অন্ধকারটা সেদিন যেন স্বাভাবিক অন্ধকার ছিল না। শ্রাবণের আকাশে মেঘের গর্জন শুনে মনে হচ্ছিল, পাতালপুরীর কোনো অদৃশ্য প্রাণী যেন বুকভরা যন্ত্রণা নিয়ে হাহাকার করছে। দমকা বাতাসে বটগাছের বিশাল ডালপালাগুলো এমনভাবে দুলছিল, যেন কেউ অন্ধকারের আড়াল থেকে হাত বাড়িয়ে পথচারীদের থামিয়ে দিতে চাইছে।
উনিশ গ্রামের প্রাণকেন্দ্র বটতলা বাজার। দিনেরবেলা মানুষের কোলাহলে মুখর থাকলেও রাত দশটার পর বাজারটা যেন অন্য এক জগতে হারিয়ে যায়। দোকানের শাটার নেমে যায়, চায়ের কাপে শেষ চুমুক পড়ে, তারপর চারদিকে শুধু নিস্তব্ধতা। দূরে কোথাও কুকুরের ডাক, মাঝেমধ্যে শিয়ালের হুক্কাহুয়া সব মিলিয়ে জায়গাটা যেন ভুতুড়ে শ্মশানে পরিণত হয়।
সেই বাজারেই কয়েক মাস আগে চেম্বার খুলেছেন কলকাতা থেকে পাস করা তরুণ চিকিৎসক ডা. তন্ময় সেন। অল্প সময়ের মধ্যেই এলাকাজুড়ে তাঁর সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু চিকিৎসার দক্ষতাই নয়, তাঁর ব্যবহারও ছিল অসাধারণ। গরিব রোগীদের কাছে তিনি ছিলেন আশীর্বাদের মতো।
তন্ময়ের একটা কথা সবাই জানত
“টাকা আজ না থাকলে কাল দেবেন। কিন্তু টাকার জন্য চিকিৎসা কখনও বন্ধ হবে না।”
এই একটি বাক্যই মানুষকে তাঁর প্রতি অগাধ বিশ্বাসী করে তুলেছিল।
সেদিন রোগী দেখতে দেখতে কখন যে রাত এগারোটা বেজে গেছে, তন্ময় টেরই পাননি।
হঠাৎ কড়াৎ!
একটা বিকট শব্দে যেন আকাশ ফেটে গেল। বজ্রপাতের সঙ্গে সঙ্গে পুরো বাজার অন্ধকারে ডুবে গেল। বিদ্যুৎ চলে গেছে।
মুহূর্তের মধ্যে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। টিনের চালের ওপর বৃষ্টির শব্দ, তার সঙ্গেঝোড়ো হাওয়ার শিস সব মিলিয়ে পরিবেশটা ক্রমশ অস্বস্তিকর হয়ে উঠল।
তন্ময় মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে টেবিলের কাগজপত্র গুছিয়ে ব্যাগে রাখলেন। স্টেথোস্কোপ কাঁধে ঝুলিয়ে শাটার নামাতে যাবেন, এমন সময় হঠাৎ যেন বরফশীতল এক ঝাপটা হাওয়া তাঁর ঘাড় ছুঁয়ে গেল।
তিনি থমকে দাঁড়ালেন। পরমুহূর্তেই বাতাসে ভেসে এল রজনীগন্ধা আর কর্পূরের তীব্র গন্ধ। ঠিক সেই গন্ধ, যা মানুষ শেষযাত্রার আগে অনুভব করে। তন্ময়ের বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল। তিনি ধীরে ধীরে মোবাইলের আলোটা পেছনের দিকে ঘোরালেন।
আলো পড়তেই দেখতে পেলেন একজন মহিলা। মাথা থেকে পা পর্যন্ত ধবধবে সাদা কাপড়ে ঢাকা। কোলে বছর তিনেকের এক ফুটফুটে শিশু।
কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি হলেও মহিলার সাদা কাপড়ে একফোঁটা জলের দাগ নেই। যেন বৃষ্টির জল তাঁকে ছুঁয়েই দেখেনি। আরও অদ্ভুত বিষয় আলো তাঁর গায়ে পড়লেও মুখটা ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না। যেন অন্ধকার নিজেই মুখটা ঢেকে রেখেছে।
তন্ময় গলা পরিষ্কার করে বললেন, “কে আপনি? এত রাতে?”
মহিলা ধীরে ধীরে মাথা নিচু করেই বললেন, “ডাক্তারবাবু… আমার সঙ্গে একবার চলুন। আমার বড় ছেলেটার খুব জ্বর। ছটফট করছে।”
গলাটা অদ্ভুত ঠান্ডা। কোনো আবেগ নেই। যেন বহুদূর থেকে ভেসে আসছে।
তন্ময় একবার বাইরে তাকালেন। এমন দুর্যোগের রাতে বেরোনো ঠিক হবে না। তিনি বললেন, “এখন? কাল সকালে নিয়ে আসুন। এই ঝড়-বৃষ্টিতে যাওয়া খুব কঠিন।”
মহিলা এবার একটু মুখ তুললেন। তাঁর মুখের অবয়ব স্পষ্ট বোঝা গেল না, শুধু দুটো গভীর, স্থির চোখ। “আপনি কাউকে ফিরিয়ে দেন না… তাই এসেছি। আমার ছেলেটার আপনি ছাড়া আর কেউ নেই।”
কথাগুলো বলার ভঙ্গিতে এমন এক অসহায় আবেদন ছিল, যা অস্বীকার করা অসম্ভব। তন্ময় আর না বলতে পারলেন না। তিনি ওষুধের ব্যাগটা তুলে নিলেন।
চেম্বারের তালা লাগিয়ে বাইরে বেরিয়ে বাইকের দিকে এগোতেই মহিলা মৃদুস্বরে বললেন, “বাইকের দরকার হবে না ডাক্তারবাবু। আমার বাড়ি খুব কাছে। আপনি শুধু আমার সঙ্গে আসুন।”
তন্ময় আর প্রশ্ন করলেন না। মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে দু’জনে হাঁটতে শুরু করলেন।
প্রথম কয়েক মিনিট সবকিছু স্বাভাবিকই মনে হচ্ছিল। তারপর… হঠাৎ তন্ময়ের মনে হলো, চারদিকে শুধু তাঁর নিজের জুতোর ছপছপ শব্দই শোনা যাচ্ছে। সামনে হাঁটা মহিলার কোনো পায়ের শব্দ নেই! তিনি টর্চের আলো নিচের দিকে ফেললেন। নিজের পায়ের ছাপ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে কাঁদার ওপর। কিন্তু মহিলার? একটিও নয়!
তন্ময় থমকে দাঁড়ালেন। মহিলা পেছন ফিরে তাকালেন না। শুধু বললেন, “কী হলো ডাক্তারবাবু? চলুন…”
তাঁর কণ্ঠে কোনো তাড়া নেই, কোনো অস্থিরতাও নেই। যেন তিনি নিশ্চিত তন্ময় তাঁর পিছু নেবেই। তন্ময় নিজের মনকে বোঝালেন “হয়তো আলো কম। হয়তো চোখের ভুল।” তবু বুকের ভেতর অকারণ একটা অস্বস্তি জমে উঠল।
প্রায় দশ মিনিট হাঁটার পর তাঁরা গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে পৌঁছালেন। চারপাশে বাঁশঝাড়। বাতাসে পাতার ঘর্ষণের শব্দ। মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক ভাঙাচোরা কুঁড়েঘর। জানালার ফাঁক দিয়ে ক্ষীণ আলো বেরিয়ে আসছে। হ্যারিকেনের আলো।
মহিলা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ধীরে বললেন, “এসে গেছি, ডাক্তারবাবু…”
তন্ময় একবার আকাশের দিকে তাকালেন। মনে হলো এই বাড়ির ওপর যেন অন্ধকারটা আরও একটু বেশি ঘন।
তন্ময় দরজাটা ঠেলে ঘরের ভেতরে ঢুকলেন। একটা মাত্র হ্যারিকেন টিমটিম করে জ্বলছে। আলো এতটাই ক্ষীণ যে ঘরের এক কোণ থেকে আরেক কোণ স্পষ্ট দেখা যায় না। স্যাঁতসেঁতে মাটির মেঝে, বাঁশের বেড়া আর খড়ের ছাউনি দারিদ্র্য যেন ঘরের প্রতিটি দেওয়ালে নিজের ছাপ এঁকে রেখেছে।
ঘরের একপাশে ছেঁড়া মাদুরের ওপর শুয়ে আছে বছর বারো-তেরোর একটি ছেলে। জ্বরে তার মুখ লাল হয়ে উঠেছে। কপালে ভেজা কাপড় রাখা, তবুও সে অস্থির হয়ে এপাশ-ওপাশ করছে।
তন্ময় ছেলেটির পাশে বসে নরম গলায় বললেন, “কী নাম তোমার?”
ছেলেটি আধখোলা চোখে একবার তাকিয়ে আবার চোখ বন্ধ করে ফেলল। জ্বরের ঘোরে সে কোনো উত্তর দিতে পারল না। তন্ময় তার কপালে হাত রাখলেন। প্রচণ্ড জ্বর। তিনি দ্রুত স্টেথোস্কোপ বের করে ছেলেটির বুকে রাখলেন।
আর তখনই তাঁর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। অস্বাভাবিক! শরীর জ্বরে পুড়ছে, অথচ বুকটা যেন বরফের মতো ঠান্ডা! কয়েক সেকেন্ড তিনি স্থির হয়েই রইলেন। তারপর নিজেকে সামলে আবার পরীক্ষা করলেন। হৃদস্পন্দন দ্রুত চলছে, শ্বাস-প্রশ্বাসেও তেমন কোনো সমস্যা নেই।
তিনি মনে মনে ভাবলেন, “সম্ভবত উচ্চ জ্বরের জন্য শরীরের তাপমাত্রার ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে।” ডাক্তারি যুক্তি দিয়ে নিজের অস্বস্তিটাকে চাপা দিলেন। ব্যাগ থেকে জ্বরের ওষুধ, অ্যান্টিবায়োটিক বের করে টেবিলের ওপর রাখলেন।
মহিলার দিকে তাকিয়ে বললেন, “এখনই প্রথম ডোজটা খাইয়ে দিন। তারপর এই কাগজে যেমন লিখে দিলাম, ঠিক সেইভাবে ওষুধ দেবেন। শরীরে জল কমতে দেবেন না।”
মহিলা নিঃশব্দে মাথা নাড়লেন। তিনি ওষুধের শিশিটা হাতে নিলেন, কিন্তু তাঁর আঙুলগুলো এতটাই ফ্যাকাশে যে হ্যারিকেনের আলোয় মনে হচ্ছিল কাচের তৈরি।
তন্ময় ব্যাগ গুছিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই খেয়াল করলেন, বৃষ্টি অনেকটাই কমেছে। শুধু টুপটাপ করে চালের কার্নিশ থেকে জল পড়ছে।
উঠোনে এসে তিনি বললেন, “আমি তাহলে চলি। কাল সকালে আবার একবার এসে দেখে যাব।”
মহিলা ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন। তাঁর মুখ এখনও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। শুধু সেই শান্ত, স্থির কণ্ঠস্বর “ডাক্তারবাবু… আজ আপনাকে কিছুই দিতে পারলাম না। ঘরে একটা টাকাও নেই। কাল আমি আপনার ফি পৌঁছে দেব।”
তন্ময় হালকা হেসে বললেন, “ফি নিয়ে ভাববেন না। আপনার ছেলে আগে সুস্থ হয়ে উঠুক। মানুষের জীবন টাকার চেয়ে অনেক বড়।”
এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, মহিলার ঠোঁটের কোণে যেন মৃদু একটা হাসি ফুটে উঠল। কিন্তু পরের মুহূর্তেই সেটা মিলিয়ে গেল। তিনি শুধু বললেন, “আপনি খুব ভালো মানুষ… ঈশ্বর আপনার মঙ্গল করুন।”
তন্ময় কিছু বললেন না। মহিলা তাঁকে বাড়ির সীমানা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে লাগলেন। দু’জনে নিঃশব্দে হাঁটছেন। চারদিকে শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর ভেজা পাতার গন্ধ।
কিছুদূর এসে তন্ময় একবার পেছন ফিরে বললেন, “আপনি আর আসবেন না। এখান থেকেই আমি চলে যেতে পারব।”
কোনো উত্তর এল না। তন্ময় ফিরে তাকিয়ে দেখলেন পথে তিনি একা দাঁড়িয়ে। চারপাশে কেউ নেই। মহিলা যেন মুহূর্তের মধ্যে বাতাসে মিলিয়ে গেছেন। তিনি বিস্মিত চোখে চারদিকে আলো ফেললেন। রাস্তার দুই পাশে ঝোপঝাড়। সামনে ফাঁকা কাঁচা রাস্তা। পেছনে সেই ভাঙা বাড়ি। কিন্তু কোথাও সাদা কাপড় পরা কোনো মহিলার চিহ্ন নেই।
এত অল্প সময়ে একজন মানুষ কোথায় গেল? তন্ময়ের বুকের ভেতরটা কেমন যেন হিম হয়ে গেল। ঠিক তখনই আবার বাতাসে ভেসে এল সেই পরিচিত গন্ধ রজনীগন্ধা… কর্পূর… আর যেন কোথা থেকে এক ফোঁটা দীর্ঘশ্বাস।
তিনি দ্রুত হাঁটতে শুরু করলেন। বাজারে ফিরে নিজের চেম্বারের সামনে এসে দেখলেন, বাইকটা ঠিক যেখানে রেখে গিয়েছিলেন, সেখানেই রয়েছে। বাইকে উঠেও তাঁর হাত কাঁপছিল। স্টার্ট দিতে দু’বার চেষ্টা করতে হলো।
বাড়ি পৌঁছেও সেদিন রাতের ঘটনাগুলো মাথা থেকে সরাতে পারলেন না। খাওয়ার টেবিলে বসেও বারবার মনে হচ্ছিল, সাদা কাপড় পরা সেই মহিলাটি যেন দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। ঘুমোতে গিয়েও চোখ বন্ধ করতে পারলেন না।
তন্ময় ধড়মড় করে উঠে বসলেন। ঘরের আলো জ্বালালেন। কেউ নেই। জানালার বাইরে শুধু শ্রাবণের বৃষ্টি। নিজেকে বোঝালেন “হয়তো অতিরিক্ত ক্লান্তি… হয়তো মনের ভুল…” কিন্তু ঘরের ভেতর এখনও স্পষ্ট ভাসছে রজনীগন্ধা আর কর্পূরের সেই তীব্র গন্ধ। সারা রাত আর তাঁর চোখে ঘুম এল না।
সকালবেলার রোদ যেন রাতের সমস্ত অস্বস্তিকে মুছে দিতে চেয়েছিল। বটতলা বাজার আবার তার চেনা ছন্দে ফিরেছে। দোকানের ঝাঁপ খুলছে, চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠছে, মানুষের কোলাহলে রাতের ভয়ংকর স্মৃতিগুলো যেন অবাস্তব মনে হতে লাগল।
তবু চিকিৎসকের দায়িত্ব তাঁকে শান্তিতে বসতে দিল না। তিনি ঠিক করলেন, ছেলেটিকে একবার দেখে আসবেন। জ্বর কমেছে কি না, ওষুধ ঠিকমতো খেয়েছে কি না এসব নিশ্চিত হওয়া দরকার।
দুপুরের দিকে বাইক নিয়ে তিনি সেই গ্রামের উদ্দেশে রওনা দিলেন। দিনের আলোয় পথটা অনেক সহজ মনে হচ্ছিল। কিন্তু ভাঙা বাড়িটার কাছাকাছি পৌঁছাতেই আবার বুকের ভেতর অকারণ একটা চাপা অস্বস্তি ফিরে এল। বাঁশঝাড়গুলো দিনের আলোতেও কেমন যেন নিশ্চুপ। হাওয়া নেই, তবু শুকনো বাঁশপাতা খসখস করে উঠছে।
ঘরের সামনে কয়েকজন গ্রামবাসী দাঁড়িয়ে গল্প করছিল। তন্ময়কে দেখে তারা এগিয়ে এল। “আসুন ডাক্তারবাবু, ছেলেটা অনেকটাই ভালো আছে।”
তন্ময় ঘরে ঢুকলেন। গত রাতের সেই হ্যারিকেনটা এখনও জ্বলছে, যদিও দিনের আলোয় তার প্রয়োজন নেই। মাদুরের ওপর বসে ছেলেটি ভাত খাচ্ছে। মুখে আগের মতো জ্বরের ছাপ নেই। তন্ময় তার নাড়ি দেখলেন, বুক শুনলেন। সবকিছুই এখন স্বাভাবিক। তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।
“এখন আর ভয়ের কিছু নেই। নিয়ম করে ওষুধ খেলেই পুরোপুরি সেরে যাবে।”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধ কৃতজ্ঞ গলায় বললেন, “আপনি না এলে কী যে হতো ডাক্তারবাবু!”
তন্ময় অবাক হয়ে বললেন, “আমি তো শুধু আমার কর্তব্য করেছি। আচ্ছা, ওর মা কোথায়? উনাকে কিছু কথা বলে যাই।”
প্রশ্নটা শুনে ঘরের ভেতর হঠাৎ অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল। সবাই একে অন্যের মুখের দিকে তাকাতে লাগল। একজন মধ্যবয়সি লোক বিস্মিত গলায় বলল, “ওর… মা?” “হ্যাঁ। কাল রাতে উনিই তো আমাকে ডেকে নিয়ে এসেছিলেন।”
লোকটার মুখের রং ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে বলল, “ডাক্তারবাবু… আপনি কী বলছেন?”
তন্ময় অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। বৃদ্ধ লোকটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “এই ছেলেটার নাম মানিক। ওর মা আর ছোট ভাই আজ থেকে ঠিক এক বছর আগে শ্রাবণের এমনই এক রাতে ওলন্দাজ পুকুরে ডুবে মারা যায়।”
তন্ময়ের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। তিনি যেন ঠিক শুনতে পাচ্ছেন না। “অসম্ভব! কাল রাতে তো…”
আরেকজন বলল, “কাল রাতে মানিকের খুব জ্বর উঠেছিল। আমরা ভেবেছিলাম সকাল হলে আপনাকে খবর দেব। কিন্তু রাতে তো এই বাড়িতে কেউ আসেনি।”
তন্ময়ের গলা শুকিয়ে গেল। “কেউ আসেনি মানে? একজন সাদা কাপড় পরা মহিলা… কোলে একটা ছোট্ট বাচ্চা…”
কথাটা শেষ হতেই বৃদ্ধ লোকটি কাঁপা গলায় বললেন, “ছোট্ট বাচ্চাটা ছিল মানিকের ভাই। ও-ও সেদিন মায়ের সঙ্গে ডুবে মারা যায়।”
ঘরের ভেতর যেন হঠাৎ বাতাস ভারী হয়ে উঠল। তন্ময়ের মনে হলো, চারপাশের সব শব্দ এক মুহূর্তে থেমে গেছে। তিনি ধীরে ধীরে মানিকের দিকে তাকালেন। ছেলেটা চুপচাপ বসে আছে। তারপর খুব আস্তে বলল, “মা মাঝে মাঝে আসে।”
ঘরের সবাই অবাক হয়ে মানিকের দিকে তাকাল। মানিক নিচু স্বরে বলতে লাগল, “জ্বর এলে মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। রাতে ভয় পেলে মা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকে। কেউ বিশ্বাস করে না।”
তন্ময়ের শরীর শিউরে উঠল। তিনি আর কোনো কথা বলতে পারলেন না। ঠিক তখনই হঠাৎ একটা ঠান্ডা বাতাস ঘরের ভেতর দিয়ে বয়ে গেল। জানালা বন্ধ, দরজাও আধখোলা; তবু বাতাস এল কোথা থেকে? তার সঙ্গে ভেসে এল সেই পরিচিত গন্ধ রজনীগন্ধা আর কর্পূর…
তন্ময় দ্রুত দরজার বাইরে বেরিয়ে এলেন। উঠোনের শেষ প্রান্তে, বাঁশঝাড়ের পাশে, এক মুহূর্তের জন্য তিনি যেন দেখলেন সাদা কাপড়ে ঢাকা এক নারীমূর্তি। কোলে ছোট্ট একটা শিশু। মূর্তিটা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মনে হলো, সে মানিকের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসছে।
তন্ময় চোখের পলক ফেললেন। পরমুহূর্তেই সেখানে কিছু নেই। শুধু বাতাসে দুলছে বাঁশপাতা, আর রজনীগন্ধার গন্ধ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। তিনি আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালেন না। দ্রুত বাইকে উঠে চেম্বারের দিকে ফিরে এলেন।
সারা পথ একটাই প্রশ্ন মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগল গত রাতে যাঁর সঙ্গে তিনি হেঁটে গিয়েছিলেন, তিনি যদি মানুষ না হন… তবে কে ছিলেন?
সেদিন সারাদিন রোগী দেখলেও মন বসছিল না। বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল সেই সাদা শাড়ি, সেই পলকহীন দৃষ্টি, আর সেই কণ্ঠস্বর “আমার ছেলেটাকে বাঁচিয়ে দিন, ডাক্তারবাবু…”
রাত নামতে শুরু করল। বটতলা বাজার আবার ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে এল। তন্ময় জানতেন না গত রাতের অলৌকিক ঘটনার শেষ অধ্যায় এখনও বাকি।
সেদিন সন্ধ্যার পর থেকেই তন্ময়ের মনটা অদ্ভুত অস্থির হয়েছিল। রোগী দেখছিলেন ঠিকই, কিন্তু মন বারবার ফিরে যাচ্ছিল ভাঙা বাড়িটার দিকে। মানিকের মুখটা, গ্রামের লোকদের কথা, আর সেই সাদা কাপড় পরা মহিলার অবয়ব সবকিছু যেন মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল।
রাত বাড়ল। একজন… দু’জন… করে শেষ রোগীরাও চলে গেল। ঘড়ির কাঁটা তখন রাত দশটা ছুঁইছুঁই। তন্ময় প্রেসক্রিপশনের খাতাটা বন্ধ করে শাটার নামাতে যাচ্ছিলেন। ঠিক তখনই বাইরে কারও পায়ের শব্দ পেলেন।
তিনি মাথা তুলে তাকালেন। চেম্বারের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে চার-পাঁচ বছরের একটি ছোট্ট ছেলে। ছেলেটার গায়ে সাদা জামা। চুলগুলো ভেজা। মনে হচ্ছিল, এইমাত্র যেন জল থেকে উঠে এসেছে। তবে আশ্চর্যের বিষয়, তার পায়ের নিচে কোথাও একফোঁটা জলের দাগ নেই। সে নিঃশব্দে তন্ময়ের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ দুটো অস্বাভাবিক স্থির।
তন্ময় এগিয়ে এসে মৃদু হেসে বললেন, “কী হয়েছে বাবা? কার সঙ্গে এসেছ?”
ছেলেটি কোনো উত্তর দিল না। শুধু হাতে ধরা ছোট্ট কাপড়ের ব্যাগটা তন্ময়ের দিকে বাড়িয়ে দিল। “মা পাঠিয়েছে।”
তন্ময় অবাক হলেন। “মা? কোন মা?”
ছেলেটি শান্ত গলায় বলল, “কাল রাতে আপনি আমার দাদাকে বাঁচিয়েছেন। এটা আপনার ফি।”
তন্ময়ের বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। তিনি তাড়াতাড়ি বললেন, “তোমার নাম কী?”
ছেলেটি মৃদু হেসে উত্তর দিল, “মা বলেছে, আপনি বুঝে যাবেন।”
কথাটা বলেই সে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। তন্ময় ব্যাগটা হাতে নিয়ে এক মুহূর্তের জন্য নিচে তাকালেন। আবার মুখ তুলে বললেন, “শোন… দাঁড়াও…”
কিন্তু সামনে কেউ নেই। ফাঁকা রাস্তা, নিঃশব্দ বাজার। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে ছেলেটা যেন বাতাসে মিলিয়ে গেছে। তন্ময়ের বুকের ভেতর ঢাকের মতো শব্দ হতে লাগল। কাঁপা হাতে তিনি কাপড়ের ব্যাগটা খুললেন। ভেতরে কোনো টাকা নেই। সযত্নে মোড়ানো একটা ছোট লাল কাপড়।
কাপড়টা খুলতেই বেরিয়ে এল একটি পুরোনো নিরেট সোনার আংটি। আংটির গায়ে সূক্ষ্ম কারুকাজ। কিন্তু সেটাই সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় নয়; আংটিটা এখনও ভেজা! টপ… টপ… করে জল পড়ছে। তার গায়ে লেগে আছে সবুজ শ্যাওলা, আর ভেসে আসছে পুকুরের কাদামাটির গন্ধ!
তন্ময়ের হাত কাঁপতে শুরু করল। তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল ওলন্দাজ পুকুর… সাদা কাপড় পরা সেই মা… কোলে ছোট্ট সন্তান… আর জ্বরে কাতর মানিক।
তিনি ধীরে ধীরে চেয়ারে বসে পড়লেন। কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে আবার বাইকে চেপে মানিকদের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিলেন।
রাত তখন আরও গভীর। ভাঙা বাড়িটার সামনে পৌঁছে দেখলেন, মানিক দরজার কাছে বসে আছে। তন্ময় আংটিটা তার হাতে দিয়ে বললেন, এটা তোমাদের। আমি এটা নিতে পারব না।”
মানিক বিস্মিত চোখে আংটির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব আস্তে বলল, এটা আমার মায়ের বিয়ের আংটি।”
তন্ময় স্তব্ধ। “তুমি চিনলে কী করে?”
মানিক মৃদু হেসে বলল, “মা বলেছিল, যদি কোনোদিন খুব ভালো মানুষ আমাদের জন্য কিছু করে, তাহলে এই আংটিটা তাকে দিতে।”
তন্ময়ের চোখ ভিজে উঠল। তিনি আংটিটা আবার মানিকের হাতেই ফিরিয়ে দিলেন। “এটা তোমার কাছে থাক। তোমার মায়ের স্মৃতি কোনো ফি হতে পারে না।”
মানিক কিছু বলল না। শুধু আংটিটা বুকে চেপে ধরল।
ঠিক সেই মুহূর্তে একদমকা বাতাস বয়ে গেল। বাঁশঝাড়গুলো একসঙ্গে কেঁপে উঠল। বাতাসে আবার ভেসে এল রজনীগন্ধা আর কর্পূরের মিশ্র গন্ধ। তন্ময় অজান্তেই বাঁশঝাড়ের দিকে তাকালেন।
সেখানে… চাঁদের ফিকে আলোয়… এক মুহূর্তের জন্য তিনি আবার দেখলেন সেই মহিলাকে। সাদা শাড়ি পরা, কোলে ছোট্ট সন্তান। তিনি মানিকের দিকে তাকিয়ে আছেন, তারপর তন্ময়ের দিকে।
এবার প্রথমবারের মতো তাঁর মুখটা স্পষ্ট দেখা গেল। সেখানে কোনো ভয় ছিল না, ছিল শুধু এক মায়ের সীমাহীন কৃতজ্ঞতা। তিনি ধীরে ধীরে দুই হাত জোড় করে তন্ময়কে প্রণাম করলেন। তন্ময়ও অজান্তেই হাত জোড় করলেন।
পরের মুহূর্তেই বাতাসের সঙ্গে মিলিয়ে গেল সেই অবয়ব। রজনীগন্ধার গন্ধটুকুও ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল রাতের অন্ধকারে।
বহু বছর কেটে গেছে। ডা. তন্ময় সেন আজও বটতলা বাজারেই চিকিৎসা করেন। তাঁর চেম্বারের দেওয়ালে কোনোদিন সেই ঘটনার কথা লেখা হয়নি। কাউকে তিনি ঘটনাটি বোঝানোর চেষ্টাও করেননি। কারণ তিনি জানেন পৃথিবীর সব সত্যি বিজ্ঞানের বইয়ে লেখা থাকে না।
আজও শ্রাবণের কোনো ঝড়ের রাতে, যখন হঠাৎ বাতাসে রজনীগন্ধা আর কর্পূরের গন্ধ ভেসে আসে, তন্ময় কিছুক্ষণ নীরবে দরজার বাইরে তাকিয়ে থাকেন। মনে হয়, কোনো এক অসহায় মা হয়তো এখনও সন্তানের জন্য প্রার্থনা করে চলেছেন।
সেদিনের পর থেকে তন্ময় প্রতিটি প্রেসক্রিপশনের নিচে একটি লাইন লিখতে শুরু করেছিলেন
“চিকিৎসা শুধু ওষুধে নয়, মমতাতেও হয়।”
কারণ তিনি জানেন, মানুষের পৃথিবীর বাইরেও আর-একটি জগৎ আছে মায়ালোক। আর সেই জগৎ থেকেও কখনও কখনও লেখা হয়ে আসে এমন কিছু প্রেসক্রিপশন, যার ব্যাখ্যা কোনো চিকিৎসাবিজ্ঞান দিতে পারে না।