ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়লেও বিনিয়োগ কম
বিদেশি বিনিয়োগের ৩.৩ শতাংশ ভারতের
‘পরিবেশ ভালো হলে ৫ শতাংশে উন্নীত হবে’
শুল্ক-অশুল্ক বাধা কাটলে রপ্তানি বাড়ার আশা
স্থলবন্দরগুলোর মান উন্নয়নের তাগিদ
গত এক দশকে বাংলাদেশ-ভারতের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বেড়েছে তিনগুণ, পৌঁছেছে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের। আমদানি ও রপ্তানি দুটোই উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও বাংলাদেশে ভারতের বিনিয়োগ অনেক কম। বাংলাদেশে মোট বৈদেশিক বিনিয়োগের মধ্যে ভারতের বিনিয়োগের হার মাত্র ৩ দশমিক ৩ শতাংশ এবং উৎপাদনমুখী খাতের চেয়ে বাণিজ্য খাতেই বেশি। গত ২০২১-২০২২ অর্থবছরে নতুন বিনিয়োগ এসেছে মাত্র দেড় কোটি ডলার। আর বাংলাদেশে মোট বিনিয়োগ হয়েছে ৬৫২.৩৮ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় সাড়ে ৬৫ কোটি ডলার।
ফলে রপ্তানির তুলনায় আমদানি বেশি হওয়ায় বাণিজ্য ঘাটতি পৌঁছেছে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারে। বাংলাদেশ সরকারের নানামুখী উদ্যোগেও কাঙ্খিত মাত্রায় কমছে না বাণিজ্য ঘাটতি। এমন অবস্থায়, সমন্বিত বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তির দিকে এগোচ্ছে দুই দেশ। যার নাম কমপ্রিহেনসিভ ইকনোমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট বা সেপা। স্থলবন্দরগুলোর প্রযুক্তি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন, ভারতের শুল্ক-অশুল্ক বাধা কেটে গেলে রপ্তানি কয়েক গুণ বাড়বে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে ঘাটতি কমাতে দেশের স্থলবন্দরগুলোর মান উন্নয়ন ও রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধির তাগিদ অর্থনীতিবিদদের।
বাংলাদেশ ব্যাংক এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১২-১৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ছিল ৫৩০ কোটি ডলার, সেখানে গত ২০২১-২২ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫৯৩ কোটি ডলারে। অর্থাৎ এক দশকে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বেড়েছে ২০০ শতাংশ। তবে বাংলাদেশে ভারত থেকে পণ্য আমদানির তুলনায় পণ্য রপ্তানির পরিমাণ অনেক কম, তাই গেলো এক দশকে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ১৮৬ শতাংশ।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক বিনিয়োগের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২১ সালের জুন মাস পর্যন্ত বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ভারতের ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করেছেন। এই খাতে ভারতের বিনিয়োগ হয়েছে ১৭৮ মিলিয়ন ডলারের। এরপরেই রয়েছে টেক্সটাইল খাত। সেখানে নানা ধরনের ভারতের ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করেছেন ১২০ মিলিয়ন ডলারের। বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ রয়েছে ৯৫ মিলিয়ন ডলারের।
খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে ১৮ মিলিয়ন ডলার, বাণিজ্যে ১৪ মিলিয়ন ডলার, রাসায়নিক ও ওষুধ শিল্পে ২৯ মিলিয়ন ডলার, চামড়া শিল্পে ৩০ লাখ ডলার, কৃষি ও মৎস্য খাতে ৮০ লাখ ডলার, নির্মাণ খাতে ৪০ লাখ, বীমা খাতে ৭০ লাখ ডলার। অন্যান্য খাতে ভারতের বিনিয়োগ রয়েছে ১৭২ মিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি, পণ্য পরিবহন, মোবাইল, ধাতব শিল্প, ভোজ্য তেল, সিমেন্ট, যন্ত্রপাতি, মোটরসাইকেল সংযোজন ইত্যাদি খাত রয়েছে।
এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতি কমাতে ভারতে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানি সহজীকরণ করতে হবে। বাণিজ্য ঘাটতি কমলে দু’দেশের জন্যই লাভজনক হবে। দু’দেশের সরকারকেই অশুল্ক বাধা দূর, বন্দরে পণ্য আমদানি-রপ্তানি সহজ করা, পাটপণ্যে এন্টিং ডাম্পিং শুল্ক প্রত্যাহার ও স্থলবন্দরের অবকাঠামো উন্নয়নে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, বাংলাদেশের উদীয়মান অভ্যন্তরীণ বাজার, আন্তর্জাতিক বাজারে সহজ প্রবেশাধিকার, বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ওয়ান স্টপ সার্ভিস ও উদার বিনিয়োগ নীতিমালার সুবিধা গ্রহণ করতে হবে। এর মাধ্যমে ভারতের উদ্যোক্তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করে লাভবান হতে পারেন।
বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, ব্যবসায়িক সম্পর্ক জোরদার হলে বাংলাদেশ-ভারত উভয় দেশই উপকৃত হবে। বাংলাদেশের পোশাকখাত বিশ্ব বাজারের প্রবণতা ও চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ, বিশেষ করে নন-কটন এবং উচ্চ মূল্য সংযোজিত পণ্যের উপর জোরালোভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে। অন্যদিকে, ভারতের একটি বৃহৎ টেক্সটাইল খাত রয়েছে এবং ম্যান-মেইড ফাইবার ও মিশ্রিত টেক্সটাইল পণ্য সরবরাহ করার যথেষ্ট সামর্থ্য এ খাতটির রয়েছে। আবার, দেশটি বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির জন্য একটি সম্ভানাময় বাজারও। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশের পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্প বিকাশের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানোমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলছেন, শুধু ভারত নয়, সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ কম। এমনকি যেসব দেশ-বিদেশি বিনিয়োগ করেছে, তারা সুনির্দিষ্ট কয়েকটি খাতে বিনিয়োগ করেছে। ভিয়েতনাম, কোরিয়ার মতো অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করি, বাংলাদেশ কিন্তু সেভাবে বিদেশি বিনিয়োগ কখনো আকৃষ্ট করতে পারেনি। বাংলাদেশ ছাড়াও প্রতিবেশী অন্যান্য দেশেও ভারতের বড় ধরনের বেশি বিনিয়োগ নেই। তারা বিনিয়োগ করেছে এই অঞ্চলের বাইরে। হয়তো রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ব্যবসার খরচ-ইত্যাদি বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে এক ধরনের দ্বিধা কাজ করে।
বাংলাদেশ-ভারত চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সহ-সভাপতি এবং ইনডোফিল বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিজ প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অভিষেক দাস বলেন, ভারত প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশে বিনিয়োগ আরও বেশি হওয়া উচিত এবং হবেও। এখন ৩ শতাংশ আছে সেটা হয়তো ৫ শতাংশে উঠবে। এখানে ১৫ বছর আগেও বিনিয়োগের পরিমাণ অনেক কম ছিল। এখন বাড়তে শুরু করেছে। সম্প্রতি বিডার কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশে ৮ কোটি টাকার বিনিয়োগ এসেছে। বাংলাদেশের পরিবেশ আরও ব্যবসাবান্ধব হলে বিনিয়োগ ৫ শতাংশে চলে যাবে। বাণিজ্য ঘাটতি ধীরে ধীরে কমে আসছে আরও কমবে। ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ছে। ভারতীয় বিনিয়োগও আসছে, বর্তমান সরকারও খুব ইন্ডাস্ট্রি ফ্রেন্ডলি সরকার। ভিসার কিছুটা জটিলতা আছে, ঠিক হলে আরো বিনিয়োগ হবে।
অভিষেক দাস বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরকে ব্যবহার করা যায় কি না সেটা দেখতে হবে। চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য এলো আবার রিএক্সপোর্ট হয়ে বের হয়ে গেল, যেটা দুবাই করে। তাহলে একটা বিশাল সম্ভাবনা থাকবে। ভারতের সবচেয়ে কাছের পোর্ট চট্টগ্রাম বা মোংলাও করতে পারে। তাহলে ব্যবসা বাড়বে। ট্রেডিং হাব সিংগাপুর করেছে, দুবাই করেছে, বাংলাদেশেরও সম্ভাবনা আছে। ট্রেডিং হাব হলে ভারতই সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করবে আরও দেশতো আছেই। সেখানেও বাংলাদেশের ব্যবসা বা ভারতের বিনিয়োগ আরও বেড়ে যাবে। বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, যাতায়াত, রোড ট্রান্সপোর্ট এখন খুব সুন্দরভাবে আছে আরও উন্নতির যায়গা আছে সেগুলো আস্তে ধীরে হবে।
বাংলাদেশের রপ্তানি ভারতে এখন ২ বিলিয়ন ছাড়িয়েছে, যেটা এক বছর আগেও কম ছিল। এখন তো এগোচ্ছে। কারণ দুই দেশের আয়তন দুই রকম, চাহিদা আলাদা তাই ঘাটতি কিছুটা হবে। বিনিয়োগকারীরা বুঝেছে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যে দুরত্ব তা কোনো দিনই কমবে না বা বাড়বে না, এটা সবচেয়ে বড় সুবিধা। যারা বুঝেছে তারা এখানে বিনিয়োগ করেছে। আমি দুটো কোম্পানির হয়ে দুটো ফ্যাক্টরি স্থাপন করেছি। তাদের এটাই বুঝিয়েছিলাম। এখান থেকে কোলকাতা মাল পাঠাতে যতটা সুবিধা, যদি গুজরাটে ফ্যাক্টরি থাকে তবে সেখান থেকে কোলকাতা মাল পাঠাতে ততটাই অসুবিধা। তাই তাদের এখানে ফ্যাক্টরি স্থাপন করা উচিত।
স/এষ্

