সাকিবকেই বেছে নিচ্ছে বিসিবি
রাহুল রাজ ।। ‘বাংলার আকাশে আজ দুর্যোগের ঘনঘটা। কে তাকে আশা দেবে, কে তাকে ভরসা দেবে।’ বিখ্যাত এই উক্তির বর্তমান বাস্তব উদাহরণ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। গত কয়েক দিন ধরে বাংলার ক্রিকেটে নানাভাবে রং পাল্টেছে। আচমকা মোড় নিয়েছে গল্পের মোড়।
তামিমের অবসব, আবার ফিরে আসা, নিজের অধিনায়ত্ব ছাড়া। বিসিবির নতুন করে অধিনায়ক খোঁজার মিশন। সব মিলিয়ে রংধনুর সাত রংই ছুঁয়ে গেছে বিসিবির ক্যানভাস। সেই ছবির শেষ পূর্ণতা পাচ্ছে সাকিব আল হাসানের ছোঁয়াতে।
অনেক জল ঘোলা করে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অধিনায়কত্বের দায়িত্ব সাকিবের কাঁধেই পড়তে যাচ্ছে। আসন্ন এশিয়া কাপ ও বিশ্বকাপের জন্য নতুন অধিনায়ক খুঁজতে ব্যস্ত সময় পার করছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে লিটনকে অধিনায়ক করে ব্যাটিংয়ে চাপ না বাড়ানোর কথা বলেছেন নাজমুল হাসান পাপন।
এদিকে এশিয়া কাপ কিংবা বিশ্বকাপের জন্য নয় দীর্ঘ মেয়াদে অধিনায়কত্ব দিলেই দায়িত্ব নিবেন বিসিবিকে এই শর্ত দিয়েছেন সাকিব। আসন্ন দুই মেগা ইভেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে বিসিবি কাছে সাকিব ছাড়া ভালো অপশনও নেই। তাই গত শনিবার বিসিবি সভাপতি বলেছেন অধিনায়ক বানানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে সহজ অপশন হচ্ছে সাকিবকে বানিয়ে দেওয়া।
বোর্ড সভাপতির এই বক্তব্যের পর কিছুটা হলেও ধারণা পাওয়া যায় এশিয়া কাপ ও বিশ্বকাপে কার কাঁধে উঠতে যাচ্ছে দলকে সামলানোর দায়িত্ব। রোববার ক্রিকেট বোর্ডের একটি বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যেই সাকিবের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে বিসিবি।
বর্তমানে শ্রীলঙ্কায় রয়েছেন বাঁ-হাতি এই ব্যাটার। সেখানে লঙ্কা প্রিমিয়ার লিগে খেলছেন তিনি। সেখানেই সাকিবের কাছে বোর্ডের চূড়ান্ত প্রস্তাবনা পাঠানো হবে দুই একদিনের ভেতরেই। বোর্ডের সেই সূত্র বলেন, বোর্ড সভাপতি নিজে বিষয়টি দেখছেন।
ওর কাছে দু-একদিনের ভেতর চূড়ান্ত প্রস্তাব পাঠানো হবে তার কাছে। আমরা ওর সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছি। দীর্ঘমেয়াদেই ওকে আমরা দলের দায়িত্ব দেব। এর ভেতর লিটনও নিজেকে প্রস্তুত করে ফেলতে পারবে। আপাতত আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে অন্তত দুই বছরের জন্য তাকে অধিনায়ক করা।
যদি এমনটি হয়, তাহলে অন্তত ২০২৫ সাল পর্যন্ত ওয়ানডে দলের দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন বাঁহাতি এই অলরাউন্ডার। সাকিব ২০২৫ পর্যন্ত দলকে সামলালে মাঝের এই সময়টাতে লিটন নিজেকে প্রস্তুত করে নিতে পারবেন ২০২৭ বিশ্বকাপের জন্য।
যে কারণে সব দিক বিবেচনা করেই সাকিবের হাতে ওয়ানডে দলের দায়িত্ব তুলে দিতে যাচ্ছে বোর্ড। পাপনের কাছ থেকে প্রস্তাব পেলে হয়তো না করতে পারবেন না সাকিব।
কারণ, তিনিও তো চান ভারতে অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপে ভালো করুক বাংলাদেশ। এ ছাড়া তামিম স্বেচ্ছায় নেতৃত্ব ছাড়ায় সাকিবকে নেতৃত্বে আনা হলে বিতর্কিত হওয়ারও কিছু নেই। বিসিবি পরিচালক ও কর্মকর্তাদের একটা বড় অংশ আগে থেকেই বিশ্বকাপে সাকিবকে অধিনায়ক করার পক্ষে ছিলেন।
বিভিন্ন মঞ্চে এ নিয়ে আলোচনা হলেও বিসিবি সভাপতি পাপন ও ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের চেয়ারম্যান তামিমেই আস্থা রেখেছেন। পুরোপুরি ফিট থাকলে অধিনায়ক বদলের কোনো সুযোগ ছিল না। কোমরের ব্যথা থাকায় টানা ম্যাচ খেলার অনিশ্চয়তার বিষয়টি বুঝতে পেরে তামিম নিজে থেকেই অধিনায়কত্ব ছেড়ে দেন।
তাই নতুন অধিনায়ক নির্বাচনের একটা বাধ্যবাধকতা চলে এসেছে। বিসিবি পরিচালকরাও সাকিবকে অধিনায়ক হিসেবে পাওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে আছেন। যদিও এখন পর্যন্ত ঢাকার ফোন পাননি সাকিব। লঙ্কান প্রিমিয়ার লিগে (এলপিএল) গলে টাইটান্সের হয়ে ম্যাচ খেলতে এ মুহূর্তে ক্যান্ডিতে রয়েছেন টাইগার টেস্ট ও টি২০ অধিনায়ক।
সেখানে পরিবার নিয়ে ভালো সময় কাটছে তার। এই ভালো লাগা মধুর করে তুলতে পারে ২০২৫ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি পর্যন্ত ওয়ানডে দলের নেতৃত্ব দেওয়া চূড়ান্ত হয়ে গেলে।
তামিমের নেতৃত্ব ছাড়ার সংবাদ সম্মেলনে বিসিবি সভাপতি বলেছেন, নতুন অধিনায়ককে দীর্ঘ মেয়াদে মনোনীত করা হবে। দুই বছরের কথা স্পষ্ট করে বলেছেন তিনি।
গতকাল বলেছেন, ‘সাকিবের সঙ্গে কথা বলব। আমাদের জানতে হবে সে দুই বছর খেলবে কিনা। খেলোয়াড়দের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তবে সে আমাদের অবধারিত পছন্দ।
হ্যাঁ, লিটনও আছে। কিন্তু দ্বিপক্ষীয় সিরিজ আর বিশ্বকাপ এক না। বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে দায়িত্ব দেওয়া হলে চাপে তার ব্যাটিংয়ের ক্ষতি হয় কিনা। তাই আমরা আলোচনা করে একটা সিদ্ধান্ত নেব।’ সেদিক থেকে ২০২৫ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি পর্যন্ত নেতৃত্ব পেতে পারেন সাকিব।
সব্যসাচী এ ক্রিকেটারের শেষ বৈশ্বিক টুর্নামেন্টও হতে পারে এটি। কারণ, তখন তার বয়স ৩৮ বছর পেরোবে। তাই আশা করা যায় না, ২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপেও খেলবেন তিনি।
সে যাই হোক, সাকিবকে অধিনায়ক করা হলে ২০২৭ বিশ্বকাপের জন্য লিটন কুমার দাস তৈরি হয়ে যাবেন। কারণ টেস্ট ও টি২০-এর মতো ওয়ানডে দলেও সহকারী অধিনায়ক হবেন তিনি। সব দিক বিবেচনা করে সাকিবকে অধিনায়কের প্রস্তাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিসিবি।
২০১১ সালের বিশ্বকাপে নেতৃত্ব দেওয়া, ২০১৫ ও ২০১৯ সালের বিশ্বকাপে মাশরাফি বিন মুর্তজার সহকারী থাকা সাকিবকে মনোনীত করার চেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারে না। কারণ, বিশ্বকাপে জাতীয় দলের ভালো বা খারাপ করার বিষয়টি অনেকাংশে নির্ভর করছে অপেক্ষাকৃত যোগ্য নেতার হাতে দল তুলে দেওয়ার ওপর।
স/এষ্

