ঢাকাসোমবার , ১৩ এপ্রিল ২০২৬
  1. Bangla
  2. chomoknews
  3. English
  4. অপরাধ
  5. অভিনন্দন
  6. আমাদের তথ্য
  7. কবিতা
  8. কর্পরেট
  9. কাব্য বিলাস
  10. কৃষি সংবাদ
  11. খুলনা
  12. খোলামত
  13. গল্প
  14. গাইড
  15. গ্রামবাংলার খবর

জলপ্রহরী

admin
এপ্রিল ১৩, ২০২৬ ১১:৪১ অপরাহ্ণ
Link Copied!

জলপ্রহরী

-রাহুল রাজ

বগুলা পাড়ার শিবতলার শিব মন্দিরটি নিয়ে লোকমুখে অনেক কথা প্রচলিত। মন্দিরের বিগ্রহটি বছরের বেশির ভাগ সময় থাকে পাশের বাওড়ের গভীরে। চৈত্র মাসের শেষে বিশেষ তিথিতে সন্ন্যাসীরা যখন সেই পাথরের মূর্তিটি উপরে তোলেন, তখন হাজার হাজার ভক্তের ভিড়ে বাওড়ের পাড় জনসমুদ্রে পরিণত হয়।

লোকে বলে, সন্ন্যাসীরা যখন জল থেকে সেই বিশাল পাথরের মূর্তিটি তোলেন, তখন মূর্তির গা দিয়ে নাকি পদ্মফুলের ঘ্রাণ বের হয়। জলের তলে থাকলেও মূর্তিটির গায়ে কোনো শ্যাওলা লেগে থাকে না।

প্রত্নতাত্ত্বিক বিচারে সেটি একটি প্রাচীন বিষ্ণুমূর্তি হলেও, যুগ যুগ ধরে গ্রামের মানুষ একে ‘মহাদেব’ হিসেবেই পুজো করে আসছে। কিন্তু এই মূর্তিকে ঘিরে একটা অলিখিত নিয়ম আছে—সূর্যাস্তের পর বাওড়ের ওই বিশেষ ‘ব্রহ্ম-দহ’ অংশে কোনো নৌকা যায় না। কারণ, গ্রামবাসীদের বিশ্বাস, জলের নিচে যা রাখা আছে, তার পাহারাদার কোনো মানুষ নয়।

লোকগাথা বলে, প্রতি বছর মূর্তিটি নাকি তিল তিল করে আয়তনে বাড়ে। তবে সবচেয়ে বড় রহস্য বাওড়টি নিজে। এর গভীরতা কত, বা এর নিচে কী আছে—তা কেউ জানে না। বংশপরম্পরায় সন্ন্যাসীরাই কেবল নির্দিষ্ট জায়গায় ডুব দিয়ে মূর্তিটি খুঁজে পান।

দেশ থেকে বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছে এই মূর্তির কথা। ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভক্তরা নিজ চোখে এক পলক মূর্তিটিকে দেখতে প্রতিবছরই চৈত্র মাসের এই লগ্নে এখানে ভিড় করে। দেশ ও বিদেশের অনেকের কাছেই মূর্তিটিকে নিয়ে তৈরি হয়েছে ব্যাপক কৌতূহল ও আগ্রহ। এরই কারণে কালোবাজারের মূর্তি পাচারকারী চক্রের নজর পড়েছিল মূর্তিটির প্রতি।

কলকাতার নিমাই মণ্ডল আর কাস্তে বণিক দুজনেই কুখ্যাত মূর্তি পাচারকারী চক্রের সদস্য। জীবনে বহুবার বহু স্থান থেকে বহু মূর্তি চুরি করে তারা তুলে দিয়েছে বিদেশিদের হাতে। এবার তাদের নজর পড়েছে প্রাচীন এই শিবমূর্তির দিকে।

প্রত্নতাত্ত্বিক ব্ল্যাক মার্কেটের কয়েক কোটি টাকার লোভে টানা দুই বছর ধরে তারা মূর্তির প্রতিটি খুঁটিনাটি লক্ষ্য করেছে। তারা জানত, সন্ন্যাসীরা কোনো এক গুপ্ত সংকেত মেনে মূর্তির অবস্থান ঠিক করেন।

সন্ধ্যা নামতেই বাওড়ের দুপাশের গ্রামগুলো নিস্তব্ধ হয়ে যায়। রাতের আঁধারে সহজে মূর্তিটি হাতিয়ে নিতে পারবে ভেবে পরিকল্পনা করতে থাকে। মাঘ মাসের শীতে বাওড়ের জল খানিকটা শুকিয়ে যায়। এ সময় কনকনে ঠান্ডা বাতাসে রাতে বাওড়ের ধারেকাছে কেউ আসে না।

মাঘের এক হাড়কাঁপানো রাতে যখন কুয়াশায় চার হাত দূরের মানুষ দেখা যাচ্ছে না, তখন তারা বাওড়ের পাড়ে হাজির হলো। নিস্তব্ধ রাত। দূরে কোনো গাছে নিশিপাখি ডেকে উঠছে থেকে থেকে।

সিন্দ্রানী থেকে কমলাবাসে যাওয়ার রাস্তায় ভাঙা ব্রিজের নিচে দিন থাকতে তারা একটি ডিঙি নৌকা বেঁধে রেখেছিল। নিঃশব্দে তারা দুজনে ডিঙি নৌকায় উঠে বাওড়ের জলে নৌকা ভাসিয়ে দিল।

নিমাই বৈঠায় জল ঠেলে কুয়াশার চাদর ভেদ করে বাওড়ের সেই নির্ধারিত স্থানে এসে উপস্থিত হয়। হাতের ইশারায় কাস্তেকে সেই সংকেত দেখিয়ে বলে, এই জায়গায় জলের নিচেই রাখা আছে মূর্তিটি। কাস্তের চোখ ছলছল করে উঠল। ফিসফিস করে সে নিমাইকে বলল, আমি কোমরে দড়ি বেঁধে জলে নামছি। আমার মনে হচ্ছে বেশি সময় লাগবে না। মূর্তিটা পেলেই দড়িতে টান দেব। সঙ্গে সঙ্গে তুই আমাকে টেনে উপরে তুলবি।

কোমরে শক্ত দড়ি বেঁধে কাস্তে বণিক যখন বাওড়ের কালো জলে ডুব দিল, নিমাই ডান হাতে দড়ির অন্য প্রান্ত ধরে রাখল। সুযোগ বুঝে একটা বিড়ি ধরিয়ে টানতে লাগল নিমাই। কাস্তে জলে নামার সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ করেই নিমাইয়ের চারপাশের পরিবেশ বদলে যেতে লাগল। কিছু সময়ের মধ্যেই কুয়াশা বেড়ে গেল কয়েক গুণ। সেই কুয়াশার চাদর ভেদ করে নিজেকেও ঠিকমতো দেখতে পারছিল না নিমাই। ঘুটগুটে অন্ধকার আর কনকনে ঠান্ডা বাতাসে সময় যেন থমকে গেছে। নিমাই অপেক্ষা নিয়ে বড় বড় চোখে তাকিয়ে আছে জলের দিকে।

কয়েক মুহূর্ত পরেই দড়িতে আচমকা টান পড়ল। বিড়িটা জলে ছুড়ে ফেলে দুহাতে দড়িটা শক্ত করে ধরল নিমাই। সে মনে মনে ভাবল কাস্তে মূর্তির সন্ধান পেয়ে গেছে। দড়িতে আবারও টান পড়ল। এবারের টান আগের থেকেও কঠিন ও জোরালো। নিমাই শক্ত করে দড়িটা ধরে উপরের দিকে টান মারল। কিন্তু ক্রমশই দড়িটা নিচের দিকে এমনভাবে নামছে যেন জলের তলার কোনো দানব ওটাকে গোগ্রাসে গিলছে। সে দড়ি ধরে হ্যাঁচকা টান দিল। কিন্তু প্রতিদানে নিচ থেকে যে টান এল, তাতে ডিঙি নৌকাটি প্রায় উল্টে যাওয়ার উপক্রম হলো।

হঠাৎ নিমাই লক্ষ্য করল, বাওড়ের জলটা হঠাৎ ফুটন্ত কড়াইয়ের মতো টগবগ করে ফুটতে শুরু করেছে। চারপাশের কুয়াশা যেন আরও ঘন হয়ে তাকে ঘিরে ধরছে। সেই সঙ্গে জলে সৃষ্টি হয়েছে ঘূর্ণি-স্রোত। চারপাশ থেকে ভেসে আসছে তীব্র আঁশটে গন্ধ। তার নৌকাটা ঘূর্ণি স্রোতে একা একা ঘুরছে। নিজের সর্বশক্তি দিয়ে সে আবার দড়ি টানতে শুরু করল। প্রবল টানাটানিতে হঠাৎ দড়িটা মাঝখান থেকে ছিঁড়ে আলগা হয়ে এল। নিমাই ছিটকে পড়ল নৌকার ওপর। কম্পিত হাতে মোবাইলের ফ্ল্যাশ লাইটটা জ্বালতেই তার আত্মা শুকিয়ে গেল।

জলের ওপর একটা হাত ভেসে আছে। কবজির কাছে কাটা দাগটা দেখে নিমাই বুঝে গেছে সেটা কাস্তের হাত। সে দড়ি ছেড়ে হাতটা ধরে সজোরে টান দিল। পরমুহূর্তেই একটা কাটা হাত নিয়ে সে আবার নৌকায় ছিটকে পড়ল। হাতটা দেখে বোঝা যাচ্ছে কোনো অতিকায় প্রাণী তার মাংস আর হাড় অবলীলায় চিবিয়ে আলাদা করে দিয়েছে।

নিমাইয়ের সারা শরীর ভয়ে পাথর হয়ে গেল। চোখের সামনে ভেসে উঠল জলের নিচে কাস্তের ভয়াবহ পরিণামের ছবি। কিন্তু এই বাওড়ে এমন কোনো ভয়ংকর দানবীয় প্রাণীর থাকার কথাই নয়। গত দুই বছর এই বাওড় সম্পর্কে তারা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব তথ্য নিয়েছে। এটা অসম্ভব, এটা হতে পারে না। এই বাওড়ের জলে এমন কোনো দানবীয় প্রাণী থাকতেই পারে না। প্রচণ্ড রাগে নিমাই হাতের বৈঠা দিয়ে জলের উপরে এলোমেলোভাবে পাগলের মতো বাড়ি দিতে থাকল।

ঠিক সেই মুহূর্তে অন্ধকার চিরে ভেসে এল এক গম্ভীর ‘ডমরু’ বাজার শব্দ। মনে হচ্ছে শব্দটা বাওড়ের গভীর তলদেশ থেকে উঠে আসছে, আবার পরক্ষণেই মনে হচ্ছে আকাশ থেকে নেমে আসছে। সেই শব্দের কম্পনে নিমাইয়ের কানের পর্দা ফেটে যাওয়ার উপক্রম। বৈঠা ফেলে দিয়ে সে দু-হাত দিয়ে কান চেপে ধরে নৌকার পাটাতনে কুঁকড়ে শুয়ে পড়ল।

শব্দটা দূর থেকে আসছে না, মনে হচ্ছে সরাসরি নিমাইয়ের মাথার ভেতর বাজছে। সেই তীব্র শব্দের কম্পনে নৌকার কাঠ পর্যন্ত থরথর করে কাঁপছে। নিমাই দুই কানে হাত দিয়ে চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু দেখল তার মুখ থেকে কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না। তার শরীর যেন পাথরের মতো ভারী হয়ে গেছে। সে চোখের পলক পর্যন্ত ফেলতে পারছে না। সে চিৎকার করে বলতে চাইল, কে কোথায় আছো আমাকে বাঁচাও। কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। তার মনে হচ্ছে কে যেন তার বুক চেপে ধরে রেখেছে। তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। এমন করে কত সময় কেটেছে তা জানা ছিল না নিমাইয়ের।

হঠাৎ কুয়াশা সরে গিয়ে জল আয়নার মতো স্বচ্ছ হয়ে গেল। নিমাই দেখল নৌকার ঠিক নিচেই সেই পাথরের মূর্তিটি। কিন্তু এ কী! পাথরের সেই বিষ্ণুমূর্তির মাথার উপরের নাগ সাপের চোখ দুটো খুলে গেছে। সেই চোখে কোনো মায়া নেই, আছে এক আদিম শীতলতা। মূর্তির চার হাত থেকে সাপেরা জীবন্ত হয়ে চারিদিকে ছটফট করছে। আর নিমাইয়ের নৌকার চারপাশ ঘিরে ফেলেছে বিশালাকার সব কুমির। তাদের চোখগুলো আগুনের গোলার মতো জ্বলছে।

সবচেয়ে ভয়ংকর দৃশ্যটা ছিল নৌকার ঠিক পেছনে। জলের তলা থেকে উঠে এল এক দীর্ঘ ছায়া, যার আকার কোনো মানুষের মতো নয়। নিমাই অনুভব করল হাড়কাঁপানো শীতের রাতটা হঠাৎ তপ্ত হয়ে উঠেছে। নিমাইয়ের সারা শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছে। পেছন থেকে একটা ভারী নিশ্বাস তার ঘাড়ের কাছে তপ্ত বাষ্পের মতো এসে লাগল। সে বুঝতে পারল, সে একা নয়, নৌকায় তার ঠিক পেছনেই কেউ একজন বা কিছু একটা বসে আছে। সে পরিষ্কার বুঝতে পারল, তার চারপাশে অসংখ্য অশরীরী তাকে ঘিরে ধরেছে। তাদের বিষাক্ত নিঃশ্বাসে তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। কারা যেন অসংখ্য হাত বাড়িয়ে তার দিকে এগিয়ে আসছে। সেই দৃশ্য নিমাই আর দেখতে পেল না। সে জ্ঞান হারালো।

কতক্ষণ কেটেছিল জানা নেই। যখন সে চোখ মেলল, দেখল কুয়াশা উধাও। আকাশজুড়ে অসংখ্য উজ্জ্বল তারা। বাওড়ের জল এখন কাঁচের মতো স্বচ্ছ। কিন্তু একি! মাঘের শীতের রাত মুহূর্তেই যেন ভ্যাপসা গরমের রাতে বদলে গেছে। তার সারা শরীর বেয়ে ঘাম ঝরছে।

নিমাই নৌকায় বসে আবার চারিদিকে দেখতে লাগল। সে দেখল নৌকার চারপাশে অদ্ভুত স্থিরতায় ভেসে আছে কয়েক জোড়া চোখ। রাতের অন্ধকার চোখে সয়ে যাওয়ার পরে নিমাই দেখল চোখগুলো বড় বড় কুমিরের। কিন্তু তারা আক্রমণ করছে না, শুধু তাকে ঘিরে রেখেছে।

নিমাই নড়াচড়া করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। সে দেখতে পেল বাওড়ের স্বচ্ছ জলের অনেক নিচে সেই বিষ্ণুমূর্তিটি জ্বলজ্বল করছে। মূর্তির চার হাতে ধরা শঙ্খ, চক্র, গদা আর পদ্ম যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। আর মূর্তির মাথায় ফণা তুলে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল নাগ।

নিমাই বুঝল, এই মূর্তি কোনো সাধারণ পাথর নয়, এ এক প্রাচীন জাগ্রত পবিত্র পাথর। যা চুরি করা যায় না, দখল করা যায় না, কেবল ভক্তি দিয়ে দর্শন করা যায়। আর এই মূর্তি পাহারা দেয় অসংখ্য জলপ্রহরী। দিনের আলোয় বা রাতের অন্ধকারে এদের দেখা যায় না। শুধু মূর্তির অনিষ্টের মুহূর্তেই প্রকট হয় এই জলপ্রহরীরা।

নিজের কৃতকর্মের কথা ভেবে আবারও আঁতকে ওঠে নিমাই। চারিপাশে তাকিয়ে নিজের সর্বশক্তি দিয়ে সে দেখতে পায় সব কুমিরেরা নৌকার চারপাশে বিশেষ ছন্দে ঘুরছে। তাদের চলার গতিতে জলে আবার সৃষ্টি হয়েছে ঘূর্ণন। সেই ঘূর্ণন ক্রমশ বেড়ে উঠল। এমন কিছুটা সময় চলার পর একটি কুমির বিশাল বড় হাঁ করে কামড়ে ধরল ছোট নৌকাটি। সঙ্গে সঙ্গে নৌকা ভেঙেচুরে তলিয়ে গেল বাওড়ের সেই ঘূর্ণন জলে। নিমাইয়ের অবশ শরীর ছেড়ে শেষ আত্মচিৎকার প্রতিধ্বনিত হলো বাওড়ের দুই প্রান্তে।

পরদিন সকালে গ্রামবাসী বাওড়ের পাড়ে প্রায় ভাঙা একটি ডিঙি নৌকা দেখতে পায়। কিন্তু নিমাই বা কাস্তের কোনো চিহ্ন সেখানে ছিল না। কেউ জানতেই পারল না গতরাত্রে মূর্তি চুরি করতে আসা লোভীদের শেষ পরিণতির কথা। এমন করে কত নিমাই আর কাস্তে লোভের বশে এই বাওড়ের জলে মিশে গেছে সে হিসাব জানা নেই বগুলার গ্রামবাসীদের।

আজও চৈত্র মাসে মেলা বসে। সন্ন্যাসীরা সেই একইভাবে মূর্তি তোলেন। ভক্তরা জল ঢালে। আজও কেউ কেউ বলে, অমাবস্যার রাতে বাওড়ের মাঝখান থেকে আবছা ডমরুর শব্দ শোনা যায়, আর জলের নিচে দেখা যায় এক অলৌকিক নীল আভা।