রাহুল রাজ ।। ঝুমঝুম বৃষ্টি আর লোডশেডিং, কালীপুরের মতো অজপাড়াগাঁয়ে এই যুগলবন্দি নতুন কিছু নয়। বর্ষা নামলেই সন্ধ্যার পর গ্রামটা যেন পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। চারদিকে শুধু বৃষ্টির শব্দ, কাদা, ঝোড়ো হাওয়া আর ঘুটঘুটে অন্ধকার। কিন্তু আজকের রাতটা অন্যরকম। অস্বাভাবিক। যেন অন্ধকারেরও একটা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য আছে।
ঘড়িতে তখন রাত পৌনে বারোটা।
সনাতনবাবু বিছানায় আধশোয়া হয়ে পুরনো তালপাতার হাতপাখা নাড়ছিলেন। বিদ্যুৎ নেই প্রায় তিন ঘণ্টা। গরমে ঘাম ঝরছে, অথচ তাঁর শরীরের ভেতরটা অকারণে ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। বুকের ভেতর কেমন যেন চাপা ধড়ফড়ানি। মনে হচ্ছে, অন্ধকারের আড়াল থেকে কেউ অনেকক্ষণ ধরে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাঁকে দেখছে।
তিনি সরকারি হাসপাতালের একজন সার্জন। কিন্তু গ্রামবাসীর কাছে তাঁর আরেকটা পরিচয় আছে—”লোভী ডাক্তার।” চাকরির পাশাপাশি নিজের নার্সিংহোমে মোটা টাকার লোভে তিনি এমন অনেক অপারেশন করতেন, যেগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বা নিরাপদ পরিবেশ কোনোটাই সেখানে ছিল না। তাঁর কাছে রোগী ছিল না মানুষ—ছিল স্রেফ কাঁচা টাকা।
কয়েক মাস আগের এক রাত হঠাৎ মনে পড়ে গেল সনাতনবাবুর।
সেদিনও এমনই ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছিল। দুজন লোক একজন মধ্যবয়সী মানুষকে নিয়ে এসেছিল। পেটে অসহ্য ব্যথা। তাকে দ্রুত শহরের বড় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া দরকার ছিল। কিন্তু সনাতনবাবু গম্ভীর গলায় ভয় দেখিয়ে বলেছিলেন, “এখন নিয়ে গেলে পথেই মারা যাবে। আমার নার্সিংহোমেই এক্ষুণি অপারেশন করতে হবে।”
অসহায় পরিবারের সামনে মোটা টাকার অঙ্ক বলে দিয়েছিলেন তিনি। লোকগুলো ধার করে, ঘটিবাটি-গয়না বন্ধক রেখে, শেষ সম্বল জমিটুকু বিক্রি করে টাকা জোগাড় করেছিল।
অপারেশন শুরু হলো। মাথার ওপর পুরনো সার্জিক্যাল লাইটটা দপদপ করছিল। সিলিং ফ্যানটা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে ঘুরছিল। স্টিলের ট্রেতে সাজানো ছিল স্ক্যালপেল, ফোর্সেপ, সার্জিক্যাল কাঁচি, রিট্র্যাক্টর, সুঁই-সুতো, গজ আর তুলো। অ্যানেস্থেশিয়ার ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত অপ্রতুল। অক্সিজেন সিলিন্ডার একটা ছিল বটে, কিন্তু সেটি অনেকদিন আগেই খালি হয়ে পড়ে ছিল।
নার্স কাঁপা গলায় বলেছিল, “স্যার, রোগীর প্রেশার খুব কমে যাচ্ছে।” সনাতনবাবু বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন, “অপারেশন করো, অত ভয় পেলে এই লাইনে থাকা যায় না।”
মনিটরে তখন হৃদস্পন্দনের শব্দ উঠছিল—বিপ… বিপ… বিপ… রোগীটা আচ্ছন্ন অবস্থাতেও তীব্র যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল, “ডাক্তারবাবু… আমাকে শহরে নিয়ে চলুন… আমি মরতে চাই না…”
কিন্তু সনাতনবাবুর চোখ তখন রোগীর দিকে নয়, ছিল টেবিলের পাশে রাখা টাকার ব্যাগের দিকে। ঠিক সেই সময় হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। জরুরি আলোটাও কয়েকবার দপদপ করে নিভে গেল। ঘর ডুবে গেল ঘুটঘুটে অন্ধকারে।
“মোবাইলের আলো ধরো!”—চেঁচিয়ে উঠেছিলেন তিনি। মোবাইলের ক্ষীণ, হলদেটে আলোয় আবার অন্ধের মতো ছুরি চলতে লাগল। হঠাৎ রোগীটা একবার প্রবলভাবে ছটফট করে সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
মনিটরের শব্দ বদলে গেল। বিপ… বিপ… তারপর—বীইইইইইইইপ… একটানা ফ্ল্যাট লাইনের শব্দ। নার্স কাঁপতে কাঁপতে বলেছিল, “স্যার… রোগী…” সনাতনবাবু কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে ঠান্ডা গলায় বলেছিলেন, “মৃত্যুর সময় লিখে রাখো। আর বাইরে কাউকে কিছু বোলো না।”
টাকার জোরে সেবারও মামলাটা ধামাচাপা পড়ে গিয়েছিল। লোকটা মরে বেঁচেছিল, কিন্তু তার শেষ যন্ত্রণাকাতর ও প্রতিহিংসামূলক দৃষ্টিটা আজও সনাতনবাবুকে ছেড়ে যায়নি।
হঠাৎ তিনি বর্তমান সময়ে ফিরে এলেন।
ঘরের বাতাস বদলে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ আগেও গরমে দমবন্ধ লাগছিল, এখন মনে হচ্ছে কেউ চারপাশের সব উষ্ণতা শুষে নিয়েছে। নিঃশ্বাসের সঙ্গে বরফের মতো ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকছে ফুসফুসে।
ঠিক তখনই—ঠাস! ঠাস! ঠাস! সদর দরজায় প্রচণ্ড ধাক্কা।
সনাতনবাবু চমকে উঠলেন। এই দুর্যোগে এত রাতে কে? আতঙ্কের মাঝেও পুরনো লোভী অভ্যাসটা মাথা তুলল। নতুন রোগী? নতুন টাকা?
টর্চ হাতে দরজার কাছে গিয়ে খুলতেই ঝোড়ো বাতাস আর বৃষ্টির ছাঁট ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল। কিন্তু বাইরে… কেউ নেই। শুধু নিকষ কালো অন্ধকার। “কে?” কোনো উত্তর নেই।
দরজা বন্ধ করতে যাবেন, এমন সময় টর্চের আলো বারান্দার এক কোণে গিয়ে থামল। সেখানে একজনের ছায়া। মানুষের মতো কিছু একটা। তার গায়ে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে, কিন্তু শরীর ভিজছে না; যেন জল তাকে স্পর্শ করতে ভয় পাচ্ছে।
ধীরে ধীরে সে মুখ তুলল। সনাতনবাবুর বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল। মুখের চামড়া গলে ঝুলে পড়েছে। চোখ দুটো কোটর থেকে ঠেলে বেরিয়ে এসেছে। আর পেটের বাঁদিকে সেই গভীর কাঁচা কাটা ক্ষত ! ঠিক সেই মানুষটা… যে তাঁর নার্সিংহোমের অপারেশন টেবিলে ছটফট করে মারা গিয়েছিল।
তার ঠোঁট নড়ছে না, তবু মুখে একটা নিষ্ঠুর, বাঁকা হাসি। যেন সে নীরবে বলছে—”ডাক্তারবাবু, আমাকে চিনতে পেরেছেন?”
সনাতনবাবু চিৎকার করতে গেলেন, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোল না। হাত থেকে টর্চটা পড়ে গিয়ে ভেঙে গেল। চারপাশ আবার অন্ধকারে ডুবে গেল।
তারপর—চ্যাট… চ্যাট… চ্যাট… ভেজা পায়ের শব্দ। বারান্দা থেকে… ঘরের ভেতরে… আরও কাছে… আরও কাছে…
হঠাৎ চারদিকের চেনা পরিবেশটা বদলে যেতে লাগল। শোবার ঘরের দেওয়ালগুলো কুয়াশার মতো মিলিয়ে গেল। তার জায়গায় চারপাশটা রূপ নিল তাঁর নিজের সেই অভিশপ্ত নার্সিংহোমের অপারেশন থিয়েটারে!
মাথার ওপর দপদপ করতে থাকা ওটি লাইট। মনিটরের সবুজ রেখা। স্টিলের ট্রে। রক্তমাখা গজ। বাতাসে স্পিরিট আর পচা রক্তের তীব্র ভ্যাপসা গন্ধ। সাকশন মেশিনের ঘড়ঘড়ানি আর ভেন্টিলেটরের হিসহিস আওয়াজ। বিপ… বিপ… বিপ…
হঠাৎ ঘাড়ে এসে লাগল বরফ-ঠাণ্ডা একটা নিঃশ্বাস। কানের কাছে ফিসফিসানি— “টর্চটা জ্বালাবেন না, ডাক্তারবাবু… আমি আলো সইতে পারি না… সেই অপারেশন লাইটের আলোও আমি সইতে পারিনি…”
ঠিক তখনই আকাশ চিরে তীব্র বিদ্যুৎ চমকাল। মাত্র এক সেকেন্ডের জন্য। কিন্তু দেওয়ালে ঝোলানো পুরনো আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে সনাতনবাবুর হৃৎপিণ্ড স্তব্ধ হয়ে গেল।
পেছনে কেউ নেই। কিন্তু আয়নার ভেতরের সনাতনবাবু তাঁর নড়াচড়া নকল করছে না। সে নিজে থেকেই ধীরে ধীরে হাত তুলল। তার মুখটা গলতে শুরু করল, চোখ দুটো ফুলে বেরিয়ে এল। তারপর আয়নার ভেতরের সেই অবয়বটা বিকট হেসে বলল—”এবার অপারেশন শুরু হোক।”
অন্ধকারের ভেতর থেকে একে একে বেরিয়ে এল আরও কয়েকটি ছায়ামূর্তি। সবার মুখ নোংরা, সবুজ সার্জিক্যাল মাস্কে ঢাকা। কারও চোখ নেই, কারও চামড়া খসে পড়েছে, কারও গলাটা কাটা।
তাদের হাতে চকচক করছে ধারালো স্ক্যালপেল। কেউ ধরে আছে রক্তমাখা ফোর্সেপ, কারও হাতে হাড় কাটার করাত, কেউ আবার একটা মরচে পড়া সাকশন মেশিন টেনে নিয়ে এল। ঘরের চারদিকে তখন তীব্র হয়ে উঠেছে ডেটল, স্পিরিট আর পচা মাংসের গন্ধ।
হঠাৎ বন্ধ থাকা মেশিনগুলো নিজেরাই অলৌকিকভাবে চালু হয়ে গেল। বিপ… বিপ… সাঁইইইই… টিক… টিক… একটা পুরনো ভেন্টিলেটর নিজে থেকেই ক্যাঁচক্যাঁচ করে নড়ে উঠল। আর ওটি লাইটের তীব্র, অন্ধ করে দেওয়া সাদা আলো এসে পড়ল সরাসরি সনাতনবাবুর মুখে।
একটি ছায়ামূর্তি সনাতনবাবুর দুই হাত চেপে ধরল, আরেকজন পা দুটো। অন্য একজন অপারেশন লাইটটা তাঁর মুখের একদম কাছে নামিয়ে আনল। চোখ ঝলসে গেল তাঁর।
ছায়ামূর্তিগুলো একসঙ্গে বিকট শব্দে হেসে উঠল। সে হাসি কোনো মানুষের হতে পারে না। তারপর প্রথম মৃত রোগীটা এগিয়ে এসে তাঁর কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, “অ্যানেস্থেশিয়া? আমারও তো দাওনি ডাক্তারবাবু…”
আরেকটা ছায়া পাশ থেকে জং-ধরা কাঁচিটা উঁচিয়ে বলল, “ফিস দিতে পারবে তো, ডাক্তার?” আরেকজন ঠাট্টা করে হেসে উঠল, “নাকি আবার মৃত্যুর পর গরিব পরিবারের কাছে বিল পাঠাবে?”
তারপর সবাই একসঙ্গে কোরাস বলে উঠল, “আজ তোমার পালা…!”
সনাতনবাবুকে শক্ত চামড়ার বেল্ট দিয়ে অপারেশন টেবিলে বেঁধে ফেলা হলো। লাইটের আলো আরও উজ্জ্বল, আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠল। তীব্র আতঙ্কে তিনি চোখ বন্ধ করে ফেললেন।
ঠিক তখনই লাইটটা দপদপ করতে শুরু করল। একবার জ্বলল, একবার নিভল। মনিটরে ভেসে উঠল তাঁর নিজের দ্রুত কমতে থাকা হার্টবিট। বিপ… বিপ… বিপ… বিপ… ধীরে ধীরে শব্দটা মন্থর হয়ে এল। বিপ…… বিপ…… তারপর—বীইইইইইইইইইইইইপ… একটানা সেই চেনা শব্দ।
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই অপারেশন লাইটটা সম্পূর্ণ নিভে গেল। চারদিক আবার ঘুটঘুটে অন্ধকার। শুধু সেই অন্ধকারের বুক চিরে স্পষ্ট শোনা গেল—ধারালো ছুরি দিয়ে জ্যান্ত মানুষের মাংস কাটার বীভৎস শব্দ!
পরদিন সকালে গ্রামের মানুষ সদর দরজা খোলা দেখে ভেতরে ঢুকল। সনাতনবাবু নিজের বিছানায় মৃত অবস্থায় পড়ে আছেন। চোখ দুটো আতঙ্কে প্রায় ঠিকরে বেরিয়ে এসেছে, মুখে জমাটবাঁধা এক আদিম ভয়ের ছাপ।
গ্রামের সরকারি ডাক্তার এসে পরীক্ষা করে শুধু বললেন, “তীব্র আতঙ্কে ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক হয়েছে।”
কিন্তু পরীক্ষা করার সময় ডাক্তারবাবু গোপনে একটা জিনিস দেখে ভীষণ অবাক ও শিউরে উঠলেন—সনাতনবাবুর বুকে কোনো ক্ষত নেই, কিন্তু বিছানার চাদরে তাঁর বুকের ঠিক নিচটায় তখনও ছোপ ছোপ তাজা রক্ত লেগে আছে!
গ্রামের মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। এক লোভী কসাই ডাক্তারের শেষ হয়েছে। সবাই চলে যাওয়ার পর ঘরটা আবার নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল।
কয়েক দিন পরের কথা। অমাবস্যার রাতে ঘরের ভেতরের দেওয়ালের পুরনো আয়নাটার কাঁচের ওপরে যেন জলের মতো ঢেউ উঠল। কাঁচের ওপার থেকে ধীরে ধীরে ভেসে উঠল ডাক্তার সনাতনবাবুর মুখ। কিন্তু সেই মুখে এখন আর কোনো ভয় বা আতঙ্ক নেই। সেখানে কেবল লেগে আছে এক অদ্ভুত, পৈশাচিক আর নিষ্ঠুর হাসি।
ঠিক তখনই বাইরে আবার দরজায় প্রচণ্ড ধাক্কা পড়ল। ঠাস! ঠাস! ঠাস!
আয়নার ওপার থেকে সনাতনবাবু ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে স্থির হলেন। বাস্তব জগতের দরজাটা হঠাৎ আপনাআপনিই একটুখানি খুলে গেল। বাইরে দেখা গেল এক মধ্যবয়সী দরিদ্র মানুষ বুক চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। লোকটা কাঁপা গলায় বলল, “ডাক্তারবাবু… বুকে খুব কষ্ট হচ্ছে… আমাকে বাঁচান…”
আয়নার ওপার থেকে সনাতনবাবুর ঠোঁটে চিলতে কামনার হাসি ফুটে উঠল। তিনি অতি মৃদু, শীতল গলায় বললেন, “অবশ্যই বাঁচাব… আগে ভেতরে আসুন। আজ রাতেই অপারেশন করতে হবে। তবেই তো আমাদের এই ওটি-র দল ভারী হবে, কী বলো?”
তাঁর পেছন থেকে ওপার থেকে সারি সারি মুখোশপরা ছায়ামূর্তি একসঙ্গে খিলখিল করে হেসে উঠল। তাদের হাতে ধরা স্ক্যালপেল আর কাঁচিগুলো আকাশের বিদ্যুতের ঝলকানিতে আয়নার ভেতর একবার চকচক করে উঠল।
সদর দরজাটা ধীরে ধীরে, সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল। বাইরে তখন আবার ঝুমঝুম বৃষ্টি। আর কালীপুরের রাতের বুক চিরে ভেসে এল এক নতুন মানুষের অসহায়, তীব্র আর্তনাদ।
সেই আর্তনাদ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল অলৌকিক অপারেশন থিয়েটারের একটানা ফ্ল্যাট লাইনের শব্দে—বীইইইইইইইইইইইইপ…