কপলার-৪৫২বি গ্রহের ইতিহাসে আজকের দিনটি স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। আনন্দ এবং উত্তেজনায় ফুটছে গোটা গ্রহের অধিবাসীরা। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর, আজ পৃথিবী নামক সেই রহস্যময় নীল গ্রহের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিচ্ছে তাদের বিশেষ নভোযান ‘সিঙ্গো-১’।
এই অভিযানের মূল কারিগর প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ডক্টর টম রুবাসব। বছর দশেক আগে তিনিই প্রথম এই দূরবর্তী সৌরজগৎটি আবিষ্কার করেছিলেন। ডক্টর রুবাসব এবং তার দল নিরলস গবেষণার পর নিশ্চিত হন, এই সৌরজগতের একটি নির্দিষ্ট গ্রহে প্রাণ ধারণের সব উপাদান—তরল জল, উপযুক্ত বায়ুমণ্ডল এবং আদর্শ তাপমাত্রা—বিদ্যমান। কপলার-৪৫২বি-এর মতোই এই গ্রহেও বুদ্ধিমান প্রাণী থাকতে পারে বলে বিজ্ঞানীদের দৃঢ় ধারণা।
সিঙ্গো-১ কোনো সাধারণ নভোযান নয়। এটি কপলারের প্রযুক্তির এক পরম বিস্ময়—একটি সম্পূর্ণ অদৃশ্য যান। ঠিক যেন বাতাস; যা দেখা যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায়। পৃথিবীর বুকেও যদি কোনো উন্নত সভ্যতা থেকে থাকে, তারা যেন হুট করে এই ভিনগ্রহের যানটি দেখে আতঙ্কিত না হয়ে পড়ে বা আক্রমণ না করে, তার জন্যই এই বিশেষ ব্যবস্থা। যানটির গা বেয়ে প্রতিনিয়ত প্রবাহিত হচ্ছে এক বিশেষ শক্তির বর্ম, যা সব ধরণের আলো এবং রাডার তরঙ্গকে শুষে নেয় বা পাশ কাটিয়ে পাঠিয়ে দেয়।
কপলার-৪৫২বি থেকে পৃথিবীর দূরত্ব কম নয়—চৌদ্দশ আলোকবর্ষ। পৃথিবী যেমন তার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে, কপলার-৪৫২বি-ও তেমনি ‘জি-২’ নামক একটি নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। পৃথিবীর এক বছর ৩৬৫ দিনে, আর কপলারের বছর ৩৮৫ দিনে। আকার-আয়তনে কপলার পৃথিবীর চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বড় হলেও, দুই গ্রহের আচরণে অদ্ভুত মিল। আর এই মিলই কপলারের বিজ্ঞানীদের মনে আশার আলো জ্বালিয়েছে—পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব নিশ্চিত।
মহাকাশের বুক চিরে আলোর চেয়েও দ্রুতগতিতে ছুটে চলল সিঙ্গো-১। কয়েক “কপলার-ঘণ্টা”র মধ্যেই যানটি পৃথিবীর কক্ষপথে প্রবেশ করল। কপলারের বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে অবতরণের স্থান নির্বাচন করলেন—পৃথিবীর দক্ষিণ মেরু বা সাউথ পোলের ঠিক ৯০° দক্ষিণ অক্ষাংশে অবস্থিত নির্জনতম , অ্যান্টার্কটিকার মাটিতে।
সিঙ্গো-১ নিঃশব্দে ধবধবে সাদা বরফের চাদরে ঢাকা অ্যান্টার্কটিকার বুকে অবতরণ করল। যানের ভেতর থেকে কপলারের অভিযাত্রী দল রোবোটিক ক্যামেরার মাধ্যমে বাইরের দৃশ্য দেখল। চারিদিকে শুধুই সাদা বরফ, দিগন্ত বিস্তৃত তুষারশুভ্র মরুভূমি। কোনো গাছপালা নেই, কোনো ঘরবাড়ি নেই, এমনকি কোনো প্রাণীর নড়াচড়াও চোখে পড়ল না।
দলের প্রধান বিজ্ঞানী লারা হতাশ স্বরে বললেন, “ডক্টর রুবাসব, আমাদের ধারণা কি ভুল ছিল? এখানে তো বরফ ছাড়া আর কিছুই নেই। তাপমাত্রা এতটাই কম যে এখানে প্রাণ থাকা অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে।”
ডক্টর রুবাসব শান্ত গলায় বললেন, “হাল ছেড়ো না লারা। আমরা মাত্র এক জায়গায় নেমেছি। গ্রহটা বিশাল। তবে আপাততঃ আমাদের পরিকল্পনা মতো কাজ করি। এখান থেকে কিছু বরফের নমুনা সংগ্রহ করে নাও। এই বরফ বিশ্লেষণ করলেই আমরা এই গ্রহের ইতিহাস এবং বায়ুমণ্ডলের অনেক কিছু জানতে পারব।”
সিঙ্গো-১ এর অদৃশ্য হাতল প্রসারিত হলো বরফ সংগ্রহের জন্য।
এদিকে, পৃথিবীর অন্য প্রান্তে, আমেরিকার নাসার (NASA) কন্ট্রোল রুমে তখন হুলস্থুল পড়ে গেছে। নাসার অত্যাধুনিক ডিপ স্পেস নেটওয়ার্ক বা কোনো রাডারেই সিঙ্গো-১ এর অস্তিত্ব ধরা পড়েনি ঠিকই, কিন্তু অ্যান্টার্কটিকায় স্থাপিত তাদের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ ডিটেক্টর (মহাকর্ষীয় তরঙ্গ মাপক) অদ্ভুত এক সংকেত পাঠিয়েছে।
তরুণ বিজ্ঞানী আরিয়ান স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “স্যার! অ্যান্টার্কটিকার ভস্তক স্টেশনের কাছে মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে হঠাৎ একটা অদ্ভুত বিচ্যুতি ধরা পড়েছে। এটা কোনো ভূমিকম্প নয়, কোনো উল্কাপাতও নয়। মনে হচ্ছে যেন বিশাল ভরের কিছু একটা ওখানে ল্যান্ড করেছে, কিন্তু… কিন্তু আমাদের স্যাটেলাইট ইমেজে ওখানে কিছুই দেখা যাচ্ছে না!”
নাসার ডিরেক্টর গম্ভীর হয়ে বললেন, “কিছুই দেখা যাচ্ছে না মানে? ভালো করে চেক করো। টেকনিক্যাল গ্লিচ হতে পারে।”
“না স্যার,” আরিয়ান দৃঢ় কন্ঠে বলল, “ডিটেক্টর দুবার রিডিং কনফার্ম করেছে। ওখানে এমন কিছু আছে যার ভর প্রচণ্ড বেশি, কিন্তু তা দৃশ্যমান আলোর পাল্লার বাইরে। স্যার, আমার মনে হচ্ছে এটা… এটা কোনো ভিনগ্রহের যান হতে পারে। আর এটা ইনভিজিবল (অদৃশ্য)!”
কন্ট্রোল রুমে পিনপতন নীরবতা নেমে এল। অদৃশ্য ভিনগ্রহের যান! নাসার ডিরেক্টর দ্রুত নির্দেশ দিলেন, “অ্যান্টার্কটিকার কাছাকাছি থাকা আমাদের বিশেষ টিমকে এখুনি অ্যালার্ট করো। ড্রোন পাঠাও। আমাদের এই অদৃশ্য আগন্তুককে খুঁজে বের করতেই হবে।”
অ্যান্টার্কটিকার বরফে তখন সিঙ্গো-১ যান্ত্রিক হাতে বরফের চাঙর তুলছে। কপলারের বিজ্ঞানীরা তখনও জানেন না, তাদের ‘অদৃশ্য’ যানটি পৃথিবীর মানুষের কাছে ভিন্নভাবে ধরা পড়ে গেছে। এক হাজার চারশ আলোকবর্ষ দূরের দুই সভ্যতার প্রথম সংঘাত বা সংযোগের সূচনা হতে যাচ্ছে এই নির্জন বরফের রাজ্যে।
ডক্টর রুবাসব বরফের নমুনার দিকে তাকিয়ে আপনমনে বললেন, “এই সাদা বরফের নিচে হয়তো কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে। পৃথিবী, আমরা আসছি তোমার রহস্যভেদ করতে।”
সিঙ্গো-১ এর ইঞ্জিন আবার নিঃশব্দে গর্জে উঠল। তারা এবার অন্য কোনো মহাদেশের দিকে যাবে। নাসার ড্রোনগুলো তখন অ্যান্টার্কটিকার আকাশে হন্যে হয়ে খুঁজছে সেই মহাকর্ষীয় বিচ্যুতিকে—সেই অদৃশ্য আগন্তুককে।
কিন্তু মহাবিশ্বের পরিহাস বোধহয় একেই বলে। যখন সিঙ্গো-১ পৃথিবীর বুকে প্রাণের স্পন্দন খুঁজে না পেয়ে এক তুষারশুভ্র নির্জনতাকে ‘মৃত গ্রহ’ বলে ভুল করছিল, ঠিক সেই মুহূর্তেই পৃথিবীর বিজ্ঞানীরাও মহাকাশের অন্য এক প্রান্তে তাদের নিজস্ব ‘রোভার’ পাঠিয়েছে। কাকতালীয়ভাবে সেই রোভারটি অবতরণ করেছে অন্য কোনো এক ভিনগ্রহের ঠিক তেমনই এক জনমানবহীন, বরফে ঢাকা দুর্গম মেরু অঞ্চলে।
পৃথিবীর সেই রোভারটির যান্ত্রিক চোখ দিয়ে বিজ্ঞানীরা স্ক্রিনে কেবল মাইলের পর মাইল ধূসর বরফ আর পাথুরে পাহাড় দেখছেন। নাসার কন্ট্রোল রুমে বসে থাকা বিজ্ঞানীরা হতাশ হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলছেন, “না, এই গ্রহেও কোনো প্রাণের চিহ্ন নেই। এটা কেবলই এক নিথর পাথরের স্তূপ।”
তারা কল্পনাও করতে পারছেন না যে, ঠিক সেই মুহূর্তে সেই ভিনগ্রহের অন্য কোনো গোলার্ধে হয়তো গড়ে উঠেছে এক বিশাল উন্নত সভ্যতা, যারা হয়তো পৃথিবীর চেয়েও হাজার বছর এগিয়ে। হয়তো সেই গ্রহের বাসিন্দারাও ঠিক ডক্টর রুবাসবের মতো কোনো এক ‘অদৃশ্য’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই পৃথিবীর ছোট্ট রোভারটির গতিবিধি লক্ষ্য করছে আর মৃদু হাসছে।
মহাবিশ্বের বিশালতায় দুই ভিন্ন জগতের দুই সভ্যতা একে অপরের খুব কাছে এসেও আজ যোজন যোজন দূরে রয়ে গেল। দুই পক্ষই নিজেদের সীমাবদ্ধতা দিয়ে অন্যকে বিচার করল, আর দুই প্রান্তেই প্রতিধ্বনিত হলো একই ভুল ধারণা— ‘সেখানে কেউ নেই’।
দৃশ্যত এই বিশাল মহাবিশ্ব হয়তো শান্ত ও জনশূন্য, কিন্তু অদৃশ্যভাবে তা কতশত প্রাণের কোলাহলে পূর্ণ, তার রহস্য হয়তো কোনো একদিন কোনো এক মহেন্দ্রক্ষণে উন্মোচিত হবে।