জমি নিয়ে জটিলতা, সমাধান নেই কোথাও!

Exif_JPEG_420

জমি নিয়ে জটিলতা, সমাধান নেই কোথাও!

গৌরীপুর (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি-
জমির সমস্যা নিয়ে ভূমি অফিস ও থানায় হয়রানি নতুন নয়। এই অনিয়মটাই এখন নিয়মে পরিনত হয়েছে দেশে! ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন জমির সমস্যা নিয়ে ভূমি অফিসে গেলে কতো বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। মানুষের শেষ ভরসা আদালত, সেই আদালত থেকে নির্দেশ পেয়েও মিলছে না সমাধান। ভূমি অফিসের বারান্দা আর থানায় ঘুরতে ঘুরতেই কেটে যায় জীবনের অর্ধেক।
উপজেলার ডৌহাখলা ইউনিয়নের গয়েশখিলা গ্রামে একটি জমি সংক্রান্ত বিরোধের মামলায় আদালত কর্তৃক ১৪৪ ধারা জারির পর পুলিশের উপস্থিতিতে সেই জমিতে সাইনবোর্ড টানানো ও সীমানা প্রাচীর নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে।
জানা যায়, গয়েশখিলা মৌজায় এসএ ১৭, বিআরএস ৩৬, সাবেক দাগ নং ৭১, হালদাগ ১২৮ এ ২৫ শতক ভূমি রয়েছে। বিআরএসমূলে উক্ত ভূমির মালিকানা হিস্যা নবী হোসেনের ছেলে মেহের আলী মন্ডল ০.১৩০ ও দেওয়ান আলী ০.১৩০, আবুল হোসেনের ছেলে আব্দুল কাদের ০৬৩০ এবং  আবুল হোসেনের স্ত্রী  কমর বানু বেওয়া ০.১১০। অর্থাৎ আব্দুল কাদের ও তার মা কমর বানু বেওয়ার উক্ত জমিতে প্রাপ্য অংশ সাড়ে ১৮ শতক।  উক্ত জমি থেকে আব্দুল কাদের ও কমর বানু বেওয়া ০৮/১০/১৯৮৫ ইং তারিখে অপর দুই অংশীদার মেহের আলী মন্ডল ও দেওয়া আলীর কাছে সাফকাওলা মূলে ১০ শতক জমি বিক্রি করেন। পরবর্তীতে একই দাগ থেকে ১৭/০৯/১৯১৩ ইং তারিখে কমর বানু বেওয়ার মেয়ে, আব্দুল কাদেরের বোন মোছাঃ রেজিয়া খাতুনকে চার শতক জমি লিখে দেন তারা।
২০১৪ সালের ২০ জানুয়ারি মেহের আলীর ছেলে মোঃ আমিনুল ইসলামের কাছে আব্দুল কাদের ও কমর বানু বেওয়া আরও দুই শতাংশ জমি বিক্রি করেন। তাদের আর অবশিষ্ট থাকে ২.৫ শতাংশ জমি। কিন্তু ২০১৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি আব্দুল কাদের ১২৮ দাগ থেকে ময়মনসিংহ সদর উপজেলার উত্তর দাপুনিয়া মহল্লার মোঃ আমিনুল ইসলামের ছেলে মোঃ আরিফুল ইসলামের কাছে আরও ৯ শতাংশ জমি বিক্রি করেন। এক্ষেত্রে তিনি প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে পূর্বে জমি বিক্রির বিষয়টি গোপন করে গৌরীপুর ভূমি অফিস থেকে বিআরএসমূলে একটি নামজারি নেন। তিন লাখ ৮০ হাজার টাকায় নয় শতাংশ জমি বিক্রি করেন আব্দুল কাদের।
বিষয়টি জানতে পেরে মেহের আলীর ছেলে আমিনুল ইসলাম ২৬/০৮/২০১৪ ইং তারিখে গৌরীপুর সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর উক্ত জমিতে আব্দুল কাদেরের নাম জারির অতিরিক্ত অংশ বাতিলের আবেদন করেন। তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) কাউসার আজিজ চারটি শুনানির পর বদলি হয়ে যান। পরবর্তীতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার দূর-রে-শাহওয়াজ সহকারী কমিশনারের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনকালে দুইটি শুনানি শেষে ২১/০৯/২০১৫ইং তারিখে আমিনুল ইসলামের পক্ষে রায় দেন এবং ডৌহাখলা ইউনিয়নের ভূমি সহকারী কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।
দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও বাস্তবায়ন হয়নি সেই নির্দেশ। আমিনুল ইসলাম আজও কাগজপত্র নিয়ে ভূমি অফিস ও আদালতের দরজায় ঘুরছেন।
পরর্বতীতে ২০২০ সালের ২৩ নভেম্বর ময়মনসিংহ বিজ্ঞ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করেন তিনি। যার দরখাস্ত নং গৌরীপুর ১০০৬/২০২০। বিজ্ঞ আদালত শুনানি শেষে ওই দিনই উক্ত ভূমিতে ১৪৪ ধারা জারি করেন ও গৌরীপুর সহকারী কমিশনার ভূমিকে ১৮/০২/২০২১ইং তারিখে তদন্তপূর্বক কোর্টে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। এবং নালিশ ভূমি বর্তমান দখলদারের দখল অক্ষুণ্ণ রেখে যাতে কোন রকম শান্তি ভঙ্গ না ঘটে সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন গৌরীপুর থানার অফিসার ইনচার্জকে।
অপরদিকে আদালতের রায়ের পর তা বাস্তবায়ন না করে গৌরীপুর থানার পুলিশ এস আই জামালের নেতৃত্বে বিবাদী আরিফুল ইসলামের পক্ষ নিয়ে গত ০৭/১২/২০২০ ইং তারিখে উক্ত জায়গায় বিবাদীর নামসহ সাইনবোর্ড ঝুলানো হয় এবং সীমানা প্রাচীর নির্মাণের চেষ্টা করা হয়। এসময় নিরুপায় হয়ে বাদী আমিনুল ইসলাম জাতীয় জরুরী সেবা ৯৯৯ এ কল দিয়ে সহযোগিতা চান, যার নং CFS24127916.
আমিনুল ইসলাম অভিযোগ করেন- ৯৯৯ এর কল পেয়ে পুলিশের অন্য একটি টিম ঘটনাস্থলে গেলেও পূর্ব থেকে উপস্থিত এসআই জামাল বাদীর সাথে তাদের কথা বলতে দেননি। এমনকি বাড়াবাড়ি করলে গ্রেফতারের হুমকি দেন। বিষয়টি তিনি গৌরীপুর সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ আবিদুর রহমানকে জানালে তিনি এসআই জামালকে মোবাইলে কল দেন এবং কাজ বন্ধ করার নির্দেশ দেন।
আমিনুল ইসলাম আরও জানান- দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও আজও গৌরীপুর সহকারী কমিশনার (ভূমি) আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী কোর্টে প্রতিবেদন দাখিল করেননি।
এ ব্যাপারে আব্দুল কাদেরের মোবাইলে কল করলে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরবর্তীতে আবারও কল করলে তাঁর মেয়ে রিসিভ করে বলেন, বাবা ফোন রেখে বাইরে চলে গেছেন।
জমির ক্রেতা আরিফুল ইসলামের শাশুড়ী আসমা বেগম জানান- আরিফ দেশের বাইরে থাকেন। জমিটি অভিযোগকারী আমিনুলের মাধ্যমেই তার চাচার কাছ থেকে ক্রয় করা হয়েছে। এখন আমিনুল নিজেই ঝামেলা করছে। কাগজপত্র ঠিক বেঠিকের বিষয়ে আমরা কিছু জানি না।
গৌরীপুর থানার এসআই জামাল বলেন- কারো জমিতে সাইনবোর্ড দেয়া ও সীমানা প্রাচীর নির্মাণ পুলিশের কাজ নয়। ঘটনারদিন উক্ত জমি নিয়ে উভয় পক্ষের মাঝে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়। ফৌজদারি অপরাধ ঘটতে পারে, এমন অভিযোগ পেয়ে আমি ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থলে যাই এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনি। এর বাইরে আর কিছু জানি না।
গৌরীপুর সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ আবিদুর রহমান বলেন- জমিটি নিয়ে দীর্ঘদিন যাবত সমস্যা চলছে বিষয়টি আমি অবগত। সাইনবোর্ড ঝুলানো ও সীমানা প্রাচীর নির্মাণের অভিযোগ পেয়ে এসআই জামালকে কল দিয়ে কাজটি বন্ধ করেছিলাম। করোনায় দীর্ঘদিন লকডাউনে আদালতে বন্ধ থাকায় প্রতিবেদনটি দেয়া হয়নি।
তিনি আরও জানান- ভূমি অধিগ্রহণ আইনে পারিবারিক সম্পত্তি বন্টননামা দলিল ছাড়া ক্রয়-বিক্রয় সম্পূর্ণ নিষেধ, অথচ সাবরেজিস্টার অফিসে এসব আইন না মেনেই জমির দলিল করছে। যেকারণে এসব জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
স/বি
Facebook Comments Box

Print Friendly, PDF & Email
Spread the love