বদলগাছিতে বিচারের নামে নারীর সঙ্গে সমাজপতিদের এ কেমন আচরণ!
খালিদ হোসেন মিলু, বদলগাছি (নওগাঁ) প্রতিনিধি || নওগাঁর বদলগাছি উপজেলার মথুরাপুর ইউনিয়নের একটি গ্রামে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ তুলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর এক গৃহবধূর মাথা ন্যাড়া করে তাঁর মাথায় ঘোল ঢেলে শুদ্ধ করার অভিযোগ উঠেছে।
ওই গ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সমাজপতিরা এ কাজটি করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আজ সোমবার সকাল নয়টার দিকে ওই গৃহবধুর বাড়ির আঙিনায় মাথা ন্যাড়া ও মাথায় ঘোল ঢেলে শুদ্ধ করার এ ঘটনা ঘটে। বিপুলসংখ্যক উৎসুক লোকজন ঘটনার সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
সমাজপতিদের কাউকে গ্রামে গিয়ে পাওয়া যায়নি। ওই গৃহবধূর প্রতিবেশী নারীদের দাবি- একই গ্রামের মসলিম যুবকের সঙ্গে গৃহবধূর অনৈতিক সর্ম্পক ছিল। গৃহবধূর মাথা ন্যাড়া করে ঘোল ঢেলে শুদ্ধ করা হয়েছে। গৃহবধূর স্বামীর সম্মতি সমাজপতিরা এ কাজটি করেছেন।
দুপুরে ওই গৃহবধূর বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, গৃহবধূ শাড়ীর আঁচল দিয়ে মাথা ঢেকে রেখেছেন। প্রতিবেশী নারীরা গৃহবধূকে ঘর বের হতে দিচ্ছেন না। ওই গৃহবধূ বলেন, আমার সঙ্গে অনৈতিক সর্ম্পক হয়নি । সমাজপতিরা আমার মাথা ন্যাড়া দিয়ে ঘোল ঢেলে দিয়েছন। কারও বিরুদ্ধে আমার অভিযোগ নেই।
প্রতিবেশী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারীরা জানান, ওই গৃহবধূ দুই সন্তানের জননী। গ্রামের কমল হোসেনে নামে বিবাহিত মসলমান যুবকের সঙ্গে তাঁর পরকীয়ায় সম্পর্ক ছিল। ১০-১২ দিন আগে নিজ বাড়িতে অনৈতিক সর্ম্পক করার গৃহবধূকে তাঁর স্বামী হাতেনাতে ধরে ফেলেন। এরপর গৃহবধূ তাঁর বাবার বাড়িতে চলে যান।
গত শনিবার গৃহবধূ তাঁর বাবার বাড়ি থেকে স্বামীর বাড়িতে চলে আসেন। গৃহবধূকে শুদ্ধ করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সোমবার সকাল নয়টার দিকে গ্রামের লোকজনের উপস্থিতিতে গৃহবধূর বাড়ির আঙিনায় তাঁকে শুদ্ধ করার আয়োজন করা হয়। নাপিত ডেকে এনে গৃহবধূর মাথা ন্যাড়া করার পর মাথায় ঘোল ঢেলে দেওয়া হয়। ওই গৃহবধূ ও তাঁর স্বামীর সম্মতি এ কাজ করা হয়েছে।
প্রতিবেশী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর এক নারী বলেন, শুদ্ধ করার সময় গ্রামের উৎসুক লোকজন উপস্থিত ছিলেন। শুদ্ধ করার রীতি আমাদের ধর্মে আছে। এছাড়া গৃহবধূ ও তাঁর স্বামী এ কাজে কোনো আপত্তি জানায়নি।
হিন্দুধর্মালম্বী গোবিন্দ সাহা (৭৫) বলেন, আমার বয়সে আমাদের গ্রামে আগে কখনো মাথা ন্যাড়া করে ঘোল ঢেলে শুদ্ধ করার ঘটনা ঘটেনি। অনৈতিক সর্ম্পকের অভিযোগ তুলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর এক গৃহবধূকে মাথা ন্যাড়া করে ঘোল ঢেলে শুদ্ধ করা হয়েছে। ওই গৃহবধূ প্রতিহিংসার শিকার বলে মনে হচ্ছে।
ঐ গৃহবধূর বড় শ্বশুড় গোবিন্দ বলেন, কয়েক দিন আগে আমার বাস্তাবউ এর সাথে গ্রামের কমল নামের এক ব্যাক্তির পরকিয়ার অভিযোগ তুলে স্থানীয় ইউপি সদস্য বাবুর উপস্থিতিতে তাদের বিচার হয়। গ্রাম্যসালিশ শেষে গৃহবধূকে বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দেয় স্থানীয়রা।
ঐ গৃহবধূকে বাড়িতে আসার প্রস্তাব দেয় তার শ্বাশুড়ি।শ্বাশুড়ির প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে ভুক্তভোগী গৃহবধূ তার স্বামীর বাড়িতে ফিরে আসে। ঐ গৃহবধূ স্বামীর বাড়িতে পূনরায় ফিরে আসায় ক্ষুব্ধ হয় স্থানীয় একাধিক মাতব্বর।
সোমবার ঐ গ্রামের প্রভাবশালী মাতব্বর, বিমল পাহান,সুভাষ এর হুকুমে স্থানীয় কয়েকজন নারী এমন অমানবিক কর্মকাণ্ড ঘটায়।
আমার ভাস্তা বউকে এমন ভাবে মাথার চুলকেটে ন্যাড়া করে দেওয়া মুটেও ওরা ঠিক করেনি।এমন ঘটনায় মাতব্বরদের বিচার এখন হওয়া উচিত।
সচেতন মহলের একাধিক ব্যাক্তি জানান, গৃহবধূ যদি অপরাধ করে তার জন্য আইনগত ব্যবস্থা তারা নিতে পারতো কিন্তু ঐ সমাজের মাতব্বররা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে গৃহবধূর মাথার চুল কেটে ন্যাড়া করে দেওয়া উচিত হয়নি,সালিশের নামে ঐ নারীর সাথে এমন বাজে আচরণ করা মুটেও ঠিক হয়নি।
এটা অন্যায় হয়েছে, মানবাধিকা লঙ্ঘণ হয়েছে। সমাজপতিদের এমন কর্মকাণ্ড তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন সুশিল সমাজের একাধিক ব্যাক্তিরা।
মথুরাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুদ রানা বলেন, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর গৃহবধূকে মাথা ন্যাড়া করে মাথায় ঘোল ঢেলে দেওয়ার ঘটনা আমার জানা নেই।
বদলগাছি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আতিয়ার রহমান সোমবার বিকেল সাড়ে পাঁচটায় বলেন, আমি ঘটনা শুনেছি। কি কারণে ঘটনাটি ঘটল তা জানতে পুলিশ পাঠানো হবে।
স/এষ্

