খাদ্য নিরাপত্তায় নানামুখি উদ্যোগ সরকারের
বিশেষ প্রতিনিধি : রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়া, জ্বালানি তেলের প্রায় ৫০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধিসহ নানা সংকটে অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে নিত্যপণ্যের বাজার। দেশের প্রধান খাদ্যশস্য চালের বাজারও এখন চড়া। এছাড়া আটা, চিনি, ডিম, সয়াবিন তেলসহ প্রায় সব দ্রব্যমূল্যের দাম প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ফলে দেশের দুর্বল জনগোষ্ঠী অর্থাৎ গরীব ও নিম্ন-মধ্যবিত্তরা মারাত্মক খাদ্যঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
গত কয়েক মাস ধরেই বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এখনই যদি পরিস্থিতি সঠিকভাবে সামাল দেওয়া না যায়, তাহলে বিপুল সংখ্যক মানুষ নতুন করে দারিদ্রসীমার নিচে নেমে যাবে। এমন পরিস্থিতিতে উচ্চ বাজারমূল্য থেকে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষকে সুরক্ষা দিতে এবং তাদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খাদ্য মন্ত্রণালয়কে এ সংক্রান্ত নির্দেশনাও দিয়েছেন।
বাড়ছে ওএমএস-টিসিবির কার্যক্রম:
সরকার ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) এক কোটি কার্ডধারীকে মাসে কমপক্ষে একবার ১০ কেজি চাল দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া বাড়ানো হচ্ছে খোলাবাজারে বিক্রি (ওএমএস) কার্যক্রমও। ওএমএস বিক্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা আড়াই গুণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি চালের আমদানি খরচ কমাতেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চালের মজুদ বাড়াতে ভারত ও ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশ থেকে চাল আমদানির উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। দেশের খাদ্য চাহিদা মেটাতে পর্যাপ্ত চাল আমদানি নিশ্চিত করতে বিদ্যমান ২৭.৫% আমদানি শুল্ক ও কর পুরোপুরি প্রত্যাহার করতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। এছাড়া, ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধিতে আগামী বোরো মওসুমে উৎপাদন যাতে ব্যাহত না হয়, সেজন্য সেচে ব্যবহৃত ডিজেলের দাম কমানোর পরিকল্পনা করছে সরকার। এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়, জ্বালানি বিভাগ ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।
কম দামে চাল পাবেন টিসিবি কার্ডধারীরা:
বর্তমানে টিসিবি ফ্যামিলি কার্ডধারী এক কোটি পরিবারের মধ্যে দুই লিটার সয়াবিন তেল, দুই কেজি ডাল, এক কেজি চিনি ও দুই কেজি পেঁয়াজ বাজারের চেয়ে অনেক কম দামে বিক্রি করছে সরকার। কার্ডধারী ভোক্তারা প্রতি লিটার সয়াবিন তেল ১১০ টাকা, প্রতি কেজি চিনি ৫৫ টাকা, মসুর ডাল ৬৫ টাকা ও প্রতি কেজি পেঁয়াজ ২০ টাকা দওে কিনতে পারছেন। তবে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে শুধু সিটি করপোরেশন এলাকা ও টিসিবির আঞ্চলিক কার্যালয়-সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোতে।
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে এখন থেকে এসব পণ্যের সঙ্গে ১০ কেজি করে চাল দেওয়া হবে টিসিবি কার্ডধারীদের। তবে এই চালের দাম কত হবে তা এখনও নির্ধারণ হয়নি। সূত্র জানিয়েছে, প্রতি কেজি চালের দাম ১৫ টাকা করে রাখার বিষয়ে চিন্তাভাবনা চলছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে খাদ্য সচিব মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, এতদিন টিসিবির মাধ্যমে এক কোটি পরিবারকে কমদামে সয়াবিন তেল, চিনি ও মসুর ডাল বিতরণ করা হয়েছে। এখন টিসিবির ফ্যামিলি কার্ডের পণ্যে চাল যুক্ত করার পরিকল্পনাও হাতে নিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন। শিগগির এ কার্যক্রম চালু হবে। এর পদ্ধতি নিয়ে টিসিবি ও খাদ্য মন্ত্রণালয় কাজ করছে। কারণ টিসিবির এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ডিলার আলাদা। এ ছাড়া এ চাল কত দামে দেওয়া হবে, কতবার দেওয়া হবে- সেগুলোও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
সারাদেশে ওএমএসের ১২’শ পয়েন্ট বাড়ছে:
এদিকে দেশজুড়ে ওএমএসের ব্যাপ্তি বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমানে সারাদেশে প্রায় ৮০০ ডিলারের মাধ্যমে ওএমএসে চাল, আটা বিক্রি হয়। আগামী মাসে ডিলারের সংখ্যা বাড়িয়ে ২,০১৩টি করা হবে। ওএমএসের দোকান থেকে প্রতিদিন ৪ লাখ ৪০ হাজার জন চাল ও আটা কিনতে পারবেন।
খোলা বাজারে বিক্রয় কর্মসূচি- ওএমএসের আওতায় ১ সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ টাকা কেজি দরে চাল বিতরণ শুরু করবে খাদ্য মন্ত্রণালয়। আগে এই চালের দাম ছিল ১০ টাকা। খাদ্যবান্ধব এই কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৫০ লাখ কার্ডধারী মাসে ৩০ কেজি করে চাল কিনতে পারবে।
এ প্রসঙ্গে খাদ্য সচিব বলেন, দরিদ্র ও নিম্ন-আয়ের মানুষকে সহায়তা করতে ওএমএস কার্যক্রম বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমানে আটশর বেশি পয়েন্ট থেকে ওএমএস ডিলারের মাধ্যমে চাল সরবরাহ করা হচ্ছে। এখন সিদ্ধান্ত হয়েছে সারাদেশে ২ হাজার ১৩ পয়েন্ট থেকে চাল ও আটা সরবরাহ করা হবে।
জিটুজি ভিত্তিতে কমদামে আসবে আরও চাল:
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে চালের পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও মূল্যস্ফীতির প্রভাব থেকে দরিদ্রদের সুরক্ষায় সরকার খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি সম্প্রসারণের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে জিটুজি (সরকার থেকে সরকার) ভিত্তিতে চাল আমদানির পরিকল্পনা করছে।
সূত্র আরও জানায়, জিটুজি ভিত্তিতে ভিয়েতনাম থেকে চাল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ভিয়েতনামের বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করবে মন্ত্রণালয়। এছাড়া চালের মজুদ বাড়াতে ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে চাল আমদানির উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। রাশিয়া থেকে গম আমদানির প্রক্রিয়া চলছে, যা শিগগিরই চূড়ান্ত হবে।
আমদানি শুল্ক কমানোর উদ্যোগ :
এদিকে চালের আমদানি খরচ কমানোর জন্য শুল্ক কমানোর উদ্যোগও নিয়েছে সরকার। খাদ্য মন্ত্রণালয় চালের উৎপাদন, আমদানি, সরবরাহ, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যসহ সামগ্রিক পরিস্থিতি তুলে ধরে দেশে আমদানি বাড়ানো দরকার উল্লেখ করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে একটি প্রতিবেদন পাঠিয়েছে। এ প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) চালের আমদানি শুল্ক সাময়িকভাবে কমিয়ে শূন্য শতাংশ করার পরামর্শ দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। যদিও এনবিআর এখনও পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। জানা গেছে, এনবিআর চালের আমদানি শুল্ক একেবারে প্রত্যাহার না করে কিছু শুল্ক রাখতে চাইছে। চাল আমদানিতে আগে ৬২ শতাংশ শুল্ক ছিল। আমদানি উৎসাহিত করতে গত ৩০ জুন এক সার্কুলারে তা কমিয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়।
অনিয়ম ঠেকাতে সতর্কতা চান খাদ্যমন্ত্রী:
সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে যাতে কেউ অনিয়ম-জালিয়াতি করতে না পারে সে ব্যাপারে কর্মকর্তাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার।
গত সোমবার খাদ্য ভবনে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে বরাদ্দ বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা হয়েছে। কেউ যেন সরকারি কর্মসূচিতে অনিয়ম-জালিয়াতি করতে না পারে, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। সরকারের প্রকিউরমেন্ট, ওএমএস কার্যক্রম ও অবৈধ মজুতদারী কঠোরভাবে মনিটরিং করা হবে।
যাদের পাওয়ার কথা, তারাই যেন পায়:
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। ফলে দরিদ্র, নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষ কম খেয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। এ অবস্থায় সরকারের এ উদ্যোগ খুবই সময়োপযোগী। তবে এক্ষেত্রে শুধু মাত্র সীমিত আয়ের মানুষেরাই অর্থাৎ যাদের এ সুবিধা ভোগ করার কথা তারাই যাতে সুবিধা পায় সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষণা সংস্থা- সানেম এর গবেষণা পরিচালক সায়েমা হক বিদিশা বলেন, চলমান পরিস্থিতিতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জীবন নির্বাহ খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে। তাদের খাদ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এমন অবস্থায় সরকার যেসব উদ্যোগ নিচ্ছে আমি সেগুলোকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছি। তবে আমার মতে এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নে, উপকারভোগী চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে আরও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা দরকার। ভর্তুকি মূল্যের এসব খাদ্যপণ্য যাদের পাওয়ার কথা, তারাই যেন পায়- তা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া শুধু সরকার নয়, চলমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বেসরকারিখাতের শিল্প মালিকদেরও উচিত, তাদের শ্রমিকদের জন্য কম দামের খাবার নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নেওয়া।
স/এষ্

