আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও ভূমি রক্ষা দাবি আদিবাসীদের
নিজস্ব প্রতিবেদক ।। আদিবাসীদের আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি, ভূমির অধিকার রক্ষায় ভূমি কমিশন গঠনের বিকল্প নেই। বাংলাদেশের আদিবাসীদের অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্র বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করছে। স্বাধীন দেশ হিসেবে এ দেশের আদিবাসীদের আত্মপরিচয়ের স্বীকৃতি, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি বলে বক্তারা দাবি করেন।
জাতীয় আদিবাসী পরিষদের লড়াই-সংগ্রামের ৩ দশক (১৯৯৩-২০২৩) উদযাপন উপলক্ষে সকল আদিবাসীদের আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান, সমতলের আদিবাসীদের জন্য স্বাধীন ভূমি কমিশন ও পৃথক মন্ত্রণালয় গঠনসহ বিভিন্ন দাবিতে ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ রাজধানী ঢাকার শাহবাগ চত্বরে বিকাল ৩.৩০ মিনিটে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশের পূর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেসিয়াম চত্বর থেকে শাহবাগ চত্বর পর্যন্ত বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় আদিবাসী পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটি এই সমাবেশের আয়োজন করেন।
জাতীয় আদিবাসী পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন এর সভাপতিত্বে বৃহত্তর ঢাকা কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিভূতী ভূষণ মাহাতো’র সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন, জাতীয় আদিবাসী পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নরেন চন্দ্র পাহান।
সমাবেশে আরো বক্তব্য রাখেন, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির মূখপাত্র ও দপ্তর সম্পাদক সূভাষ চন্দ্র হেমব্রম, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক মানিক সরেন, বৃহত্তর ঢাকা কমিটি সভাপতি হরেন্দ্রনাথ সিং, গাইবান্ধা জেলার সভাপতি ডা. ফিলিমন বাস্কে, বগুড়া জেলার সভাপতি সন্তোষ সিং বাবু, নাটোর জেলার সভাপতি রঘুনাথ এক্কা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি বিচিত্রা তির্কী, পাবনা জেলা কমিটির সভাপতি আশিক বানিয়াস, রংপুর জেলা কমিটির সভাপতি বিমল খালকো, নওগাঁ জেলা কমিটির সদস্য সচিব মার্টিন মুরমু, এবং আদিবাসী ছাত্র পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি নকুল পাহান ও সাধারণ সম্পাদক তরুণ কুমার মুন্ডা প্রমূখ।
একই সাথে সংহতি বক্তব্য রাখেন, বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের সহকারী সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সহ সাধারণ সম্পাদক ডা: গজেন্দ্রনাথ মাহাতো, বাংলাদেশ আদিবাসী সমিতির উপদেষ্টা আরিফ খান ইউসুফ জাই, বাংলাদেশ আদিবাসী সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি সভাপতি বিশ্বনাথ সিং, বাংলাদশে যুব ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুল্ল্যাহ আল মাসুম, বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক টনি চিরান, বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রম পরিষদ এর সভাপতি অলিক মৃ, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মুক্তা বাড়ৈ, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি দীপক শীল, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ সাধারণ সম্পাদক জগদ্বীশ চাকমা প্রমুখ।
বরীন্দ্রনাথ সরেন বলেন, আমরা আদিবাসীদের জন্য যারা জীবন দিয়েছেন তাদের জন্য আমাদের লড়াই সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। তা না হলে তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে। আমরা এই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি। মহান মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন আমরা দেখতে পাচ্ছি না। সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার জন্য আমরা আমাদের লড়াই সংগ্রাম চালিয়ে যাবো। আমাদের লড়াই এবং সংগ্রাম যদি ন্যায়সঙ্গত থাকে তবে আমরা সফল হবো, আমাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে।
রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, বাংলাদেশের আদিবাসী যুবরা মাথায় রাখেন, কাকে ভোট দিবেন, কাকে ভোট দিলে আপনার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। আপনারা যদি সংগঠিত থাকতেন তবে আপনারা সংসদের কয়েকটি আসন বরাদ্ধ পেতেন। সংখ্যানুপাতিক ভোটের ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে আদিবাসীরা তাদের ভোটাধিকার পাবে। বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে, বাংলার ভাষায় আদিবাসীদের প্রায় ১৪ হাজারের অধিক শব্দ রয়েছে যেগুলো বাংলা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়।
বক্তারা আরো বলেন, এই ভূখন্ডের আদিবাসী হিসেবে হাজার বছর ধরে আমরা বসবাস করছি এবং ন্যায়সংগত অধিকারের জন্য লড়াই করছি। আদিবাসী রাষ্ট্র কর্তৃক বার বার প্রতারিত হয়েছে।
তাই কখনো তারা আন্দোলন করছে তাদের পূর্ব পুরুষের ভূমি রক্ষার জন্য, কখনো জীবন দিচ্ছে সেচের পানির জন্য, কখনো জীবিকা ও কর্মসংস্থানের দাবিতে রাজপথে কখনো লড়ছি শিক্ষা ও চাকরির জন্য, আবার নির্যাতন লাঞ্ছনার বিরুদ্ধেও সংগ্রাম করতে হচ্ছে আমাদেরকে।
এই লড়াই সংগ্রাম করতে গিয়ে নির্মমভাবে হত্যার শিকার হয়েছেন নওগাঁর আলফ্রেড সরেন, দিনাজপুরের ঢুডু সরেন, সাতক্ষীরার শ্যামনগরের নরেন্দ্রনাথ মুন্ডা। যাদের হত্যার বিচার আজো হয়নি। উত্তরবঙ্গের বিশেষত সমতলের আদিবাসীদের সংগঠিত করে আমরা জাতীয় আদিবাসী পরিষদ প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আন্দোলন সংগ্রাম করে আসছি।
আদিবাসী পরিষদকে বিভক্তির ষড়যন্ত্র চলছে। সকল ষড়যন্ত্রকে প্রতিহত করে সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে হবে। অনেক চড়াই-উতরাই পার করে আজ ৩ সেপ্টম্বর ২০২৩ তিন দশক পূর্তি উপলক্ষে আজকের সমাবেশ কর্মসূচি পালন করছি।
আদিবাসীদের দাবিসমূহ:
১. সকল আদিবাসীদের আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে;
২. সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় ও ভূমি কমিশন গঠন করতে হবে;
৩. সরকারি চাকুরিতে আদিবাসীদের ৫% কোটা পুনর্বহাল এবং উচ্চ শিক্ষায় আদিবাসীদে কোটা বাস্তবায়ন করতে হবে;
৪. গাইবান্ধা জেলার সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্মের তিন সাঁওতাল হত্যার বিচার চাই, রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে সেচের পানি না পাওয়ায় অভিনাথ মার্ডি ও রবি মার্ডির আত্মহত্যার প্ররোচনাকারীদের বিচার চাই;
৫. পাবর্ত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনতিবিলম্বে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে এবং সারাদেশে আদিবাসীদের উপর নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, জমি জবর দখল, মিথ্যা মামলা, লুটপাট, পুলিশী হয়রানি, আদিবাসীদের নামে বরাদ্দকৃত টাকা আত্মসাৎ, ভূমি অফিসের ঘুষ-দূর্নীতি বন্ধ করতে হবে।
স/এষ্

