ঢাকাবুধবার , ৯ মে ২০১৮
  1. Bangla
  2. chomoknews
  3. English
  4. অপরাধ
  5. অভিনন্দন
  6. আমাদের তথ্য
  7. কবিতা
  8. কর্পরেট
  9. কাব্য বিলাস
  10. কৃষি সংবাদ
  11. খুলনা
  12. খোলামত
  13. গল্প
  14. গাইড
  15. গ্রামবাংলার খবর

একজন ছমির মোল্ল্যা

admin
মে ৯, ২০১৮ ৬:৪৯ অপরাহ্ণ
Link Copied!

একজন ছমির মোল্ল্যা

—রাহুল রাজ

এক

সকাল থেকেই টিনের চালে টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। বিছানায় ‘দ’ আকারে পাতলা কাঁথা গায়ে শুয়ে আছে ছমির মোল্ল্যা। বৃষ্টির শব্দের কারণে সকালের এই মিষ্টি ঘুম ছেড়ে উঠতে ইচ্ছা করছে না তার। মাথার ভেতর ঝিমঝিম করছে ভোররাতের স্বপ্নটা। শাপলা বিলে নৌকা থেকে সে পড়ে গেছে, নৌকা ভেসে যাচ্ছে আর সে জড়িয়ে যাচ্ছে জলশেওলায়। এতটুকুই মনে পড়ছে। কিন্তু শাপলার বিলে তার যাওয়ার কথা নয়। ছোটবেলায় সেই বিল ছেড়ে এই করিমগঞ্জে চলে আসা হয়েছে, তারপর আর কখনো সেখানে যাওয়া হয়নি। এত বছর পর শাপলার বিল স্বপ্নে দেখে তার মন ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। খোয়াবনামায় পড়েছে, ভোররাতের স্বপ্ন নাকি সত্যি হয়।

আজ সোমবার, কিস্তি দেওয়ার তারিখ। কিন্তু কিস্তির পুরো টাকা জোগাড় হয়নি। গতকাল বেশ কিছু জায়গায় চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে সে। লতিফার টাইফয়েড জ্বরের সময় ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক থেকে দশ হাজার টাকা লোন নিয়েছিল ছমির। বর্ষার সময় জোগালের (শ্রমিকের) কাজ কম থাকে, তাই এই সপ্তাহের কিস্তির টাকাটা মেলানো যায়নি। ছমির মোল্ল্যা শাপলা বিলের মোল্ল্যা বংশের ছেলে, কারো টাকা মেরে খাওয়ার ইচ্ছা তার কোনোকালে ছিল না। একবার কদম আলীর বত্রিশ টাকা বাকি ছিল; কদম আলী গ্রাম ছেড়ে গঞ্জে দোকান দিলে ছমির সেখানে গিয়ে টাকা শোধ করে এসেছিল। তার সততার এমন অনেক গল্প গাঁয়ের লোকের জানা। কিন্তু ব্যাংকের ম্যানেজারের কাছে এই সততার কোনো দাম নেই।

গোয়ালের গরুর হাম্বা হাম্বা ডাকে ছমির আর শুয়ে থাকতে পারল না। টিপটিপ বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সে গোয়ালঘরের দিকে পা বাড়াল। গরুটার হাড় জিরজিরে অবস্থা দেখে তার মন খারাপ হয়ে যায়। ঘাসের অভাবে অবলা প্রাণীটা কষ্ট পাচ্ছে। কোমরে গামছা বেঁধে কাঁচি হাতে সে বিলের কচুরিপানা কাটতে বের হলো। রাবেয়া পেছন থেকে ধোঁয়ার মধ্যে ফু দিতে দিতে বলে উঠল, “গায়ে সরিষার তেল মেখে তারপর পানিতে নামেন। বর্ষার পানির কামড় শরীরের জন্য ভালো না।”

ছমির কোনো উত্তর দিল না। বিলের পাড়ে গিয়ে দেখল সামনের দিকের সব কচুরিপানা শেষ। তার জন্য যা আছে, তা কাটতে বুক সমান পানিতে নামতে হবে। বদরের ছেলে আলাল নৌকা নিয়ে আসার আগেই তাকে কাজ শেষ করতে হবে। বৃষ্টি আরও বাড়ল। ছমির কচুরিপানা কাটছে আর আপনমনে আওড়াচ্ছে, “জমিদারের বেটি কয় কী! জ্বর আসলে কিছু করার থাকবো না। বেটি কি ডাক্তার নাকি? আজ যে কিস্তি দিতে হবে, সেই চিন্তা কি তার আছে?”

এমন সময় আলাল নৌকা নিয়ে হাজির। ছমিরকে কচুরিপানা কাটতে দেখে সে রসিকতা করে জিজ্ঞাসা করল, “কী করো কাকা?” ছমির দাঁত কিড়মিড় করে উত্তর দিল, “চোখে কি ছানি পড়ছে? দেহো না কী করি?” আলাল জানাল সে কাল বিকেলে বঁড়শি গেঁথে গিয়েছিল, সেই বঁড়শিগুলো খুঁজতে এসেছে। ছমির বিরক্তি নিয়ে নিজের কাজে মন দিল।

বিকেল নাগাদ গরুর জন্য যথেষ্ট খাবার জোগাড় হলো। ফেরার পথে নতুন পানিতে গজিয়ে ওঠা কলমি শাক দেখে ছমিরের জিভে জল এল। কলমির ঝোলের সাথে ছোট মাছ—ভাবতেই ভালো লাগছে। সে ভাবল, বৃষ্টির মধ্যে নিশ্চয়ই আজ ব্যাংকের স্যার কিস্তি নিতে আসবে না। সামনের সপ্তাহে জোগালের কাজ আছে, তখন সব দিয়ে দেবে। বাড়ি ফেরার পথে একটা ডোরা সাপ দ্রুত তার পাশ কাটিয়ে চলে গেল। ছমির হিসহিস শব্দ করে সাপটাকে তাড়াল।

বাড়িতে ঢুকে দেখল লতিফা আর আঞ্জু বারান্দায় লুডু খেলছে। গরুর চাড়িতে কচুরিপানা দিয়ে সে কলপাড়ে গোসল সারল। রাবেয়া ভাতের থালা বেড়ে জিজ্ঞেস করল, “কিস্তির টাকা কি জোগাড় হইছে?” ছমির খিঁচিয়ে উঠল, “স্কুলের নাম নাই, লুডু নিয়া বসছোস কেন?” রাবেয়া প্রতিবাদ করলে ছমির খালের স্রোত আর কিস্তির যন্ত্রণা নিয়ে কড়া কথা শুনিয়ে দিল। রাবেয়া চুপ করে গেল। সে জানে, তার স্বামীর মেজাজ এখন কিস্তির চিন্তায় তুঙ্গে।

দুই

ছমির কিস্তির টাকার শেষ চেষ্টায় আজগর মুদির দোকান থেকে শুরু করে সাদেক মাস্টারের বাড়ি পর্যন্ত ঘুরে এল, কিন্তু কোথাও টাকা মিলল না। দশটার দিকে বাড়ি ফিরতেই লতিফা জানাল, ব্যাংকের স্যার আঞ্জুদের বাড়িতে কিস্তি নিচ্ছে এবং ছমিরকে ডেকেছে।

ক্ষুধার্ত ছমির মনমরা হয়ে বারান্দায় বসল। পরশু কচুরিপানা কাটতে গিয়ে তার হাঁটুতে একটা মহিষা জোঁক ধরেছিল, জায়গাটা এখনও কালচে হয়ে আছে। তার মনে হলো ব্যাংকের স্যারও যেন সেই জোঁকের মতোই রক্ত চুষছে। লতিফা আবার এসে তাগাদা দিল, “বাবা, স্যার ডাকছে।” ছমির নিরুপায় হয়ে স্যারের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

“ছমির, টাকা কই?” “স্যার, পুরাটা জোগাড় হয় নাই। সামনের সপ্তাহে দিয়া দিমু। বর্ষায় কাম-কাজ নাই।” “এসব বললে চলবে না। টাকা নেওয়ার সময় তো এই কথা ছিল না।” ছমির অনুনয় করল, কিন্তু স্যার নাছোড়বান্দা। তিনি সাইকেলে উঠে বললেন, “আমি উত্তর পাড়া ঘুরে আসছি, এর মধ্যে টাকার ব্যবস্থা করে রাখবা।” ছমির কোনো পথ দেখতে পেল না।

তিন

কিছুক্ষণ পর ব্যাংকের স্যার ছমিরের উঠানে এসে দাঁড়ালেন। ছমির সাফ জানিয়ে দিল তার কাছে টাকা নেই। স্যার ভারি গলায় বললেন, “ব্যাংকের নিয়ম হলো—হয় টাকা, না হয় অন্য কিছু। তোমার ঘর থেকে কিছু একটা নিয়ে যেতে হবে।” ছমির ব্যাকুল হয়ে বলল, “আমার ঘরে কী আছে?” স্যার গোয়ালঘরের দিকে ইশারা করে বললেন, “গরুটা ব্যাংকে জমা রাখতে পারো। টাকা দিলে ফেরত পাবে।”

গরুর কথা শুনেই ছমিরের মস্তিষ্কে রক্ত চড়ে গেল। সে ক্ষ্যাপা বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল স্যারের ওপর। সর্বশক্তি দিয়ে ধাক্কা দিয়ে স্যারকে দূরে ফেলে দিল। হাতের কাছে পড়ে থাকা কোদালের আছাড়ি (হাতল) তুলে নিয়ে চিৎকার করে উঠল, “সাহস থাকলে আমার গরুর গায়ে হাত দেন তো দেহি! বুকের মধ্যে কলিজা কত বড় হইছে আপনার?”

স্যার প্রতিবাদ করলেন, কিন্তু ছমির তখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। সে স্যারের সাইকেলে লাথি মেরে ফেলে দিয়ে বলল, “এখুনি বাড়ি থেকে বের না হলে মাথা দুই ভাগ করে দিমু!” বিয়ে হওয়ার পর রাবেয়া তার স্বামীর এমন ভয়ংকর রূপ কখনো দেখেনি। স্যার অগ্নিদৃষ্টি দিয়ে প্রস্থান করলেন।

দুপুরবেলা ছমির কলমি শাক দিয়ে ঠান্ডা ভাত খেতে বসেছে। এমন সময় আলাল দৌড়ে উঠানে ঢুকে চিৎকার করে বলল, “কাকা, তোমারে ধরতে পুলিশ আইতাছে! তুমি পালাও!” ছমির সে কথায় কান না দিয়ে শান্ত গলায় স্ত্রীকে বলল, “আর একটু মাছের তরকারি দাও।” রাবেয়া আঁচলে মুখ গুঁজে ডুকরে কেঁদে উঠল।