ঢাকারবিবার , ২৯ মার্চ ২০২৬
  1. Bangla
  2. chomoknews
  3. English
  4. অপরাধ
  5. অভিনন্দন
  6. আমাদের তথ্য
  7. কবিতা
  8. কর্পরেট
  9. কাব্য বিলাস
  10. কৃষি সংবাদ
  11. খুলনা
  12. খোলামত
  13. গল্প
  14. গাইড
  15. গ্রামবাংলার খবর

শ্রাবন্তী ও দুটো ভালো ভূত

admin
মার্চ ২৯, ২০২৬ ৯:৩৫ অপরাহ্ণ
Link Copied!

শ্রাবন্তী ও দুটো ভালো ভূত
–রাহুল রাজ

বগুলায় শ্রাবন্তীদের নতুন বাড়ির নাম ‘মায়ের কোল’। নামটা যেমন মায়াবী, বাড়িটাও তেমন চমৎকার। ছিমছাম একতলা বাড়ি, সামনে একফালি বাগান। কিন্তু এই চমৎকার বাড়ির ঠিক সীমানায় দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল, বুড়ো আতা গাছ। সাধারণত আতা ফল খুব একটা মিষ্টি হয় না, কিন্তু এই গাছের আতাগুলো যেন চিনির সিরায় ডুবানো। তাই মায়াবশত শ্রাবন্তীর বাবা গাছটা কাটেননি।

তবে শ্রাবন্তী জানত না, এই মিষ্টি আতার আড়ালে বাস করে একদল তিতকুটে চেহারার কিন্তু মিষ্টি স্বভাবের ভূত।

শ্রাবন্তীর পুরোনো অভ্যাস হলো রাতে ছাদে হাঁটা। পূর্ণিমা হোক বা অমাবস্যা, আকাশ দেখা আর খোলা হাওয়া খাওয়া তার চাই-ই চাই। ঘটনার শুরু এক অমাবস্যার রাতে। ঘড়িতে তখন রাত বারোটা। চারপাশ নিঝুম, পাড়ার সব আলো নিভে গেছে। শুধু দূরে একটা কুকুর ‘কুঁই কুঁই’ করে সম্ভবত কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছে।

হঠাৎ শ্রাবন্তী শুনল, আতা গাছের দিক থেকে অদ্ভুত সব শব্দ আসছে। অনেকটা ভাঙা রেডিওর নয়েজের মতো ফিসফাস। “ওরে পচা, তুই কি আজকেও বাতাসের সাথে পাতিলেবু মিশিয়েছিস? টক টক লাগছে কেন?” “আরে না দাদা, এটা পাশের বাড়ির পান্তা ভাতের গন্ধ। ওফ! কী যে অ্যারোমা!”

শ্রাবন্তী থমকে দাঁড়াল। গা ছমছম করে উঠল। পাশের বাড়িটা তো খালি পড়ে আছে, সেখানে পান্তা ভাত আসবে কোথা থেকে? আর কথা বলছে কে? সে একটু সাহস সঞ্চয় করে ছাদের কিনারে গিয়ে ঝুঁকে দেখল। কিন্তু গাছে কোনো মানুষ নেই, শুধু পাতার খসখসানি।

“কে? কে কথা বলে?” শ্রাবন্তী গলা কাঁপিয়ে জিজ্ঞেস করল।

গাছের ভেতর থেকে আওয়াজ এল, “ধুর ছাই! এই মেয়েটা তো শুনতে পায় দেখছি। পচা, ভলিউম কমা!”

পরক্ষণেই একটা ধোঁয়াটে অবয়ব ডাল থেকে টুপ করে নিচে ঝুলে পড়ল। উল্টো হয়ে ঝুলে থাকা অবয়বটার শরীর থেকে হালকা নীলচে আলো বেরোচ্ছে। মুখটা বিকট, চোখ দুটো ভাঁটার মতো বড়। অবয়বটা বলল, “হাই! আমি পচা। আর ইনি আমার বড় ভাই গচা। ভয় পাবেন না…”

পচার বিকট চেহারা দেখেই শ্রাবন্তীর বুকের ভেতরটা ধড়াস করে উঠল। আর্তনাদ করার সময়টুকুও পেল না সে। মাথাটা ভোঁ ভোঁ করে ঘুরল এবং চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এল। ধপাস করে ছাদের ওপর জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেল শ্রাবন্তী।

এদিকে পচা আর গচা তো মহাবিপদে। তারা ভয় দেখাতে চায়নি, স্রেফ কথা বলতে চেয়েছিল। গচা তাড়াতাড়ি অদৃশ্য হাত বাড়িয়ে আতা গাছের ডাল থেকে কয়েকটা বড় পাতা পেড়ে আনল। পচা নিচে নেমে এসে ছাদের কোণে রাখা জলের বালতি থেকে আঁজলা ভরে জল নিয়ে এল।

দুজনে মিলে শ্রাবন্তীর মুখে-চোখে জলের ঝাপটা দিল। গচা বড় পাতা দিয়ে শ্রাবন্তীকে বাতাস করতে লাগল। মিনিট পাঁচেক পর শ্রাবন্তী ধীরে ধীরে চোখ মেলল। আবছা আলোয় আবার সেই নীলচে ধোঁয়াটে অবয়ব দুটোকে দেখেই সে শিউরে উঠল, আবার জ্ঞান হারানোর উপক্রম।

গচা এবার নরম গলায় বলল, “শ্রাবন্তী দিদি, দোহাই তোমার, আর অজ্ঞান হয়ো না। জল দিতে দিতে আমাদের হাত ব্যথা হয়ে গেছে।”

পচা বলল, “হ্যাঁ দিদি, আর আমরা তো বালতি করে জল এনেছি।”

শ্রাবন্তী এবার উঠে বসার চেষ্টা করল। ভয়ে তার হাত-পা কাঁপছে। দেওয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে সে বলল, “তো-তোমরা… তোমরা সত্যি ভূত?”

“হ্যাঁ, আমরা ভূত। তবে বিশ্বাস করো, আমরা ভালো ভূত।” গচা বিজ্ঞের মতো বুঝিয়ে বলল। “সব মানুষ যেমন খারাপ হয় না, তেমনি সব ভূতও খারাপ হয় না, তাই না? আমরা এই আতা গাছে অনেক যুগ ধরে আছি। মানুষের কোনো ক্ষতি আমরা করি না।”

পচা ফোড়ন কাটল, “ক্ষতি তো দূর থাক, আমরা তো লোকের এন্টারটেইনমেন্ট করি। কিন্তু কেউ আমাদের পাত্তা দেয় না।”

গচা আবার বলল, “সারা পৃথিবীর মানুষদের মধ্যে একমাত্র তুমিই আমাদের কথা শুনতে পাচ্ছ, আর আজ জ্ঞান ফেরার পর দেখতেও পাচ্ছ। আমাদের ফ্রিকুয়েন্সি শুধু তোমার সাথেই মিলেছে। তুমি চাইলে আমরা বন্ধুত্ব করতে পারি।”

শ্রাবন্তী দেখল, ভূত দুটোর কথা বলার ভঙ্গি বেশ মজাদার। চেহারাটা একটু অদ্ভুত হলেও তারা বেশ অমায়িক। কিছুক্ষণ পর তার ভয় কেটে গেল। সে ভাবল, ছাইপাশে একা একা হাঁটার চেয়ে দুটো ভূতের সাথে গল্প করা অন্তত ভালো। সে মৃদু হেসে বলল, “ঠিক আছে, বন্ধুত্ব করা যেতে পারে। তবে শর্ত একটাই—হুটহাট উল্টো হয়ে ঝুলে পড়ে ভয় দেখানো চলবে না।”

পচা আর গচা আনন্দে ছাদের ওপর ডিগবাজি খেতে লাগল। কয়েক দিনের মধ্যেই শ্রাবন্তীর ভয় পুরোপুরি কেটে গেল। বরং ছাদটাই এখন তার আড্ডার জায়গা। পচা আর গচার কাছে ভূতের সমাজের অদ্ভুত সব নিয়ম শুনল সে।

গচা বেশ বিজ্ঞের মতো বুঝিয়ে বলল, “দেখুন শ্রাবন্তী দিদি, আমাদের লাইফস্টাইল একদম সর্টেড। পূর্ণিমার ১৫ দিন আমরা ডায়েট করি—শুধু চাঁদের আলো খাই। জিরো ক্যালরি, কোনো মেদ নেই। আর অমাবস্যার ১৫ দিন আমরা ফ্রি। বাতাসে ভেসে বেড়াই, দেশ-বিদেশে ঘুরি। একে বলে ‘এয়ার ক্যাফে’।”

পচা বলল, “তবে বড়দার খুব শখ মেক্সিকান বাতাসের। বলে কি না ওতে একটু ঝাল ঝাল ফ্লেভার থাকে! আর আমার পছন্দ থাইল্যান্ডের বাতাস, ওতে লেমনগ্রাসের গন্ধ পাওয়া যায়।”

শ্রাবন্তী হেসেই অস্থির। এই ভূতেরা ভয় দেখানো তো দূর থাক, মাঝেমধ্যে আতা পেড়ে শ্রাবন্তীর জানলার কার্নিশে রেখে দেয়। তবে শর্ত একটাই—লবণ-মরিচ দিয়ে মেখে খেতে হবে, যেন গন্ধটা তারাও একটু পায়।

সুখে দিন কাটছিল, কিন্তু শ্রাবন্তীর ব্যবসায়িক পার্টনার জয়দেব ছিল আস্ত এক খচ্চর। শ্রাবন্তীর কাপড়ের শো-রুম থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা সে সরিয়ে ফেলেছে, এখন উল্টো শ্রাবন্তীকেই ফাঁসানোর চেষ্টা করছে।

একদিন রাতে শ্রাবন্তী গুমরে গুমরে কাঁদছিল আতা গাছের নিচে। পচা আর গচা ওপর থেকে সব শুনল। পচা ডাল থেকে ঝুলে পড়ে বলল, “আরে দিদিমণি, কাঁদছেন কেন? ওই জয়দেব লোকটা তো স্রেফ একটা পাতিলেবু! ওকে আমরা সাইজ করছি।”

গচা গম্ভীর হয়ে বলল, “ভুতুড়ে বিচার শুরু হবে আজ থেকেই। আপনি শুধু জয়দেবের বাড়ির ঠিকানা আর ওর প্রিয় বালিশের কালারটা বলুন।”

জয়দেব তখন তার এসি রুমে আয়েশ করে ঘুমাচ্ছিল। হঠাৎ তার মনে হলো রুমের টেম্পারেচার মাইনাস ডিগ্রিতে চলে গেছে। সে চোখ খুলে দেখল, তার বুকের ওপর বসে আছে পচা, আর গচা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে জয়দেবের দামী পারফিউম মাখছে।

জয়দেব চিৎকার করতে গেল, কিন্তু দেখল তার গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছে না। গচা এগিয়ে এসে বলল, “শোনো জয়দেব ভাই, তুমি শ্রাবন্তীকে ঠকাচ্ছ, এটা আমাদের ভূতের ইউনিয়নে পাশ হয়নি। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, কালকের মধ্যে যদি তুমি সব টাকা ফেরত না দাও, তবে তোমার মাথায় আমরা আতা ফলের গাছ গজিয়ে দেব।”

পচা যোগ করল, “আর আমি রোজ রাতে তোমার কানে এসে বেসুরো গলায় ‘টুম্পা গান’ গাইব। চয়েস ইজ ইয়োরস!”

জয়দেব ভাবল স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু পরদিন সকালে উঠে সে দেখল তার বালিশের ওপর একটা আধ খাওয়া আতা ফল পড়ে আছে, আর দেওয়ালে বড় বড় করে লেখা— “টাকা ফেরত দে, নয়তো গান শুনবি!”

ভয়ে জয়দেবের অবস্থা কেরোসিন। সে ভাবল সিসিটিভি চেক করবে। কিন্তু সিসিটিভিতে শুধু দেখা গেল, ঘরের ভেতর একটা অদৃশ্য হাত হাওয়ায় পারফিউম স্প্রে করছে আর ড্রয়ার থেকে টাকা বের করে গুছিয়ে রাখছে।

এমন কান্ড পর-পর কয়েক দিন ঘটল। উপায়অন্ত না দেখে একদিন সকালে জয়দেব কাঁপতে কাঁপতে শ্রাবন্তীর বাড়িতে হাজির। সব চেক ফেরত দিয়ে হাতজোড় করে বলল, “দিদি, আমাকে ক্ষমা করো। তোমার বাড়িতে কী আছে জানি না, কিন্তু ওরা খুব বাজে গান গায়! আমি চললাম।”

জয়দেব চম্পট দিল। শ্রাবন্তী ছাদে গিয়ে দেখল পচা আর গচা আতা গাছের মগডালে বসে দাঁত কেলিয়ে হাসছে।

গচা বলল, “দিদিমণি, জয়দেবের মাথায় আমরা এমন এক ‘ভাইরাস’ ঢুকিয়ে দিয়েছি যে, এখন থেকে সে আতা ফল দেখলেই শ্রাবন্তী দেবীর নাম জপবে।”

শ্রাবন্তী হাসল। সে বুঝল, মানুষ সবসময় মানুষের বন্ধু হয় না, কিন্তু মাঝেমধ্যে আতা গাছের ডালে বসে থাকা ভূতেরা পরম বন্ধু হয়ে ওঠে। বগুলায় এখন ‘মায়ের কোল’ বাড়িটা শুধু শ্রাবন্তীদের নয়, পচা-গচাদেরও নিরাপদ আশ্রয়।

অমাবস্যার রাতে এখন আর ফিসফাস হয় না, এখন হয় উচ্চস্বরে হাসি আর আতা খাওয়ার ধুম। কারণ ভূতেরা এখন আর লুকোচুরি খেলে না, তারা শ্রাবন্তীর পরিবারের অদৃশ্য সদস্য হয়ে গেছে।