ঢাকাবুধবার , ১১ জুন ২০২৫
  1. Bangla
  2. chomoknews
  3. English
  4. অপরাধ
  5. অভিনন্দন
  6. আমাদের তথ্য
  7. কবিতা
  8. কর্পরেট
  9. কাব্য বিলাস
  10. কৃষি সংবাদ
  11. খুলনা
  12. খোলামত
  13. গল্প
  14. গাইড
  15. গ্রামবাংলার খবর

রাহুল রাজের ছোট গল্প- খোকন মিয়া ও কয়েকটি প্রজাপ্রতি

চমক নিউজ বার্তা কক্ষ
জুন ১১, ২০২৫ ৮:২৫ অপরাহ্ণ
Link Copied!

রাহুল রাজের ছোট গল্প- খোকন মিয়া ও কয়েকটি প্রজাপ্রতি


একটা মাছি অনেকক্ষণ ধরে উড়ে উড়ে খোকন মিয়ার নাকের ওপর বসছে। বিষয়টা খুবই বিভ্রান্তিকর। মাছি ওড়ার ভোঁ-ভোঁ শব্দ আর নাকের ওপর বসে সুড়সুড়ি দেওয়ার কারণেই বারবার খোকন মিয়ার ঘুম ভেঙে যাচ্ছে। ঘুমের ঘোরে কয়েকবার মাছিটাকে ওড়ানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে সে। মশারির ভেতরের একটি মাছিই যথেষ্ট ঘুম চটিয়ে দেওয়ার জন্য।

মাওয়া থেকে প্রতি রাতে ইট বোঝাই ট্রাক চালিয়ে ঢাকা নিয়ে আসে খোকন মিয়া। সম্প্রতি খালাসি থেকে ড্রাইভার হয়ে ‘ওস্তাদ’ নামটা নিজের পদবিতে যুক্ত করেছে। ভোররাতে নিজের ঘরে ফিরে মশারি টাঙিয়ে দুপুর পর্যন্ত ঘুমিয়ে নেয় খোকন মিয়া। ঘুমের ভেতর বিভিন্ন স্বপ্নের ভিড়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলার সময় বারবার ব্যাঘাত ঘটাচ্ছিল নাকের ওপর বসা মাছিটি। বিরক্তি সহকারে উঠে পড়ে খোকন মিয়া। তার চোখ জবা ফুলের মতো লাল হয়ে আছে। অনেকে মনে করেন খোকন মিয়ার কোনো বদভ্যাসের কারণেই তার চোখের এই অবস্থা। কিন্তু খোকন মিয়া চা-পান-সিগারেট কিছুই খান না। অসময়ে ঘুম ভেঙে গেলে তার চোখ অস্বাভাবিক লাল হয়ে ওঠে।

ঘুমজড়ানো চোখে বিরক্ত নিয়ে খোকন মিয়া ডাক ছাড়ল— “আপন! রুপন!” কয়েকবার ডাকার পরেও কোনো প্রত্যুত্তর এল না। আপন ও রুপন খোকন মিয়ার দুই ছেলে। বড় ছেলের বয়স ১০, ছোট ছেলের ৭। দুটোই চরম বদ। পড়াশোনা তাদের মাথায় না ঢুকলেও দুনিয়ার সকল অপকর্ম সহজেই মাথায় ঢুকে যায়। নিজেদের সৃজনশীলতায় সেই জ্ঞানের বহু শাখা-প্রশাখা উদয় হয়।

ময়লার গাড়ির পাম্প ছেড়ে তা পঙ্গু করা বা কারো জুতো লুকিয়ে রাখা তাদের কাছে নেহাত ডালভাত। খোকন মিয়ার কোনো শাসন বা আদেশ তারা কানে তোলে না। বাপ হিসেবে খোকন মিয়ার ভূমিকা তাদের কাছে নেহাত ক্ষণিকের অতিথির মতো। এতোটুকু বয়সে তাদের কর্মকাণ্ডে পাড়া-প্রতিবেশীদের বিচার নিত্যদিনের কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে। বরং একদিন বিচার না আসলেই অবাক হয় খোকন মিয়া। তার স্ত্রী উপমা কাজ করে গার্মেন্টসে। সে-ও বাড়িতে শুধুমাত্র রাতের অতিথি।

খোকন মিয়ার স্ত্রীর নাম উপমা। সে খিটখিটে মেজাজের। কথাবার্তায় কোনো প্রকারের রসকষ নেই, গলার স্বরও রুক্ষ। নয়টা-পাঁচটা অফিস এবং তার ওপর ওভারটাইম করে বাড়িতে ফিরে উপমার মেজাজ আরও বিগড়ে থাকে। গরম মাথাতেই খাবার তৈরি ও ঘর গোছানোর কাজ করতে হয় তাকে। স্বামীর সঙ্গে সুখ-দুঃখের আলাপ বা খুনসুটি করার মতো বিলাসী সময় তার নেই।

খোকন মিয়া দুই-চারবার ডেকেও যখন ছেলেদের সাড়া পেল না, তখন উঠে শলার ঝাড়ুটা খোঁজার জন্য তোশকের এপাশ-ওপাশ উঁচু করল। মশারির ভেতরে আটকে পড়া মাছি খুব সহজেই শলার ঝাড়ু দিয়ে মারা সম্ভব। কিন্তু আজ মাছি মারার হাতিয়ার সে খুঁজে পেল না। অগত্যা মশারি উঁচু করে কয়েকবার ঝাড়া শুরু করল। ঘুম চোখে মাছি মুক্তির আশায় আবার শুয়ে পড়ল নব্য ওস্তাদ। সবেমাত্র চোখ দুটো লেগে এসেছিল, এমন সময় টিনের চালের ওপর দুটো বিড়ালের তুমুল ঝগড়া আর মারামারিতে আবার ঘুম ভাঙল তার।

গায়ের লেপটা জড়িয়ে অন্য দিকে ফিরে শুতে যেতেই ছোট ছেলের কান্নার শব্দে ঘুম চটে গেল। রুপন ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ঘরের দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। সে জানাল, রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা সাদা রঙের প্রাইভেট কারের সাইলেন্সারে আপন একটি গোল আলু ভরে দিয়েছিল। সেই কাণ্ড দেখে ফেলে গাড়ির মালিক। আপন দৌড়ে পালালেও রূপন ধরা পড়ে যায়। গাড়ির মালিক রূপনের দুই গাল লাল করে দিয়েছে। খোকন মিয়া উভয় সংকটে পড়ে ছোট ছেলেকে ধমক দিয়ে বলল, “বড়ডা কই?”


ঘন কুয়াশার চাদর ভেদ করে ৫ টনি ট্রাকটি সামনে এগিয়ে নিচ্ছে খোকন মিয়া। হেল্পার মজিদ গামছা দিয়ে কয়েক দফা উইন্ডশিল্ড মুছে দিয়েছে। বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়ির ফগ লাইট হঠাৎ চোখে লাগলে খোকন মিয়া জঘন্য কিছু খিস্তি দিচ্ছে। গাড়িতে বসে খিস্তি দেওয়ার রীতি বহু বছর ধরে প্রচলিত।

আজ মহাজনের কড়া কথা শুনতে হয়েছে খোকনকে। মহাজনের ফোন ধরতে না পারলে চড়া কথা শুনতেই হয়। শখ করে একটা টাচ মোবাইল ফোন কিনেছে সে, কিন্তু দুই ছেলে সেটাতে গেমস খেলায় এমন মত্ত থাকে যে মহাজনের কল কেটে দেয়। মহাজন আজ তাকে শেষবারের মতো হুমকি দিয়েছে— “কাম কাজ বাদ দিয়া ফুর্তি করস? এর পরে ফোন না ধরলে পুটকিতে লাথি দিয়া ট্রাক থেইকা নামায় দিমু।”

নীরবে সব সহ্য করে খোকন মিয়া কুয়াশার ভেতর গাড়ি চালাচ্ছে। মজিদ খালাসি, ওস্তাদের ফাই-ফরমাস খাটা আর সিগন্যাল দেওয়াই তার কাজ। খোকন মিয়ার দু-চোখ ঘুমে ভেঙে আসছে। জ্যামের কারণে ট্রাক স্থির দাঁড়িয়ে থাকলে সে স্টিয়ারিংয়ে মাথা রাখে, কিন্তু পরক্ষণেই হর্নের শব্দে সজাগ হতে হয়। সন্ধ্যার পর থেকে তার বুক জ্বলছে; বউ আজ তরকারিতে ঝাল বেশি দিয়েছে। খোকন মিয়া তরকারিতে ঝাল সহ্য করতে পারে না।

হঠাৎ মুরগি বোঝাই একটি পিকআপ পার হওয়ার সময় দুর্গন্ধে খোকন মিয়ার বমি হয়ে গেল। পেটের ঝালযুক্ত তরকারি বেরিয়ে আসায় বুক জ্বলাটা কিছুটা কমল। সে মাফলারে মুখ মুছে আবার গিয়ার পরিবর্তন করতে লাগল।


গাড়ি আবার জ্যামে আটকে আছে। খোকন মিয়া জমশেদ নামে এক ড্রাইভারের কাছে টাকা পাবে। জমশেদ সুযোগ পেলেই দৌলতদিয়ার ‘রাতপরীদের’ অতিথি হয়। এই বদভ্যাসের কারণে খোকন তাকে সহ্য করতে পারে না। জমশেদকে ফোন দিলে এক কুখ্যাত শিল্পীর ‘অশ্লীল গান’ কলার টিউন হিসেবে বাজতে থাকে। খোকন মিয়া বিরক্ত হয়ে মজিদকে বলল বারবার ফোন দিতে।

আজ দুপুরবেলা গোসলটা মনের মতো হয়নি খোকন মিয়ার। বাড়িতে সাবান ছিল না। গত পরশুই নতুন সাবান আনা হয়েছিল, অথচ আজ সেটা উধাও। সম্ভবত ছেলেরা সাবান নিয়ে কোনো নতুন ‘সৃজনশীল’ অপকর্ম করেছে। ছেলেদের ছাড়া খেতে বসার ইচ্ছা তার ছিল না, কিন্তু পেটের খিদের কাছে আবেগ চলে না।

হঠাৎ জ্যাম শেষ হতেই খোকন ট্রাকের গতি বাড়াল। মিটারে কাঁটা ৯০ কিলোমিটার ছুঁইছুঁই। দুপুরে ঘুমানো হয়নি, শরীর খুব দুর্বল লাগছে। সে ভাবল, এই ট্রিপ শেষ করে সে আজ আর গাড়ি চালাবে না।


গাড়ি আশুলিয়ার কাছে আসতেই নতুন বিপত্তি। পিছনের একটি চাকা পাংচার হয়েছে, কিন্তু চাকা খোলার ‘জ্যাক’ বা ‘জগ’ গাড়িতে নেই। মেজাজ খিটখিটে হয়ে আছে খোকন মিয়ার। রসু মহাজনকে ফোন দিয়ে জানা গেল, ভুলবশত জ্যাক অন্য গাড়িতে চলে গেছে। মহাজন তাকে সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বললেন।

শীতের রাতে কুয়াশার ভেতর খোকন মিয়া ট্রাকের কেবিনে দরজা আটকে বসে পড়ল। মজিদকে পাঠিয়েছে দূরে এক গ্যারেজে জ্যাকের সন্ধানে। খোকন মিয়ার একটা ফ্রিজ কেনার শখ বহুদিনের। ধীরে ধীরে টাকা জমাচ্ছে সে। এক সেট সোফাও কেনার ইচ্ছা আছে। অভাবের সংসারে বড় হওয়া খোকন মিয়া কী রঙের ফ্রিজ কিনবে ভাবতে ভাবতে কখন যেন তার দু-চোখ বুজে এল। স্টিয়ারিংয়ে মাথা রেখেই সে সময়টা কাজে লাগাতে চাইল।

ঘুমের ভেতর সে যখন হরেক রকম স্বপ্নে ব্যস্ত, ঠিক তখনই আচমকা এক বিরাট ঝাঁকুনিতে তার চেতনা ফেরে। পেছন থেকে একটি বাস তার ট্রাকে সজোরে ধাক্কা মেরেছে। খোকন মিয়া চোখ খুলেও সব অন্ধকার দেখছে। কপাল বেয়ে স্রোতের মতো রক্ত ঝরছে। কানে হর্নের ভোঁ-ভোঁ শব্দে তার মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে। যাত্রীদের আর্তচিৎকার শোনা যাচ্ছে অনেক দূর থেকে।

আস্তে আস্তে চারপাশের সব শব্দ কমে আসছে। নিস্তেজ শরীরটা নেতিয়ে পড়ছে। চোখের সামনে ভেসে উঠছে দুই ছেলের মুখ। খোকন মিয়ার কল্পনার চোখে ভেসে উঠল কয়েকটি প্রজাপতি। যারা মাঠজুড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। খোকন মিয়া ও তার দুই ছেলে সেই প্রজাপতিগুলোর পেছন পেছন ছুটে চলেছে। দূরে বউ কর্কশ গলায় তাদের ডাকছে, কিন্তু সেই ডাক এখন আর খোকন মিয়ার কানে বিরক্তি ধরাচ্ছে না। ছেলেদের নিয়ে সে আরও দ্রুত প্রজাপতির পেছনে ছুটতে শুরু করল। এক গভীর শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ল খোকন মিয়া।

গল্পের গল্প।। দু তিন কিস্তিতে গল্পটি লেখা শেষ করলাম। মাঝে গ্যাপ হয়েছে তিন মাস। ৮ জুন ২০২৫ শুক্লা বাপের বাড়ি গেছে। আমি বাসায় একা। এরই মাঝে গল্পটি আবার শুরু থেকে পড়ে শেষ অংশটুকুন লিখে ফেললাম। কাকতালীয় ব্যাপার আমার বাসার পাশে সত্যিই একজন খোকন নামের ড্রাইভার আছে। গল্পের অনেক ঘটনাই তার জীবনের থেকে অনুপ্রাণিত।- রাহুল রাজ।

লেখক পরিচিতি : পুরো নাম রাহুল বিশ্বাস রাজ। রাহুল রাজ নামে লেখালেখি করেন। সাংবাদিকতার পাশাপাশি দেশের অনেক জনপ্রিয় গানের গীতিকার তিনি। সাউন্ড টেক ও কলের গান থেকে ২০১৭ ও ২০১৯ সালে সেরা গীতিকার নির্বাচিত হন। বিটিভি ও দেশের বেসরকারি টেলিভিশনে লিখেছেন প্রচুর টিভি নাটক। জাতীয় নাট্য উৎসবে ২০০৮ সালে হন সেরা নাট্যকার। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত কবিতার বই সাতটি। এর ভিতর ২০১৭ সালে নীল পদ্মের কষ্ট কবিতার বইটি হয় সে বছরের সেরা প্রেমের কবিতার বই।