ঢাকাশুক্রবার , ১৫ আগস্ট ২০২৫
  1. Bangla
  2. chomoknews
  3. English
  4. অপরাধ
  5. অভিনন্দন
  6. আমাদের তথ্য
  7. কবিতা
  8. কর্পরেট
  9. কাব্য বিলাস
  10. কৃষি সংবাদ
  11. খুলনা
  12. খোলামত
  13. গল্প
  14. গাইড
  15. গ্রামবাংলার খবর
আজকের সর্বশেষ

হরিপদ নাপিত ও তার অদ্ভুত খরিদ্দার

admin
আগস্ট ১৫, ২০২৫ ৯:৩৬ অপরাহ্ণ
Link Copied!

হরিপদ নাপিত ও তার অদ্ভুত খরিদ্দার

— রাহুল রাজ

চাঁদের আলোয় ধোয়া গাণ্ডুবির ছোট বাজারটা যেন এক অলৌকিক মায়াপুরী। আজ গুরুপূর্ণিমার রাত। সচরাচর অন্য দিনগুলোতে সন্ধ্যে নামতেই হাটের সব দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়, চারপাশ ফাঁকা হয়ে পড়ে। কেবল সপ্তাহের হাটের দিনগুলোতেই রাত ন’টা পর্যন্ত কিছু মানুষের আনাগোনা থাকে। কিন্তু আজ হাটের দিন পেরিয়ে কাঁটায় কাঁটায় রাত দশটা বাজলেও হরিপদ নাপিতের সেলুন ‘রূপশ্রী’-তে কাঁচির কিচকিচ আর কড়কড় শব্দ থামার কোনো লক্ষণ নেই।

একেবারে গায়ে-পড়া ভিড়। হরিপদ এ গাঁয়ে প্রায় কুড়ি বছর ধরে নাপিতের কাজ করছে, হাটের সবার হাঁড়ির খবর তার নখদর্পণে। কিন্তু আজ রাতে যারা তার দোকানে আসছে, তাদের কাউকেই সে চিনতে পারছে না। অদ্ভুত তাদের চাউনি, বীভৎস চেহারা, আর তার চেয়েও অদ্ভুত চুল কাটার বায়না।

একজন খসখসে, পচা গলার আওয়াজে বলল, “হরিপদ, আমার মাথার পেছনের দিকটা একদম ছেঁটে দাও তো, যেন ঘাড়ের হাড় আর খোলা মেদগুলো স্পষ্ট দেখা যায়!”

আরেকজন আয়নার দিকে না তাকিয়েই ভেজা গলায় বলে উঠল, “আমার মাথার ওপরের চুলগুলো এমনভাবে ছাঁটো, যেন মনে হয় কোনো ভারী চাকার নিচে পিষে মগজ বেরিয়ে গেছে।”

হরিপদ মনে মনে তীব্র অস্বস্তি আর ভয় পাচ্ছিল, কিন্তু “খরিদ্দার মানে তো লক্ষ্মী”—এই ভেবে সে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে কাঁচি চালিয়ে যাচ্ছিল। রাত ১২টার আগে যারা চুল কাটাতে এসেছিল, তারা অবশ্য সবাই স্বাভাবিক মানুষের মতোই সাধারণ কাগুজে নোটে চুল কাটার দাম মিটিয়ে দিয়ে চলে গেছে। হরিপদের মনে কোনো কু-ডাক ডাকেনি। কিন্তু রাত যত বাড়তে লাগল, লোক আর শেষ হয় না! রাত বারোটা পার হতেই খরিদ্দারদের হাবভাব আর টাকা দেওয়ার ধরন যেন অদ্ভুতভাবে বদলে যেতে শুরু করল। একজন বের হয় তো আরেকজন ঢোকে। হরিপদ তার দোকানে কাজ করা ছোট ছেলেটাকে দিয়ে বাড়িতে খবর পাঠিয়ে দিল—আজ ফিরতে দেরি হবে, এখনো দোকানে খরিদ্দার আছে।

দোকানের বাইরে আকাশে তখন গুরুপূর্ণিমার থালার মতো লালচে-হলুদ চাঁদ ঝুলছে। ধবধবে জোৎস্নায় পুরো হাট থমথম করছে, অথচ চারপাশ মৃতের মতো নীরব। হাটের কোনো কুকুর ডাকছে না, বাতাসে কোনো পাতার খসখস শব্দটুকু পর্যন্ত নেই। এক অস্বাভাবিক, হিমশীতল ও বিষাক্ত নিস্তব্ধতা গিলে খেয়েছে চারপাশটাকে।

রাত একটা পেরিয়ে গেল। হরিপদ খেয়াল করল, তার দোকানের বাইরে এখনো কয়েকটা অবয়ব ধোঁয়ার মতো ঘুরঘুর করছে। আর সেলুনের পুরোনো কাঠের বেঞ্চিতে বসে দুজন লোক খবরের কাগজ পড়ছে। হঠাৎ তাদের একজন একদম নিচু, ঘড়ঘড়ে পৈশাচিক গলায় জোরে জোরে পত্রিকার পাতা থেকে খবর পড়তে শুরু করল:

“আজ সকালে গাণ্ডুবি খালের ব্রিজের কাছ থেকে এক যুবকের কঙ্কালসার পচা দেহ উদ্ধার… গলায় এখনো ফাঁসের দাগ পেঁচিয়ে আছে…”

পাশের জন এক চরম কুৎসিত হাসি হেসে অন্য পাতা উল্টে সায় দিল, “হুম, আর ওই যে তিন বছর আগে বিষ খেয়ে মরা মেয়েটা? তার চুলগুলো তো এখনো ভেজা আর বিষের গন্ধে ভরা, তাই না?”

কথাগুলো শুনতেই হরিপদের গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়, পিঠ বেয়ে এক হিমস্রোত নেমে যায়। সে আতঙ্কে আড়চোখে বেঞ্চির দিকে তাকাল। আয়নায় লোক দুটোর কোনো ছায়াই দেখা যাচ্ছে না! পুরো আয়নাটা একদম ফাঁকা! হরিপদ নিজেকে প্রবোধ দেওয়ার জন্য ভাবল, দোকানের পুরোনো ৩৫ ওয়াটের ফিলামেন্ট বাল্বটার আলো হয়তো বড্ড মিটমিট করছে, আর বাইরের জোৎস্নার আলো এসে আয়নার কাচে প্রতিফলিত হয়ে এমন একটা দৃষ্টিবিভ্রম বা অপটিক্যাল ইল্যুশন তৈরি করেছে। তাছাড়া রাতের অন্ধকারের জন্য হয়তো লোকগুলোর ছায়া ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু মনের কোন এক কোণে ভয়ের ঠান্ডা স্রোতটা বন্ধ হলো না।

ঠিক সেই মুহূর্তে চেয়ারে বসা লোকটার চুল কাটা শেষ হলো। হরিপদ কাঁপা গলায় গামছা দিয়ে নিজের কপালে জমা ঠান্ডা ঘাম মুছে বলল, “হয়েছে বাবু… পঞ্চাশ টাকা দিন।”

লোকটা আয়নার দিকে না তাকিয়েই এক বিকট, চোয়াল-অ্যাঁকড়ানো পৈশাচিক হাসি হাসল। ১২টার আগের খরিদ্দাররা পকেট থেকে টাকা বের করে দিলেও, এই লোকটার টাকা দেওয়ার পদ্ধতি হরিপদের রক্ত জল করে দিল।

লোকটা ফিসফিস করে বলল, “ওহ্, টাকা? টাকা তো আমি ওই হাটের পুরোনো বটগাছের কোটরে আমার ব্যাগে রেখে এসেছি। দাঁড়াও, এখনই এনে দিচ্ছি।”

কথাটা শেষ হতেই লোকটা একবিন্দু না হেঁটে, নিজের জায়গায় মোমের মতো স্থির দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু তার ডান হাতটা সাপের মতো একেবেঁকে, হাড়-মজ্জা বেরিয়ে লম্বা হয়ে সেলুনের দরজার বাইরে বেরিয়ে গেল! দেখতে দেখতে পচা মাংস ঝুলতে থাকা হাতটা প্রায় পঁচিশ-ত্রিশ হাত দূরে দাঁড়িয়ে থাকা বিশালাকার বটগাছটার মগডালে গিয়ে পৌঁছাল। গাছের কোটর থেকে দলামোচড়ানো কিছু ভেজা নোট বের করে এনে হরিপদের দিকে বাড়িয়ে দিল সেই দীর্ঘায়িত পচা-গলিত হাত! গন্ধে পুরো সেলুনটা যেন শ্মশানের পোড়া গন্ধে ভরে গেল।

হরিপদের বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। গলার নালী শুকিয়ে কাঠ, চোখ দুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসার উপক্রম। কাঁচিটা তার হাত থেকে খসে মেঝের ওপর বিকট শব্দে পড়ে গেল। এবার সে স্পষ্ট বুঝতে পারল—এরা কেউ সাধারণ মানুষ নয়! প্রতি বছর গুরুপূর্ণিমার অলৌকিক ও অভিশপ্ত রাতে পরিভ্রমণে বেরোনো অশরীরী প্রেতাত্মার দল! আর এ বছর তাদের মূল আস্তানা হয়েছে হরিপদের এই দোকান।

পায়ের তলার মাটি যেন একেবারে সরে যাচ্ছিল হরিপদের। আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে সে পরের খরিদ্দারের মাথায় হাত দিল। সে ছুঁতেই বুঝতে পারল—মাথার চামড়া পুরো বরফের মতো ঠান্ডা ও বরফ-কঠিন। তাদের পরস্পরের ফিসফিস কথোপকথন হরিপদের কানে আসতে লাগল:

“ওরে নিবারণ, তোর মাথার পেছনের ফাঁসের দাগটা কিন্তু এখনো তাজা!” “ছাড় তো ভাই ফণি, তিন বছর আগে পুকুরে ডুবে মরেছি, আজ গুরুপূর্ণিমায় একটু মাথাটা কামিয়ে হালকা হতে এলাম। হরিপদ লোকটা অবশ্য ভালো হাত চালায়…”

নিবারণ! ফণি! নামগুলো শুনতেই হরিপদের বুকের ভেতর যেন হাতুড়ির বাড়ি পড়ল। নামগুলো তার খুব চেনা! এরাই তো সেই সব মানুষ, যারা বিভিন্ন সময় অপঘাতে বা মর্মান্তিক রোগে মারা গিয়েছিল! তাদের মৃত্যুর পর শ্রাদ্ধের আগে পরিজনদের মাথা কামানোর দায়িত্ব তো এই হরিপদই নিয়েছিল!

হরিপদ বুঝতে পারল, সে এক ভয়ংকর ও নিঃশ্বাস বন্ধ করা ফাঁদে আটকে পড়েছে। পালানোর কোনো পথ নেই, দরজার বাইরে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে ছায়াশরীরী হাড্ডিসার প্রেতাত্মার দল। রাত যত ভোরের দিকে এগোচ্ছে, ঘরের তাপমাত্রা তত ঠান্ডা হয়ে এলো।

হঠাৎ ঘরের আলোটা একবার রক্ত-লাল হয়ে দপ করে উঠে নিভে গেল। যে লোকটার চুল হরিপদ কাটছিল, সে ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে হরিপদের দিকে তাকাল। তার ঘাড়টা মানুষের মতো স্বাভাবিক ঘুরল না, হাড় মোড়ানোর মড়মড় শব্দের সাথে একেবারে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে সরাসরি পেছনে চলে এলো! লোকটার কোটরহীন দুটো চোখে জ্বলছে এক পৈশাচিক নীলাভ আলো, আর মুখ থেকে গড়িয়ে পড়ছে কালো পচা রক্ত।

সে হরিপদের শক্ত হয়ে যাওয়া বরফ-ঠান্ডা হাতটা হাড়ের আঙুল দিয়ে চেপে ধরে গহ্বর-সদৃশ মুখটা খুলে গর্জে উঠল, “হরিপদ… অনেক বছর তো ছাঁটলে! আমাদের পরকালের জন্য আমাদের পরিবারের মাথা কামালে। এবার আর একা একা এই বেঁচে থাকার ভণ্ডামিতে ফিরে কী করবে? আমাদের সঙ্গে চলো… আমাদের দলে এখন একজন ভালো নাপিতের খুব দরকার!”

হরিপদ প্রাণপণে চিৎকার করে উঠতে চাইল, কিন্তু ভয়ে তার বাকশক্তি পুরোপুরি লোপ পেয়েছে। ঘরের ভেতরের সব কটি অশরীরী একযোগে ঘর-কাঁপানো অট্টহাসি হেসে উঠল। সেই হাসির বিকট শব্দে যেন পুরো হাটের জোৎস্না ও বাতাস স্তব্ধ হয়ে গেল।

পরদিন সকালে হাটের লোক এসে দেখল, ‘রূপশ্রী’-র দরজা হা-হা করে খোলা। রক্তে মাখামাখি কাঁচি আর চিরুনি মেঝেতে পড়ে আছে। আর ভেতরের চেয়ারে নিথর ও শক্ত হয়ে বসে আছে হরিপদ নাপিত। তার চোখ দুটো স্থির, অস্বাভাবিক বড় হয়ে ঠিকরে বেরিয়ে আসছে, মুখটা আতঙ্কে হাঁ হয়ে আছে। তার হাতে তখনো শক্ত করে ধরা কাঁচি ও চিরুনি।

হরিপদের নিথর দেহটা সেখানে পড়ে থাকলেও, গাণ্ডুবির হাটে আর কখনো কোনো গুরুপূর্ণিমার রাতে নিস্তব্ধতা থাকে না। স্থানীয়রা বলে, প্রতি গুরুপূর্ণিমায় মাঝরাতে নাকি ফাঁকা হাটের সেই বন্ধ সেলুনের ভেতর থেকে এখনো কাঁচির কিচকিচ শব্দ, আর্তনাদ আর অশরীরীদের পৈশাচিক অট্টহাসি ভেসে আসে। হরিপদ এখন ওদেরই দলে, প্রতিদিন রাতে সে ওদের চুল ছাঁটে।

আর প্রতি গুরুপূর্ণিমার রাতে এই অশরীরীর দল তাদের সংখ্যা বাড়াতে নতুন নতুন পেশার মানুষের খোঁজ করে। সাবধান! পরের গুরুপূর্ণিমার রাতে তাদের পরবর্তী শিকার হয়তো হতে পারেন….আপনিও!