ঢাকাশনিবার , ১১ জুলাই ২০২৬
  1. Bangla
  2. chomoknews
  3. English
  4. অপরাধ
  5. অভিনন্দন
  6. আমাদের তথ্য
  7. কবিতা
  8. কর্পরেট
  9. কাব্য বিলাস
  10. কৃষি সংবাদ
  11. খুলনা
  12. খোলামত
  13. গল্প
  14. গাইড
  15. গ্রামবাংলার খবর

বেড নম্বর ৩২৫

admin
জুলাই ১১, ২০২৬ ৭:৪১ অপরাহ্ণ
Link Copied!

বেড নম্বর ৩২৫

—রাহুল রাজ

রিমির শরীরটা বেশ কিছুদিন ধরেই একদম ভালো যাচ্ছে না। এক অদ্ভুত, অজানা জ্বরে ভেতরটা যেন পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে। গ্রামের ডাক্তাররা রোগ ধরা তো দূরের কথা, তার চোখের দিকে তাকিয়েই কেমন যেন শিউরে উঠছিলেন,যেন রিমির চোখের মনিতে তারা অন্য কারোর ছায়া দেখতে পাচ্ছিলেন। অবশেষে নিরুপায় হয়ে বাড়ির লোক তাকে কুমারখালী সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করে।

মহিলা ওয়ার্ডের একেবারে শেষ প্রান্তে, জানলার ঠিক পাশে রিমিকে যে বেডটা দেওয়া হলো,তার নম্বর ৩২৫। মরিচা ধরা লোহার রড আর ফ্যাকাশে চাদরে ঢাকা সেই বেডে শোয়ামাত্রই রিমির শিরদাঁড়া বেয়ে একটা বরফশীতল স্রোত নেমে গেল। তার মনে হলো, চাদরের নিচ থেকে অদৃশ্য একজোড়া ঠান্ডা হাত পরম আক্রোশে তাকে জাপটে ধরেছে।

হাসপাতালের বাতিগুলো যখন নিভে যেত, চারপাশটা অদ্ভুত থমথমে হয়ে উঠত। রিমি চোখ বুজলেই মনে হতো, বেডের চারপাশে বেশ কয়েকজন ছায়ামূর্তি গোল হয়ে বসে একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। মাঝরাতে যখন পুরো ওয়ার্ড ঘুমে নীরব হয়ে যেত, তখন লোহার খাটের তলা থেকে আসত ফিসফিসানি আওয়াজ, নখ দিয়ে কাঠ আঁচড়ানোর খসখস শব্দ!

রাত যত গভীর হতো, জানালার বাইরে গাছের পাতাগুলো বাতাসে কোনো এক কান্নার সুরে ডুকরে উঠত। করিডোরের টিমটিমে আলোটা অকারণেই কাঁপতে কাঁপতে হঠাৎ দপ করে নিভে যেত। রিমি স্পষ্ট শুনতে পেত, তার ঠিক কানের কাছে কেউ একজন খুব দ্রুত আর গরম নিশ্বাস ফেলছে। কিন্তু চোখ মেললেই চারপাশে কেউ নেই।

ঠিক সেই সময়ই হাসপাতালের পেছনের সারির মর্গ অর্থাৎ লাশ রাখার ঘর থেকে ধেয়ে আসত এক দমকা বাতাস। সেই বাতাসে মিশে থাকত তীব্র, দমবন্ধ করা কাঁচা মাংস পচা গন্ধ। বাতাসে ভেসে আসত স্ট্রেচারের চাকা ঘোরার ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ আর মর্গের ভেতরের হিমঘর থেকে লোহার ড্রয়ার টেনে খোলার বিকট আওয়াজ। যেন মৃতদেহগুলো একে একে জ্যান্ত হয়ে করিডোর দিয়ে হেঁটে এই মহিলা ওয়ার্ডের দিকেই এগিয়ে আসছে!

একই সাথে খাটের নিচ থেকে একটা হিমশীতল হাওয়া রিমির পা ছুঁয়ে ওপরে উঠে আসত, আর বাতাসে ভেসে বেড়াত পচা ফরমালিন আর ফিনাইলের এক তীব্র, দমবন্ধ করা গন্ধ। মনে হতো পুরো ওয়ার্ডটা জীবন্ত, আর সেটার কেন্দ্রবিন্দু এই ৩২৫ নম্বর বেড!

পরপর দুই রাত এমন চলার পরে, আতঙ্কে রিমি ডাক্তারকে বলেছিল, “স্যার, দয়া করে আমার বেডটা বদলে দিন। এই বেডে আমি ঘুমাতে পারছি না।” ডাক্তার ফাইল থেকে চোখ না তুলেই উদাসীনভাবে বললেন, “হাসপাতালে একটা বেডও ফাঁকা নেই। ওখানেই থাকতে হবে।”

কিন্তু একদিনেই রিমি বুঝে গেছে, ৩২৫ নম্বর বেডটি আসলে জীবন্ত আত্মাপুরী।

রাত বাড়লেই রিমির অবচেতন মন চলে যেত অন্য এক ভুবনে। প্রতিদিন স্বপ্নে তার সঙ্গে দেখা হতো এক একটা নতুন আত্মার।

তৃতীয় রাতে এলো এক তরুণী। তার চোখ দুটো ছিল নীল, ঠোঁটের কোণে কালচে রক্তের দাগ। সে ফুঁপিয়ে কেঁদে বলল, “যৌথুকের জন্য শ্বশুরবাড়ির লোক বিষ খাইয়েছিল আমাকে। এই ৩২৫ নম্বর বেডেই ছটফট করতে করতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছি আমি।”

চতুর্থ রাতে এলো এক কলেজপড়ুয়া মেয়ে। তার বাঁ হাতের কবজিটা ধারালো ব্লেডে কাটা, সেখান থেকে টপটপ করে রক্ত পড়ছে। সে ফিসফিস করে বলল, “প্রেমে ধোঁকা খেয়ে রাগ সামলাতে পারিনি। এই বেডেই তিন দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে হেরে গিয়েছিলাম।”

পঞ্চম রাতে যে আত্মাটি এলো, সে ছিল এক মাঝবয়সী মায়ের। তার সমস্ত শরীর আগুনে পোড়া, চামড়াগুলো কয়লার মতো কালো হয়ে খসে পড়ছে। সে যন্ত্রণায় চিৎকার করে রিমির হাত ধরে বলল, “জমির লোভে নিজের ছোট দেওর আমার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। পুড়ে যাওয়া শরীর নিয়ে এই ৩২৫ নম্বর বেডে যখন যন্ত্রণায় ছটফট করছিলাম, তখন ডাক্তাররা আমায় অবহেলা করেছে। কেউ বাঁচায়নি আমাকে!”

এভাবে একের পর এক অতৃপ্ত আত্মা ভিড় জমাতে লাগল রিমির স্বপ্নে। তারা সবাই এই ৩২৫ নম্বর বেডেই মরেছে, কিন্তু কেউ মুক্তি পায়নি। হাসপাতালের এই কোণটাতেই তারা আটকা পড়ে আছে। তাদের একটাই আর্তনাদ, একটাই দাবি “প্রতিশোধ!” তারা রিমির কানের কাছে এসে তীব্র স্বরে চিৎকার করত, “আমাদের হয়ে ওদের শেষ করে দাও, রিমি! নইলে আমরা তোমাকেও ছাড়ব না!”

পরদিন সকালে রিমি নার্স ও ডাক্তারকে এসব জিজ্ঞাসা করল। তারা কেউ কোনো কথা না বলে শুধু গম্ভীর মুখে বলেছিল, “হাসপাতালে সুস্থ হতে এসেছ। দ্রুত সুস্থ হয়ে বাড়ি যাও। এসব অলীক বিষয় নিয়ে মাথা ঘামিও না।” তাদের চোখে-মুখে এক অদ্ভুত এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা ছিল।

সেদিন দুপুরে রিমি যখন স্নান করতে যাচ্ছিল, তখন ওয়ার্ড বয় বিশ্বনাথ রিমির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। তার চোখে ছিল গভীর জিজ্ঞাসা আর এক চিলতে দয়া। করিডোরের নির্জন কোণে রিমি তার মুখোমুখি হলো।

বিশ্বনাথ ফিসফিস করে বলল, “তুমিই কি ৩২৫ নম্বর বেডের নতুন রোগী?” রিমি ভয়ে ভয়ে মাথা নাড়ল। বিশ্বনাথ এদিক-ওদিক তাকিয়ে গলা আরও নামিয়ে বলল, “ঐ বেডে তোমার কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো খুকি?” রিমির চোখ দুটো মুহূর্তে জলে ছলছল করে উঠল, সে তার ভয়ার্ত অভিজ্ঞতার কথা বলতে চাইল। বিশ্বনাথ তার ফ্যাকাশে ও পাংশুটে মুখ দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “ঐ বেডে যত রোগী ভর্তি হয়, তারা সবাই ভূত দেখে। কেউ বাঁচতে পারে না গো! হয় তারা তিলে তিলে পাগল হয়ে যায়, না হয় রহস্যময়ভাবে মারা যায়। ওই বেডটা অভিশপ্ত! ওখানে মৃত মানুষদের আত্মারা নতুন শরীর খোঁজে!” বিশ্বনাথের এই কথা শুনে রিমির বুকটা কেঁপে উঠল। সে বুঝতে পারল, সে এক মরণফাঁদে আচ্ছন্ন হয়েছে।

ধীরে ধীরে রিমির নিজস্ব অস্তিত্ব বিলীন হতে লাগল। ৩২৫ নম্বর বেডের মৃত আত্মারা তার শরীর আর মস্তিষ্ক সম্পূর্ণ দখল করে নিল। তবে অবচেতন মনে আত্মারা রিমিকে আশ্বস্ত করেছিল, প্রতিশোধগুলো পূর্ণ হলে তারা তাকে সুস্থ করে দেবে। শুধু রিমির শরীরটা তারা প্রতিশোধের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করবে, আর বিনিময়ে রিমিকে তারা দেবে এই যন্ত্রণা থেকে চিরমুক্তি।

রাত ঠিক দুটো। পুরো হাসপাতাল যখন নিঝুম, তখন ৩২৫ নম্বর বেড থেকে নিঃশব্দে নেমে দাঁড়াল রিমি। তার চোখ দুটো তখন আর সাধারণ মানুষের মতো ছিল না সেখানে জ্বলছিল এক অলৌকিক, হিংস্র লাল আলো। সে সম্মোহিতের মতো হাসপাতাল থেকে পেরিয়ে যেত রাতের অন্ধকারে। আত্মাদের দেওয়া ঠিকানায় পৌঁছে খুঁজে বের করত সেই অপরাধীদের।

রাত আড়াইটা। বিষ খাওয়া মেয়েটির শ্বশুর তখন তার অন্ধকার শোবার ঘরে একা ঘুমাচ্ছিলেন। হঠাৎ মাঝরাতে ঘরের সিলিং ফ্যানটা তীব্র গতিতে ঘুরতে ঘুরতে অকারণেই বন্ধ হয়ে গেল। ঘরের তাপমাত্রা এক নিমেষে হাড় কাঁপানো ঠান্ডা হয়ে উঠল এবং বাতাসজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল পচা ফরমালিনের গন্ধ। লোকটা ধড়ফড় করে উঠে বসতেই দেখলেন, খাটের পাশে অন্ধকারের মধ্যে জ্বলজ্বল করছে দুটি রক্তাভ লাল চোখ। কিছু বোঝার আগেই মায়া এক অলৌকিক শক্তিতে তার গলা চেপে ধরল এবং তার মুখে ঢেলে দিল তীব্র এক বোতল ডাইরেক্ট লিকুইড পয়জন। লোকটা নিজের বিছানাতেই ঠিক তার পুত্রবধূর মতো নীল হয়ে, ছটফট করতে করতে শেষ হয়ে গেল। মায়া আবার রিমির শরীরে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।

পরদিন রাত ৩টা। কলেজপড়ুয়া মেয়েটির প্রতারক প্রেমিক তার ঘরের পড়ার টেবিলে বসে ল্যাপটপে কাজ করছিল। হঠাৎ ঘরের জানলাগুলো তীব্র বাতাসে সশব্দে আছড়ে পড়ল। টেবিলের ওপর রাখা ল্যাম্পের আলোটা নিভে গিয়ে পুরো ঘরে ঘুটঘুটে অন্ধকার নেমে এলো। সেই অন্ধকারের মাঝেই লোকটা স্পষ্ট শুনতে পেল মেঝেতে ফোঁটা ফোঁটা তরল পড়ার শব্দ—টপ, টপ, টপ! ঘাড় ঘুরিয়ে সে দেখল, দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে আছে প্রয়ন্তী; তার ডান হাত থেকে অনবরত রক্ত ঝরছে। লোকটা আতঙ্কে চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হলো না। প্রয়ন্তী এগিয়ে গিয়ে ছেলেটিকে বিছানায় ছুঁড়ে ফেলল এবং টেবিল থেকে একটি ধারালো পেপার-কাটার তুলে নিয়ে নিখুঁতভাবে ছেলেটির কবজির প্রধান রগ দুটো কেটে দিল। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটে ঘরের মেঝে ভেসে গেল। রিমির শরীরে থাকা প্রয়ন্তী সেই রক্ত নিজের তর্জনী দিয়ে তুলে নিজের ঠোঁটে লাগাল। তারপর তার প্রেমিকের গালে একটা চুমু দিয়ে বলল, “চল, দুজনে মিলে লং ড্রাইভে যাই।”

পরের রাতে ঘড়ির কাঁটা যখন ঠিক ২টা ছুঁয়েছে, সেই পাষণ্ড দেওর তখন তার ঘরের ভেতর অঘোরে ঘুমাচ্ছিল। হঠাৎ তার ঘুমের ঘোরে মনে হলো চারপাশটা প্রচণ্ড গরম হয়ে উঠেছে। চোখ মেলতেই তার বুকটা শুকিয়ে গেল—ঘরের চারদিকের জানলা-দরজা বাইরে থেকে শক্ত করে লক করা এবং ঘরের চালে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে! আগুনের লেলিহান শিখার মাঝে জানলার কাচের ওপাশে সে দেখতে পেল তার সীমা বৌদিকে; তার সারা গায়েও আগুন জ্বলছে, কিন্তু তিনি ছটফট করছেন না, বরং হাসছেন! তার সারা শরীর বেয়ে কয়লার মতো পোড়া চামড়া খসে পড়ছে। লোকটা বাঁচানোর জন্য দরজায় আছড়ে পড়ে চিৎকার করতে লাগল, কিন্তু ধোঁয়া ও আগুনের লেলিহান শিখায় কেউ তার চিৎকার শুনল না। ঘরের ভেতরেই জীবন্ত পুড়ে কয়লা হয়ে গেল সে, ঠিক যেভাবে মরতে হয়েছিল তার সেই বৌদিকে। সীমা আত্মতৃপ্তির হাসি হেসে রিমির শরীরে মিলিয়ে গেল।

শহরে একের পর এক রহস্যময় মৃত্যুতে পুলিশ প্রশাসন নড়েচড়ে বসল।

গোয়েন্দা হেডকোয়ার্টারে তখন টানটান উত্তেজনা। টেবিলের ওপর সাজানো একাধিক খুনের ফাইল। মূল তদন্তকারী অফিসার নাড়ু মন্ডল হঠাৎ চমকে উঠে পেনসিল দিয়ে ফাইলগুলোর মাঝে একটা কাল্পনিক রেখা টানলেন। দেখা গেল, মৃত ব্যক্তিরা সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতের হলেও একটা জায়গায় এসে তারা মিলে যাচ্ছে। অফিসার নাড়ু মন্ডল ফিসফিস করে সহকারীর উদ্দেশ্যে বললেন, “অবিশ্বাস্য! এই বিষক্রিয়া, রগ কাটা আর আগুনে পুড়ে যাওয়া… প্রতিটি কেসের শিকার হওয়া ব্যক্তিরা কোনো না কোনোভাবে কুমারখালী হাসপাতালের ৩২৫ নম্বর বেডের পুরোনো রোগীদের সাথে জড়িত! আর বর্তমানে ওই বেডে ভর্তি আছে রিমি নামের একটা মেয়ে।” কোনো অকাট্য প্রমাণ না থাকায় পুলিশ এবার গোপনে রিমিকে ২৪ ঘণ্টা চোখে চোখে রাখার কঠোর সিদ্ধান্ত নিল।

সেদিন অমাবস্যার রাত। বাইরে তুমুল ঝড়-বৃষ্টি। হাসপাতালের ওয়ার্ডের বাইরে পুলিশের আরও শক্ত পাহারা বসানো হলো। কিন্তু তার মধ্যেও রিমি কোনো এক অলৌকিক আধিভৌতিক ক্ষমতায় সবার চোখ ধুলো দিয়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে গেল।

শহরের এক নামী ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, বলাই বাবু, নিজের বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টের ১৭ তলার ঘরে বসে যখন ব্যবসার হিসাব মেলাচ্ছিলেন, তখন হঠাৎ তার চোখ গেল ঘরের খোলা বারান্দার দিকে। জানলার কাচের ওপাশে তিনি দেখলেন একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে অঝোর বৃষ্টিতে ভিজছে!

বলাই বাবুর বুকটা ধক করে উঠল। এই ঝড়ের রাতে, এত নিরাপত্তা এড়িয়ে, ভবনের ১৭ তলার বারান্দায় কোনো মানুষের পক্ষে আসা অসম্ভব! বলাই বাবু প্রথমে প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেলেও পরক্ষণেই রহস্য উন্মোচনের জন্য হাত কাঁপিয়ে একটা লাঠি তুলে নিলেন। পা টিপে টিপে তিনি বারান্দার দরজাটা খুললেন।

কিন্তু বারান্দায় ও কে দাঁড়িয়ে?! সুলতা!

মুহূর্তে বলাই বাবুর সারা শরীর ঘেমে উঠল। অতীতটা একমুহূর্তে তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। এই সুলতাই তো তার ফার্ম হাউস থেকে বিধ্বস্ত, লাঞ্ছিত হয়ে বিচার চাইতে পুলিশের কাছে গিয়েছিল। কিন্তু থানার বড় বাবু ছিলেন বলাই বাবুর বিশেষ পছন্দের লোক, তার পকেটের মানুষ। সেই সুবাদে বড় বাবু সুলতার কোনো কথাই বিশ্বাস করেননি, উল্টো তাকে থানা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তীব্র অপমানে আর রাগে থানা থেকে বের হয়ে চলন্ত গাড়ির নিচে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল সুলতা। বলাই বাবু নিজে সেই বীভৎস লাশ দেখেছিলেন!

কিন্তু এই বৃষ্টির রাতে এত লোকের চোখ ফাঁকি দিয়ে, ১৭ তলার উঁচুতে তার বারান্দায় সে কীভাবে দাঁড়িয়ে আছে?

সুলতা বলাই বাবুর দিকে মুখ ফিরিয়ে একটা হিমশীতল, মুচকি হাসি দিল। মুখের ওপর লেপ্টে থাকা ভেজা চুলগুলো হাত দিয়ে সরিয়ে এক অতিপ্রাকৃতিক মৃদু গলায় বলল, “কী বলাই বাবু, মনে পড়ে সেই রাতের কথা?”

বলাই বাবুর শিরদাঁড়া দিয়ে বরফ-ঠান্ডা ঘাম বয়ে গেল। আতঙ্কের এক চরম সীমায় পৌঁছে তিনি আর নিজের শরীরের টাল সামলাতে পারলেন না। তীব্র এক অদৃশ্য ধাক্কায় ১৭ তলার বারান্দার রেলিং গলে তিনি ছিটকে নিচে পড়ে গেলেন। নিচের কংক্রিটের রাস্তায় পড়ে মাথার খুলিটা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল তার।

কিছুক্ষণ পর পুলিশ যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছাল, তখন বলাই বাবুর রক্তাক্ত লাশের ঠিক পাশেই পাওয়া গেল একটা ভেজা কাগজ—সেটি ছিল কুমারখালী সরকারি হাসপাতালের ৩২৫ নম্বর বেডের একটি পেশেন্ট কার্ড!

পুলিশ আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। সাইরেন বাজিয়ে তাদের গাড়ি ঝড়-বৃষ্টির বুক চিরে ছুটে গেল হাসপাতালের দিকে। অফিসার নাড়ু মন্ডল নিশ্চিত, এবার তারা রিমিকে হাতেনাতে ধরবেন। কারণ এত নিরাপত্তার মধ্যেও খুনি নিজের অজান্তেই প্রমাণ ফেলে গেছে।

ঝড়ের বেগে পুলিশ দল মহিলা ওয়ার্ডের শেষ প্রান্তে ৩২৫ নম্বর বেডের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। টর্চের আলো ফেলতেই তারা থমকে গেল।

রিমি বেডে শুয়ে আছে। তার গায়ে চাদর জড়ানো, চোখ দুটো বোজা। সে এক গভীর, প্রশান্তির ঘুমে আচ্ছন্ন। তার শ্বাস-প্রশ্বাস একদম স্বাভাবিক। দেখে মনেই হবে না যে গত কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সে বিছানা থেকে এক চুলও নড়েছে।

তদন্তকারী অফিসার নাড়ু মন্ডল রিমিকে ডাকতে যাবেন, এমন সময় তার চোখ পড়ল রিমির বিছানার চাদরের দিকে। এক তীব্র আতঙ্কে অফিসারের হাত থেকে টর্চটা প্রায় পড়েই যাচ্ছিল।

রিমির চাদরটা নিচ থেকে কেউ যেন শক্ত করে টেনে ধরে রেখেছে, আর ফ্যাকাশে সাদা চাদরের ওপর আস্তে আস্তে ফুটে উঠছে দুটো তাজা, ভেজা রক্তের হাতের ছাপ! ঠিক যেন কেউ খাটের তলা থেকে রিমিকে জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলছে “ধন্যবাদ, রিমি… আমাদের সব প্রতিশোধ শেষ, এবার তোমার মুক্তির পালা…”

আর ঠিক তখনকেই, গভীর ঘুমে থাকা রিমির ফ্যাকাশে ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বীভৎস, অতিপ্রাকৃতিক তৃপ্তির হাসি—যে হাসির সাথে মিশে আছে চিরমুক্তির এক পরম শান্তি।