ঢাকারবিবার , ৬ আগস্ট ২০২৩
  1. Bangla
  2. chomoknews
  3. English
  4. অপরাধ
  5. অভিনন্দন
  6. আমাদের তথ্য
  7. কবিতা
  8. কর্পরেট
  9. কাব্য বিলাস
  10. কৃষি সংবাদ
  11. খুলনা
  12. খোলামত
  13. গল্প
  14. গাইড
  15. গ্রামবাংলার খবর

রাতের নৌপথে মরণফাঁদ বাল্কহেড

admin
আগস্ট ৬, ২০২৩ ৯:৩৫ অপরাহ্ণ
Link Copied!

রাতের নৌপথে মরণফাঁদ বাল্কহেড

নিষেধাজ্ঞার পরও ‘ম্যানেজ’ করে অবাধে চলাচল
দায় নিতে নারাজ বিআইডব্লিউটিএ

চমক প্রতিবেদক ।। সারাদেশের নদীপথে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বালুবাহী নৌযান বাল্কহেড। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, ধলেশ^রীসহ বিভিন্ন নদীতে বেপরোয়া গতিতে চলাচল করা এসব বাল্কহেডের ধাক্কায় প্রতিনিয়ত ডুবছে যাত্রীবাহী নৌযান, প্রাণ হারাচ্ছে অসংখ্য মানুষ।

বাল্কহেডের অবস্থান নির্দেশ করার জন্য মিটমিট করে জ্বলা লাল রঙের যে নিরাপত্তা বাতি ব্যবহার করা হয়, তাও ইদানীং অনেক বাল্কহেডে থাকে না। বালুবোঝাই থাকলে এসব নৌযানের পুরোটাই থাকে পানির নিচে। শুধু সামনের এবং পেছনের সামান্য অংশ পানির ওপরে কোনো রকম মাথা তুলে দৃশ্যমান থাকে।

এ অবস্থাতেই বেপরোয়াভাবে চলাচল করে বাল্কহেডগুলো। ফলে নদীপথগুলোতে প্রায়ই ঘটছে মর্মান্তিক সব দুর্ঘটনা।

এসব দুর্ঘটনা ঠেকাতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সূর্যাস্তের পর থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত সারা দেশের নৌপথে বাল্কহেড চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। তারপরও নির্দেশনা অমান্য করে চলছে এই জলযান। বিআইডব্লিউটিএ, নৌ-পুলিশ ও কোস্টগার্ডকে ম্যানেজ করেই রাতে এসব যান নির্বিঘ্নে চলাচল করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সবশেষ গত শনিবার রাতে মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ে একটি বাল্কহেডের ধাক্কায় ৪৬ জন যাত্রী নিয়ে একটি ট্রলার ডুবে যায়। এ ঘটনায় এ পর্যন্ত আটজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিস। এর আগে গত ১৬ জুলাই ঢাকার সদরঘাটের কাছে বুড়িগঙ্গা নদীতে ডুবে যায় ওয়াটার বাস। এ দুর্ঘটনায় পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

একইদিন টাঙ্গাইলের যমুনা নদীর উপর নির্মাণাধীন বঙ্গবন্ধু রেলসেতু‌র পিলারে ধাক্কা দিয়ে একটি বালুবাহী বাল্কহেড ডুবে যায়। এ সময় চালকসহ ছয়জন দ্রুত সাঁতরে পাড়ে উঠে আসেন। এ ঘটনায় কেউ হতাহত হননি। ১০ জুলাই মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায় আড়িয়াল খাঁ নদে বাল্কহেড ডুবে ৩ শ্রমিক মারা যান।

এছাড়া গত ১০ জুন বরিশালের কীর্তনখোলা নদীতে ঢাকাগামী এমভি পারাবাত-১১ লঞ্চের ধাক্কায় বালুবাহী বাল্কহেড ডুবে একজন নিখোঁজ হন। ১১ জুন বরিশালের গৌরনদী উপজেলার আড়িয়াল খাঁ নদীতে বালুবাহী বাল্কহেডের ধাক্কায় এক নারী ট্রলারযাত্রী নিহত হন। আহত হন আরও ৬ জন ট্রলারযাত্রী।

তার আগে গত বছরের ৬ জানুয়ারি মেঘনার হিজলা-বাবুগঞ্জ অংশে বাল্কহেডের ধাক্কায় ডুবে যায় মালবাহী জাহাজ হালিমা সোবাহান-১।

১ ফেব্রুয়ারি চাঁদপুরে ডাকাতিয়া নদীতে বালুবাহী বাল্কহেডের ধাক্কায় ৫ জন নিহত হন। ওই বছর ১৬ ফেব্রুয়ারি রাতে মুন্সিগঞ্জের কলাগাছিয়ায় মেঘনা-ধলেশ্বরী নদীর মোহনায় ঢাকা থেকে বরিশালগামী সুরভী-৭ লঞ্চের সঙ্গে সংঘর্ষে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান লঞ্চের ৫ শতাধিক যাত্রী।

৭ মার্চ শীতলক্ষ্যা নদীর নিতাইগঞ্জ এলাকায় বাল্কহেডের ধাক্কায় নৌকা ডুবির ঘটনায় এক তরুণীর লাশ উদ্ধার করা হয়।

২০২১ সালের ৩ মে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার বাংলাবাজার-শিমুলিয়া নৌরুটের কাঁঠালবাড়ী ঘাট সংলগ্ন এলাকায় বাল্কহেডের ধাক্কায় স্পিডবোট দুর্ঘটনায় ২৬ জন নিহত হন। এছাড়া ২১ মে রাতে মেঘনায় এমভি গ্লোরি অব শ্রীনগর-২ লঞ্চের সঙ্গে বালুবাহী বাল্কহেডের সংঘর্ষ হয়। লঞ্চটির ডানদিক পানিতে নিমজ্জিত হলেও প্রায় আড়াইশ যাত্রীকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়।

তিন দিন পর ২৪ মে রাতে কয়েকশ যাত্রী নিয়ে ঝড়ের কবলে পড়ে এমভি মানামী। মেঘনায় লঞ্চটি নিরাপদ আশ্রয়ে গেলে হঠাৎ একটি বাল্কহেড লঞ্চটির মাঝ বরাবর ধাক্কা দেয়। এতে লঞ্চের নিচতলা ও দ্বিতীয়তলার কেবিনসহ বেশকিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এক যাত্রী গুরুতর আহত হন।

একই রাতে মেঘনা নদীর মিয়ারচরে তিনশ যাত্রী বোঝাই এমভি যুবরাজ-৭ লঞ্চকে ধাক্কা দেয় একটি বাল্কহেড। ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে তলা ফেটে গেলে লঞ্চটিকে চরে তুলে দিয়ে যাত্রীদের প্রাণ বাঁচানো হয়।

২০২০ সালের ৩১ অক্টোবর শীতলক্ষ্যা নদীতে নারায়ণগঞ্জে বন্দর স্কুল ঘাট এলাকার বালুবাহী বাল্কহেডের ধাক্কায় নৌকা ডুবির ঘটনায় এক ব্যবসায়ী নিহত হন।

অবৈধভাবে চলছে কয়েক হাজার বাল্কহেড:
নৌ-পরিবহন অধিদফতরের তথ্য বলছে, অভ্যন্তরীণ নৌপথে চলাচলের জন্য ১৫ ধরনের নৌযানের অনুমতি আছে। অভ্যন্তরীণ রুটে সারা দেশের সব মিলে প্রায় ১৬ হাজার ৯৮০টি অনুমোদিত নৌযান চলাচল করে।

এর মধ্যে অনুমোদিত বালুবাহী নৌযান (বাল্কহেড) আছে ৬৩৭৯টি। তবে এর বাইরেও সারা দেশের নদীতে চলছে অবৈধভাবে আরও কয়েক হাজার বাল্কহেড চলাচল করছে। এসব অবৈধ বাল্কহেড চলছে দক্ষ মাস্টারের পরিবর্তে অদক্ষ সুকানি দিয়ে।

নেই ফিটনেসের বালাই। যদিও দেশে কতসংখ্যক অবৈধ নৌযান চলাচল করছে, সে হিসাব নেই নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের কাছে।

নৌ-নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষক বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক মো. ইমরান উদ্দিন বলেন, ‘নদীতে চলা বেশির ভাগ বাল্কহেড অনিবন্ধিত। এসব নৌযানের নকশায় ত্রুটি থাকে। নিজেদের মতো তৈরি করে নদীতে নামায়। তা ছাড়া বাল্কহেডগুলোর ডিজাইন এমন যে, ধাক্কা লাগলে বড় বড় নৌযান ডুবিয়ে দিতে পারে।’

কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করেই অবাধে চলাচল: নৌ খাতের মালিক ও শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নৌ মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও নৌ-পরিবহন অধিদপ্তর ছাড়াও নৌ-পুলিশ, কোস্টগার্ডসহ স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই অবাধে চলাচল করছে এসব বাল্কহেড।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বাল্কহেডের মালিক খোলা কাগজকে বলেন, প্রতি মাসে বিআইডব্লিউটিএ ও নৌ পুলিশকে ৩ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত মাসোয়ারা দিয়ে বাল্কহেড চলাচল করে। এছাড়া স্থানীয় প্রশাসনকেও ম্যানেজ করতে হয়। অনুমোদন বা নিবন্ধন নিতে হলে একদিকে বড় অঙ্কের টাকা উৎকোচ দিতে হয়, নকশা নিয়েও থাকে নানা হয়রানি-জটিলতা।

লঞ্চমালিক সমিতির মহাসচিব শহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, ‘বাল্কহেড চলাচল মনিটর করার দায়িত্ব যাদের, তাদের ম্যানেজ করেই রাতে অবৈধভাবে চলছে বাল্কহেড। রাতে যাত্রীবাহী নৌযান আমরা খুব কষ্টে চালাই। কারণ বাল্কহেড একটি আতঙ্কের নাম। গত ১০ বছরে অনেক যাত্রীবাহী নৌযানে দুর্ঘটনা ঘটেছে শুধুমাত্র এই বাল্কহেডের কারণে।’

দায় নিতে নারাজ বিআইডব্লিউটিএ:

বিআইডব্লিউটিএর উপ-পরিচালক ওবায়দুল করিম খান বলেন, ‘অবৈধ বাল্কহেড চলাচল নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আমরা প্রায়ই অভিযান পরিচালনা করে থাকি। তারপরও যেহেতু নৌপথ বিস্তৃত এলাকা সেক্ষেত্রে অনেক সময় আমরা একদিকে কাজ করতে থাকলে অন্যদিক দিয়ে বাল্কহেডগুলো অবৈধভাবে চলাচল করে। এছাড়া এরা দিনের বেলায় চলাচল করে না।

রাতের আঁধারে যখন বিআইডব্লিউটিএ’র লোকজন চলে যায়, তখন তারা বালু উত্তোলন করে। এটা পুরোপুরিভাবে বিআইডব্লিউটিএর একার পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তারপরও আমরা এগুলো বন্ধ করার জন্য বারবারই ব্যবস্থা নিচ্ছি।’

অভিযোগ রয়েছে নৌপথে বিআইডব্লিউটিএ ও নৌপুলিশের পৃষ্ঠপোষকতায় নৌপথে অবৈধ বাল্কহেডগুলো চলাচল করে, এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না, বিআইডব্লিউটিএ নদীতে বালু তোলার জন্য কোনো অনুমতি দেয় না। এটা জেলা প্রশাসনের দায়িত্ব।

বিআইডব্লিউটিএ কখনোই কোনো বাল্কহেড কিংবা ড্রেজারকে বালু তোলার অনুমোদন কখনোই দেয় না। বরং আমরা এগুলো প্রতিহত করার জন্য সব সময় কাজ করে যাচ্ছি।’

স/এষ্