মুন্সীগঞ্জে দাম বৃদ্ধির সুযোগে ভেজাল সরিষার তেলে বাজার সয়লাব
মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি : বাজারে ভোজ্য তেলের দাম বৃদ্ধির সুযোগটি কাজে লাগিয়ে অসাধু ব্যবসায়ী সরিষার তেলে ভেজাল মিশিয়ে বিভিন্ন হাট বাজারের মুদি দোকানগুলোতে সর্বরাহ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জেলা সদরের বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা মোটর চালিত ঘানি মেইলগুলোতে ভাঙ্গানো হচ্ছে সরিষা।
সেখান থেকে ব্যবসায়ীরা সরিষা কিনে নিয়ে ভেজাল মিশিয়ে বাজারজাত করছেন। নানা বিষাক্ত কেমিক্যাল মিশ্রিত ভেজাল তেলকে আসল সরিষার তেল ভেবে রান্নায় ব্যবহার করে অগণিত মানুষ প্রতিনিয়িত গ্যাস্ট্রিকসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেজাল তেল জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। বিশেষ করে শিশুস্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর।
জানাগেছে, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় এবছর সরিষার ফলন ভালো হয়েছে। কৃষকদের কাছ থেকে অসাধু অসাধু ব্যবসায়ীরা কিনছেন সরিষা। তার পর মেশিন বসিয়ে সরিষা ভাঙ্গার পর কেমিক্যাল মিশিয়ে ভেজাল করছেন। তাদের উৎপাদিত ভেজাল সরিষার তেল সরবরাহ করা হচ্ছে বিভিন্ন হাট-বাজারে ।
এসব তেলর মিলে সস্তা দামের স্পেন্ডেল ওয়েল, মরিচের গুঁড়া ও কেমিক্যাল মিশানো হচ্ছে দেদারছে। মোটর চালিত ঘানিতে নামমাত্র সরিষার সাথে ওই সব মিশানো হচ্ছে। এসব ভেজাল তেল হাট-বাজারে ও মুদি দোকানে খোলা তেল হিসেবে বিক্রি করা হয়। দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত মানুষেরা এসব ভেজাল তেল কিনে প্রতারিত হচ্ছে।
মনের অজান্তে শরীরে নানা রকম রোগের জন্ম দিচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে ভেজাল তেল পরিক্ষার – নিরিক্ষা করার কোন ব্যবস্থা না থাকায় অসাধু ব্যবসায়ীরা ভেজাল তেল উৎপাদন ও বিক্রি করে পার পেয়ে যাচ্ছে।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, মিরকদিম বন্দর, পঞ্চসার, বিনোদপুর এবং সদর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা ছোট ছোট মেইলগুলোতে ভালো সরিষার পাশাপাশি নিম্ন মানের সরিষা ভাঙানো হচ্ছে এসব মিলে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষও এসব মিল থেকে সরিষা কিনে নিয়ে ভাঙিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
রাতের আঁধারে ভাঙানো সরিষার তেল জমা করে রাখা হয় বড় বড় ড্রামে। সেখান থেকে বোতলে ভরে কোন ধরনের রিফাইনিং না করেই হাটবাজারে থাকা দোকানগুলোতে সর্বরাহ করা হচ্ছে। স্থানীয় লোকজন এসব মিলে গিয়ে কিনছেন এসব নিম্ন মানের তেল। মিলগুলোতে প্রতি কেজি সরিষার তেল বিক্রি হচ্ছে ২শ টাকা কেজিতে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক তেলের মিলের শ্রমিক জানান, ১৪ মন সরিষায় সর্বোচ্চ ১৪ কেজি তেল হয়। যদি সরিষার দানা রিষ্ট পুষ্ট হয়ে থাকে। তবে নরমালি ১ মন সরিষা থেকে গড়ে সাড়ে তের কেজির তেল কখনও বের হচ্ছেনা। সরিষা ভাঙানোর পর খইলগুলো ৩০ টাকা কেজিতে মিল মালিকদের নিকট বিক্রি করে দেন ব্যবসায়ীরা।
বর্তমানে পাইকারি ব্যবসায়ীদের সব খরচ বাদ দিয়ে ১ কেজি খাঁটি সরিষার তেল উৎপাদনে খরচ হচ্ছে ২৫৫ থেকে ২৬০ টাকা। পাইকাররা হাটবাজারে থাকা খুচরা ব্যবসায়ীদের নিকট প্রতি কেজি সরিষার তেল বিক্রি করেন ২৭০ থেকে ২৮০ টাকায়।
খুচরা ব্যবসায়ীরা কিছুটা লাভ করে ২৯০ থেকে ৩০০ টাকায় । বর্তমানে বাজারে ভোজ্য তেলের দাম অনেক বেশি। খোলা সয়াবিনের নামে নিম্ন মানের পাম ওয়েল মানুষ ১৮৫ টাকায় কিনে খাচ্ছেন। খাঁটি মানের তেল আর স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা চিন্তা করে এখন মানুষ সরিষার তেলের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। ভোক্তাদের অতিরিক্ত চাহিদার সুযোগটি কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীরা সরিষার তেলে ভেজাল করে বাজারজাত করছেন। এতে তারা আর্থিকভাবে লাভবান হলেও ক্রেতারা হচ্ছেন প্রতারিত।
মিল মালিকরা বলছেন, অসাধু ব্যবসায়ীরা অধিক পরিমান সরিষা কিনে নিজেরা কিংবা ছোট ছোট মেইলগুলোতে নিয়ে সরিষা ভেংগে তেল বের করছেন। সেখান থেকে নেয়ার পর তারা সরিষার তেলে ভেজাল মিশিয়ে বিক্রি করেন। মানুষ যারা সচেতন তারা সরিষা কিনে আনার পর মেইলে বসে থেকে ভাঙ্গিয়ে নিয়ে যায়। তারা শুধু একমাত্র খাঁটি সরিষার তেল পাচ্ছে। কিন্তু যারা শত শত মন সরিষা কিনে আমাদের থেকে ভাঙ্গিয়ে নিয়ে যান তারা বেশী লাভের আশায় সরিষায় ভেজাল মিশায়।
ক্রেতারা অভিযোগ, মুদি দোকানে থাকা অধিকাংশ খোলা সরিষার তেল ভেজাল।
দোকানগুলোতে থাকা তেলগুলো ভেজাল কিনা সেটা জানার কোন উপায় নেই। দোকানদারদের কথায় বিশ্বাস করেই এসব তেল কিনে নিচ্ছে মানুষ। ছোট ছোট মেইলগুলোতে নোংরা পরিবেশে তেল উৎপাদন করা হচ্ছে। ভেজাল বিরোধী অভিযান জোরদার করা হচ্ছেনা বলেও অভিযোগ করেছেন সাধারণ ক্রেতারা।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, জেলা পর্যায়ে ভেজাল ভোজ্য তেল পরিক্ষা- নিরিক্ষা করার কোন ব্যবস্থা নেই। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা সরিষার তেলে ভেজাল মিশাচ্ছেন। ভেজাল প্রতিরোধে নিয়মিত বাজার মনিটরিং জোরদার খুবই জরুরি। ভোজ্য তেলে ভেজাল রোধে প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন । এমনটাই প্রত্যাশা করেছেন স্থানীয় সচেতন ভোক্তা সাধারণ ।
স/এষ্

