বাংলাদেশের অবিশ্বাস্য জয়
রাহুল রাজ
মেহেদী মিরিজের ব্যাট থেকে জয়ের জন্য শেষ রান আসতেই বাংলার ক্রিকেট ভক্তদের বুকে আটকে থাকা নিশ্বাস জয়ের উল্লাসে বেরিয়ে আছে। প্রতি বলে বলে রং বদলানো ম্যাচের নায়ক বনে যান মেহেদী মিরাজ। ভারতের বোলারদের নাকানিচোবানি দিয়ে তাদের হাতের মুঠোয় থাকা ম্যাচ বের করে বিশ্বক্রিকেটকে অবাক করে দেন।
মোস্তাফিজুরকে নিয়ে গড়েন ৪১ বলে ৫৪ রানের জুটি। সাত বছর পরে বাংলাদেশে সিরিজ খেলতে এসে প্রথম ম্যাচ ১ উইকেটের নাটকীয় হারে রাতের ঘুম হারাম হয় ভারত সিবিরের। ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায় এই ম্যাচ স্থায়ী ভাবে জায়গা করে দেবে এমনটাই স্বাভাবিক।
আগামী প্রজন্ম এই ম্যাচের থেকে শিক্ষা নিতে পারবে, কি ভাবে জয়ের মানসিকতা থাকলে হার ম্যাচেও জয় পাওয়া যায়। ২৪ বল বাকি থাকতে টাইগারদের এমন জয়ে মিরাজের ৩৮ রানের অপরাজিত অবদান স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। সকালে টস জয়ের মধ্য দিয়ে দিন শুরু করে বাংলাদেশ। ভারতকে ব্যাটিংয়ে পাঠিয়ে স্বল্প রানে আটকে রাখে টাইগার বোলারেরা। সাকিব আল হাসান তুলে নেন ৫ উইকেট।
সেলুটবয় ইবাদত হোসেনের ঝুলিতে জমা পড়ে ৪ উইকেট। অন্যটি তুলে নেন মেহিদী মিরাজ। ৪১.২ বলে ১৮৬ রানে অল-আউট হয় ভারত। দলের পক্ষে লোকেশ রাহুল করেন সর্বোচ্চ ৭৩ রান। ভারত সিবিরের অন্যব্যাটসম্যানেরা সাজ ঘরে আসা যাওয়া মঝেই নিজেদর ব্যস্ত রাখেন। বাংলাদেশের পক্ষে দশম উইকেট জুটিতে এর আগে ৫৪ রানের করেন খালেদ মাসুদ পাইলট ও তাপস বৈশ্য। যদিও সেদিন হারারেতে জয় তুলতে পারেনি বাংলাদেশ। মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ১১তম ওভারে বোলিংয়ে এসেই রোহিত শর্মাকে বোল্ড করেন সাকিব আল হাসান ম্যাচর দৃশ্যপট শুরু মূলত সেখান থেকেই।
এক বল পরেই তার শিকার রান মেশিন বিরাট কোহলি। অবশ্য কোহলির আউটে এক্সট্রা কাভারে থাকা লিটনের অবদানও কম নয়। শূন্যে ঝাঁপিয়ে ডানহাতে তালুবন্দি করেন লিটন। হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় কোহলিকে। রোহিত-কোহলিকে দিয়ে শুরু, এরপর একে একে পাঁচ পাঁচটি উইকেট নেন এই বাঁহাতি অলরাউন্ডার। তিন বলে ২ উইকেট নিয়ে যে সাকিব শুরু করলেন থামলেন দীপক চাহারকে এলবিডব্লিউ করে।
মাঝে ফেরান শার্দুল ঠাকুর ও ওয়াশিংটন সুন্দরকে। ভারতের বিশ্বসেরা ব্যাটিং লাইনআপকে চূর্ণ করে পূর্ণ করেন ফাইফার। ওয়ানডে ক্যারিয়ারে চতুর্থবার এক ম্যাচে পাঁচ উইকেট নেওয়ার কীর্তি গড়লেন সাকিব। শুধু তাই নয়, ঘূর্ণি জাদু দেখিয়ে একমাত্র ক্রিকেটার হিসেবে নাম লেখালেন অনন্য এক ইতিহাসে। রোহিতদের বিপক্ষে ৩৬ রানে ৫ উইকেট নিয়ে ওয়ানডে ইতিহাসে ভারতের বিপক্ষে বিশ্বের যে কোনো বাঁহাতি স্পিনারের এটি ক্যারিয়ার সেরা বোলিং। এর আগে ইবাদত জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচে ২ উইকেটে ৩৮ রান দিয়েছিলেন।
একমাত্র ওয়ানডেতে এটিই এতদিন ছিল ইবাদতের ক্যারিয়ার সেরা বোলিং। ভারতের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডেতে সুযোগ পেয়েই ছাড়িয়ে গেলেন নিজেকে। শের-ই-বাংলায় শর্ট বলের ফাঁদে ফেলে ৮.২ ওভারে ৪৭ রান দিয়ে ৪ উইকেট নেন। ১৩৬ রানের মাথায় নবম উইকেট হারায় বাংলাদেশ। শেষ উইকেটে দলের হাল ধরেন অদম্য মেহেদী হাসান মিরাজ ও মোস্তাফিজুর রহমান। ভারতের ছুড়ে দেওয়া ১৮৬ রান বাংলাদেশ ৪৬ ওভারে ৯ উইকেট হারিয়ে জিতে যায়। মিরাজ ৩৯ বলে ৪ চার ও ২ ছক্কায় ৩৮ রানে অপরাজিত থাকেন। তার সঙ্গে মোস্তাফিজ ১১ বলে ২ চারে ১০ রানে অপরাজিত থাকেন। মিরপুরের শের-ই বাংলা স্টেডিয়ামে রোববার ভারতের হাতের মুঠোয় থাকা ম্যাচ ছিনিয়ে নিয়েছে বাংলাদেশ। রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে মিরাজের বীরত্বে এক উইকেটে জিতেছে লিটন দাসের দল।
অবিশ্বাস্য এই জয়ে ৩ ম্যাচের সিরিজে ১-০তে এগিয়ে গেল টাইগাররা। ৫০ ওভারে বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্যটা ছিল ১৮৭ রানের। ওয়ানডে ম্যাচের প্রেক্ষিতে এই রান তাড়াকে বেশ সহজই বলা চলে। কিন্তু সেই লক্ষ্যটাও পাহাড়সম মনে হল বাংলাদেশি মিডল অর্ডারের দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যাটিংয়ের কারণে। শুরুটা হয় নাজমুল হোসেন শান্তকে দিয়ে। ইনিংসের প্রথম বলেই রোহিত শর্মার হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন বাঁহাতি এ ওপেনার। ধীরগতির ইনিংস খেলতে থাকা এনামুল হক বিজয় নবম ওভারে একবার জীবন পান। তবে পরের ওভারে আউট হয়ে যান।
মোহাম্মদ সিরাজের বলে মিডউইকেটে ক্যাচ দিয়ে ১৪ রানে ফেরেন তিনি। তবে সাকিব আল হাসানকে নিয়ে চাপটা ভালোভাবেই সামলে যাচ্ছিলেন এই সিরিজে অধিনায়কত্ব পাওয়া লিটন দাস। রানের চাকাও চলছিল বেশ ভালোভাবেই। কিন্তু বাধ সাধেন ওয়াশিংটন সুন্দর। তারপরও লক্ষ্যটা নাগালে রেখেই এগিয়ে যাচ্ছিলেন অভিজ্ঞ দুই ব্যাটার মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহ। কিন্তু পরপর দুই বলেই সর্বনাশ। দ্রুত বিদায় নেন মাহমুদউল্লাহ ও মুশফিকের উইকেট।
মাহমুদউল্লাহ ১৪ ও মুশফিক ১৮ রানে ফেরেন। এরপর বিপদটা আরও বাড়ে কুলদীপ সেনের বলে আফিফের বিদায়ে। সেই ওভারেই আরও এক উইকেট নিয়ে বাংলাদেশকে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেন কুলদীপ। দিশেহারা টাইগাররা পরের ওভারে হারায় হাসান মাহমুদকে। সেখান থেকেই শুরু মিরাজের বীরত্ব।
৪১ তম ওভারে পরপর দুই বলে দুই ছক্কা মেরে মোমেন্টামটা শুরুতে দলের দিকে নিয়ে আসেন তিনি। এর পরের ওভারগুলোতেও মিরাজ খেলেছেন আগ্রাসীভাবেই। তবে শার্দুল ঠাকুরের বলে একবার ক্যাচও দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ভাগ্যের জোরে সে ক্যাচটা লোকেশ রাহুলের হাত ফসকে বেরিয়ে যায়। বেঁচে যান মিরাজ। শেষের দিকে মিরাজকে ভালোই সঙ্গ দিয়েছেন মুস্তাফিজ। রান না করতে পারলেও উইকেট বিলিয়ে দেননি সহজে। দুজনের ৫১ রানের জুটিতে ৪ ওভার হাতে রেখে জয়ের বন্দরে পৌঁছায় বাংলাদেশ।
প্রথমবার বাংলাদেশকে ওয়ানডেতে নেতৃত্ব দিতে নামা লিটন দাস আজ টস জিতে নিয়েছেন বোলিংয়ের সিদ্ধান্ত। ব্যক্তিগত ৭ রানে ধাওয়ানকে ফিরিয়ে অধিনায়ককে শুভ সূচনা এনে দেন মিরাজ। এরপর দলীয় ৪৮ রানে ফের ভারতকে আঘাত। এবার ব্যক্তিগত ৭ রানে আউট ভারতীয় এই ওপেনার। এরপর দলীয় ৪৮ রানে ফের ভারতকে আঘাত। এবার সাকিব ফেরান রোহিত শর্মাকে। ব্যক্তিগত ২৭ রানে আউট ভারত অধিনায়ক।
তাকে বোল্ড আউটের ফাঁদে ফেলেন সাকিব। দুই বল পরই ফের সাকিব ম্যাজিক। ভারতের সেরা অস্ত্র কোহলিকে সাজঘরের পথ দেখান সাকিব। লিটনের দারুণ ক্যাচে ফিরে যান কোহলি ৯ রান করে। দুর্দান্ত ক্যাচ লিটনের। হতাশই হলেন কোহলি। ৪৯ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে ধুঁকতে থাকা ভারতের শিবিরে কিছুটা আশার সঞ্চার করেন শ্রেয়াস আয়ার এবং কেএল রাহুল। তবে ভারতের দলীয় ৯২ রানে আবারও আঘাত হানে বাংলাদেশ। এবার আয়ারকে ফেরান এবাদত হোসেন। ব্যক্তিগত ২৪ রানে লিটনের কাছে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন এই ব্যাটার।
এরপর এক প্রান্ত আগলে রেখে দলকে এগিয়ে নিতে থাকেন রাহুল। কিছুক্ষণ তাকে ভালোই সঙ্গ দিচ্ছিলেন ওয়াশিংটন সুন্দর। কিন্তু আবারও সাকিবের বাধা। ওয়াশিংটনকে ১৯ রানে ফিরিয়ে আবারও রানের লাগাম টানেন বিশ্বসেরা এই অলরাউন্ডার। এই জুটি ভাঙার পর আরও বিধ্বংসী হয়ে ওঠে বাংলাদেশ। পরের দুই ওভারে আরও তিন উইকেট ফেলেন সাকিব-এবাদত। ৩৫ তম ওভারে দীপক চাহারকে এলবিডব্লিউ করে ফিরিয়ে নিজের নম্বর পাঁচ উইকেটটা তুলে নেন সাকিব। বিশাল বিপদের মুখেও সিরাজকে নিয়ে একটু একটু করে আগাতে চেষ্টা করছিলেন রাহুল।
কিন্তু তাকে সেই সুযোগটা দিলেন না এবাদত। ভারতের শেষ আশা কে এল রাহুলকে ৭৩ রানে ফেরান ডানহাতি এ পেসার। শেষ উইকেটটাও নিয়েছেন তিনিই। তাতে ম্যাচে তার উইকেট সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় চারে।
স/এষ্

