মুন্সীগঞ্জে জেলা জুড়ে বাড়ছে ভিক্ষাবৃত্তি, অস্বস্তিতে সাধারণ মানুষ
মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি ।। মুন্সীগঞ্জ জেলায় দিন দিন বাড়ছে ভিক্ষুকের সংখ্যা। প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ ভিক্ষা করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। স্থানীয়রা নয়, বিভিন্ন জেলা থেকে আসছেন ভিক্ষুকরা। তাদের উৎপাতে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ।
ভিক্ষুক বেড়ে যাওয়া বিরক্ত মানুষ। জেলার সব উপজেলা শহরে বাড়ছে ভিক্ষুকের সংখ্যা। গ্রামে তাদের তেমন দেখা না মিললেও শহরে তাদের সংখ্যা বাড়ছে । এদের অনেকেই বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী । অর্থনৈতিক দূরবস্থা ও কাজের অভাবে ভিক্ষাবৃত্তিকে জীবিকা হিসেবে বেছে নেয়ার দাবি করলেও অনেকেরই এটা এখন পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, প্রতিদিন শত শত ভিক্ষুকের সম্মুখিন হতে হয় মানুষজনদেরকে। অস্বস্থিতে পড়ে মানুষ তাদেরকে সাহ্যয্য করতে বাধ্য হচ্ছে। তবে দোকান মালিক ও ক্ষুদে ব্যবসায়ীরা বলছেন, দিনে ২শ থেকে ৩শ টাকা ভিক্ষুকদের দিতে হচ্ছে।
রাস্তাঘাটে চলাচল কিংবা চায়ের দোকান, মার্কেট, বিপণী বিতান থেকে শুরু করে সর্বখানেই দেখা মিলে ভিক্ষুকদের। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ভাসমান মানুষগুলো ভিক্ষাবৃত্তিতে ব্যবসায় পরিনত করেছে। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে ঘৃণিত একটি পেশা মানুষ গ্রহণ করুক এটা কাম্য নয়।এটি ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও দেশের সম্মান নষ্ট করে।
দারিদ্র্যের কষাঘাতে পিষ্ট হয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে অথবা শারীরিক অক্ষমতায় অনেকে ভিক্ষা করতে বাধ্য হয় । অর্থ-উপার্জনের সহজ পথ হিসেবে ভিক্ষাবৃত্তিকে অনেকে পেশা ও ব্যবসা হিসেবে বেছে নিয়েছে।
অসহায় মানুষ যেমন পেটের দায়ে ভিক্ষা করে, তেমনি একটি স্বার্থান্বেষী মহল বিভিন্ন কায়দা-কানুন করে ভিক্ষাবৃত্তিকে নিজেদের জন্য লাভজনক বৃত্তিতে পরিণত করেছে। ভিক্ষুকেরা মারাত্মকভাবে অপব্যবহৃত হচ্ছে। জেলু জুড়ে পরিচালিত হচ্ছে লাখ লাখ টাকার ভিক্ষা-বাণিজ্য।
সব ধরনের শারীরিক সুস্থতা থাকা সত্ত্বেও শুধু পরিশ্রম করার মানসিকতার অভাবে ভিক্ষাবৃত্তির আশ্রয় নেয় এমন ভিক্ষুকের সংখ্যাও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
অনুসন্ধানে জানাগেছে, জেলা শহর থেকে শুরু করে প্রতিটা উপজেলায় শত শত ভিক্ষুকের সমারোহ। এদের মধ্যে শতকরা ৭০ শতাংশ বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ভাসমান ভিক্ষুক। ২০ শতাংশ ভিক্ষুক জেলার বিভিন্ন স্থানে অস্বায়ী বাসিন্দা হয়ে বসবাস করেন।
আর ১০ শতাংশ ভিক্ষুক জেলার স্থানীয় নাগরিক। তাদের মধ্যে অনেকেই অন্ধ, প্রতিবন্ধী বা শাররিকভাবে অক্ষম। জেলা শহরের গুরুত্বপূর্ন সড়ক, অফিসপাড়া, বাসাবাড়ী, হাট বাজার সর্বত্র চষে বেড়াচ্ছেন ভিক্ষুকরা। তারা দুই জন , চার জন এবং ৫ জনের গ্রুপ করে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
সারাদিন ভিক্ষাবৃত্তি করে সন্ধ্যা শেষে টাকা ভাগাভাগি চলে তাদের মধ্যে। দল নেতার নির্দেশে তারা পুরো জেলা চষে বেড়ান। লঞ্চঘাট থেকে শুরু করে জেলার লোকসমাগম এলাকাগুলোকে টার্গেট করে।
এদের মধ্যে শিশু ভিক্ষুক আছে তারা পথযাত্রীদের পথ গতিরোধ করে পায়ে ধরে বসে থাকে। টাকা আদায় ছাড়া কাউকে ছাড়তে চায় না। পাশাপাশি বেঁধে সম্প্রদায়ের যুবতী নারীরাও একটা সাপের বাস্ক নিয়ে দু”টি বিষয়কে প্রধান্য দিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করছে।
সাপকে দুধ খাওয়াবো টাকা দেন। বোন বিয়ে দিবে, কেউ মেয়ে বিয়ে দিবে এমন নানান অযুহাতে তারা ভিক্ষাবৃত্তি করছেন। দল বেঁধে ভিক্ষা করা নারী – পুরুষরাই অধিকাংশই নেত্রকোনা, গাইবান্দা, রংপুর, বরিশালসহ অন্যান্য জেলার।
এরা শহরের বিভিন্ন স্থানে বাসা ভাড়া নিয়ে ভিক্ষা বৃত্তি পেশা চালিয়ে যাচ্ছেন। ভিক্ষুক রাহেলা বিবি, ছমিরন এবং আসাদুল্লাহসহ বেশ কয়েকজন ভিক্ষুকের সাথে কথা হলে তারা জানান, মোট ৭ টি জেলা থেকে শত শত নারী পুরুষ ভিক্ষুকরা রয়েছে তাদের গ্রুপে।
এরা সকাল হলে দল নেতার সিডিউল অনুযায়ী ভিক্ষা করতে বেরিয়ে পড়েন। দিন শেষে চলে তাতের ভাগ ভাটোয়ারা। শুধু তাই নয়, দল নেতার আদেশে ক্রমে তারা একেক দিন একেক এলাকায় গ্রুপ বেঁধে অবস্থান করে চালায় তাদের ভিক্ষা বৃত্তি পেশা ।
ভিক্ষুক শফি মন্ডল জানান, তারা এক মাস নারায়নগঞ্জ অন্য মাস মুন্সীগঞ্জে। এভাবেই তারা দুটি জেলায় ভিক্ষা করেন। একেক উপজেলায় তাদের সহকর্মী ভিক্ষুকের সংখ্যা প্রায় দেড় সহস্রাধিক। এদের মধ্যে নারী ভিক্ষুকের সংখ্যাই বেশি। অনেকে আছে মধ্য বয়সী, তাদের কাজ করার শক্তি আর সামর্থ দুটোই আছে।
স্থানীয় ভিক্ষুক বৃদ্ধ আছিয়া বেগম বেগম বলেন, আমাদের মতো অনেক নারী এবং পুরুষ আছে যারা বয়সের ভাড়ে কোন কাজ করতে পারিনা। পেটের দায়ে মানুষের কাছে হাত পাতি। কিন্তু বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ভিক্ষুকদের কারণে তারা তেমন ভিক্ষা পাচ্ছেনা।
মানুষের বাসাবাড়ীতে গেলে মানুষ দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়। অনেক বাসার গেট থাকে তালাবদ্ধ। কাজ করার কোন সামর্থ নেই । জেলাজুড়ে থাকা ব্যবসায়ী ভিক্ষুকদের সংখ্যা কমানো গেলে তারা আগের মতো ভিক্ষা পাবে এবং জেলায় ভিক্ষুকদের সংখ্যা কমে যাবে বলেও জানান এই বৃদ্ধা।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, অনেক ভিক্ষুক আছেন যারা শুধুমাত্র ভিক্ষাবৃত্তি করে লাখপতি হয়েছেন। জেলার বাইরে থেকে আসা ভিক্ষুকরা জেলার বিভিন্ন স্থানে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন।
বাসায় তাদের ঘরে টিভি, ফ্রিজসহ মধ্যবিত্তদের মতো জীবন যাপন। কিন্তু যারা প্রকৃত ভিক্ষুক তারা তিনবেলা খাবারের টাকা জোগার করতেও হিমশিম খাচ্ছে। পাশাপাশি জেলাজুড়ে ভিক্ষুকদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণে জেলার সুনাম অক্ষুন্ন হচ্ছে।
অধিকাংশ মানুষ যাদের কাজ করার শক্তি আর সামর্থ আছে তারাও ভিক্ষা করছেন শুধুমাত্র পরিশ্রম করার মানসিকতার অভাবে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা,অন্ধও কানা, বোবা, হাত-পা নেই, মানসিক প্রতিবন্ধকতা এদেরকে পুনর্বাসন ও দক্ষতা বৃদ্ধি করে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
ভিক্ষা দেয়ার হাত বন্ধ না করা গেলে নেয়ার হাত কখনও বন্ধ করা যাবে না। জেলাজুড়ে ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধে প্রশাসন কার্যকরি ব্যবস্থা নিবেন। এমনটাই প্রত্যাশা করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
স/এষ্

