টিকে থাকার লড়াইয়ে হিমশিম খাচ্ছে মানুষ
খাদ্যতালিকায় কাটছাঁট করছেন নিম্ন-মধ্যবিত্তরা
মাছ-মাংস-সবজির বাজারে স্বস্তি নেই
সরকারের অব্যবস্থাপনাকে দুষছেন বিশেষজ্ঞরা
চমক নিউজ প্রতিবেদক ।। লাগামহীন নিত্যপণ্যের বাজার। প্রায় প্রতিদিনই বাড়ছে কোনো না কোনো পণ্যের দাম। ফলে টিকে থাকার লড়াইয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষদের।
দুর্মূল্যের এই বাজারে যতটুকু আয় তার মধ্যেই চলতে বাধ্য হয়েই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছে সাধারণ মানুষ।
বাড়তি দ্রব্যমূল্যের এই বাজারে সাধারণ ভোক্তাদের জন্য কোনো সুখবর নেই বলে মনে করে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। এদিকে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, সরকারি মূদ্রানীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে বাড়ছে মূল্যস্ফীতি। আর এতে প্রতিনিয়ত চাপ বাড়ছে ভোক্তাদের ওপর।
লাগামহীন নিত্যপণ্যের দাম ।। গত মাসের তুলনায় পেঁয়াজের দাম বেড়েছে প্রায় ২৭%। টিসিবির তথ্য বলছে, দেশের বাজারগুলোতে এখন প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ৮০ থেকে ৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ গত মাসে বাজারে দেশি পেঁয়াজের দাম ছিল ৬০-৭০ টাকা। একইভাবে বেড়েছে রসুনের দামও। গত মাসে ১২০ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হওয়া দেশি রসুনের দাম এখন বাজারে ৬৪.২৯% বেড়ে ২২০ থেকে ২৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এদিকে বৃষ্টি ও বন্যার অজুহাতে মাছ ও মুরগির বাজারেও দাম বেড়েই চলেছে। সোনালী মুরগির দাম বেড়েছে একলাফে ৩০ থেকে ৪০ টাকা। খুচরা বিক্রেতারা এজন্য দুষছেন পাইকার ও আমদানিকারকদের কারসাজিকে। দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে অসাধু ব্যবসায়ীদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি সাধারণ ক্রেতাদের।
স্বস্তি নেই সবজির বাজারেও। আমদানির পরও কাঁচা মরিচের কেজি ২৪০ থেকে ২৫০ টাকা কেজিদরে বিক্রি হচ্ছে। দেশি টমেটো ২৫০ আর ভারতীয় টমেটো বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকা কেজিতে। যদিও চাল-ডাল, তেল-আটার বাড়তি দাম এখনো বাজারে অপরিবর্তিত রয়েছে।
টিকে থাকার লড়াইয়ে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ ।। কেরাণীগঞ্জে একটি গার্মেন্টস কারখানায় কাটিং হেলপার হিসেবে কাজ করেন রহিমা। দুই সন্তানের জন্য মাঝেমধ্যে বাজারের অপেক্ষাকৃত সস্তা মাছ আর ব্রয়লার মুরগি কিনতেন তিনি। কিন্তু এই দুর্মূল্যের বাজারে মাসিক ৯ হাজার টাকা বেতনে এখন আর মাছ-মুরগি খাওয়ার সামর্থ্য নেই তার।
মাছ-মুরগির দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিবারের খাদ্য তালিকা থেকে এসব পণ্য বাদ দিয়েছেন রহিমা। তিনি খোলা কাগজকে বলেন, ‘বাজারে গিয়ে চারটা ডিম কিনেছি। আমার পরিবারে চারজন সদস্য। ডিমগুলো অর্ধেক করে চারটা ডিম দিয়ে দুবেলা ভাত খাবো।
আগে মুরগি কিনতাম ১২০ টাকা কেজি, সেটা দিয়ে দুদিন চালাতাম। এখন তো একটা ব্রয়লার মুরগি কিনতে গেলেই ২৫০ টাকা চলে যায়। আমাদের আয় তো সীমিত।
কিন্তু জিনিসের দাম তো সামর্থ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে। মাছ খেতে পারিনা কতদিন, শুঁটকি মাছ কিনে রান্না করে খাই। এভাবেই খেয়ে না খেয়ে খুব কষ্ট করে বেঁচে আছি।’
রাজধানীর তিনটি বাজারে ঘুরে রহিমার মত কমপক্ষে ৫ জন সীমিত আয়ের মানুষের সঙ্গে কথা হয় দৈনিক খোলা কাগজের। জানা যায়, তারাও দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির সঙ্গে লড়াই করছেন।
পণ্যমূল্য বেড়ে যাওয়ায় তাদের আমিষ চাহিদা পূরণে ব্যয় কমিয়ে দিতে হয়েছে, গ্রামে টাকা পাঠানোর পরিমাণ কমেছে বা বন্ধ হয়ে গেছে। যারা কিছু সঞ্চয় করছিলেন, সেই পরিমাণও কমে গেছে বা বাদ দিতে হয়েছে।
কাঁচপুর এলাকায় এসএফ ওয়াশিং লিমিটেডের কর্মী শরীফ খোলা কাগজকে বলেন, ‘গত ৩/৪ মাস ধরে মুরগি কিনি না। তেলাপিয়া আর পাঙ্গাস মাছ কিনতাম এখন সেগুলোরও দাম বেড়ে গেছে। ডিমের দামও নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। খরচ যে হারে বাড়ছে সেই অনুপাতে বেতন বাড়াও খুব দরকার, কিন্তু বাড়ছে না।’
সরকারের অব্যবস্থাপনায় মূল্যস্ফীতির চাপ ভোক্তাদের ওপর ।। ক্যাবের সভাপতি মো. গোলাম রহমান খোলা কাগজকে বলেন, ‘ভোক্তাদের জন্য কোনো রকমের ইতিবাচক পদক্ষেপ সরকার নিচ্ছে না। সকল ক্ষেত্রে মানুষের ব্যয় বাড়ছে, কিন্তু আয় তেমন বাড়ছে না।
সরকার যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছে যেমন, এক কোটি পরিবারকে সাশ্রয়ী মূল্যে কিছু পণ্য দিচ্ছে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়াচ্ছে। এগুলো হলো অনেকটা ক্ষতস্থানে মলম দেওয়া। সত্যিকারের যে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, যাতে দেশের আপামর জনগণ সুবিধাভোগ করবে তেমন পদক্ষেপ আমি দেখছি না।’
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘আমরা প্রচুর টাকা ছাপিয়েছি গত বছর। সেটার প্রভাব কিন্তু আসতে থাকবে সামনের দিকে। তাছাড়া আমরা আমাদের আর্থিক খাতগুলোকে এতটা দুর্বল করে ফেলেছি, এতভাবে ধ্বংস করেছি।
ফলে এসব খাত থেকে সরকারের ঋণ করাটা অসম্ভব হয়ে গেছে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে যেতে হচ্ছে, তারা টাকা ছাপাচ্ছে। টাকা ছাপালে বিশ্বের কোনো দেশেই মূল্যস্ফীতিকে দমিয়ে রাখা যাবে না।’
স/এষ্

