রঘুনাথ ব্যানার্জি বোম্বাইয়ের (মুম্বাই) একটি নামকরা সমবায় সংস্থা—স্বপ্ন পূরণ সমিতি—এর এরিয়া ম্যানেজার হিসেবে গত দশ বছর ধরে কর্মরত ছিলেন। এই সমিতিটি কোনো সাধারণ ব্যাংক ছিল না; এটি ছিল শত শত গরিব মানুষের বেঁচে থাকার রসদ। এখানকার সদস্যরা ছিলেন কোলাবার মাছবাজারের কুলি, ভাসির পাইকারি বাজারের মাছ বিক্রেতা, সবজিওয়ালা, রিকশাচালক আর দিনমজুর। তারা প্রতিদিন রোদ-জল-ঝড় মাথায় নিয়ে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে দশ, কুড়ি, পঞ্চাশ বা একশো টাকা করে জমাতেন। উদ্দেশ্য একটাই—ভবিষ্যতের স্বপ্ন পূরণ। কারও মেয়ের বিয়ে, কারও ছেলের পড়াশোনা, আবার কারও হয়তো জীবনের শেষ বয়সে একটা ছোট্ট মাথা গোঁজার ঠাঁই খোঁজার স্বপ্ন। আর এই সমস্ত অসহায় মানুষের অগাধ বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন শান্ত, মৃদুভাষী রঘুনাথবাবু।
দশ বছরের বিশ্বস্ততায় রঘুনাথ এমন এক জায়গায় পৌঁছেছিলেন, যেখানে সমিতির অন্ধ বিশ্বাসই তার মনের ভেতরের ঘুমিয়ে থাকা লোভের দানবটাকে জাগিয়ে তুলল। তিনি জানতেন, সমিতির পুরোনো নথিতে তার কোনো স্থায়ী ঠিকানা বা সঠিক পরিচয়পত্র জমা নেই। নিছক বিশ্বাসের ওপর ভর করেই এতগুলো বছর কেটে গেছে। ঠিক এই সুযোগটাই নিলেন রঘুনাথ। মাসের পর মাস ধরে হিসাবের খাতা জাল করে, সদস্যদের পাসবইয়ের টাকা সরিয়ে, একদিন সুযোগ বুঝে প্রায় দেড় কোটি টাকা আত্মসাৎ করে তিনি উধাও হয়ে গেলেন।
বোম্বাই থেকে পালিয়ে কলকাতার কাছে নিজের আদি গ্রাম কেষ্টপুকুরে এসে আত্মগোপন করলেন তিনি। পরিবারের লোকজনকে বললেন, “এত বছর পরবাসে কাটল, আর চাকরি ভালো লাগছিল না। তাই চলে এলাম।” অল্প কিছুদিনের মধ্যেই রঘুনাথের রূপ বদলে গেল। গ্রামের এক কোণে মাথা তুলল পেল্লাই সাইজের এক রাজকীয় দোতলা বাড়ি, গ্যারেজে এসে ঢুকল চকচকে গাড়ি, বিঘার পর বিঘা জমি কেনা হলো। গ্রামের মানুষ হঠাৎ রঘুনাথের এই কুবেরের ধন পাওয়ার রহস্য বুঝল না ঠিকই, কিন্তু তার বিত্ত আর প্রতিপত্তির সামনে সবাই মাথা নোয়াতে বাধ্য হলো।
বিপত্তিটা ঘটল গ্রাম ফিরে আসার ঠিক ছয় মাস পর। এক বর্ষার রাতে রঘুনাথের স্ত্রী লাবণ্য বাহারি সব সুস্বাদু রান্নার আয়োজন করেছিলেন। ইলিশ মাছের ঝাল, খাসির মাংস, গলদা চিংড়ির মালাইকারি—সব মিলিয়ে রাজকীয় ভোজ। রঘুনাথবাবু তৃপ্তি করে খেতে বসেছেন। প্রথম আইটেম—গরম ভাতে ইলিশের তেল মেখে মুখে তুলতেই হঠাৎ তিনি থমকে গেলেন।
এক লোকমা ভাত যেন মাঝ-গলায় এসে আটকে গেল। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এল রঘুনাথের। তিনি ভয়ংকরভাবে কাশতে শুরু করলেন। কাশতে কাশতে মুখ-চোখ লাল হয়ে রক্তবর্ণ ধারণ করল, চোখ দিয়ে হুড়হুড় করে জল বেরিয়ে এল। লাবণ্য ছুটে এসে পিঠে চাপড় মারতে মারতে হেসে বললেন,
— “কী গো, এত লোভ কিসের? আস্তে খাও। কেউ বুঝি তোমাকে খুব মনে করছে?”
লাবণ্যের রসিকতায় রঘুনাথের বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত আতঙ্কে কেঁপে উঠল। বোম্বাইয়ের সেই জরাজীর্ণ মাছবাজারের মুখগুলো যেন এক মুহূর্তের জন্য তার চোখের সামনে ভেসে উঠল।
সেদিন রাতের পর থেকেই শুরু হলো এক বিভীষিকা। সেই বিষম আর থামল না। শুধু ভাত কেন, জল মুখে দিলেও রঘুনাথের গলায় যেন কেউ অদৃশ্য হাত দিয়ে চেপে ধরত। সামান্য ফল, দুধ বা চা মুখে তুললেই শুরু হতো ফুসফুস ফাটানো কাশির দমক, আর চোখ দিয়ে নামত ধারাশ্রু। গ্রামের ডাক্তার বাবু পরীক্ষা করে কূলকিনারা পেলেন না। কলকাতার বড় বড় হাসপাতালের নামী চিকিৎসকদের কাছে যাওয়া হলো। এন্ডোস্কোপি থেকে শুরু করে ফুসফুসের এক্স-রে, পাকস্থলীর পরীক্ষা—সব রিপোর্ট একদম স্বাভাবিক। কোনো শারীরিক রোগ নেই।
কিন্তু রঘুনাথের খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। এক এক লোকমা খাবার যেন মৃত্যুর সমান কষ্ট নিয়ে আসত।
শারীরিক কষ্টের সাথে এবার যোগ হলো মানসিক নির্যাতন। ঘটনার মাসখানেক পরের এক অমাবস্যার রাতে, বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি পড়ছে। রঘুনাথ কাশির চোটে বিছানায় ছটফট করছেন। হঠাৎ তার মনে হলো, ঘরের বন্ধ জানালার ওপার থেকে অসংখ্য ফিসফিসে কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে।
তিনি কান পাতলেন। স্পষ্ট একটা চেনা গলা ভাঙা বাংলায় ডুকরে কেঁদে বলছে—
“বাবু… আমার মাছ বিক্রির টাকাটা ফেরত দিন… আমার বউটা বিনা চিকিৎসায় মারা গেল…”
আরেকটা কর্কশ, কান্নাবিজড়িত কণ্ঠস্বর—
“মেয়ের বিয়ের জন্য জমানো টাকাটা নিয়ে পালালেন বাবু? আমার মেয়ের বিয়েটা ভেঙে গেল…”
একসঙ্গে শত শত মানুষের কান্নার আওয়াজ চারপাশের বাতাসকে ভারী করে তুলল—
“আমাদের স্বপ্ন ফিরিয়ে দিন রঘুনাথবাবু… আমাদের ভাতের গ্রাস ফিরিয়ে দিন…”
আতঙ্কে রঘুনাথ বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে দরজা খুলে বারান্দায় এলেন। চারদিক নিঝুম, ঘুটঘুটে অন্ধকার। কেউ কোথাও নেই। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, ঝুম বৃষ্টির মধ্যেও বাতাসে এক তীব্র, ভ্যাপসা কাঁচা মাছের গন্ধ! যে গন্ধটা রঘুনাথকে টেনে নিয়ে গেল বোম্বাইয়ের সেই চেনা দুর্গন্ধময় মাছবাজারে, যেখানে প্রতিদিন শত শত মানুষ তার হাতে টাকা তুলে দিত।
এরপর থেকে প্রতি রাতেই এই ভৌতিক কাণ্ড ঘটতে লাগল। রঘুনাথ ঘরের জানালা দিয়ে দেখতেন, উঠোনের অন্ধকারে অসংখ্য ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। সবার হাতে একটা করে চেনা লাল রঙের সঞ্চয়ের খাতা। কিন্তু রঘুনাথ চিৎকার করে আলো জ্বেলে বাইরে গেলেই সব ফাঁকা। দিনের পর দিন না খেতে পেয়ে রঘুনাথের হৃষ্টপুষ্ট শরীর কঙ্কালসার হয়ে গেল। চোখের নিচে কালসিটে, গাল দুটো বসে গেছে। টাকার পাহাড়ে ঘুমিয়েও মানুষটা এক ফোঁটা জলের জন্য ছটফট করতে লাগল।
একদিন রঘুনাথের কলেজপড়ুয়া ছেলে কিষাণ বাবার এই রহস্যময় অসুখের কারণ খুঁজতে গিয়ে ঘরের ভেতরের পুরোনো কাঠের ট্রাঙ্কটা খোলে। সেখানে কাপড়ের নিচে লুকানো ছিল কিছু গোপন নথিপত্র আর ডায়েরি। ডায়েরির ওপরে লেখা—স্বপ্ন পূরণ সমিতি।
খাতাটা খুলতেই কিষাণের চোখ চড়কগাছ। কোটি কোটি টাকার হিসাব, আর তার নিচে শত শত গরিব মানুষের নাম, টিপসই আর স্বাক্ষর। অর্ক আর বুঝতে বাকি রইল না যে, তাদের এই বিলাসবহুল জীবন আসলে কতগুলো অসহায় মানুষের কান্নার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কিষাণ খাতাগুলো নিয়ে সরাসরি রঘুনাথের শয্যাশায়ী বিছানার সামনে এসে আছাড় মারল।
— “বাবা! এগুলো কী? এই পাপের টাকায় তুমি আমাদের খাওয়াচ্ছ? এইজন্যই তোমার এই দশা?”
রঘুনাথ প্রথমে চিৎকার করে অস্বীকার করতে চাইলেন, কিন্তু কিষাণের জলভরা, তীব্র ঘৃণায় ভরা চোখের দিকে তাকিয়ে তিনি আর পারলেন না। বিছানা থেকে গড়িয়ে নিচে পড়ে হাউহাউ করে কেঁদে উঠলেন। জীবনের সব সত্য, সব অপরাধ স্বীকার করলেন সে রাতেই।
কিষাণ পরদিন সকালেই বাবাকে টেনে নিয়ে গেল গ্রামের শ্মশানের ধারে কুঁড়েঘরে থাকা এক অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন বৃদ্ধ সাধক, গদাধর বাবার কাছে। রঘুনাথের কঙ্কালসার চেহারা আর পাপের কাহিনী শুনে বৃদ্ধ সাধক তার জ্বলজ্বলে চোখ দুটো বন্ধ করলেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— “এটা কোনো প্রেতাত্মার কাজ নয়, রঘুনাথ। মানুষের অভিশাপের শক্তি ভূতের থেকেও ভয়ংকর। যারা একবেলা না খেয়ে তোমার বাক্সে টাকা জমাত, সেই অভুক্ত মানুষদের কান্নার গ্রাস আজ তোমার গলায় অদৃশ্য শিকল হয়ে আটকে আছে। তাদের পেটের খিদে আজ তোমার গলার বিষম।”
রঘুনাথ সাধকের পায়ে মাথা কুটে কাঁদতে লাগলেন,
— “আমাকে বাঁচান বাবা! আমি আর পারছি না! আমি বাঁচব কী করে?”
গদাধর বাবা গম্ভীর গলায় বললেন,
— “যা তোমার নয়, তা ফিরিয়ে দাও। যার স্বপ্ন চুরি করেছ, তার স্বপ্ন ফিরিয়ে দাও। নইলে এই বিষম খুব শীঘ্রই তোমার ফুসফুস ফাটিয়ে প্রাণ কেড়ে নেবে।”
কথাটা শেষ হতেই রঘুনাথের নজর গেল সাধকের ধুনির পাশে। সেখানে হুবহু স্বপ্ন পূরণ সমিতির মতো একটা লাল রঙের পাসবই পড়ে আছে! রঘুনাথ চমকে উঠে সেটা হাত দিয়ে ছুঁতে গেলেন, কিন্তু পলকের মধ্যে খাতাটা হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। চোখের পলক ফেলতেই দেখা গেল কুঁড়েঘরে গদাধর বাবাও নেই! শুধু শ্মশানের বাতাসে সেই চেনা, তীব্র কাঁচা মাছের গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে।
রঘুনাথ আর এক মুহূর্তও নষ্ট করলেন না। পাপের ধন আঁকড়ে ধরে মরার চেয়ে প্রায়শ্চিত্তের পথ বেছে নিলেন। কিষাণের কথামতো নিজের বাড়ি, গাড়ি, জমি—সব বিক্রি করে দিলেন। সমস্ত টাকা ব্যাগে ভরে ছেলেকে সাথে নিয়ে পরদিনই রওনা হলেন বোম্বাইয়ের উদ্দেশ্যে।
সমিতির পুরোনো ভাঙাচোরা অফিসে যখন রঘুনাথ গিয়ে দাঁড়ালেন, তখন সেখানকার বর্তমান ম্যানেজার তাকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলেন। রঘুনাথ একে একে আত্মসাৎ করা সমস্ত টাকা কর্তৃপক্ষের হাতে বুঝিয়ে দিলেন। ডায়েরি দেখে দেখে যাদের খুঁজে পাওয়া সম্ভব, তাদের দরজায় দরজায় গিয়ে ক্ষমা চাইলেন। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। বৃদ্ধ রিকশাচালক রামুয়া অর্থাভাবে বিনা চিকিৎসায় মারা গেছে, সবজি বিক্রেতা হরিপদর মেয়ে লোকলজ্জায় আত্মহত্যা করেছে। রঘুনাথের ফিরিয়ে দেওয়া টাকা এখন আর তাদের জীবন ফিরিয়ে দিতে পারবে না, কিন্তু রঘুনাথের বিবেকের বোঝা কিছুটা হালকা হলো।
কাজ শেষ করে, ফেরার পথে বোম্বাই সেন্ট্রাল স্টেশনের এক ছোট্ট, সস্তা ভাতের হোটেলে এসে বসলেন বাবা আর ছেলে। সামনে ধোঁয়া ওঠা সাধারণ ভাত আর ডাল। রঘুনাথ কাঁপতে কাঁপতে প্রথম লোকমাটা মুখে তুললেন। কিষাণ ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল।
এক সেকেন্ড… পাঁচ সেকেন্ড… দশ সেকেন্ড। কোনো কাশি হলো না!
রঘুনাথ দ্বিতীয় লোকমাটা খেলেন, তারপর তৃতীয় লোকমা। কোনো বিষম হলো না! দীর্ঘ ছয় মাস পর কোনো বাধা ছাড়া খাবার রঘুনাথের গলা দিয়ে নেমে গেল। রঘুনাথের চোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরতে লাগল। তবে এ জল কষ্টের নয়, এ জল মুক্তির। তিনি বুঝলেন, জগতের সমস্ত শারীরিক রোগের ওষুধ হয়তো ডাক্তারদের কাছে থাকে, কিন্তু বিবেকের রোগের ওষুধ একটাই—নিষ্ঠুর প্রায়শ্চিত্ত।
এই ঘটনার ঠিক তিন মাস পর, এক মেঘলা বর্ষার রাতে নিজের গ্রামের একটা সাধারণ ভাড়া বাড়িতে রঘুনাথ ঘুমের মধ্যেই শান্তিতে মারা গেলেন। সকালে যখন লাবণ্য তাকে ডাকতে গেলেন, দেখলেন রঘুনাথের মৃতদেহের মুখে লেগে আছে এক অদ্ভুত, স্বর্গীয় শান্তির হাসি।
এর কয়েক সপ্তাহ পরের ঘটনা। বোম্বাইয়ের সেই পুরোনো স্বপ্ন পূরণ সমিতি ভবনটি যখন নতুন করে সংস্কার করা হচ্ছিল, তখন দেওয়ালের ভেতর থেকে একটা মরচে পড়া গোপন লকার পাওয়া যায়। সেই লকারের ভেতর থেকে উদ্ধার হয় একটি পুরোনো লাল খাতা। খাতাটির শেষ পাতায় রঘুনাথের কাঁপা কাঁপা হাতের অক্ষরে একটি বার্তা লেখা ছিল, যা আজীবন মানুষের বিবেককে নাড়া দেবে:
“মানুষের টাকা চুরি করা হয়তো সহজ। কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকার স্বপ্ন চুরি করলে, সেই স্বপ্ন একদিন গলায় বিষম হয়ে ফিরে আসে। সেই অলৌকিক বিষমের কোনো ডাক্তার নেই, কোনো ওষুধ নেই। আছে শুধু নিজের পাপের অনুতাপ আর প্রায়শ্চিত্ত।”
আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেই লেখার ঠিক নিচে একটি গোল জলের দাগ শুকিয়ে গোল হয়ে রয়ে গেছে। অনেকেই বলেন, ওটা রঘুনাথের অনুশোচনার চোখের জল। বছরের পর বছর কেটে গেছে, ডায়েরির পাতা পুরোনো হয়েছে, কিন্তু শুকিয়ে থাকা সেই অশ্রুবিন্দুটি আজও কেউ মুছে ফেলতে পারেনি।