ঢাকাবৃহস্পতিবার , ২৬ মার্চ ২০২৬
  1. Bangla
  2. chomoknews
  3. English
  4. অপরাধ
  5. অভিনন্দন
  6. আমাদের তথ্য
  7. কবিতা
  8. কর্পরেট
  9. কাব্য বিলাস
  10. কৃষি সংবাদ
  11. খুলনা
  12. খোলামত
  13. গল্প
  14. গাইড
  15. গ্রামবাংলার খবর

রাহুল রাজ এর ছোট গল্প- আকন্দ তলার স্কুল ঘর

admin
মার্চ ২৬, ২০২৬ ২:৪৮ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

রাহুল রাজ এর ছোট গল্প- আকন্দ তলার স্কুল ঘর

রাহুল রাজ ।। সিন্দ্রানী থেকে দত্তপুলিয়া যাওয়ার এই রাস্তাটা দিনের বেলাতেও কেমন যেন থমথমে থাকে। পিস ঢালা রাস্তার দুপাশে ফসলের ক্ষেত শেষ হলেই শুরু হয় জঙ্গল। আশেপাশে বসতি নেই বললেই চলে। বাওরের পাশ দিয়ে এই রাস্তায় কিছুটা এগিয়ে গেলেই দেখা যায় দাঁড়িয়ে আছে সেই দানবীয় আকৃতির আকন্দ তলার বটগাছ। তার ঝুরিনামা ডালপালা যেন শত শত কালো হাত বাড়িয়ে আকাশটাকে খামচে ধরে আছে। দিনের আলোতেও ওর নিচে জমাট বাঁধা অন্ধকার রাজত্ব করে।

এই বটগাছের পাশেই ছোট্ট ‘কুঁড়ি বিকাশ’ কেজি স্কুল। স্কুল থেকে পরপর দু-দুটো বাচ্চা, পাঁচ বছরের মিন্টু আর সাত বছরের রিয়া, রহস্যজনকভাবে হারিয়ে যাওয়ার পর থেকেই গোটা তল্লাটে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রামের লোকেরা এখন দিনের বেলাতেও এই রাস্তা দিয়ে একা যেতে ভয় পায়। সবার মুখে এক কথা—এটা ওই অপদেবতার কাজ।

কিন্তু গ্রামের নতুন ডাক্তার, তরুণ সুদীপ্ত বিশ্বাস, এসব কুসংস্কারে কান দেওয়ার পাত্র নন। তিনি বিজ্ঞানের ছাত্র, ভূত-প্রেত তার কাছে নিছক আষাঢ়ে গল্প। তিনি মনে করেন, বাচ্চা চুরির পেছনে কোনো পাচারকারী চক্র বা মানসিক রোগী জড়িত। মানুষের মনে ভয় ঢুকিয়ে তারা গা ঢাকা দিচ্ছে।

এক সন্ধ্যায় সুদীপ্ত বাবু গ্রামের কালীতলায় ব্রহ্মা ঠাকুরের মন্দিরে বসে ছিলেন। সেখানে মোড়ল হরেন কাকা তাকে সতর্ক করে বলেন, “ডাক্তারবাবু, আপনি এই গ্রামে নতুন এসেছেন, জানেন না। ওই বট গাছটা অভিশপ্ত। অনেক বছর আগে এক কাপালিক ওই গাছের নিচে সিদ্ধিলাভের জন্য একটি ছোট বাচ্চাকে বলি দিয়েছিল। স্থানীয়রা প্রতিবাদ করলে সে এই বটগাছ তলা থেকে সরে গেলেও অভিশাপ দিয়ে যায় ‘যে এই গাছ আমার হয়ে প্রতিশোধ নেবে। এই বট গাছের যারা ক্ষতি করবে, তারা নিঃবংশ হবে।’ এরপরে গ্রামের লোকেরা যারাই বটগাছটি কাটার পরিকল্পনা করেছিল তাদেরকেই দিতে হয়েছিল চরম মূল্য। এরপর থেকে বহু যুগ গ্রামের লোকে ভয়ে গাছের একটা পাতাও ছিড়তো না। এই শতাব্দীতে কিছু বছর আগে পাশের গ্রামের এক ঠিকাদার ওই গাছের ডাল কাটার কথা বলেছিল। তার পরের অমাবস্যাতেই তার পুরো পরিবার এক রহস্যময় আগুনে মারা যায়। লোকে বলে, তারপর থেকেই নাকি গাছের ডালপালা ভাঙলে বা কাটলে ওখান থেকে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত পড়ে।”

সুদীপ্ত বাবু হেসেছিলেন। “হরেন কাকা, রক্ত না ওটা হয়তো লাল কষ বা কোনো পোকার কারসাজি। আর ঠিকাদারের ঘটনাটা নিছক দুর্ঘটনা।”

হরেন কাকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলেন। “শুধু তাই নয় ডাক্তারবাবু। অনেকে মাঝরাতে ওই গাছের পাশ দিয়ে আসার সময় কান্নার আওয়াজ শুনেছে। আর অমাবস্যার রাতে যারা একা ওখান দিয়ে গেছে, তাদের অনেকেই নাকি অনুভব করেছে গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে কে যেন তাদের পা জড়িয়ে ধরছে—বটগাছের শিকড়গুলো নাকি তখন জ্যান্ত সাপের মতো হয়ে ওঠে।”

সবচেয়ে ভয়াবহ গুজবটা ছিল স্কুলটাকে নিয়ে। গ্রামের অনেকে বিশ্বাস করত, স্কুল ছুটির পর রাতের আধার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই স্কুলে অন্য পৃথিবীর বাচ্চারা পড়াশোনা করতে আসে। রাত-বিরেতে ওই স্কুল থেকে নাকি ভাঙা ভাঙা স্বরে নামতা পড়ার আওয়াজ শোনা যায়। কিছু পথিক নাকি জানালা দিয়ে আবছা আলোয় অদ্ভুত, ফ্যাকাসে মুখ ওয়ালা ছোট ছোট অবয়বদের বেঞ্চে বসে থাকতে দেখেছে।

ডাক্তার সুদীপ্ত সিদ্ধান্ত নিলেন, এই অলৌকিক ভয়ের অবসান ঘটাবেন। অমাবস্যার এক রাতে, যখন গোটা গ্রাম ঘুমে মগ্ন, তিনি তার বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। টর্চ, একটা ধারালো ছুরি আর একটা ক্যামেরা—ব্যাস, এই তার সম্বল। উদ্দেশ্য, ওই রাতে বটগাছের কাছে গিয়ে একাই সময় কাটানো এবং প্রমাণ করা যে সব গুজব মিথ্যা।

রাত তখন বারোটা। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। বাইকের হেডলাইটের আলোয় আকন্দ তলার বটগাছটা সামনে এল সুদীপ্ত। হেড লাইট বন্ধ করতেই অন্ধকার যেন আরও ঘনীভূত হয়ে উঠলো ডালপালার ফাঁকে। সুদীপ্ত বাবু বাইক থেকে নেমে টর্চটা জ্বাললেন।

“সব শান্ত। কোনো কান্নার আওয়াজ নেই, কোনো রহস্যময় আলো নেই,” একাই বটগাছের নিচে গিয়ে দাঁড়ালেন। এখানে কোন শব্দ নেই এমনকি ঝিঁঝি পোকাও ডাকছে না। নিজের নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ শোনা যাচ্ছে না। উপর থেকে নিচে নেমে আসা বটগাছের ঝুরিগুলো কেমন যেন চটচটে। টর্চের আলো একটা অজগর সাপের মত বড় ঝুরির ওপর ফেলতেই তিনি থমকে গেলেন। দেখলেন গাছের শিকড় বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা লাল তরল পড়ছে—সত্যিই রক্তের মতো দেখতে। তিনি ছুরি দিয়ে সামান্য পরিমাণের সেই তরল তুলে তার আঙুলে লাগল। খানিকটা গরম ও তেলতেলে অনুভব করলেন তিনি। পরীক্ষা করার জন্য খানিকটা তরল শিশিতে ভরে নিলেন। মনে মনে ভাবলেন “কাল ল্যাবে টেস্ট করলেই বোঝা যাবে। তরলটি কি?” হঠাৎ স্কুলের ঘন্টা পড়ার শব্দে তিনি চমকে উঠলেন। বট গাছের শিকড় থেকে মুখ ফিরিয়ে তিনি স্কুলের দিকে পা বাড়ালেন। স্কুলের প্রতিটা দরজা তালা মারা। চাবি ছাড়া কোনোভাবেই সেই দরজা খোলা সম্ভব না। বারান্দার কাছে এসে খোলা জানালা দিয়ে ভেতরে টর্চের আলো ফেললেন। বেঞ্চগুলো খালি। ব্ল্যাকবোর্ডে কিছু আঁকা নেই। তবে ঘন্টা কে বাঁচালো? নিছক মনের ভুল এই ভেবে তিনি হাসলেন। “ভূত বা ভূতের বাচ্চা—কিছুই নেই। ওসব হয় না। ভূত বলে কিছু নেই।” নিজের মনকে এসব যখন বোঝাচ্ছিলেন সুদীপ্ত তখন হঠাৎ বাতাস বইতে শুরু করল।

বটগাছের পাতাগুলোর মড়মড় শব্দে যেন একটা করুণ কান্নার সুর ভেসে আসছে। না, এটা বাতাসের শব্দ নয়। কোনো ছোট বাচ্চার অস্পষ্ট কান্নার আওয়াজ।

“মিন্টু? রিয়া?” সুদীপ্ত বাবু ডাকলেন। কোনো সাড়া নেই। আওয়াজটা বটগাছের ওপর থেকেই আসছে বলে মনে হলো।

তিনি সাহস করে বটগাছের দিকে এগিয়ে গেলেন। টর্চের আলো গাছের ওপরের দিকে ফেললেন। হঠাৎ তার নজরে পড়ল, একটা মোটা ডাল থেকে সাদা কাপড় পরা একটা ছোট হাত নিচের দিকে ঝুলছে। তার রক্ত হিম হয়ে এল। “মিন্টু, তুমি ওখানে?”

তিনি গাছের দিকে এগোতে চাইলেন, কিন্তু হঠাৎ অনুভব করলেন তার পা দুটো ভারী হয়ে গেছে। তিনি নড়তে পারছেন না। টর্চের আলো নিচের দিকে ফেলতেই তিনি আঁতকে উঠলেন। বটগাছের অসংখ্য সরু শিকড় তার পা দুটোকে জড়িয়ে ধরেছে, একদম অক্টোপাসের মতো। সেগুলো ক্রমেই শক্ত হচ্ছে।

“না, এটা হতেই পারে না! এটা ভুল!” তিনি আর্তনাদ করে উঠলেন। তার বৈজ্ঞানিক যুক্তি, তার অবিশ্বাস—সব যেন ধুলোয় মিশে গেল। শিকড়গুলো তার শরীর বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করল।

হঠাৎ গাছের ওপর থেকে সেই অস্পষ্ট কান্নার আওয়াজটা বদলে গেল একটা বীভৎস হাসিতে। টর্চের আলোটা হাত থেকে পড়ে গেল। অন্ধকারের মধ্যে তিনি দেখলেন, বটগাছের ডালপালা থেকে নেমে আসছে অসংখ্য ফ্যাকাসে, চোখহীন ছোট ছোট বাচ্চা, তারা হাসছে আর ছন্দে ছন্দে নামতা গুনতে গুনতে ডাক্তার সুদীপ্তকে ঘিরে ধরল। তিনি অনুভব করলেন তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে, তার শরীর ক্রমেই ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। সারা শরীরে অনুভব হচ্ছে অসংখ্য ছোট ছোট আঙ্গুলের স্পর্শ। আর দূর থেকে ভেসে আসছে কোন এক কাপালীর অদ্ভুত মন্ত্র পড়ার সুর। সুদীপ্তর শেষ আর্তনাদটা বাতাসের সঙ্গে মিলিয়ে গেল। দূরে এক পাল শেয়াল ডেকে উঠলো আত্ম স্বরে।

পরের দিন ভোরে গ্রামের লোকে আকন্দ তলার বটগাছের নিচে ডাক্তার সুদীপ্ত চৌধুরীর বাইকটা পড়ে থাকতে দেখল। তিনি কোথায় গেলেন, তার কোনো খোঁজ মিলল না। শুধু গাছের ডাল থেকে একটা শিশি ঝুলছিল, তাতে ছিল জমাট বাঁধা লাল তরল। আর কেজি স্কুলের ব্ল্যাকবোর্ডে চক দিয়ে অস্পষ্ট হাতে লেখা ছিল—”ডাক্তার কাকাও পড়তে এসেছে।”

আজও অমাবস্যার রাতে কেউ ওই রাস্তা দিয়ে একা গেলে, সে নাকি এখনও সুদীপ্ত বাবুর আর্তনাদ আর সেই ভূতের বাচ্চাদের মিলিত হাসির আওয়াজ শুনতে পায়। আকন্দ তলার বটগাছটা দাঁড়িয়ে থাকে মাথা উঁচিয়ে, তার ডালপালার আঁধারে আরও অনেক রহস্য আর ভয় লুকিয়ে রাখে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম।

— ২৬ মার্চ ২০২৬, মায়ের কোল।