রাজশাহী মহানগরীর ফুটপাত দখলকারীদের দাপটে কোনঠাসা পথচারি!
মঈন উদ্দীন: রাজশাহী মহানগরীতে ফুটপাত দখল করে ব্যবসায়ীদের দাপটে কোনঠাসা হয়ে পড়েছেন পথচারিরা। তাদের কারণে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে নারী, পুরুষ ও স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের। ফলে অনেকে বাধ্য হয়ে ফুটপাতের চেয়ে সড়কের পাশ দিয়ে চলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করলেও পড়তে হচ্ছে ছোট-বড় দুর্ঘটনায়।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ২৮১ মোট সড়কের মধ্যে পথচারীদের নিরাপদ চলাচলের জন্য ৩৫ কিলোমিটার সড়কে ফুটপাত রয়েছে। কিন্তু এখন তার মধ্যে সিংহভাগ দখল করে রেখেছেন হকারসহ বিভিন্ন ধরণের ব্যবসায়ীরা। এর জন্য রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষের উদাসহীনতাকে দুষছেন পথচারীরা। গত ফেব্রুয়ারী মাসে রাজশাহীতে বাংলাদেশ-ভারত ৫ম সাংস্কৃতিক মিলনমেলাকে কেন্দ্র করে নগরীর সমস্ত ফুটপাত পরিস্কার করা হয়েছিল। এর কয়েকদিন পর আবারও শুরু হয় ফুটপাত দখলের প্রতিযোগিতা।
চলতি বছরের গত ১৫ মার্চ রাজশাহীতে জাতীয় ভোক্তা অধিকার দিবসের আলোচনা সভায় বিভাগীয় কমিশনারসহ ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সামনে এক নাগরীক প্রশ্ন করেছিলেন, আমার টাকায় ফুটপাত বানানো হয়। কিন্তু আমি ফুটপাত দিয়ে হাঁটার সুযোগ পাই না। শুধু ব্যবসায়ীরাই ফুটপাত দখল করে থাকে। এতে কি আমার অধিকার ক্ষুন্ন হয় না?’ প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেননি উপস্থিত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
রাজশাহী মহানগরীর সবখানেই এখন টাইলস বসানো দৃষ্টিনন্দন ফুটপাত করা। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর সেই ফুটপাত আর মানুষের হাঁটাচলার জন্য উন্মুক্ত থাকছে না। হকার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নিজেদের প্রয়োজনে ফুটপাত দখল করে নিচ্ছেন। নগরী ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে।
এর মধ্যে সাহেব বাজার ও লক্ষ্মিপুর এলাকার আশে-পাশের এলাকার চিত্র ভয়ঙ্কর কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে ফুটপাতের ওপরে এক ধরনের টাইলস বসানো হলেও এ ফুটপাতগুলো ব্যবহারের অনুমতি নেই যেন পথচারীদের। সাহেব বাজারসহ আশে-পাশের সব এলাকার ফুটপাত ব্যবসায়ীদের দখলে। ফুটপাতগুলো কেউ ফলের দোকান সাজিয়ে, কেউ কাপড়ের দোকান সাজিয়ে, কেউ স্যান্ডেলের দোকান কেউ বা চায়ের দোকান তুলে বসেছেন।
দোকানপাটের ভিড়ে যেন ধাপ ফেলানোরও জায়গা পাওয়া যায় না। দোকানপাটের কারণে বাধ্য হয়ে মানুষ ফুটপাত ছেড়ে রাস্তা দিয়ে চলাচল করেন। লক্ষ্মীপুর এলাকায় সবচেয়ে বিপদে পড়তে হয় রোগীও তাদের স্বজনদের।
এছাড়াও সোনাদিঘীর মোড়, আলুপট্টি, লক্ষীপুর, উপশহর নিউমার্কেটসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সবগুলো ফুটপাত দখল করে আছেন ছোট-বড় ব্যবসায়ীরা। ফুটপাতে পা ফেলানোর কোনো জায়গা নাই। ফুটপাত ছেড়ে অটোরিকশার ভিড় ঠেলে পায়ে হেঁটে রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় কথা হয় রেবেকা সুলতানা নামের এক তরূণীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমরা নারী। আমাদের এমনিতেই পথ চলতে নানা বাধা।
এর মধ্যে গাড়ির ভিড় ঠেলে চলাচল করতে হচ্ছে। কারণ ফুটপাত ধরে হাঁটার কোনো উপায় নাই। দেখেন না, সবগুলো ফুটপাতে দোকানপাট। হেঁটে যাবেন কি করে। দোকান পাটের ফাঁক দিয়ে ভিড় ঠেলে কিভাবে হেঁটে যাবেন-পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন রেবেকা। জয়নাল আবেদিন নামের এক ষাটার্দ্ধ ব্যক্তিও ছোট ছোট পায়ে একটি ব্যগ হাতে নিয়ে হাঁটছিলেন সাহেব বাজার আডিএ মার্কেটের সামনে দিয়ে।
জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই দেখো বাবা ফুটপাত দিয়ে কিভাবে যাবো? একটু জায়গায় ফাঁকা আছে, নাই। এগুলো দোকানদাররা কিভাবে দখল করে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর দখল করে ব্যবসা করছে। কিন্তু কেউ কিছু বলার নাই। তাহলে পথচারীরা হাঁটবে কোন দিক দিয়ে। ফলে আমাদের মতো বৃদ্ধরাও জীবনের ঝূঁকি নিয়ে রাস্তা দিয়েই হেঁটে চলছি। এভাবে হাঁটতে গিয়ে মাঝে-মধ্যেই অটোরিকশার ধাক্কাও খেতে হয়।
রাজশাহী শিরোইল বাস টার্মিনাল ও রেল স্টেশন এলাকায় প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ দুর-দুরান্ত থেকে আসেন আর এরই দুইপাশে গড়ে উঠেছে ভ্রাম্যমাণসহ স্থায়ী দোকান। কিছু কিছু দোকান এমনও আছে যেখানে স্থায়ীভাবে লোহার দরজাও এমনভাবে লাগানো হয়েছে যেন তারা সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন।
এর বাইরে রাজশাহী নগরীর শিরোইল বাসস্ট্যান্ড, শিরোই বটতলা কাঁচা বাজার এলাকা, তেরোখাদিয়া বাজার এমনকি বিসিকি শিল্প নগরীর ফাঁকা জায়গা দখল করেও গড়ে উঠেছে ফলের দোকান, কাপড়ের দোকান, স্যান্ডেলের দোকান, হোটেল এবং চায়ের দোকান। এসব দোকান থেকে সমানে চাঁদা তুলছে স্থানীয় মাস্তান বাহিনী। আর জনগণের পথ চলাচলে ব্যাপক ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে।
ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ ইমরানুল হক সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা মাঝে মাঝেই ফুটপাত দখলমুক্ত করতে যায়। তখন লোকজন বলে, আমরা নাকি গরীবের পেটে লাথি মারছি। আমরা গেলে তারা সরে যায়, চলে এলে আবার বসে যায়। একরকম চোর পুলিশ খেলা চলে। শহরটা তো আমাদের সবার। একে সুন্দর রাখা আমাদের সবারই দায়িত্ব।
স/এষ্

