মুন্সীগঞ্জে খোলা আকাশের নিচে ব্যাটারি গলিয়ে তৈরি হচ্ছে সিসা
মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি : মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ী উপজেলার যশলং আলদি – দিঘিরপাড় সড়কের হাটকান ব্রিজের পূর্বপাশে বাগানে খোলা আকাশের নিচে মোটর গাড়ির বাটারি গলিয়ে পরিবেশের ক্ষতি করে জিঙ্ক (দস্তা) সংগ্রহ হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়রা জানান, অটো মিশুকের ব্যাটারি, গাড়ীর ব্যাটারি এবং আইপিএসসহ বিকল্প পন্থায় পাওয়ার জেনারেট করে এমন সকল ধরনের পরিত্যক্ত ব্যাটারির সিসা (লেড) ও জিঙ্ক (দস্তা) সংগ্রহ হচ্ছে অস্বাস্থ্যকরভাবে।
এগুলো চুল্লিতে গলিয়ে বানানো হচ্ছে সিসা ও দস্তার মন্ড। এই মন্ড বিক্রি হচ্ছে মহাজনের কাছে। সেখান থেকে কিনে নিয়ে যাচ্ছে ব্যাটারি ও আইপিএস কোম্পানিগুলো। রিসাইক্লিং প্রক্রিয়ায় এগুলো দিয়ে ফের তৈরি হচ্ছে ব্যাটারি ও আইপিএস। বিভিন্ন এলাকায় সিসা ও দস্তা সংগ্রহের ভাসমান কারখানা গড়ে উঠেছে।
স্থানীয় লোকজন সরিয়ে নেয়ার দাবি জানালেও অজানা শক্তির বলে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এসব কারখানা এখান থেকে সরিয়ে নেয়া হচ্ছেনা। ব্যাটারি ভাঙ্গার সময় ভেতরের অনেক রাসায়নিক পদার্থ বের হয়ে আসে। এর মধ্যে পচা এসিডও থাকে।
শ্রমিকরা ব্যাটারি ভেঙ্গে এসিড মিশ্রনের পানি ফেলে দেয়। এরপর বর্জ্য ধুয়ে পরিষ্কার করে খালি হাতেই। পরিত্যক্ত বাগানে তাবু টানিয়ে শ্রমিকরা কারখানা গড়ে তুলেছেন। কারখানার আশপাশে জলাধার, ডোবা ও ছোট পুকুর আছে। প্রথমে ব্যাটারি ভেঙ্গে জলাধারে গিয়ে পরিষ্কার করা হয়। ব্যাটারি পারিষ্কারের পর পানিও বিষাক্ত হয়।
এই টক্সিক বা বিষাক্ত পানিতেই বর্জ্য থেকে সিসা ও জিঙ্ক আলাদা করা হয়। শুকানোর পর রাতে ঢালাই ফ্যাক্টরির মতো চুল্লিতে গলানো হয় ভাঙ্গাড়ি। গলানোর সময় ধোঁয়া ও উৎকট গন্ধে আশপাশের গ্রামের মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হয়।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, যশলং ইউনিয়নের হাটকান ব্রিজের পূর্বপাশে আলদিÑ দিঘিরপাড় সড়কের পূর্ব পাশে একটি পরিত্যক্ত বাগানের চলছে সিমা গলানো। বাগানটির সামনের অংশে টিনের বেড়া দিয়ে বাগানটির পূর্ব প্রান্তে খোলা আকাশের নিচে ব্যাটারি ভাঙার কাজ করছেন শ্রমিকরা।
পাশেই তাবু টানিয়ে শ্রমিকদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। শ্রমিকরা ব্যাটারি ভেঙে প্রসেস করছেন যেন রাতে তারা এগুলো চুলোয় দিয়ে গলিয়ে দস্তা উৎপাদন করা যায়। অথচ এর পশ্চিম পাশে রয়েছে হাটখান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং বহু গ্রাম।
স্থাণীয় কয়েকজন ব্যক্তি জানান, রাস্তার পাশে বাগানের ভিতরে খোলা আকাশের নিচে গলানো হচ্ছে সিসা। ফলে আধা কিলোমিটারের মধ্যে মানুষের স্বাভাবিক বসবাস অযোগ্য হয়ে পড়েছে। যে ডোবা ও জলাশয়ে ব্যাটারির বর্জ্য পরিষ্কার করা হয় সেই পানি পাশের জমিতে পড়েও বিষাক্ত হয়ে যাচ্ছে। যে শ্রমিকরা ব্যাটারি ভাঙ্গার কাছ করছে অনেকেরই হাতে ও শরীরে ঘা হয়েছে।
এই ঘা নিয়ে কাজ করে জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছেন। এছাড়াও জনবসতি এবং সরকারি স্কুলে কাছাকাছি এলাকায় কোন ধরনের সরকারি নিয়ম নীতির তোয়াক্কা করা হচ্ছেনা। মনির হোসেন নামের এক প্রভাবশালী ব্যক্তি প্রশাসনের নজর এড়িয়ে বাগানের ভিতর গড়ে তুলেছেন এই ব্যাটারি গলিয়ে সিসা তৈরির কারখানা।
শ্রমিকদের সাথে কথা হলে তারা জানান, প্রতি মণ ব্যাটরি গলিয়ে মেলে ২০ থেকে ২২ কেজি সিসা। ছাঁচে ফেলে সিসা গলানোর পর প্রতিটি সলিড বারের ওজন হয় ২০ থেকে ৩০ কেজি। প্রতি কেজি সিসা ১শ’ ৬০ টাকা থেকে ৩শ’ টাকা দরে বিক্রি হয় ব্যাটারি উৎপাদন কোম্পানির কাছে। এই সিসা ও দস্তায় তৈরি হয় রিসাইকেল পাওয়ার স্টোরেজ ব্যাটারি।
এগুলো নানা সাইজের নানা মাপের। হালে সোলার প্যানেলে বিদ্যুত সংরক্ষণের জন্য দরকার এই ব্যাটারি। ব্যাটারির ভেতরের সালফিউরিক এসিড দীর্ঘস্থায়িত্ব সংরক্ষণ করে। এই এসিড পাল্টিয়েও সচল রাখা যায়। ব্যাটারির কার্যক্ষমতা না থাকলে তা পরিত্যক্ত হয়ে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়া হয়। পরিত্যক্ত এই ব্যাটারিও মূল্যবান ভাঙ্গাড়ি দোকানিদের কাছে।
ফেলে দেয়া এইসব ব্যাটারি ৮০ থেকে এক শ’ টাকা কেজি দরে কেনা হয়। পরিত্যক্ত ব্যাটারি সরবরাহ করে সিসা ও জিঙ্ক কারখানায়। এইসব কারখানা পরিবেশ সম্মত নয়। এটা পরিবেশে এবং মানব স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্নক ক্ষতি বলেও শিকার করেন শ্রমিকরা।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, মাস্ক ও গ্লোভস ছাড়া সিসার কাজ করলে চর্মরোগ, কিডনি, লিভারসহ নানা জাটিল রোগের সম্ভাবনা থাকে। এসব কারখানাগুলো স্থাপনে পরিবেশ অধিদফতরের কোন অনুমতি নেয়া হয় না। এটা পরিবেশের জন্য মারাত্ন ঝুঁকির।
খোলা আকাশের নিচে ব্যাটারি গলিয়ে সিসা তৈরির বিষয়ে জানতে চাইলে কারখানাটির মনির হোসেন বলেন, দিনের বেলায় ব্যাটারি পুঁড়ার কাজ হচ্ছেনা। আমরা গভীর রাতে চুল্লিতে দিয়ে ব্যাটারির সিসা (লেড) ও জিঙ্ক (দস্তা) সংগ্রহ করি। পরিবেশ দূষণ কিংবা মানুষের ক্ষতি হচ্ছে কিনা সেটা আমাকে কেউ জানায়নি। প্রশাসনের কোন অনুমতি আছে কিনা জানতে চাইলে এর কোন সদ্বোত্তর দিতে পারেনি তিনি।
টঙ্গীবাড়ী উপজেলা রুমানা তানজিন অন্তরা বলেন, ব্যাটারি গলিয়ে সিসা তৈরির বিষয়টি সম্পর্কে খোঁক খবর নেয়া হচ্ছে। যারা ওখানে খোলা আকাশের নিচে ব্যাটারি পোঁড়ানোর কারখানা স্থাপনা করেছেন বিধি মোতাবেক তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
স/এষ্

