ঢাকাবৃহস্পতিবার , ৫ জুন ২০২৫
  1. Bangla
  2. chomoknews
  3. English
  4. অপরাধ
  5. অভিনন্দন
  6. আমাদের তথ্য
  7. কবিতা
  8. কর্পরেট
  9. কাব্য বিলাস
  10. কৃষি সংবাদ
  11. খুলনা
  12. খোলামত
  13. গল্প
  14. গাইড
  15. গ্রামবাংলার খবর

অজানা আতঙ্ক থেকে ব্যবসায়ীদের মুক্ত করতে হবে

চমক নিউজ বার্তা কক্ষ
জুন ৫, ২০২৫ ৯:১৮ অপরাহ্ণ
Link Copied!

অজানা আতঙ্ক থেকে ব্যবসায়ীদের মুক্ত করতে হবে

সালেহ্ বিপ্লব ।। দেশের শীর্ষ এক ব্যবসায়ীর সাথে দেখা করাটা খুব জরুরি ছিলো আমার জন্য, এটা গত এপ্রিল মাসের কথা। আমাকে অসম্ভব স্নেহ করেন তিনি, ২২ বছরের সম্পর্ক তাঁর সাথে, কখনোই তাঁর অফিসে আমাকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে যেতে হয় না, সেদিনও অ্যাপয়েন্টমেন্ট করতে হয়নি।

তবে এই প্রথম তিনি আমাকে দেখা দিলেন মাত্র দুই মিনিটের জন্য। আমি যখন তার অফিসে গিয়ে নিজের উপস্থিতি জানান দিলাম, তখন তিনি কোম্পানির বোর্ড মিটিংয়ে সভাপতিত্ব করছেন। মিটিং রুম থেকে বের হয়ে পাশের কক্ষে তিনি আমাকে স্বাগত জানালেন। কথা হলো দাঁড়িয়েই। বললেন, সালেহ্, দেখা না হলেও তোমার সব খবর আমি রাখি। যখনই কোনো প্রয়োজন হয়, আমাকে রিচ করতে না পারলে ওমুকের (একজন এক্সিকিউটিভের নাম বললেন) কাছে মেসেজ দিও। আর আমাদের জন্য দোয়া করো। আরো কিছু কথা আছে, আমাদের একজন এক্সিকিউটিভ তোমাকে ব্রিফ করবেন ।

এরপর সেই এক্সিকিউটিভের চেম্বারে বসলাম। চমৎকার ফ্লেভারের বিস্কিট দিয়ে কফি খেতে খেতে শুনলাম তার কথা। তার ব্রিফিংয়ের সারমর্ম হলো, ৫ আগস্টের পর আপনি প্রথম সাংবাদিক, যার সাথে স্যার দেখা দিয়েছেন। কথা বলেছেন। এর মধ্যে তিনি মিডিয়ার কারো ফোনই ধরেননি, ধরলেও সালাম বিনিময় করে কথা শেষ করেছেন।

এরপর জানা গেলো, ৫ আগস্টের পর তার প্রতিষ্ঠান দেশের কোনো মিডিয়ার সাথে নতুন করে কোনো স্পন্সরশীপে যায়নি। অনির্দিষ্টকালের জন্য মিডিয়ায় নতুন বিজ্ঞাপন বন্ধ। যেগুলো চলছে, সেগুলোর চুক্তিও রিনিউ করা হবে না বলে গ্রুপ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আমার কাজটাও স্পন্সর-সংক্রান্ত ছিলো, আমি সঙ্গতকারণেই কিছুটা আশাহত হলাম। তবে তার চেয়ে বেশি আশংকায় পড়লাম মিডিয়া সেক্টরের জন্য। কারণ বাংলাদেশের মিডিয়া জগতে এই গ্রুপের বিজ্ঞাপনের যে ভলিউম, তা বন্ধ হয়ে গেলে অনেক মিডিয়াতেই সামান্য হলেও সংকট দেখা দেবে।

সবচেয়ে বড়ো কথা, আমি বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া খবরে আরো জানলাম, মিডিয়ার বাজেট স্থগিত রাখা শুধু না, এই কোম্পানির বিজনেস অ্যাক্টিভিটিসও অনেকটা সীমিত করে আনা হয়েছে। যতোটা না করলেই নয়, তার বেশি একটি টাকাও নতুন বিনিয়োগ করা হচ্ছে না। কারণ, দেশের এই শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী নেতা পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের গুড বুকে ছিলেন। যে কোনো মুহূর্তে নিবর্তনমূলক কোনো পদক্ষেপের শিকার হতে পারেন, সেই আশংকা জেগেছে তার। এটাই তার কোম্পানির কর্মকাণ্ড সংকোচন বা চলমান সংকটের মূল কারণ।

সেদিন থেকেই আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে বিষয়টি। ব্যবসায়ী মহলে যাদের যাদের সাথে ঘনিষ্ঠতা আছে, তাদের সাথে কথা বললাম। ব্যক্তিগত আলাপে অনেক কথাই হয়, সব তো আর প্রকাশ করা যায় না। তবে মোদ্দা কথায় বলতে পারি, মব জাস্টিসের দিনগুলো পার হয়ে গেলেও স্বস্তিতে নেই অনেক ব্যবসায়ী, বিশেষ করে যারা সরাসরি আওয়ামী লীগের সাথে যুক্ত ছিলেন কিংবা কোনো না কোনোভাবে সেই আমলের সুবিধাভোগী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন।

একটা কথা তো অনস্বীকার্য, ব্যবসায়ী শুধু নন, যে কোনো পেশাজীবী বা সামাজিক সংগঠনের নেতা রাজনৈতিক বলয়ে অনুগত কর্মীর মতো অবস্থান করলে তার ফল কারো কারো জন্য ভালো হলেও সমাজ, দেশ ও রাষ্ট্রের জন্য ভালো ফল বয়ে আনে না। বিশেষ করে, ৫ আগস্টের ছাত্রগণঅভুত্থানের আগে একদল সিনিয়র ব্যবসায়ী নেতা যেভাবে গণভবনে গিয়ে সেই সময়কার সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার সঙ্গে যে কোনো মূল্যে থাকার যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, তাও দেশের জন্য মঙ্গলজনক হয়নি। এই ব্যবসায়ী নেতাদের প্রতি ফ্যাসিবাদবিরোধী আপামর জনসাধারণের মনে তীব্র ক্ষোভ থাকবে, তাদের প্রতি মানুষ আগ্রাসী হবে, সামান্য সময়ের জন্য হলেও এই বাস্তবতা আমাদের মেনে নিতে হয়েছে।

জুলাই-যোদ্ধাদের রক্তের ওপর ক্ষমতা ধরে রাখার যে পাশবিক খায়েশ শেখ হাসিনা দেখিয়েছিলেন, তার প্রতি-উত্তরে বর্তমান সরকার এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী জনতা ওই সরকার-সমর্থক ব্যবসায়ীদের প্রতি নাখোশ হবেন, এতে দ্বিমত করার কোনো অবকাশ নেই। কিন্তু প্রশ্ন অন্যখানে।

যখন যে সরকারই এদেশে ক্ষমতায় ছিলো, তারা ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবীসহ সব মহলের ওপর প্রকাশ্য বা অপ্রকাশ্য নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ছিলো। আর সরকার এমন এক প্রতিষ্ঠান, যাকে অগ্রাহ্য করে বা পিঠ দেখিয়ে দেশে কোটি কোটি ডলারের ব্যবসা বাণিজ্য পরিচালনা করা অসম্ভব ব্যাপার।

ব্যবসায়ীরা কখনোই সরকারকে পাশ কাটিয়ে চলতে পারে না। আর সরকার যদি পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের মতো ভ্রুক্ষেপহীন ও প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়, তাহলে সেই সরকারের নির্দেশের বাইরে একচুল যাওয়ার ক্ষমতাও কোনো ব্যবসায়ী নেতা বা সংগঠনের থাকে না। যারই ধারাবাহিকতায় কিছু চামচা শ্রেণীর ব্যবসায়ী নেতার সঙ্গে দলমতহীন পেশাদার ব্যবসায়ী নেতারাও গণভবনে গিয়েছিলেন শেখ হাসিনার ডাকে, অনেকে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন, বলা চলে।

রাজনৈতিক সরকারের প্রতি সমমনা ব্যবসায়ীদের প্রকাশ্য সমর্থন, এই পরিস্থিতিও কিন্তু একদিনে তৈরি হয়নি। সাধারণত রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের প্রভাব থাকে, হোক সে প্রকাশ্য বা প্রত্যক্ষ, এই বাস্তবতা রয়েছে গোটা বিশ্বজুড়েই। আরটিটির এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত এক দশকে বিশ্বের শীর্ষ ১০ ব্যবসায়ী নেতা নিজেদের পরিণত করেছেন রাজনীতিবিদে এবং তাদের অনেকেই রাষ্ট্র কিংবা সরকারের শীর্ষপদে নির্বাচিত হয়েছেন। এই তালিকায় প্রথমেই রয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

এরপর রয়েছেন ব্লুমবার্গের প্রতিষ্ঠাতা মাইকেল ব্লুম বার্গ, যিনি একাধারে তিনবার নিউ ইয়র্কের মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। এরপর রয়েছেন বিজনেস টাইকুন মিট রমনি, যিনি ২০১২ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদে রিপাবলিকান পার্টির পক্ষ থেকে লড়াই করে বারাক ওবামার কাছে পরাজিত হন।

এই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগে মিট রমনি ম্যাসাচুসেটস রাজ্যের গভর্নর নির্বাচিত হয়েছিলেন। তালিকায় পরের নাম ইতালীর সিলভিও বার্লুসকনি, যাকে বলা হয় মিডিয়া টাইকুন। তিনি রাজনীতিতে এসেও সাফল্যের সাথে নিজের অবস্থান তৈরি করে নেন, দেশটির প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন হন। এই তালিকায় রয়েছেন চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল জুয়ান সেবাস্টিন, লেবাননের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রফিক আল-হারিরি, জর্জিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী বরিস ইভান, যুক্তরাষ্ট্রের কার্লি ফ্লোরিনা, রস পেরট ও স্টিভ পয়জনার।

কিন্তু বিশ্বজুড়ে বিজনেস টাইকুনদের রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে আমাদের দেশের বাস্তবতার খুব একটা মিল নেই। আমাদের দেশে যেটা হয়েছে, স্বাধীনতার পর থেকেই রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ ধারাবাহিকভাবে বেড়ে চলেছে। আর এই অংশগ্রহণ ধীরে ধীরে আধিপত্যে রূপ নিয়েছে। দলের পদপদবীর পাশাপাশি জাতীয় সংসদেও ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ছে। মূলত আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মতো ক্ষমতাঘনিষ্ঠ দলে ব্যবসায়ীরা অনেক বেশি প্রভাব নিয়ে অবস্থান করছেন। জাতীয় পার্টির ছায়াতলে আশ্রয় নেওয়া ব্যবসায়ীদের সংখ্যাও কম নয়।

বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালের প্রথম সংসদ নির্বাচনে সব পেশার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদেরও প্রতিনিধিত্ব ছিল। সেই সংসদে এ হার ছিল ১৮ শতাংশ। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের হলফনামায় উল্লিখিত পেশা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৬১ শতাংশ সংসদ সদস্য ব্যবসায়ী।

দলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ ও শরিক দলের সদস্যদের ৫৯ শতাংশ ব্যবসায়ী। অন্যদিকে সেই সময়কার বিরোধী দল জাতীয় পার্টির ৫৬ শতাংশ সংসদ সদস্যই ব্যবসায়ী। অন্য সব পেশা মিলিয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছেন ২১ শতাংশ। অন্য পেশা মানে শিক্ষক, চিকিৎসক, কৃষক, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি ও সামরিক কর্মকর্তা, গৃহিণী ও পরামর্শক। এরপর দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, যেটিও নিজেদের ইচ্ছেমতো করেছিলো সেই সময়কার ক্ষমতাসীন দল, সেই নির্বাচনের মধ্যদিয়ে ১৯৭ জন ব্যবসায়ী জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

তথ্যমতে, ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচন থেকে ব্যবসায়ীদের বেশি হারে সংসদে আসার প্রবণতা বেড়েছে। ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ ২০০১ সালের সপ্তম সংসদ পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পঞ্চম সংসদে ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিত্ব ছিল প্রায় ৩৯ শতাংশ। ষষ্ঠ সংসদে তা বেড়ে হয় প্রায় ৪৭ শতাংশ। সপ্তম সংসদে ১০ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৫৭ শতাংশ। আর সর্বশেষ নির্বাচনে সেই সংখ্যা বেড়ে দুই তৃতীয়াংশ হয়েছে। অথচ প্রতিবেশী দেশ ভারতের ১৭তম লোকসভায় সংসদ সদস্যদের মধ্যে রাজনীতিক ৩৯ শতাংশ আর ব্যবসায়ী ২৩ শতাংশ। অন্যান্য পেশার সংসদ সদস্য রয়েছেন ৩৮ শতাংশ।

সাংগঠনিক হিসেবে, আওয়ামী লীগের ৮১ কেন্দ্রীয় কমিটিতে ব্যবসায়ী আছেন ২৩ জন। সভাপতিমন্ডলী, সম্পাদকমন্ডলী ও কেন্দ্রীয় সদস্য পদে রয়েছেন। রাজনীতি ও ব্যবসা এ দুই পেশা মিলিয়েও আছেন কমিটিতে। ৪১ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদে আছেন ১৬ জন। জেলা পর্যায়ের ৭৮টি সাংগঠনিক কমিটিতে শীর্ষ দুই পদসহ বিভিন্ন পদে তিন শতাধিক ব্যবসায়ী রয়েছেন। উপজেলা পর্যায়ে তো আছেই। এ ছাড়া সহযোগী সংগঠনগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদ ব্যবসায়ীদের দখলে।

অন্যদিকে, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্যে ব্যবসায়ী আছেন একজন, ভাইস চেয়ারম্যান পদে আছেন দুজন, যুগ্ম মহাসচিব পদে একজন, সহসাংগঠনিক পদে একজন, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক পদে একজন ব্যবসায়ী রয়েছেন। উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য আছেন তিনজন, বিভিন্ন সম্পাদক পদে আরও আছেন সাতজন। ২০৯ জনের জাতীয় নির্বাহী কমিটিতে ব্যবসায়ী আছেন প্রায় ৫০ জন।

দেশের রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ বাড়বে কি কমবে, নীতিনির্ধারণী এ সিদ্ধান্ত দলগুলোকেই আগে নিতে হবে। আর সে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য সরকার আইন বা বিধিমালা প্রণয়ন করে সহায়তা করতে পারেন। সেটা এখনকার নয়, আগামীর সিদ্ধান্ত।
এখনকার যে পরিস্থিতি, ৫ আগস্টের ছাত্রগণঅভুত্থানের পর আওয়ামী লীগের সমর্থক ব্যবসায়ীরা বেশ বিপাকে পড়েছেন। আওয়ামী লীগের সাথে সরাসরি যুক্ত না হলেও সমমনা হিসেবে যারা পরিচিত, তাদেরও অনেকে বিপদগ্রস্ত বলে নিজেদের মনে করছেন। তাদের সাথে আছেন জাতীয় পার্টির ব্যানারে থাকা অনেক ব্যবসায়ীও।

একজন ব্যবসায়ী যখন এমপি হন, তখন তার রাজনৈতিক কিছু দায়বদ্ধতা ও ক্ষেত্র থাকলেও, তার মূল কর্মক্ষেত্র বিনিয়োগ ও ব্যবসা। আর এমন অসংখ্য ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারির কাজের সামষ্টিক ফলাফল বাংলাদেশের অর্থনীতি।

এখন শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে যদি বিনিয়োগকারিদের হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে হয়, নতুন বিনিয়োগ ও ব্যবসার পথ রুদ্ধ করে রাখতে হয়, তাহলে অর্থনীতি টিকবে?

৫ আগস্টের পর দেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসায় বড় ধরনের মন্দা যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ, সরকারের স্থিতিশীলতা না থাকলে বা রাজনৈতিক পরিবেশ স্থিত না হলে সাধারণত ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগে যান না। এটা যেমন বড় কারণ, তেমনি বড় আরেকটি কারণ হচ্ছে, আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত থাকার কারণে অনেক ব্যবসায়ীকে মামলার আসামী করা হয়েছে, অনেকে নিরাপত্তার কারণে ব্যাকফুটে চলে গেছেন। নতুন বিনিয়োগ দূরে থাক, বর্তমান বিনিয়োগ ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন অনেকে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে তা দেশের অর্থনীতির জন্য অশনি সংকেতই বয়ে আনবে। আবার এক্ষেত্রে রাজনীতিতে অংশ নেওয়া ব্যবসায়ীদেরও বোধ হয় কিছু দায়িত্ব থেকে যায়।

ব্যবসায়ীরা অবশ্যই রাজনীতি করবেন, দলীয় পদের পাশাপাশি সংসদ সদস্যও হবেন। এতে আমি কোনো বাধা দেখি না। কিন্তু ব্যবসায়ীদের নিজেদের শক্তির বিষয়টাকে বিবেচনায় আনতে হবে। অর্থনীতিতে একজন ব্যবসায়ীর যে অবদান, তাকে ইচ্ছে করলেই ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া যায় না। আবার সরকারের রোষানলে পড়লে অনেক বিপদ ঘটতে পারে, তারও উদাহরণ কম নয়। কিন্তু রাজনীতির বলয়ে না গিয়েও যে দেশের ব্যবসা-বিনিয়োগ সেক্টরে ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল হয়ে আছেন, এমন খ্যাতিমান উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী বা ব্যবসায়ীর সংখ্যা কিন্তু কম নয়।

আর একটা বিষয় গুরুত্বের সাথে আমাদের বিবেচনা করা প্রয়োজন, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের স্বৈরাচারী ও ভ্রুক্ষেপহীন আচরণ অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। এর আগে আমাদের সামনে স্বৈরাচারের সবচেয়ে বড়ো উদাহরণ ছিলেন মরহুম এরশাদ সাহেব। এরশাদ আমলের নিপীড়ন-নির্যাতনের চিহ্ন আমরা অনেকে এখনো বহন করে চলেছি। এখনও নিভৃতে কাঁদে এরশাদ আমলে পুলিশ বা আর্মস ক্যাডারদের গুলিতে নিহতদের পরিবার পরিজন।

কিন্তু শেখ হাসিনার অপশাসন, কুশাসন ও নির্যাতন সেই এরশাদ সাহেবকে ছাড়িয়ে গেছে সবক্ষেত্রেই। আর এর মধ্য দিয়ে তিনি শুধু ব্যবসায়ী না, সব শ্রেণিপেশার মানুষের মনে রীতিমতো আতংক ধরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেই আতংকের কারণেই সেদিন গণভবনে যেতে বাধ্য হন অনেকে, তাদের সাথে দলের পা-চাটা ব্যবসায়ী নেতারা তো ছিলেনই।

১৭ বছরের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে কেউ কোনো কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। যাদের প্রধান ভূমিকা রাখার কথা, সেই বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর হামলা-মামলা-গুমের যে স্টিমরোলার চালানো হয়েছে, আক্ষরিক অর্থেই ১৭ বছরে অনেকবারই বিএনপিকে আমাদের কাছে অসহায় মনে হয়েছে।

তা সত্ত্বেও প্রতিবাদের ঝাণ্ডা উঁচু রেখেই পথ চলেছে দলটি এবং সরকারের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ প্রতিবাদ জারি রেখে তারা মাঠে নামার চেষ্টা করেছে। এমন কঠিন বাস্তবতায় কেউ যদি পেট ও পিঠ বাঁচানোর স্বার্থে সরকারের অনুগত হয়ে থাকেন, তাকেও তো আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। ফিরে যাই ব্যবসায়ীদের করণীয় প্রসঙ্গে।

আগে বলেছি, সবাই জানেন, আমাদের জাতীয় সংসদে ব্যবসায়ীদের সংখ্যা বাড়ছে। এর দায় এককভাবে আওয়ামী লীগের নয়, সেটাও সবাই জানেন। ক্ষমতামুখী অন্য দুটি দল বিএনপি ও জাতীয় পার্টিতেও পরিস্থিতি একই। এখন ভোটাররা যদি ব্যবসায়ী প্রার্থীকে নির্বাচিত করেন, সেটা ভোটার বা প্রার্থী, কারোই অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। আর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর সেই ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে নিবর্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া, সেটাও কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

এটা স্বাভাবিক পরিস্থিতির কথা। তবে আওয়ামী লীগের ১৭ বছরের দুঃশাসনের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক বলা চলে না। তাই ৫ আগস্টের বিপ্লবের পর পতিত সরকারের পেটে বা আশপাশে থাকা ব্যবসায়ীরা যে বিপাকে পড়েছেন, তা থেকে উত্তরণে সরকার এবং রাজনৈতিক শক্তির সাহায্য তাদের নিতে হবে। সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।

কার কী অপরাধ, কতোটা তারা পরিস্থিতির কারণে বাধ্য হয়ে করেছেন, সেগুলো আমলে নিয়ে তাদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড সচল করার উদ্যোগ নিতে হবে। আলোচনার এমন একটা উদ্যোগ ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকেই নিতে হবে, যেটি তারা হয়তো নেবেনও, অপেক্ষা করছেন নির্বাচন বা নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণার জন্য। কিন্তু তাদের এই প্রতীক্ষা বেশি দীর্ঘায়িত হলে অর্থনীতি বড়ো ধরনের ক্ষত সৃষ্টি হবে, যা সামাল দেওয়া ভবিষ্যতের সরকারের জন্যও কিন্তু কঠিন হয়ে পড়বে।

যাদের অবিরাম শ্রম, মেধা ও বিনিয়োগে দেশের অর্থনীতি তিলে তিলে শক্তিশালী হয়েছে, তাদের ক্ষতিগ্রস্ত করলে দিনশেষে ক্ষতিগ্রস্ত হবে আমাদের প্রিয় স্বদেশ, প্রিয় বাংলাদেশ। আবার তারা যেনো রাজনৈতিক কারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেজন্য ব্যবসায়ী ও ব্যবসায়ী নেতাদেরও জনতার পালস বুঝতে হবে, রাজপথের ভাষা বুঝতে হবে। আর সব কিছু বিবেচনায় নিয়ে পথ চললে ব্যবসায়ী কেনো, কোনো শ্রেণিপেশার প্রতিনিধি বিপদে পড়ার কথা নয়।

আমাদের পরামর্শ হবে, ব্যবসায়ী নেতারা নিজেদের সংযত করবেন, অতিমাত্রায় উৎসাহী হয়ে নিজেদের বিতর্কিত করবেন না। আবার যে ব্যবসায়ী নেতা বা ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, তার দলের সব অপকর্মের জন্য তাদেরও ঢালাওভাবে দায়ী করা যাবে না।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে সংস্কার করছেন, জমে থাকা অনেক সমস্যার সমাধান করছেন। আমরা আশা করবো, সরকার এখনই একটা পদক্ষেপ নেবেন, যাতে কেরে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কোনো ব্যবসায়ীকে যেনো আর হেনস্তা না করা হয়, অপরাধ থাকলে বিচার হতেই পারে, কিন্তু তাকে সাইজ করার জন্য ব্যবসা-বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। এমন একটা পদক্ষেপ দেশের থমকে থাকা অর্থনীতিকে আবার গতিময় করবে, এটা আমাদের শুধু প্রত্যাশা নয়, বিশ্বাসও।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক দেশবার্তা।