ঢাকামঙ্গলবার , ২২ মে ২০১৮
  1. Bangla
  2. chomoknews
  3. English
  4. অপরাধ
  5. অভিনন্দন
  6. আমাদের তথ্য
  7. কবিতা
  8. কর্পরেট
  9. কাব্য বিলাস
  10. কৃষি সংবাদ
  11. খুলনা
  12. খোলামত
  13. গল্প
  14. গাইড
  15. গ্রামবাংলার খবর

থিম এন্ড ড্রিম রেকর্ডার

admin
মে ২২, ২০১৮ ১:০৯ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

একটি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী—

থিম এন্ড ড্রিম রেকর্ডার
—রাহুল রাজ

এক
প্রফেসর ইকবালের ঘুম ভাঙল চাকর বাদশাহর ডাকে। গতরাতে আরামকেদারায় নতুন গবেষণার বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে করতে নিজের অজান্তেই তিনি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। বুকের ওপর রাখা নোটখাতায় বিভিন্ন সাংকেতিক চিহ্ন আঁকা। গত কয়েক দিনে তার চিন্তাগুলোর একটা রূপরেখা দেওয়ার জন্যই এই সূত্রগুলো তিনি তৈরি করেছেন। ঘুম থেকে ওঠার পরেও রাতের চিন্তাগুলো মাথার ভেতর জট পাকিয়ে যাচ্ছে।

“স্যার কি চা খাইবেন? লাল চা নাকি দুধ চা?” বাদশাহর এই প্রশ্ন প্রফেসর প্রথমে বুঝতে পারলেন না। মাথার ভিতরের চিন্তার জট না খোলা পর্যন্ত তার মস্তিষ্ক পুরোপুরি কাজ করবে না। কতক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে প্রফেসর পাল্টা প্রশ্ন করলেন, “আজ কী বার?” বাদশাহ কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে উত্তর দিল, “রবিবার স্যার।”

“আচ্ছা বাদশা, তুমি কি স্বপ্ন দেখো?” নিজের মাথা চুলকে সে উত্তর দেয়, “জি স্যার, দেখি। তয় সেই স্বপ্ন বড়ই বিচিত্র। কখনও দেখি আমি ঘোড়ার পিঠে চড়ে আকাশে উড়তাছি। আবার কখনও দেখি আমি নিজেই উড়তাছি। আপনি জ্ঞানী মানুষ, তাই আপনারে কইলাম। বাবুর মারে এসব বলি না, বললে আমারে পাগল ভাবতে পারে।”

“স্যার, স্বপ্ন আসলে জিনিসটা কী?”
“বাদশা, এই স্বপ্ন নিয়েই আমি গবেষণা করছি। স্বপ্ন অত্যন্ত রহস্যময় এক জগৎ। মানুষ কী স্বপ্ন দেখে তা জানলে তার মানসিক অবস্থা সম্পর্কে জানা যায়। মানুষের মনের সূক্ষ্ম চিন্তাগুলোই স্বপ্ন হয়ে দেখা দেয়। যেমন তোমার স্বপ্ন থেকে আমি বুঝতে পারছি তুমি ‘সাইকোসিস’-এর রোগী। এটা একটা মানসিক অবস্থা। এই রোগে মানুষ নিজেকে উড়তে দেখে, উঁচু স্থান থেকে পড়ে যেতে দেখে, অনেক সময় সাপ বা গরু তাড়া করতে দেখে।”

“স্যার, এসব কী কইতাছেন? তার মানে আমি মানসিক রোগী? আমি কি পাগল হইয়া যামু? আমার বাবুর মার তখন কী হইবো? স্যার, আমারে কি পাবনায় পাঠাইয়া দিবেন?”
“আরে তুমি এসব কী বলছ! তোমাকে আমি বিষয়টিই বোঝাতে পারছি না। মানুষ যা স্বপ্ন দেখে তার নব্বই শতাংশই ঘুম থেকে ওঠার সময় ভুলে যায়। সাত শতাংশ দুই থেকে পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে ভুলে যায়। বাকি তিন শতাংশের মধ্যে দুই শতাংশ চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে হারিয়ে যায়। মাত্র এক শতাংশ মানুষ মনে রাখে, তাও খুব বেশিদিনের জন্য নয়।”

প্রফেসর আরও বললেন, “মানুষ স্বপ্ন দেখে নেগেটিভের মতো, সেখানে কোনো রঙ থাকে না। সবচেয়ে মজার কথা হলো, মানুষ কখনো কোনো অদেখা বিষয় স্বপ্নে দেখতে পারে না। যা সে আগে কোনো সময় দেখেছে, তাই স্বপ্নে দেখে। শুধু দেখা বিষয়ের সাথে কল্পনা মিশে নতুন কিছু তৈরি হয়। যে মানুষ স্বপ্ন দেখে সে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ। অসুস্থ মানুষ স্বপ্ন কম দেখে।”

“স্যার, আমার মাথা তো এই সকালেই আউলাইয়া যাইতাছে! স্বপ্ন নিয়া এতো কিছু তো কোনোদিন কল্পনাও করি নাই। বাবুর মারে গিয়া আজকাই বলব—বলতো তুমি কী কী স্বপ্ন দেখেছো? আজ ওর মাথাডাও আউলাইয়া দিমু। চলেন স্যার, হাত-মুখ ধুইয়া নেন, আমি চা নিয়া আসতাছি। গরম চায়ে চুমুক দিলেই দেখবেন মাথা পরিষ্কার হইয়া যাইবো।”

ইকবাল সাহেব আর উত্তর না দিয়ে নোটখাতা নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। বাদশাহর চোখ পড়ল টেবিলের ওপর রাখা বাটির মতো অদ্ভুত দুটি বস্তুর দিকে। কত রকম তার আর নীল আলোয় ঘেরা সেই যন্ত্রটি সকালের সূর্যের আলোয় বিচিত্র দেখাচ্ছে।

দুই

চিন্তার সাথে কল্পনা মিশে তৈরি হয় স্বপ্ন। মানুষ কখনো গভীর ঘুমে স্বপ্ন দেখে না, সব স্বপ্ন দেখে হালকা ঘুমে। কিন্তু মানুষের মাথার চিন্তা ও স্বপ্ন যদি রেকর্ড করে রাখা যায়, তবে তা হবে এই শতাব্দীর সেরা আবিষ্কার।

প্রফেসর ইকবাল ভিডিও ক্যামেরার সামনে প্রেজেন্টেশন দিচ্ছিলেন, “আমি গত কয়েক বছরের পরিশ্রমে এমন একটি যন্ত্র আবিষ্কার করেছি যা দিয়ে মানুষের চিন্তা ও স্বপ্ন দুটোই রেকর্ড করা সম্ভব। শুধু তাই নয়, এই যন্ত্রের সাহায্যে অন্যের চিন্তাও বোঝা যাবে এবং প্রয়োজনে তা ‘এডিট’ করা যাবে—যাতে মানুষের খারাপ চিন্তাকে ভালো কিছুতে রূপান্তর করা সম্ভব হয়।”

এমন সময় বাদশাহ এসে জানাল, বিজ্ঞানী ফারুক সাহেব এসেছেন। ফারুকের নাম শুনে ইকবালের বিরক্তি কেটে গেল। তারা দুজনে মিলেই এই যন্ত্রের চূড়ান্ত পরীক্ষা চালাবেন। গত সপ্তাহে তারা একটি কুকুরের ওপর যন্ত্রটি পরীক্ষা করেছিলেন। কুকুরের মাথায় বাটিটি লাগানোর পর মনিটরে ‘বাইনারি কোড’ ভেসে উঠেছিল। কোড ডিকোড করে জানা গিয়েছিল, কুকুরটি বিরক্ত হয়ে ভাবছে— “এই লোকগুলো আমাকে নিয়ে কী করতে চায়? একটা কামড় বসিয়ে দেব নাকি?”

হার্ভার্ডে পড়ার সময় ফারুকের সাথে ইকবালের পরিচয়। কোয়ান্টাম ফিজিক্সে ফারুকের অগাধ জ্ঞান থাকলেও তার চরিত্রে একটা খুতখুঁতে ভাব এবং অতি-সতর্কতা রয়েছে।

তিন

বাটির মতো যন্ত্রটি বাদশাহর মাথায় বসানো হয়েছে। মনিটরে বাইনারি কোড ডিকোড হয়ে বাদশাহর মনের ভাব ফুটে উঠছে— “দুই স্যার আমারে নিয়া এইগুলা কী শুরু করছে! আমারে আবার পাগল টাগল বানাইয়া ফেলাইবো না তো? বাবুর মা সকালে কইছিল লবন নাই, না নিয়া গেলে লবন ছাড়াই খাওয়া লাগবো। পাশের বাড়ির করিম ড্রাইভার আর একবার বাবুর মার কাছে ঘেঁষলে মাথা ফাটাইয়া দিমু। স্যাররে বলতে হইবো সামনে মাস থাইকা মাইনে বাড়াইয়া দিতে।” পনেরো মিনিটেই বাদশাহর মনের কথা অনায়াসে জেনে ফেললেন দুই বিজ্ঞানী। ইকবাল সাহেব গর্বের হাসি নিয়ে ফারুকের দিকে তাকালেন। ফারুক উত্তেজনায় নির্বাক হয়ে গেছেন।

চার

বিশ্ব বিজ্ঞানী সম্মেলনের আর মাত্র এক সপ্তাহ বাকি। এর মধ্যে তারা আরও কয়েকজনের স্বপ্ন সফলভাবে রেকর্ড করেছেন। এমনকি বাদশাহর চিন্তায় তারা ‘এডিট’ করেছেন—সে এখন আর করিম ড্রাইভারের মাথা ফাটানোর চিন্তা করে না। যন্ত্রটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘থিম এন্ড ড্রিম রেকর্ডার’।

আজকের মেঘলা সন্ধ্যায় ফারুক একটি প্রস্তাব দিলেন, “ইকবাল সাহেব, আপনার নিজের মাথায় যন্ত্রটি লাগিয়ে চিন্তাগুলো রেকর্ড করে রাখি? তাহলে সম্মেলনে কোনো পয়েন্ট মিস হবে না।” নিজের আবিষ্কারে মুগ্ধ ইকবাল সানন্দে রাজি হলেন।

ইকবাল যখন চোখ বন্ধ করে গভীর ভাবনায় মগ্ন, ড. ফারুক তখন অন্য চাল চাললেন। আবিষ্কারের সব কৃতিত্ব নিজের করে নেওয়ার নেশায় তিনি পকেট থেকে চেতনানাশক স্প্রে বের করে ইকবালের নাকে ধরলেন। ইকবাল জ্ঞান হারালেন। ফারুক দ্রুত মনিটরে কোডিং পরিবর্তন করে ইকবালের সব স্মৃতি আর চিন্তা ‘এডিট’ করে দিলেন। নতুন কমান্ড দেওয়া হলো— “এই যন্ত্রের আবিষ্কারক ড. ফারুক, আর ইকবাল তার সাধারণ সহকারী।”

পাঁচ

বিশ্ব বিজ্ঞানী সম্মেলনে ড. ফারুক এখন আলোচনার তুঙ্গে। ইদানীং তিনি চুল অগোছালো রেখে নিজেকে মহান বিজ্ঞানী হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করছেন। আর প্রফেসর ইকবাল কোডিং-এর প্রভাবে সারাক্ষণ ফারুকের গুণগান গেয়ে বেড়াচ্ছেন।

সম্মেলনের মাত্র কদিন আগে শেষবারের মতো যন্ত্রটি পরিষ্কার করছিলেন ফারুক। অহংকারের বশবর্তী হয়ে ইকবালের দিকে তাকাতে গিয়ে হাত থেকে বাটিটি পড়ে গেল। বৈদ্যুতিক সংযোগ চালু থাকায় মুহূর্তেই ‘শর্ট সার্কিট’ হয়ে পুরো যন্ত্রটিতে আগুন ধরে গেল। ফারুকের সব যশের স্বপ্ন পুড়ে ছাই হতে লাগল।

তিনি পাগলের মতো ইকবালের গবেষণাগারে ছুটলেন মূল নোটখাতাটির জন্য। খাতাটি খুঁজে পেলেও পাতা খুলতেই তার মাথা ঘুরে গেল। সব লেখা সাংকেতিক চিহ্নে। প্রফেসর ইকবালের কাছে গিয়ে খাতাটি দেখালে তিনি শিশুর মতো সহজভাবে তাকিয়ে বললেন, “এই চিহ্ন তো আমি চিনি না!”

বিগত বিশ বছর কেটে গেছে। আজও বিজ্ঞানীরা সেই সাংকেতিক লিপির রহস্যভেদ করতে পারেননি। ড. ফারুক নিরুদ্দেশ হয়েছেন; অনেকে বলে তিনি পাগল হয়ে পথে পথে ঘোরেন। আর প্রফেসর ইকবাল প্রতি রাতে স্বপ্ন দেখেন ‘থিম এন্ড ড্রিম রেকর্ডার’ তিনি আবার তৈরি করেছেন—মাথার ভেতরের চিন্তাগুলো যেন তার চোখের সামনে রঙিন ছবি হয়ে ভেসে ওঠে।

রাহুল রাজ এর অন্য গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

স/এষ্