতা ফলের গন্ধ। কিন্তু সেই গন্ধে একটা বমির উদ্রেক করা উগ্রতা আছে। ঠিক যেমন মড়া পচার গন্ধ চাপা দিতে ধুনো জ্বালানো হয়।

জঙ্গলের ভেতর ঢুকতেই মহেশের হাতের টর্চের আলোটা কাঁপা শুরু করল। সামনেই সেই বিশাল আতা গাছ। দিনের বেলাতেও গাছটা দেখতে অদ্ভুত, যেন ডালপালাগুলো কঙ্কালের হাতের মতো চারদিকে ছড়িয়ে আছে। কিন্তু রাতের অন্ধকারে সেই দৃশ্য আরও ভয়ানক। মহেশ দেখল, গাছের ডাল থেকে অসংখ্য বড় বড় আতা ঝুলে আছে।

হঠাৎ পরেশ মহেশের হাত চেপে ধরল। “শুনতে পাচ্ছিস?”

মহেশ টর্চটা নিভিয়ে দিল। চারপাশ নিস্তব্ধ। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকও যেন থেমে গেছে। কিন্তু তারপরই কানে এল শব্দটা। খুব মিহি, চাপা খিলখিল হাসি। মনে হচ্ছে গাছের মগডাল থেকে ভেসে আসছে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো শব্দটা ঠিক মাটির তলা থেকে আসছে।

“আতা গাছে… কারা কথা কয়?” একটা খসখসে গলা শোনা গেল। মনে হলো যেন কোনো বৃদ্ধ মানুষ অনেক বছর পর কথা বলছে।

মহেশ আবার টর্চ জ্বালাতেই আর্তনাদ করে উঠল পরেশ। টর্চের আলোয় দেখা গেল, গাছের ডাল থেকে ঝুলে থাকা আতাগুলো আর আতা নেই! সেগুলো একেকটা মানুষের মাথার খুলি! সেই খুলিগুলোর গা আতা ফলের মতো এবড়োখেবড়ো শাঁসে ঢাকা, কিন্তু কোটর থেকে জ্বলজ্বল করছে নীলচে আলো। দাঁত বের করে খুলিগুলো যেন হাসছে।

“মহেশ! ওগুলো আতা নয়! ওগুলো সব মানুষের মাথা!” পরেশ ভয়ে কাঁদতে শুরু করল।

রতন হঠাৎ খেপে উঠল। সে কুঠার উঁচিয়ে গাছের গুঁড়িতে এক কোপ মারল। “দেখি কত বড় শয়তান এই গাছ!”

কিন্তু কোপ লাগার সঙ্গে সঙ্গে গাছ থেকে কাঠ কুচিয়ে বেরোল না, বরং ফিনকি দিয়ে টকটকে লাল গরম রক্ত ছিটকে এল রতনের মুখে। রতন যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল। মহেশ দেখল, রতনের মুখের যেখানে যেখানে রক্ত লেগেছে, সেখানে চামড়া ফুলে উঠে আতা ফলের মতো গুটি গুটি হয়ে যাচ্ছে।

গাছের মগডাল থেকে সেই খুলিগুলো এবার কথা বলে উঠল। “তোর মতোই কুঠার নিয়ে এসেছিল মাধব… ওই দেখ উপরে ঝুলে আছে।” মহেশ টর্চের আলো ওপরে ফেলতেই দেখল, একটা খুলির পাশে একটা হাতুড়ি ঝুলে আছে। ওটা গ্রামের কামার মাধবের, যে দশ বছর আগে নিখোঁজ হয়েছিল।

“আমরা এই গাছ কাটতে এসেছিলাম রে মহেশ… এখন আমরাই আতা ফল!” খুলিগুলো একসঙ্গে হেসে উঠল।

রতন তখন মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। তার শরীরটা অদ্ভুতভাবে কুঁচকে ছোট হয়ে যাচ্ছে। তার গায়ের চামড়া সবুজাভ হয়ে ফেটে যাচ্ছে। মহেশ দেখল, রতনের পায়ের নিচ থেকে শেকড় বেরিয়ে তার শরীরটাকে পেঁচিয়ে ধরছে। রতন চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু তার মুখটা ততক্ষণে আতা ফলের মতো এবড়োখেবড়ো হয়ে বন্ধ হয়ে গেছে।

একটা কালো লিকলিকে হাড়সর্বস্ব হাত গাছ থেকে নেমে এল। হাতটা রতনকে হিড়হিড় করে ওপরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। মহেশ আর পরেশ যখন দৌড়ে পালাবে, তখন দেখল গাছের ডালপালাগুলো জ্যান্ত হয়ে তাদের পথ আটকেছে।

“রতন কথা কয় না কেন? রতন আতা হবে!” খুলিগুলো সমস্বরে বিড়বিড় করতে লাগল।

পরেশ কোনোমতে ডালপালার ফাঁক দিয়ে অন্ধকারে গা ঢাকা দিল। কিন্তু মহেশ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে দেখল, রতনের মাথাটা এখন গাছের সবথেকে নীচের ডালে ঝুলছে। রতনের চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে নীল আলো দিচ্ছে। রতন এখন আর মানুষ নয়, রতন এখন এই গাছের একটি আতা ফল।

মহেশ নিজের সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু দেখল তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। তার বুক চেপে ধরছে এক অদৃশ্য শীতল হাত।

অন্ধকার কেটে পুব আকাশ যখন সবে ফ্যাকাশে হতে শুরু করেছে, স্রোতেরকোলা গ্রামের মানুষ নিবারণ চক্কোত্তির ভিটের সামনে মহেশকে পড়ে থাকতে দেখে। মহেশের চুল রাতারাতি সাদা হয়ে গেছে। সে শুধু একদৃষ্টিতে সেই আতা গাছটার দিকে তাকিয়ে আছে।

পরেশকে পাওয়া গেল বাওড়ের ধারে, সে তখনো উন্মাদগ্রস্তের মতো বলে যাচ্ছে, “পাখি কথা কয় না, মানুষের মাথা কথা কয়!”

কিন্তু রতন? রতন আর কোনোদিন বাড়ি ফেরেনি। তবে গ্রামের সেই নিস্তব্ধ ভিটের আতা গাছে এখন একটি নতুন আতা ফলেছে। সেই আতা ফলটি দেখতে অবিকল মানুষের মুখমণ্ডলের মতো। রাতের অন্ধকারে সেই বিশেষ ‘আতা ফলটি’ থেকে নাকি আজও ফিসফিসে গলায় শোনা যায়— “মহেশ… কুঠারটা নিয়ে আয় তো… আতাগুলো খুব মিষ্টি…”

স্রোতেরকোলা গ্রামের সেই ভিটে এখন চিরকালের মতো পরিত্যক্ত। ওই আতা গাছে এখন মোট তেরোটি আতা ঝুলে থাকে। যারা যারা কুঠার নিয়ে ওই গাছ কাটতে গিয়েছিল, তারা সবাই এখন ওই গাছের ডালে ডালে মানুষের মাথার খুলি হয়ে কথা কয়। শুধু বাতাস বইলে সেই ডালপালার ঘর্ষণে ভেসে আসে এক বিকৃত ছড়া— “আতা গাছে… কারা… কথা কয়…”