তিতলির পুকুরে নামতে বড্ড ভয় করে। বিশেষ করে নতুন কোনো জায়গার নতুন পুকুর হলে তো কথাই নেই। ছোটবেলা থেকেই এই অদ্ভুত ভয়টা নিয়ে তিতলি বড় হয়েছে। তার সবসময় মনে হতো, পুকুরের অচেনা জলে নামলেই অন্ধকার তলা থেকে কোনো অদৃশ্য দড়ি বা ভারী শিকল এসে তার পা আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরবে, তারপর টেনে নিয়ে যাবে অতলেরও অতলে।
স্কুলের পড়াশোনা শেষ করার পর সেবার গ্রীষ্মের ছুটিতে ভিমপুরে নিজের মামাবাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল তিতলি। গ্রামের আর পাঁচটা সাধারণ পুকুরের মতো ছিল না ওটা। সেই পুকুর নিয়ে এলাকায় অনেক অলৌকিক ও হাড়হিম করা কথা প্রচলিত ছিল। গ্রামের বয়স্করা বলতেন, এই পুকুরে নাকি কত মানুষ ডুবে মরেছে তার ইয়ত্তা নেই; প্রতি বছর কোনো না কোনো অলৌকিক কারণে এখানে একজন করে প্রাণ হারায়।
মামাবাড়ির সবার জোরাজুরিতে মনের তীব্র অনিচ্ছা সত্ত্বেও একদিন দুপুরে পুকুরে স্নান করতে নামতে হলো তিতলিকে। তখন বুকের ভেতরটা তার ভয়ে চমকে উঠছিল। অবশ্য পুকুরে তখন তিতলির মতো আরও অনেকেই স্নান করছিল। একটু দূরেই একদল ডানপিটে ছেলে পাড়ের বুড়ো বটগাছের লতা ধরে ঝুল খেয়ে পুকুরের মাঝখানে লাফিয়ে লাফিয়ে পড়ছিল। গ্রীষ্মের সেই তপ্ত দুপুরে চারপাশের জলকেলি আর হইচইয়ের গমগমে আওয়াজে ভয়টা কিছুটা হলেও ঢাকা পড়েছিল।
তিতলি ধীরে ধীরে জলে পা বাড়াল। প্রথমে হাঁটু জল, তারপর কোমর জল, শেষে বুক জলে গিয়ে দাঁড়াল সে। পায়ের নিচের নরম কাদার মধ্যে তার পা দুটো বারবার ডেবে ডেবে যাচ্ছিল। বেশ কিছুক্ষণ জলের ওপর ভেসে থাকার পর সে একটা ডুব দেওয়ার প্রস্তুতি নিল।
জলের নিচে মাথা ডোবাতেই এক অদ্ভুত অনুভূতি হলো তিতলির। বাইরের সব কোলাহল ম্লান হয়ে জলের নিচে এক তীব্র কান-ঝাঁ-ঝাঁ করা ঝিঁঝিঁ ডাকার মতো শব্দ তার কানের পর্দায় আঘাত করতে লাগল। অন্য প্রান্তে বটগাছের লতা ধরে ছেলেদের জলে ঝাঁপিয়ে পড়ার শব্দটাও জলের নিচে কেমন যেন ভারী আর অচেনা শোনাচ্ছিল। দম ফুরিয়ে আসায় তিতলি দ্রুত জল থেকে মাথা বের করল।
এভাবে পরপর কয়েকবার ডুব দিতেই তার মনের আদিম ভয়টা কিছুটা কমে এলো। সে খেয়াল করল, পায়ের নিচে নরম কাদার মধ্যে খসখসে কী যেন একটা ঠেকছে—হয়তো ঝিনুক। কৌতূহলবশত সে চাইল একটা ঝিনুক হাত দিয়ে তুলে আনবে। যেই না সে আবার ডুব দিয়ে পায়ের কাছের নরম কাদার মধ্যে হাত বাড়াল, অমনি তার পায়ের নিচ দিয়ে ঠান্ডা, ভারী একটা শিকলের মতো কী যেন সাপের মতো পিছলে চলে গেল!
জলের ভেতরেই আতঙ্কে তিতলির গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠল। সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। কাউকে কিছু না বলে, কোনোমতে জল থেকে উঠে একছুটে বাড়ির দিকে চলে গেল।
সেদিন বিকেলেই ঘটল সেই অঘটন। জানা গেল, দুপুরে যে ছেলেরা বটগাছের শিকড় ও লতা ধরে ঝুলে পুকুরে লাফ দিচ্ছিল, তাদের মধ্য থেকে কাজল নামের একটা বারো বছরের ছেলেকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মুহূর্তের মধ্যে গ্রামের মানুষ ভেঙে পড়ল পুকুরঘাটে। পাড়ার জোয়ান যুবকেরা নেমে গেল পুকুরের জলে। একের পর এক ডুব দিয়ে তারা তন্নতন্ন করে পুকুরের তলদেশ পর্যন্ত কাজলকে খুঁজতে থাকল। কিন্তু কোথাও তার হদিস মিলল না। শেষে বড় জাল এনে পুরো পুকুর ছাঁকা শুরু হলো।
ঠিক সন্ধ্যার মুখে, যখন চারপাশটা আবছা অন্ধকারে ঢাকা পড়ছে, তখন পুকুরের উত্তর কোণ থেকে টানা জালে কাজলের নিথর শরীরটা উঠে এলো। পাড়ে যখন তার দেহটা তোলা হলো, তখন গ্রামের মানুষের মুখে মুখে ফিরছিল অলৌকিক সব কথা। কিন্তু তিতলি স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে ছিল কাজলের ডান পায়ের গোড়ালির দিকে। সেখানে চামড়া ও মাংস কেটে বসে যাওয়া কোনো ভারী শিকলের স্পষ্ট কালচে দাগ।
ঠিক যেমনটা সে জলের নিচে নিজের পায়ের ওপর অনুভব করেছিল।
সেদিনের পর থেকেই তিতলির জীবনটা পুরোপুরি বদলে গেল। কাজল নিখোঁজ হওয়ার পর মামাবাড়ির সেই অভিশপ্ত পুকুরে নামার সাহস আর কারও ছিল না। তিতলিও এক বুক আতঙ্ক নিয়ে দ্রুত কলকাতা ফিরে এলো। দক্ষিণ কলকাতার এক ব্যস্ত এলাকায় তাদের ফ্ল্যাট। চারপাশের এই ইট-পাথরের শহরে কোনো পুকুর নেই, দিঘি নেই। কিন্তু তিতলির ভেতরের সেই ছটফটানিটা কমল না। যে মেয়েটি আগে নতুন পুকুর দেখলে ভয়ে শিউরে উঠত, এখন যেকোনো বড় জলাশয় দেখলেই তার ভেতরে এক আদিম, তীব্র তৃষ্ণা জেগে ওঠে। নিজেকে সে কোনোভাবেই ধরে রাখতে পারে না। মধ্যরাতেও ঘুম ভেঙে যায় তার; মনে হয় দূর থেকে কেউ জলের নিচে লোহার শিকল টেনে টেনে ঘষছে—ঝনঝন… ঝনঝন…। আয়নায় নিজের চোখের দিকে তাকালে সে শিউরে ওঠে, মণি দুটো কেমন যেন কালচে আর জলছাপ রঙের হয়ে যাচ্ছে দিন দিন।
কয়েক বছর কেটে গেছে। তিতলি এখন কলেজের ছাত্রী। বন্ধুদের সাথে সে গেছে উত্তরবঙ্গের এক প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চলের গ্রামীণ পরিবেশে। সেখানে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে এক বিশাল, প্রাচীন দিঘি। স্থানীয়রা বলে ‘রানি দিঘি’। প্রথানুযায়ী, এই দিঘি নিয়েও নানা হাড়হিম করা লোককথা প্রচলিত—এখানে নাকি প্রতি বছর কেউ না কেউ তলিয়ে যায়, আর যখন লাশ ওঠে, তখন তার শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন থাকে না, শুধু পা দুটো মচকে থাকে।
দুপুরের কড়া রোদে বন্ধুরা সবাই মিলে হইচই করে দিঘির ঠান্ডা জলে নামল। তিতলি ঘাটের পৈঠায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। রোদ চড়া হলেও দিঘির জলটা কেমন যেন কুচকুচে কালো আর স্থির। তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল, পুরনো সেই চেনা ভয়টা চাড়া দিয়ে ওঠার কথা ছিল। কিন্তু অবাক হয়ে সে খেয়াল করল, তার ভয় করছে না। বরং তার মেরুদণ্ড বেয়ে একটা অদ্ভুত আনন্দের শিহরণ বয়ে গেল। মনের গভীর থেকে কে যেন ফিসফিস করে বলে উঠল—‘নেমে পড়… নিচে অনেক তৃষ্ণা… অনেকদিন কিছু পাওয়া যায়নি…’
তিতলি সম্মোহিতের মতো ধীরে ধীরে জলের দিকে পা বাড়াল। প্রথমে হাঁটু জল, তারপর কোমর জল। জল আজ বড্ড শান্ত, ঠিক যেন ভিমপুরের সেই পুকুরটার মতো। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জলের নিচে ডুব দিল।
ডুব দিতেই চারপাশের পৃথিবীর সব আলো আর শব্দ যেন মুহূর্তে বিলীন হয়ে গেল। কানের ভেতর ঠিক সেই চেনা, যন্ত্রণাদায়ক ‘ঝাঁ ঝাঁ’ শব্দটা প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। জলের নিচে আলো-আঁধারির খেলায় সে দেখল, একটু দূরেই তার বান্ধবী শিপ্রা হাত-পা ছুড়ে সাঁতার কাটছে।
ঠিক তখনই তিতলির শরীরের ভেতর এক তীব্র, নারকীয় মোচড় অনুভূত হলো। তার মনে হলো তার পায়ের হাড়গুলো মটমট করে ভাঙছে। তীব্র যন্ত্রণায় সে জলের নিচে চোখ মেলল। আর যা দেখল, তা দেখে নিজের অজান্তেই চিৎকার করে উঠতে চাইল সে, কিন্তু মুখ দিয়ে শুধু ফুসফুসের শেষ বাতাসটুকু বুদবুদ হয়ে বেরিয়ে এলো।
তার নিজের দুই পায়ের গোড়ালি থেকে—মাংস ভেদ করে নয়, বরং তার শরীরেরই একটা জীবন্ত অংশ হয়ে—কালচে, মরচে পড়া দুটো ভারী লোহার শিকল সাপের মতো কিলবিল করে বেরিয়ে আসছে! শিকলগুলোর গায়ে লেগে রয়েছে প্রাচীন শ্যাওলা আর রক্তের মতো লালচে দাগ। ওগুলো কোনো জড় বস্তু নয়, যেন দুটো ক্ষুধার্ত জলজ অজগর! তিতলির পা থেকে আলগা হয়ে শিকলগুলো জলের স্রোত কেটে তীব্র গতিতে এগিয়ে গেল শিপ্রার দিকে।
তিতলি হাত-পা ছুড়ে ওপরে ওঠার আপ্রাণ চেষ্টা করল, কিন্তু সে আবিষ্কার করল তার নিজের শরীর সম্পূর্ণ অবশ। তার মস্তিষ্ক চাইছে শিপ্রাকে বাঁচাতে, সে হাত বাড়িয়ে শিপ্রাকে সতর্ক করতে চাইছে, কিন্তু তার শরীর চাইছে শিকার করতে! তার অবচেতন মন যেন এই জল্লাদ শিকলগুলোকে ক্ষুধার্ত পশুর মতো লেলিয়ে দিয়েছে।
সে জলের নিচে স্পষ্ট দেখল, জং ধরা সেই লোহার শিকল শিপ্রার পায়ে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরল। শিপ্রা চমকে উঠে ছটফট করারও সুযোগ পেল না; শিকলটা তাকে এক হ্যাঁচকা টানে দিঘির অতল তলার অন্ধকার কাদার দিকে নিয়ে যেতে লাগল। শিপ্রার চোখ দুটো আতঙ্কে কোটর থেকে বেরিয়ে আসছিল, দম ফুরিয়ে যাওয়া শেষ বুদবুদগুলো তিলির চোখের সামনে দিয়ে ওপরে উঠে গেল। শিপ্রার গোড়ালির হাড় ভাঙার একটা মৃদু শব্দ জলের কম্পনে তিতলির কানে এসে পৌঁছাল।
জলের নিচে শিপ্রার নিথর শরীরটা যখন একেবারে তলার অন্ধকারে তলিয়ে গেল, তিতলির পা থেকে শিকলগুলো ঠিক একইভাবে সুড়সুড় করে গুটিয়ে আবার তার চামড়ার ভেতর মিলিয়ে গেল। বাঁধন মুক্ত হতেই তিতলি কোনোমতে জল থেকে মাথা বের করে ঘাটে এসে আছড়ে পড়ল। তার মুখ দিয়ে তখন কাশির সাথে কালচে জল বেরোচ্ছে।
কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পুরো গ্রামে হুলস্থুল পড়ে গেল। পুলিশ এলো, স্থানীয় ডুবুরি নামানো হলো। বিকেলে যখন শিপ্রার নিথর দেহ জল থেকে তোলা হলো, বন্ধুরা সবাই কান্নায় ভেঙে পড়ল। কিন্তু তিতলি পাথরের মতো নিস্পলক দাঁড়িয়ে দেখছিল শিপ্রার পা দুটো। সেখানে গভীর, কালচে শিকল বসে যাওয়ার ক্ষত, আর চামড়াগুলো এমনভাবে ছিলে গেছে যেন কোনো প্রাচীন লোহার বেড়ী ওটাকে টেনে ছিঁড়েছে।
ঠিক তখনই তিতলির মাথায় বিদ্যুতের মতো খেলে গেল তার শৈশবের একটা হাড়হিম করা স্মৃতি।
তার বয়স তখন মাত্র পাঁচ বছর। মা-বাবার সাথে প্রথমবার ভিমপুরের সেই মামাবাড়িতে এসেছিল সে। তখন জলের প্রতি কোনো ভয় ছিল না। একদিন দুপুরবেলা অসাবধানতাবশত সে ঘাটের গভীর জলে পা পিছলে পড়ে গিয়েছিল। জলের নিচে হাবুডুবু খাওয়ার সময় সে দেখেছিল, তলার অন্ধকার কাদা থেকে একটা প্রাচীন, জং ধরা কালো শিকল সাপের মতো এসে তার পায়ে জড়িয়ে ধরেছিল। তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল অতলে। কিন্তু অলৌকিক কোনো কারণে সেবার সে বেঁচে যায়, গ্রামের এক লোক ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে জল থেকে টেনে তোলে।
কিন্তু আজ তিতলি চূড়ান্ত সত্যটা বুঝতে পারল। সেদিন সে একা উঠে আসেনি। ভিমপুরের সেই অভিশপ্ত পুকুরের আদিম জলপিশাচ তার শিকার হাতছাড়া করেনি, বরং সেই শিকলের রূপ ধরে তিতলির ছোট্ট নিস্পাপ শরীরে বাসা বেঁধেছিল। তিতলিকে সে বানিয়েছে তার বাহন। সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো সেই পরজীবী শক্তিটা বছরের পর বছর বড় হয়েছে তিতলির রক্তের ভেতরে, তার মাংসের গভীরে।
নিয়তি বড় নিষ্ঠুর। তিতলি সারা জীবন পুকুরে নামতে চায়নি এই শিকলের ভয়ে। আর আজ সে জানল, ভয়টা বাইরের কোনো কিছুর ছিল না, ভয়টা ছিল তার নিজেরই শরীরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক আদিম রাক্ষসের। কলকাতা হোক কিংবা কোনো প্রত্যন্ত গ্রাম—সে যেখানেই যাবে, যে পুকুর বা দিঘির জলেই পা ছোঁয়াবে, তার অজান্তেই তার শরীর থেকে বেরিয়ে আসবে সেই ক্ষুধার্ত লোহার ‘জলবেড়ী’। আর টেনে নিয়ে যাবে নতুন কোনো তাজা প্রাণকে, তার ভেতরের সেই অন্তহীন তৃষ্ণা মেটানোর জন্য।
তিতলি দিঘির জলের দিকে তাকাল। জল এখন একদম শান্ত, আয়নার মতো স্থির। বাতাসে কোনো কম্পন নেই। কিন্তু তিতলি জানে, সে এখন আর কোনো সাধারণ মানুষ নয়—সে এক অভিশপ্ত, জীবন্ত ফাঁদ। যার পরবর্তী শিকার হয়তো তারই খুব কাছের কেউ।