দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতেই দশ বছরের রম্যর মাথার ভেতর মহাকাশের রকেট চালুর মতো অদ্ভুত এক সাইরেন বেজে উঠল। ওর মাথায় যখন কোনো আইডিয়া আসে, তখন আশেপাশের পৃথিবীটা হঠাৎ শান্ত থেকে তুফান তোলার জন্য প্রস্তুত হয়।
আজকের অভিযান—উঠোনের বিশাল পুরোনো আমগাছটার মগডালে একটা গোপন ‘গ্যালাক্সি স্টেশন’ তৈরি করা।
আর এই দুর্দান্ত বুদ্ধিটা কিন্তু রম্যর নিজের পেটে তৈরি হয়নি। এর পেছনে আছেন চাচা রাসা! পেশায় তিনি একজন মহাকাশ ও বিজ্ঞান কল্পকাহিনী লেখক। বিকেলে যখন তিনি বারান্দায় বসে ধোঁয়া ওঠা চায়ে চুমুক দিতে দিতে তাঁর নতুন বইয়ের পাণ্ডুলিপি লেখেন, তখন তাঁর চারপাশে এক রহস্যময় মহাবিশ্ব ভেসে ওঠে। গত সপ্তাহেই তো চাচা তাঁর লেখা বই থেকে পড়ে শোনালেন, “বুঝলি রম্য, গ্রহাণুপুঞ্জের ভেতরে যে লাল গ্রহটা আছে, তার ধূলিঝড়ে একবার যদি কোনো স্পেসশিপ আটকা পড়ে, তবে সেখান থেকে বের হতে চাই শক্ত কন্ট্রোল রুম আর একজন চটপটে ক্যাপ্টেন!” চাচার লেখা গল্পে শনি গ্রহের বরফ বলয় আর মঙ্গল গ্রহের ধূলিঝড়ের রোমাঞ্চকর অভিযানের কথা শোনার পর থেকেই রম্য নিজেকে নাসার প্রধান বিজ্ঞানী আর ক্যাপ্টেনের সংমিশ্রণ ভাবতে শুরু করেছে।
আজ মা রান্নাঘরে ব্যস্ত থাকতেই রম্য চুপিচুপি জোগাড় করে ফেলল অভিযানের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র—একটা পুরোনো কাঠের পিঁড়ি, দুটো বড় প্লাস্টিকের পানির বোতল, লাল রঙের দড়ি, আর বড় ভাই রাজ্যের পুরোনো স্পোর্টস ঘড়িটা, যেটা বন্ধ হয়ে পড়েছিল।
গাছের মধ্যখানের একটা চওড়া ডালে কাঠের পিঁড়িটা লাল দড়ি দিয়ে কষে বাঁধল রম্য। পানির বোতল দুটি পিঠে বেঁধে তৈরি হলো ‘রকেট প্রোপালশন থার্স্টার’।
কিন্তু বিপদের সূত্রপাত হলো ঠিক তখনই, যখন নিচ থেকে ভেসে এলো গম্ভীর এক অদ্ভুত শব্দ—”হুমম, তা গ্যালাক্সি স্টেশনের দড়িটা কি কেবল একটা সাধারণ গিঁটেই আঁটকানো?”
ঝাটকা মেরে নিচে তাকাতেই রম্যর বুকটা ‘ছ্যাঁৎ’ করে উঠল। গাছের নিচে হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বড় বোন পূণ্য! ওর চোখে-মুখে গভীর গোয়েন্দাগিরির ছাপ। পূণ্য হচ্ছে রম্যর একদম উল্টো— ইংরাজী সাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা করলেও বিজ্ঞানের বই গিলে খাওয়া এক অলিখিত গবেষক।
পূণ্য একটা বড় খাতা আর কলম উঁচিয়ে বলল, “রম্য, তোর ব্যাকপ্যাকের থার্স্টারে কিন্তু মারাত্মক লিক! ওভাবে রকেট উড়ালে গ্যালাক্সিতে পৌঁছানোর আগেই উঠোনের খড়কুটোর ওপর ক্র্যাশ ল্যান্ডিং করবি।”
“তুমি কিচ্ছু জানো না পূণ্যদি! রাসা চাচা তাঁর নতুন সায়েন্স ফিকশন উপন্যাসে লিখেছেন, মহাকাশে অভিকর্ষ থাকে না, তাই পড়ে যাওয়ার কোনো চান্সই নেই!” রম্য আত্মবিশ্বাসের সাথে চ্যাঁচাল।
“কিন্তু তুই তো এখন মহাকাশে নেই, আমাদের বাড়ির আমগাছে আছিস!” বলেই পূণ্য ওর রহস্যময় চশমাটা নাকের ওপর ঠেলে দিল, “আর তোর এই স্টেশনে একটা বড় সিকিউরিটি ব্রিচ হয়েছে।”
ঠিক তখনই পিছনের বাঁশঝাড় থেকে খসখস শব্দ! গাছের ডালটা সামান্য কেঁপে উঠল। কোনো অজানা প্রাণীর উপস্থিতি টের পেয়ে রম্য শক্ত হয়ে চেপে ধরল গাছের ডাল। ঘটনা কী? গ্যালাক্সি এক্স-৯৯ এ কি সত্যি কোনো অচেনা এলিয়েন ঢুকে পড়েছে?
গাছের পেছন থেকে একটা লম্বা ছায়া ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো। মাথা তুলে তাকাতেই দেখা গেল আর কেউ নয়—বড় ভাই রাজ্য! হাতে তার বিশাল এক ট্রাইপড আর ক্যামেরা।
রাজ্য গম্ভীর মুখে ক্যামেরার লেন্স ঘুরিয়ে বলল, “ক্যাপ্টেন রম্য, আপনার স্টেশন কিন্তু চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা হয়েছে! নিচে পূণ্য দ্য সায়েন্টিস্ট, আর সামনে আমি—ইন্টারগ্যালাক্সি ফোটোগ্রাফার। ধরা দিন!”
রম্য প্রথমে একটু ঘাবড়ে গেলেও পরক্ষণেই চেঁচিয়ে উঠল, “রাজ্যদা! একদম কাছে আসবে না! আমার কাছে লেজার গান আছে!”
“লেজার গান? ওই বন্ধ টর্চলাইটটা?” রাজ্য হেসেই খুন। “রাসা চাচা তাঁর বইয়ের কাল্পনিক গল্প শুনিয়ে তোকে একদম পাগল বানিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তুই কি জানিস, রাসা চাচার সেই রোমাঞ্চকর উপন্যাসটার কথা? যেখানে মহাকাশচারীরা সুমেরু বৃত্তের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় কন্ট্রোল প্যানেলের সব বাতি নিভে যায়, আর তখন শুধু ব্যাকআপ কম্পাস দেখে পথ চলতে হয়? তোর স্পেস স্টেশনে তো সেরকম কোনো কম্পাসই নেই!”
রম্য এবার থমকে গেল। রাসা চাচার সেই বেস্টসেলার সায়েন্স ফিকশন বইয়ের উত্তর মেরুর বরফঝড়ের গল্পের কথা তো ও ভুলেই গিয়েছিল! চাচা লিখেছিলেন, যখন চারপাশ অন্ধকার হয়ে যায়, তখন কেবল মাথা ঠান্ডা রাখা আর সঠিক দিক চিনে নেওয়াই একমাত্র পথ।
রম্য সাথে সাথে বুক ফুলিয়ে বলল, “আমার কাছে দিকনির্ণয় করার জন্য পূণ্যদি আছে! পূণ্যদি, তুমি নিচে থেকে গ্রাউন্ড কন্ট্রোল সামলাও! আর রাজ্যদা, তুমি স্পেস ভিডিওগ্রাফার!”
ঠিক তখনই ডালের শেষ মাথায় লুকিয়ে থাকা পাশের বাড়ির বিড়াল ‘মিনু’ আচমকা একটা ‘মিঞাও’ ডাক দিয়ে লাফিয়ে পড়ল রাজ্যের কাঁধে! রাজ্য “ওরে বাবা রে!” বলে ট্রাইপড ফেলে পিছাতে গিয়ে উঠোনের ঘাসের ওপর ধপাস!
পুরো আমগাছের নিচটা মুহূর্তের মধ্যে হাসির রোলে ভেসে গেল। গাছ থেকে পূণ্য আর রাজ্যকে দেখে রম্যও হি-হি করে হেসে ফেলল।
উপর থেকে সব দেখছিলেন লেখক রাসা চাচা আর মা। বারান্দায় ডায়েরি আর কলম হাতে দাঁড়িয়ে রাসা চাচা হাততালি দিয়ে বললেন, “সাবাশ ক্যাপ্টেন! আমার পরবর্তী উপন্যাসের ক্লাইম্যাক্স দৃশ্যটা পেয়ে গেলাম! প্লটটা কিন্তু দারুণ জমল!”
মা একবাটি গরম গরম তাওয়া-পিঠা আর মিষ্টি আমসত্ত্ব নিয়ে গাছের নিচে এসে দাঁড়ালেন। বললেন, “সব মহাকাশচারী, লেখক আর বিজ্ঞানীদের জানানো যাচ্ছে—ফুয়েল রিচার্জের সময় হয়েছে! নিচে নামো সব!”
রম্য ডাল ধরে ঝুলে নিচে নেমে এলো। গরম পিঠায় এক কামড় দিয়ে রাজ্য আর পূণ্যর দিকে তাকিয়ে বলল, “কালকে কিন্তু আমরা সবাই মিলে মঙ্গলের রোভার বানাব, বুঝলে? রাসা চাচা আমাদের দারুণ একটা প্লট আর ডিজাইন লিখে দেবেন!”
বিকেলের সোনাঝরা রোদে তিন ভাইবোন আর গল্পকার রাসা চাচার হাসিমুখের আড্ডায় আমগাছটা যেন সত্যি সত্যিই একটা খুদে সায়েন্স-ফিকশন বইয়ের পাতায় পরিণত হলো।