নজরদারির অভাবে অরক্ষিত শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ
রাজু আহমেদ: শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে নির্মিত রাজধানীর মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান ও স্মৃতিসৌধ এলাকা বর্তমানে একশ্রেণির মাদকসেবী, ছিনতাইকারী, ভবঘুরে ও কিশোর অপরাধীদের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
প্রশাসনের সঠিক নজরদারির অভাবেই বহুল তাৎপর্যপূর্ণ এই স্থানটিতে অপরাধীরা অবাধে চলাচল করছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলাকালীন ১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধে মহান বিজয় ঘোষণার মাত্র দুদিন আগে পাকিস্তানি হানাদারদের দোসর আলবদর বাহিনীর সদস্যরা দেশের অসংখ্য বুদ্ধিজীবীদেরকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল।
সেসকল শহীদ বুদ্ধিজীবিদের স্মরণে ১৪ই ডিসেম্বর দিনটিকে ‘শহীদ বুদ্ধিজীবি দিবস’ ঘোষণাসহ রাজধানীর মিরপুরে স্থাপিত হয় শহীদ বুদ্ধিজীবি শহীদ মিনার ও কবরস্থান।
১৯৭২ সালের ২২ ডিসেম্বর এই স্মৃতিসৌধের ফলক উন্মোচন করে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান এই এলাকাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেন। এটির স্থপতি ছিলেন মোস্তফা হারুন কুদ্দুস হিলি। যেখানে বর্তমানে প্রায় ৩০০০ কবর রয়েছে।
প্রতিবছরের ১৪ ডিসেম্বর রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘শহীদ বুদ্ধিজীবি দিবস’ পালন উপলক্ষ্যে এই এলাকাটি নানা রং ও আলোকসজ্জায় সজ্জিত হলেও বছরের বাকী দিনগুলোতে অযত্নের চিত্রই বিরাজ করে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও প্রশাসনের উল্লেখযোগ্য নজরদারি না থাকায় শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ এলাকার পবিত্রতা ও মর্যাদা ক্ষুন্ন হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন ঘুরতে আসা দর্শনার্থীরা।
গত শুক্রবার থেকে একটানা কয়েকদিন সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শহীদ বুদ্ধিজীবি স্মৃতিসৌধ ও কবরস্থানটি প্রধানত দুটি অংশে বিভক্ত। দক্ষিণ পাশের অংশটি প্রখ্যাতজনদের জন্য সংরক্ষিত কবরস্থান। উত্তরের বড় অংশটি সাধারণের জন্য কবরস্থান।
এই উত্তর-দক্ষিণের মাঝখানের অংশটিতে অবস্থিত শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ/স্তম্ভ। বর্তমানে এটি ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনাধীন।
সরেজমিনে গিয়ে আরো দেখা গেল, স্মৃতিসৌধের মূল গেটের সামনেই বসেছে অস্থায়ী বাজার। আর বাজারের ময়লা-আবর্জনা পুরো এলাকাজুড়েই রয়েছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। নিয়ম করে প্রতিদিন সকাল-বিকালই এ বাজার বসে বলে জানা গেছে। এই বাজারের কারণে নিজস্ব অবয়ব হারাতে বসেছে স্মৃতিসৌধটি।
একটু এগিয়ে স্মৃতিসৌধের ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে হাজারো দর্শনার্থীদের ভীড়। স্মৃতিসৌধে আসা দর্শনার্থীদের অনেকে স্মৃতিসৌধের মর্যাদা ও পবিত্রতা রক্ষার কোনো তোয়াক্কাই করছেন না।
তারা মিনারের মূল স্মৃতিফলক ও বেদির ওপর দাঁড়িয়েই সেলফি তুলছেন। অনেকেকে অশোভন ও বাজে অঙ্গভঙ্গিও করতে দেখা গেল।
স্মৃতিসৌধ স্তম্ভের উপরে জুতা-স্যান্ডেল পায়ে দিয়ে দলে দলে নারী-পুরুষ, কিশোর-কিশোরীরা উঠে কেউ সেলফি তোলায় ব্যস্ত, কেউবা বেদীর উপরেই বসে বসে গল্প গুজব করছেন, কেউ কউ স্মৃতিসৌধ স্তম্ভের উপরে বসে বিভিন্ন খাবারদাবার খেতে ব্যস্ত।
অথচ স্মৃতিসৌধের এক পাশে সাইনবোর্ডে বেশ বড় বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে ‘শহিদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য।’ অথচ ভেতরে যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। দলীয় ব্যানার ও ফেস্টুন লাগানো রয়েছে কিছু স্থানে।
এদিকে নিরাপত্তাপ্রাচীর ভেঙে যাওয়ায় অবাধে প্রবেশ করছে লোকজন। স্মৃতিসৌধ চত্বরে উঠতি বয়সের তরুণরা দল বেঁধে আড্ডা দিচ্ছে। কিছু তরুণ-যুবক ক্রিকেট খেলছে। এ সময় কিছু তরুণ নিজেদের মধ্যে মারামারিতে লিপ্ত হয়।
আশপাশের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখানে মাদকসেবীদের আড্ডার পাশাপাশি মোবাইল ফোনে জুয়া খেলাও হয়।
এছাড়া ভবঘুরে ও ভাসমান এক শ্রেণির পতিতাদেরও অবাধ যাতায়াত রয়েছে স্মৃতিসৌধ চত্বরে। গাছগাছালির ছায়ায় তারা নিশ্চিন্তে ঘুমায় এবং সন্ধ্যা নামতেই নানাবিধ অনৈতিক কার্যক্রমে লিপ্ত হয়।
একটু এগোতেই দেখা গেল, স্মৃতিসৌধ স্তম্ভের পেছনেই রয়েছে একটি জলাধার। পানির অভাবে এটি শুকিয়ে গেছে। ময়লা-আবর্জনার স্তূপে পরিণত হয়েছে এটি।
অপরদিকে, স্মৃতিসৌধের গণকবরে যাতায়াতে বিশেষ বিধিনিষেধ থাকলেও মাদকসেবী ও ব্যবসায়ীরা সে বিষয়ে কোনো তোয়াক্কাই করছে না। তারা প্রতিনিয়ত এখানে মাদক বেচাকেনা ও সেবন করে।
স্থানীয় মীর মুজিবুর রহমান নামে এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, এখানে মাদকসেবী ও কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত বেশি। প্রায়শঃই এখানে ছিনতাইও হয়।
সঠিক নজরদারির অভাবে স্মৃতিসৌধের ভেতরের পরিবেশটা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। কয়েক মাস আগে স্মৃতিসৌধের স্মৃতিফলক ধসে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। স্থানীয়রা মনে করছেন, মাদকসেবীরা এটি ভেঙেছে।
স্মৃতিসৌধ এলাকার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্য আবুল বাশার বলেন, আজ আমরা মাত্র কয়েকজন আনসার সদস্য ডিউটি করছি।
আসলে এখানে এত পরিমাণ দর্শনার্থীরা ভীড় করেন, বিশেষ করে শুক্রবার তাদেরকে সামলানো কোনোভাবেই সম্ভব হয়না। এই এলাকার নিরাপত্তা রক্ষায় আরও লোকবল নিয়োগ করা হলে ভালো হয়।
এ বিষয়ে ডিএনসিসির ১০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবু তাহের বলেন, স্মৃতিসৌধ নিয়ে আমার কাছে কেউ অভিযোগ নিয়ে আসেনি। কেউ মারামারি করলে, মাদক কারবারি কিংবা কে বা কারা সেখানে অন্যায় অপরাধে লিপ্ত সেটি পুলিশ দেখবে।
আমি কাউন্সিলর হিসেবে সেখানে লোকজনের হাঁটা-চলা বন্ধ করতে উদ্যোগ নিলে তারা আমার বিপক্ষে অবস্থান নিতেই পারে।
কবরস্থান ও শহীদ মিনারকে ঘিরে নির্মিত নিরাপত্তাপ্রাচীর কয়েক জায়গায় ভাঙা রয়েছে স্বীকার করে তিনি আরো বলেন, সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ভাঙা প্রাচীর এপর্যন্ত সাতবার ঠিক করেছি। ঠিক করার পর তা দুষ্কৃতকারীরা ফের ভেঙে ফেলে।
এ বিষয়ে স্থানীয় ঢাকা-১৪ আসনের সাংসদ বীর মুক্তিযোদ্ধা আগা খান মিন্টু এমপি বলেন, শহীদ বুদ্ধিজীবি স্মৃতিসৌধ ঘিরে নানা অনিয়মের বিষয়ে আমার কাছেও বিভিন্ন রকমের অভিযোগ এসেছে। আসলে স্বাধীন দেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের যার যার স্থান থেকেই এর পবিত্রতা, ভাবগাম্ভীর্য ও ঐতিহ্য রক্ষায় এগিয়ে আসা উচিত।
এটি সাধারণ কোনো স্মৃতিসৌধ নয়; বরং এদেশের বর্বরোচিত ইতিহাসের স্বাক্ষী। যা দেখে আমাদের আগামী প্রজন্ম সঠিক ইতিহাস জানতে পারবে। আমি শিগগিরই এই স্মৃতিসৌধের পবিত্রতা রক্ষা ও এর সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরকে শহীদ বুদ্ধিজীবি স্মৃতিসৌধ রক্ষায় নজরদারি বৃদ্ধিতে যাবতীয় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
স/এষ্

