ঢাকারবিবার , ২৭ জুলাই ২০২৫
  1. Bangla
  2. chomoknews
  3. English
  4. অপরাধ
  5. অভিনন্দন
  6. আমাদের তথ্য
  7. কবিতা
  8. কর্পরেট
  9. কাব্য বিলাস
  10. কৃষি সংবাদ
  11. খুলনা
  12. খোলামত
  13. গল্প
  14. গাইড
  15. গ্রামবাংলার খবর
আজকের সর্বশেষ

ইলিশখেকো

admin
জুলাই ২৭, ২০২৫ ৬:৫২ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ইলিশখেকো

— রাহুল রাজ

পদ্মার বুকজুড়ে তখন অমাবস্যার ঘোর অন্ধকার। বর্ষার শেষ, তাই নদীতে টান ধরেছে, কিন্তু ইলিশের হুটোপুটি কমেনি। চরাঞ্চলের বাতাসটা আজ সন্ধ্যার পর থেকেই ভারী ও স্যাঁতসেঁতে। দূরে দু-একটা ডিঙি নৌকার আলো জোনাকির মতো জ্বলছে আর নিভছে। পদ্মা যেন এক বিশাল, অতল কালো জ্যান্ত দানব, যা ফিসফিস করে কী যেন বলে চলেছে।

ভুপেন জেলে আজ একাই নৌকা নিয়ে নেমেছে। বয়স তার আশির কাছাকাছি, চামড়া নোনা জলে ভিজে শক্ত চামড়ার মতো হয়ে গেছে। এই নদীতে জীবনের অর্ধেক কেটেছে, কত তুফান সে দেখেছে, কত রাত কাটিয়েছে—তার কোনো হিসেব নেই। কিন্তু আজকের রাতটা কেমন যেন অন্যরকম। বাতাসে কোনো শোঁ শোঁ শব্দ নেই, জল একদম থমথমে। পদ্মার ওপর যে চেনা কুয়াশা আর ইলিশের জলের হাঁকডাক থাকে, আজ সেটাও নেই। সব যেন এক ভয়ঙ্কর নীরবতায় থমকে আছে।

বুকের ভেতর এক অজানা অস্বস্তি। বিকেলে ঘাটে এক বৃদ্ধ বলেছিল, “আজ অমাবস্যা। গভীর জলে জাল ফেলিস না ভুপেন, আজ ইলিশখেকো বেরোবে।” ভুপেন তখন হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল, কিন্তু এখন নদীর নীরবতা তাকে গিলতে আসছে।

ডিঙির এক মাথায় মিটিমিটি জ্বলছে ব্যাটারির ছোট টর্চ লাইটটি। ভুপেন জালটা পদ্মার হাঁটু-জল পেরিয়ে গভীর টানে ফেলে দিল। “জয় বাবা পঞ্চানন,” বিড়বিড় করে বলে সে কপালের ঘাম মুছল।

হঠাৎ নদীর বুক থেকে একটা অদ্ভুত গন্ধ ভেসে এল—পচা ইলিশ আর ভেজা মাটির এক বিশ্রী, গা-গুলিয়ে ওঠা গন্ধ। ঠিক তখনই জলের নিচ থেকে শব্দ এলো—ছপ, ছপ, ছপ…

ভুপেন হাতের ব্যাটারির লাইটটা তুলে নদীর জলের দিকে চালল। লাইটের ফ্যাকাশে আলোয় নদীর জলটা লালচে রক্তবর্ণ মনে হচ্ছে। আর সেই জলের তলদেশ ছুঁয়ে বিশাল কিছু একটা হেঁটে এগিয়ে আসছে তার ডিঙির দিকে!

ভুপেনের বুকের ভেতরটা ছাঁৎ করে উঠল। সে দ্রুত জালটা টেনে তোলার চেষ্টা করতেই বুঝল, জাল অসম্ভব ভারী! এত ভারী যে ছোট ডিঙিটা একপাশে কাত হয়ে জলের প্রায় সমান হয়ে গেল।
“কিরে ভুপেন… এত তাড়া কিসের?”

শব্দটা কোনো মানুষের নয়, যেন মাটির নিচে কোনো পচা কাঠের বাক্স থেকে ঘষে ঘষে বের হচ্ছে। শব্দটা বাতাস থেকে নয়, আসছে ভুপেনের ঠিক কানের পাশ থেকে!

ভুপেন থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে পেছনে তাকাল। লাইটের ফোকাসে গলুইয়ের ওপর সে যা দেখল, তাতে গায়ের রক্ত জল হয়ে গেল।

সেখানে বসে আছে এক বিভৎস ছায়ামূর্তি। পরনে ছেঁড়া পচা জাল, চেহারা পচে যাওয়া মাছের মতো ধূসর, চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসছে। তার হাতের তালুতে জ্বলজ্বল করছে একটা তাজা ইলিশ, আর সেই মাছের গা বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে ঘন কালো রক্ত!

ছায়ামূর্তিটা তার মাংসহীন, কাস্তের মতো বাঁকা নখওয়ালা হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আমার নদী থেকে মাছ নিবি? আমাকে একটু ইলিশ খাওয়াবি না, ভুপেন?”

ভুপেন চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু তীব্র ভয়ে সে যেন শব্দ করতে একেবারেই ভুলে গেছে। কীভাবে নিজের কণ্ঠ ব্যবহার করে চিৎকার দিতে হয়, সেই স্মৃতিটুকুও তার মাথায় অবশিষ্ট নেই।

ঠিক তখনই জালটা প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল। ভুপেন আতঙ্কে নিচে তাকাতেই দেখল, জালের ফাঁসের ভেতর আটকে আছে একটা পচা মানুষের হাত… তারপর আরেকটা… এবং শেষে একটা ক্ষয়ে যাওয়া মুখ! মুখটা আচমকা চোখ খুলে ভয়ানক কণ্ঠে ফিসফিস করে উঠল—”পালিয়ে যা ভুপেন! পালিয়ে যা!”

ভুপেন ভয়ে জালের দড়ি ছেড়ে দিল। নদীর জল হঠাৎ ফুলে-ফেঁপে উঠে নৌকাটাকে আছাড় মারতে লাগল, যেন জলের নিচে বিশাল কোনো প্রাণী শ্বাস নিচ্ছে। ছায়ামূর্তিটা এবার হামাগুড়ি দিয়ে ভুপেনের দিকে এগোতে লাগল। প্রতিটা পদক্ষেপে কাঠ চেরা শব্দ আর পচা আঁশটে গন্ধে বাতাস বিষিয়ে উঠল।

ছায়ামূর্তিটা তার বিকট হা-করা মুখটা ভুপেনের একদম কাছে নিয়ে এল। চোখ দুটো থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছে অশুভ নীল আলো, আর চোয়াল থেকে ঝরে পড়া কালো রক্ত ভুপেনের জামায় এসে পড়ল।

“চিনতে পারছিস না?” মূর্তিটা পচা গলায় হেসে উঠল, “অনেক বছর আগে এই পদ্মায় তোর বাবাকেও আমি ডেকেছিলাম… সে-ও আর কোনোদিন ঘরে ফিরতে পারেনি! আজ তোকেও আমার সঙ্গী করব!”

ভুপেনের শরীর পুরোপুরি অবশ হয়ে গেল। সে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে দয়াল বাবার নাম জপতে লাগল। সে টের পাচ্ছিল, বরফের মতো ঠান্ডা আর আঠালো একজোড়া হাত তার গলা চেপে ধরছে। অক্সিজেনের অভাবে তার বুক ফেটে যাওয়ার জোগাড়।

ঠিক তখনই নদী প্রচণ্ড শব্দে গর্জন করে উঠল। তারপর… চারপাশের সব আলো এক এক করে নিভে গেল। পদ্মা ডুবে গেল অনন্ত অন্ধকারে।
পরদিন ভোরে যখন সূর্য উঠল, নদী আবার শান্ত। চরের জেলেরা নদীর মাঝে ভাসতে থাকা ভুপেনের খালি ডিঙিটা দেখতে পেল।

নৌকায় ভুপেন নেই। শুধু গলুইয়ের ওপর পড়ে আছে নিভে যাওয়া ব্যাটারির লাইট, আর নৌকার তলায় জমে থাকা রক্তের দাগ। তার ওপর সুন্দর করে ভাঁজ করা জালের ওপরে রাখা একটি বিশাল টাটকা ইলিশ।

গ্রামের এক তরুণ সাহস করে মাছটা হাতে তুলতেই ভয়ে চিৎকার করে উঠল। ইলিশটার পেট চেরা, ভেতরে কোনো নাড়িভুঁড়ি নেই—পড়ে রয়েছে মানুষের কাটা পড়া পাঁচটা রক্তমাখা আঙুল! ভয়ে-আতঙ্কে লোকটা মাছটা পদ্মার জলে ছুড়ে ফেলল।

আজও নাকি পদ্মার গভীর অমাবস্যার রাতে চরের মানুষ নদী পার হতে ভয় পায়। কোনো দুঃসাহসী জেলে যদি গভীর জলে জাল ফেলে, তবে দূরে নাকি ব্যাটারির লাইটের ম্লান আলো আর একা একটা ডিঙি ভেসে যেতে দেখা যায়। আর বাতাসের সঙ্গে ভেসে আসে এক করুণ, অতৃপ্ত আকুতি—”আমাকে একটু ইলিশ খাওয়াবি না?”