লালমনিরহাটে হারানোর ৩০ বছর পরেও ফাতেমা জানতে চান তার আসল পরিচয়! কে তার বাবা-মা?
লাভলু শেখ লালমনিরহাট থেকে।। মাত্র ৪ বছর বয়সে নিজ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া শিশু ফাতেমা আক্তার জনি। এরপর, বিভিন্ন বাড়িতে ২/৩ মাস আশ্রায় নিয়ে থাকলেও একপর্যায়ে লালমনিরহাটের বিডিআরহাট এলাকার পাঁচপীর মাজারের খাদেম আকবর আলী শিশু ফাতেমাকে পোষ্য সন্তান হিসেবে গ্রহণ করেন। সেখানেই তার বেড়ে ওঠা। স্বামী-সন্তানসহ এখনও সেখানেই বস-বাস করছেন।
ফাতেমার পালক মাতা হাসিনা বেওয়া ও প্রতিবেশীরা জানান, ১৯৯০-৯১ সালে লালমনিরহাট পৌর এলাকার খোচাবাড়ী গ্রামের জনৈক বৃদ্ধা ঢাকায় তার মেয়ের বাড়িতে বেড়াতে যান। সেখান থেকে ফেরার পথে ঢাকা কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেনের জন্য অপেক্ষমান ছিলেন তিনি। এ সময় একজন মহিলা কান্নারত শিশু ফাতেমাকে বৃদ্ধার হাতে দিয়ে বলেন, বাচ্চাটাকে একটু দেখবেন, আমি টয়লেট থেকে আসছি। এরপর কয়েকঘন্টা পেরিয়ে গেলেও সেই মহিলা আর ফিরে আসেননি।
এ দিকে, শিশু ফাতেমাকে নিয়ে বিপাকে পড়েন বৃদ্ধা। নির্ধারিত ট্রেনও ফেল করেন। পরে শিশুটিকে নিয়ে স্টেশনের কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যদের কাছে গেলে, তারা সবকিছু শুনে বৃদ্ধার হাতে ২০০ টাকা দিয়ে বলেন, যাদের সন্তান নেই (নিঃসন্তান দম্পতি) এমন কাউকে বাচ্চাটিকে দিয়ে দেবেন। এরপর ওই বৃদ্ধার হাত ধরেই লালমনিরহাটে আসা শিশু ফাতেমার।
বর্তমানে ২ কন্যা সন্তানের জননী ফাতেমা। স্বামী অটোরিক্সা চালক, আর নিজে সামলান একটি ছোট্ট চায়ের দোকান। অভাব অনটনের মাঝে জীবন চললেও গত একমাস আগে রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার এক বৃদ্ধ দম্পতি ২৫ বছর পূর্বে তাদের হারানো মেয়ের সন্ধানে লালমনিরহাট আসেন এবং ফাতেমাকে তারা তাদের মেয়ে দাবি করেন। এক পর্যায়ে ওই দম্পতি লালমনিরহাট সদর হাসপাতাল এলাকায় তাদের মেয়েকে খুঁজে পান।
কিছু সময়ের জন্য বাবা-মা পেয়েও হারান ফাতেমা। এ যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত এর মতো ঘটনা। আবেগ আপ্লুত ফাতেমা, রংপুরের শ্যামপুর থেকে এক পরিবার এসে দ্বাবি করেন ফাতেমা আক্তার জনি তাদের সন্তান।
কয়েক দফা আসা-যাওয়া হয় ওই পরিবারের। এক পর্যায়ে ডিএনএ টেষ্ট করার প্রস্তুতি নেন ওই পরিবার। কিন্তু ভাগ্য তার সহায়ক হয় না। এরেই মধ্যে রংপুরের শ্যামপুর থেকে আসা সেই পরিবার লালমনিরহাট সদরহাসপাতাল এলাকায় এক মেয়েকে তাদের আপন মেয়ে হিসেবে শনাক্ত করে ফেলেন। উভয় পক্ষ শত ভাগ নিশ্চিত হওয়ায় নিয়ে ফিরে পায় মা সহ পরিবারকে। ২৫ বছর ধরে খুঁজে বেড়ানো বাবা-মা পায় মেয়েকে। এ উপলক্ষে ওই পরিবার অনুষ্ঠান করে ধুমধাম করে দাওয়াত দেয় জনিসহ তার পরিবারকে।
তখনই ফাতেমা আক্তার জনির বাবা-মাকে ফিরে পাওয়ার আগ্রহ আরও প্রবল আকার ধারণ করে। হারানোর ৩০ বছর পরেও ফাতেমা জানতে চান তার আসল পরিচয়! কে তার বাবা-মা? তাদের ঠিকানা কোথায়? আর কেনই বা তিনি হারালেন? এমন হাজারো প্রশ্ন তার মনে জেগে উঠছে। এ বিষয়ে ফাতেমা আক্তার জনি জানান, আমাকে খুঁজতে এসে দীর্ঘ ২৫ বছর পর একটি পরিবার তাদের মেয়েকে খুঁজে পেয়েছে। আমিও আমার পরিবারকে খুঁজে পেতে চাই। আমি যখন হারিয়েছি তখন আমি ছোট ছিলাম। আমার না হয় কিছু মনে নেই কিন্তু যারা আমাকে হারিয়েছে তাদের কারো না কারোতো মনে থাকবে। আমার বিশ্বাস আপনারা যদি আমাকে সহযোগীতা করেন তাহলে আমি আমার পরিবারকে ফিরে পাবো ইনশাল্লাহ।
এবিষয়ে জনির মা হাসিনা বেওয়া যিনি জনিকে ৩০ টি বছর বুকে আগলে লালন-পালন করেছেন তিনি জানান, জনিকে পাওয়ার সময় ও তার নাম বলেছিলো ফাতেমা। বাবা মায়ের নাম ঠিকানা কিছুই বলতে পারতোনা জনি। তবে যে বুড়ি ওকে নিয়ে এসেছে সে বলেছিলো কমলাপুর ষ্টেশন থেকে নিয়ে এসেছিলো। আমার কোনো বাচ্চা না থাকায় আমি একটা মেয়েকে পালিত নিয়েছিলাম। পড়ে জনিকে পাওয়ার পর ২জনকেই সমান ভাবে মায়ের স্নেহ-মমতা দিয়ে মানুষ করি।
এখন আমারও ইচ্ছে হয় আমার জীবদ্দশায় যদি জনির পরিবারকে খুঁজে পাওয়া যেত তাহলে তিনিও প্রশান্তি পেতেন। আর ফেসবুক ইউটিউব সহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে জনি তার পরিবারকে ফিরে পাবে এমন প্রত্যাশা করছেন জনি,তার পরিবার ও প্রতিবেশীরা।
স/এষ্

