কপোতাক্ষের ভাঙনে পাইকগাছার বিস্তীর্ণ অঞ্চল
২৬২ কোটি টাকা ব্যয়ে খনন
হুমকির মুখে বহু উন্নয়ন প্রকল্প
বিলুপ্ত হচ্ছে তীরবর্তী বনায়ন
ইমদাদুল হক, পাইকগাছা (খুলনা) : কপোতাক্ষের ভাঙন ও পরে নাব্যতা হ্রাসে নদীতীরে বসবাসকারী লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর পড়ে বিরূপ প্রভাব। ভিটেবাড়ি হারিয়ে বহু মানুষ উদ্বাস্তু হয়েছে। জীবিকার তাগিদে পেশা বদলও ঘটেছে অনেকের। এরপর গণদাবির প্রেক্ষিতে সরকার ২৬২ কোটি টাকা ব্যয়ে কপোতাক্ষ খনন করে। নদের একাংশ ফিরে পায় তার হারানো যৌবন।
তবে কপোতাক্ষের ফের ভাঙনে নতুন করে উদ্বাস্তু হচ্ছে নদীতীরে বসবাসকারী বহু পরিবার। হুমকির মুখে পড়েছে সরকারের বহু উন্নয়ন প্রকল্প। চরম ঝুঁকিতে রয়েছে মুজিব শতবর্ষে গৃহহীন ও ভূমিহীন বহু পরিবারের পুনর্বাসনে গড়া আবাসন প্রকল্পসহ হাট-বাজার, ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। অথচ এদিকে ন্যূনতম খেয়াল নেই সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কারো।
ইতিমধ্যে কপোতাক্ষের পাইকগাছার কপিলমুনি ইউনিয়নের কাশিমনগর হাট-বাজার, মসজিদ, দোকান-পাঠ ও ৩ কোটি ২৫ লক্ষ টাকা ব্যয়ে দেশব্যাপী গ্রামীণ বাজার অবকাঠামো উন্নয়ন (সি আর এম আই ডিপি) প্রকল্পের নির্মাণাধীন চারতলা ফাউন্ডেশন কাশিমনগর হাট দুইতলা বিশিষ্ট গ্রামীণ মার্কেট বিল্ডিং, মুজিব শতবর্ষের ভূমিহীন ও গৃহহীনদের আবাসন প্রকল্প চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।
কপোতাক্ষ পাড়ের বনায়ন প্রকল্পের সিংহভাগ গাছ ইতিমধ্যে গিলে খেয়েছে আগ্রাসী কপোতাক্ষ। রামনাথপুরের বহু ঘর বাড়ি, এতিমখানা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, কবরস্থান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ কয়েকশ’ একর জমি কপোতাক্ষে বিলীন হয়েছে। বর্তমানে কপিলমুনির নতুন মাছ কাটা থেকে শুরু করে ঐতিহ্যবাহী কালীবাড়ী ঘাট, হাট-বাজার, কাশিমনগর জেলেপাড়া, গোলাবাটিসহ রাড়ুলী ইউনিয়নে কপোতাক্ষ নদের ভাঙন ফের ব্যাপক আকার ধারণ করছে। জেলে পল্লীর অন্তত ৭০টি পরিবার ভাঙনের মুখে অন্যত্র চলে গেছে। নদীগর্ভে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে আরো ২০টি পরিবারের বসতভিটা। নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে সেখানকার চলাচলের একমাত্র রাস্তার দুই তৃতীয়াংশ। জোয়ারের পানি ঠেকানোর জন্যও সেখানে নেই কোনো বাঁধ।
এছাড়া ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়েছে বোয়ালিয়া জেলেপাড়া, রামনাথপুরসহ কপোতাক্ষের বিভিন্ন এলাকা। এ ব্যাপারে কথা হয় কপিলমুনির কাশিমনগর জেলেপল্লীর বাসিন্দা উত্তম বিশ্বাসের সঙ্গে। তিনি জানান একশ বছরেরও বেশি সময় ধরে তারা সেখানে বসবাস করে আসছেন। তবে ইতিমধ্যে তাদেরসহ বহু পরিবারের মূল বসতভিটা গিলে খেয়েছে আগ্রাসী কপোতাক্ষ। অনেকেই পেশা বদলে অন্যত্র চলে গেছে। উদ্বাস্তু হয়েছে অনেক পরিবার।
একই এলাকার লিপিকা বিশ্বাস জানান রাতে জোয়ারের সময় ভয়ে বাচ্চাদের নিয়ে বসে থাকেন ভাটার অপেক্ষায়। এরপর ভাটা আসলে ঘুমাতে যান তারা। রাড়ুলীর ৩নং ওয়ার্ডের ফরিদা বেগম (৫৫) বলছিলেন, তাদের এখনকার বাড়ি ছাড়া নদীর অবস্থান ছিল আধা কিলোমিটার দূরে। তবে কপোতাক্ষের ক্রমশ ভাঙন জেলেপল্লীর পর এখন তাদেরকেও নদীর কিনারায় নিয়ে ঠেকিয়েছে।
রাড়ুলীর বাসিন্দা প্রভাষক ময়েজুর রহমান জানান, গতকাল রাড়ুলী ইউনিয়নের প্রবেশদ্বারের পুরাতন ওয়াপদা রাস্তায় নতুন করে বড় গর্তের সৃষ্টি হয়ে সেখান থেকে নদীর পানি প্রবেশ করছে।
তবে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আলহাজ অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদের পরামর্শে স্বেচ্ছাশ্রমে স্থানীয়দের সঙ্গে নিয়ে বাঁধটি আশু মেরামত করেছেন। তিনি বলেন, এর আগে বাঁধটি ২০০৯ সালে আইলায় ভেঙে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাঁধটির স্থায়ী সংষ্কার না হলে সেখানে ভাঙন বৃদ্ধি পেয়ে বিস্তীর্ণ অঞ্চল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করেন তিনি।
কপিলমুনি ইউপি চেয়ারম্যান কওছার আলী জোয়াদ্দার বলেন, রামনাথপুর, আগড়ঘাটা, ভেদামারীসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে কপোতাক্ষের ভয়বিহ ভাঙনে সেখানকার বসতিসহ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হলেও সেখানকার নদীভাঙন প্রতিরোধে কার্যত কোনো সরকার এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বিভিন্ন সময় এলাকাবাসীর অর্থায়ন ও স্বেচ্ছাশ্রমে তারা যতটুকু সম্ভব কাজ করেছেন। তবে আগামীতে এ ব্যাপারে সরকারিভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের পাইকগাছা উপজেলা উপ-সহকারী প্রকৌশলী রাজু আহম্মদ বলেন, ভাঙন প্রতিরোধে জরুরি ভিত্তিতে প্রকল্প আওতায় নিয়ে ইতিমধ্যে কপোতাক্ষের ভাঙনকবলিত কাশিমনগর এলাকায় ২০০ মিটার, গোলাবাটি আশ্রয়ণ এলাকায় ৩০০ মিটার ও মাহমুদকাটিতে সাড়ে ৩শ’ মিটার এলাকায় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে।
স/এষ্

