ঢাকাবৃহস্পতিবার , ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯
  1. Bangla
  2. chomoknews
  3. English
  4. অপরাধ
  5. অভিনন্দন
  6. আমাদের তথ্য
  7. কবিতা
  8. কর্পরেট
  9. কাব্য বিলাস
  10. কৃষি সংবাদ
  11. খুলনা
  12. খোলামত
  13. গল্প
  14. গাইড
  15. গ্রামবাংলার খবর

কুং-লুং অতঃপর

অন্তর মন্ডল
ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০১৯ ৮:৩৬ অপরাহ্ণ
Link Copied!

একটি ভিন্ন ধারার ভালোবাসার গল্প-

কুং-লুং অতঃপর

—রাহুল রাজ

 

এক

টবের পাতাবাহার গাছের তুলনামূলক অন্ধকার একটি পাতায় কুং একমনে বসে আছে। দিনের বেশিরভাগ সময় তার কেটেছে উদাসীনভাবে। অন্য কোনো কাজে তার মন বসছে না। নর্দমার পাশের ড্রেনে আজ একটা পার্টি ছিল; সেখানে আশেপাশের অনেক জ্ঞানী-গুণী মশা-মশীর আসার কথা। কিন্তু সেই পার্টিতেও তার যেতে ইচ্ছে করছে না।

প্রতিমুহূর্তে কুং-এর চোখের সামনে শুধু একটি মুখ ভেসে উঠছে। তার চঞ্চলভাবে এঁকেবেঁকে ওড়ার দৃশ্য কুং-এর মনকে আরও উতলা করে তুলছে। দিনকয়েক আগে রাস্তার পাশের নির্মাণাধীন বিল্ডিংয়ের জলের চৌবাচ্চার দেওয়ালে কুং সেই ললনা মীকে দেখেছে।

এই বয়সে অনেক মশীই তার আশেপাশে এসেছে, সঙ্গ পেতে চেয়েছে; কিন্তু কুং কখনও তাতে আকর্ষণ অনুভব করেনি। নাম না জানা, পরিচয়হীন এক মশী এক মুহূর্তের দেখা দিয়েই তার সাজানো জীবনটাকে এলোমেলো করে দিল। এখন কুং-এর চোখে ঘুম নেই, গাছের পাতার রসও তার ভালো লাগছে না। সে শুধু চাইছে সেই চৌবাচ্চার কাছে যেতে, যদি সেখানে আবার সেই রমণী মশীর দেখা মেলে।

কুং যখন দূর থেকে একদৃষ্টিতে তাকে দেখছিল, সেই মশী তা টেরই পায়নি। কুং চোখ বন্ধ করলেই তার কানে ভেসে আসে সেই মশীর পাখা নাড়ার মধুর শব্দ। হঠাৎ অন্য মশা-মশীদের চিৎকার আর শোরগোলে তার মধুর কল্পনা ভেঙে যায়। কুং বুঝতে পারছে না, দিনের এই বেলায় সবাই দিকবিদিক ছুটোছুটি করছে কেন?

ঝং নামে তার এক বন্ধু উড়তে উড়তে জানাল, পাশের বনে ও ড্রেনের ধারে মানুষ বিষাক্ত ধোঁয়া দিচ্ছে। ধোঁয়া থেকে বাঁচতেই সবাই এদিকে আসছে। কুং আত্মকেন্দ্রিকভাবে নিজেকে আবার পাতার আড়ালে লুকাতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই তার চোখ পড়ল একটু দূরের এক মশীর ওপর। যে চোখ সে খুঁজছে, যে পাখার শব্দ তাকে পাগল করে দিয়েছে—সেই মশীই অত্যন্ত কষ্টে উড়তে উড়তে এদিকে আসছে। ধোঁয়ায় তার দম আটকে যাচ্ছে, পাখা টলছে। সে শূন্য থেকে ড্রেনের জলের স্রোতে পড়ে যাচ্ছিল। কুং আর নিজেকে স্থির রাখতে পারল না। নিজের সর্বস্ব শক্তি দিয়ে উড়ে গিয়ে সেই মশীর হাত ধরে ফেলল। মশীটি চোখ বন্ধ করার আগে শুধু দেখল, এক পুরুষ মশা পরম যত্নে তাকে জড়িয়ে ধরেছে।

দুই

মানুষের খাটের নিচে দুই ডাসার মাঝে কুং-এর ঘর। পরিপাটি করে সাজানো এই স্থানেই সে বাস করে। কুং-এর প্রথম প্রেম, সেই রূপসী মশী কাকতালীয়ভাবে অচেতন অবস্থায় তার ঘরেই শুয়ে আছে। কুং পাশে বসে একদৃষ্টে সেই মায়াবী চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। সে আবিষ্কার করল, কী মায়ায় ভরা সেই কালো দুটো চোখ!

অচেতন শরীরটা হঠাৎ নড়ে উঠল। মৃদু চোখে তাকাল সে। কুং পরম আবেগে তার আরও কাছে এসে বসল এবং যত্ন করে তাকে ধরল। কুং বলল, “আস্তে আস্তে… এখন কেমন লাগছে? এখানে ধোঁয়া আপনাকে কিছু করতে পারবে না। আমার নাম কুং। এখন আপনার কোনো ভয় নেই। এই গাছের পাতার রসটুকু খেয়ে নিন, শরীরে জোর পাবেন।”

রমণী মশী কথা না বলে রসটুকু খেয়ে একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে রইল। জ্ঞান হারাবার ঠিক আগে এই পুরুষটিই তাকে আগলে ধরেছিল। পরম কৃতজ্ঞতায় সে বলল, “আমি লুং। এখন আমার অনেক ভালো লাগছে। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।”

কুং মনে মনে বলল, “নামের সাথে রূপের দারুণ মিল।” কুং তাকে জানাল সে তাকে আগে থেকেই চেনে। চং পাড়ার চৌবাচ্চার পানিতে তাকে দেখেছিল। লুং হাসল। কুং বলল, “সব মুখ কি মনে রাখা যায়? যে মুখ মনে দাগ কাটে, সেই মুখই চিরকালের জন্য মনে স্থান করে নেয়।” কথা শুনে লুং লজ্জায় লাল হয়ে গেল।

তিন

কুং ও লুং-এর সম্পর্কটা গড়িয়েছে বেশ কদিন হলো। এখন তারা ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’তে চলে এসেছে। কুং প্রতি সেকেন্ডে ৩০০ থেকে ৬০০ বার ডানা নাড়িয়ে লুংকে গান শোনায়। নিভৃতে দুজনে দুজনকে ছুঁয়ে দেয় প্রেমের পরশে। আমের মুকুলের মৌ মৌ গন্ধে যখন চারপাশ ছেয়ে যাবে, কুং প্রস্তাব দিল তখনই তাদের বাসর হবে। লুং সম্মতির হাসিতে কুং-এর বুকে মুখ লুকাল।

চার

আজ বেশ সমারোহে কুং ও লুং-এর বিয়ে। আমগাছের মুকুলের মাঝে চলছে উৎসব। জিঁ…জিঁ… শব্দে দলীয় গানে সবাই নতুন দম্পতিকে অভিবাদন জানাচ্ছে। বয়স্ক মশা ঝং এসে আশীর্বাদ করল, “তিন হাজার ডিম পাড়ো! মানুষের কোনো বাধাই যেন তোমাদের বংশবিস্তারে বাধা হতে না পারে।” একে একে সবাই বিদায় নিল। আমের মুকুলের গন্ধে কুং ও লুং হারিয়ে গেল সৃষ্টির খেলায়।

পাঁচ

মানুষের বাড়ির বন্ধ জলে লুং তিনশটি ডিম পেড়েছে। কুং খুশিতে বারবার লুংকে জড়িয়ে ধরে। কিন্তু লুং স্বামীকে থামিয়ে দিয়ে বলে, “এই ডিমগুলো ফোটাতে তো দরকার হিমোগ্লোবিন। তার জন্য মানুষের রক্ত চুষে আনতে হবে। ডিমগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে এখন তাজা রক্ত লাগবে।”

কুং শঙ্কিত হয়ে বলল, “কিন্তু রক্ত আনতে গিয়ে তোমার যদি কিছু হয়?”
লুং তাকে শান্তনা দিল, “আমরা নারী জাতি, প্রাকৃতিক ভাবেই অনেক কিছু জানি। আমি একটা টার্গেট ঠিক করে হুল ঢুকিয়ে রক্ত চুষে আনব।”
কুং প্রিয়তমার হাত ধরে বলল, “আমার যে ভয় হয়! মানুষ কয়েল জ্বালায়, স্প্রে করে, মশারি টাঙায়। এত সাবধানতার মধ্যে তুমি কীভাবে যাবে?”
লুং বলে, “একটুও চিন্তা করো না। আমাদের ভালোবাসার নিদর্শনের জন্য আমাকে যেতেই হবে।”

ছয়

উড়তে উড়তে মানুষের কাছাকাছি চলে এসেছে লুং। ঘরের কোণে বসে সে নিজের লক্ষ্য ঠিক করছে। লুং নিজের ৪৭টি দাঁতের মাঝে হুলটি শানিয়ে নিল। স্বামীর চোখের আড়ালে দু-ফোটা অশ্রু মুছে সে লক্ষ্যপানে উড়াল দিল।

কুং দূর থেকে একদৃষ্টে লুং-এর দিকে তাকিয়ে আছে। মানুষের হাতের বাহুতে লুং বসে রক্ত চুষছে। আর কিছুক্ষণ পরেই তার পেট ভরে যাবে। মানুষের একটু নড়াচড়াতেই কুং-এর বুক ধড়ফড় করে উঠছে। লুং রক্ত চোষার মাঝেই স্বামীর দিকে তাকিয়ে বিজয়ের এক হাসি হাসল। রক্ত চোষা প্রায় শেষ, এবার সে উড়াল দেবে।

ঠিক তখনই মানুষের অন্য একটি হাত উড়ে এসে মুহূর্তেই লুংকে পিষ্ট করে দিল। মানুষের শরীরে লেগে থাকল লাল রক্তের রেখা। চোখের পলকে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় কুং আর্তচিৎকার দিয়ে উঠল, “লুং! তুমি কোথায়?” কিন্তু লুং-এর আর কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। সেই তিনশটি ডিমের ভবিষ্যৎ আর কুং-এর পৃথিবী—সবই এক নিমিষে স্তব্ধ হয়ে গেল।

রাহুল রাজের অন্য গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

—সমাপ্ত—