ইভিএমে ভোটকে আওয়ামী লীগের স্বাগত, বিএনপির প্রত্যাখ্যান
বিশেষ প্রতিনিধি : অধিকাংশ রাজনৈতিকদলের মতামত উপেক্ষা করে নানা জল্পনা-কল্পনার অবাসন ঘটিয়ে আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৫০ আসনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ভোট গ্রহণের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এই নিয়ে দেশের প্রধান বড় দুই দল তাদের অবস্থান পরিস্কার করেছে। ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ। তবে ইভিএমে ভোট গ্রহণ প্রত্যাখ্যান করেছে বিএনপি। একই সঙ্গে দলটি নির্বাচনকালীন সময়ে একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া এদেশে কোনো নির্বাচন হবে না বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চরণ করেছে।
প্র্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়ালের সভাপতিত্বে নির্বাচন কমিশনের বৈঠক শেষে গত মঙ্গলবার ইসি সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ বলেন, কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে- অনূধর্ব ১৫০টি আসনে ইভিএমে নির্বাচন করা হবে। ন্যূনতম একটি আসনেও হতে পারে। সব কিছু বিচার-বিশ্লেষণ করে কমিশন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নির্বাচন কমিশণ থেকে এমন বক্তব্য আসার পর থেকে রাজনৈতিক অঙ্গনে পক্ষে-বিপক্ষে নানা মন্তব্য উঠে আসছে।
বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলো এমনকি জাতীয় পার্টি পর্যন্ত তারা সবাই কিন্তু নির্বাচন কমিশনে গিয়ে বলে এসেছিল যে, ‘আমরা ইভিএম চাই না’। কারণ ইভিএম দিয়ে জনগণের রায় সঠিকভাবে প্রতিফলিত হবে না। বর্তমান নির্বাচন কমিশন অবৈধ নির্বাচন কমিশন হিসেবে মনে করে না তারা। এই কমিশন গঠন করাও সঠিক পদ্ধতিতে হয়নি বলেও জানান বিএনপি নেতারা। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ইভিএমে কোনো ঝামেলা নেই। যারা ইভিএমকে ভয় পায়, তারা জনগণের ভোট নিরপেক্ষ হোক এটা চান না। কারচুপিমুক্ত ভোট হউক এটা তারা চায় না।
ইভিএমে ভোট গ্রহণ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, সংলাপে আমরা ৩০০ আসনেই ইভিএম চেয়েছিলাম। নির্বাচন কমিশন অর্ধেক আসনে সম্মত হয়েছে। আমরা নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই।
তিনি বলেন, আমরা ২০১৮ সালের নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপে বলেছি আধুনিক যে টেকনোলজি এটা ব্যবহার করা সংগত। কারচুপির ও জালিয়াতির নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি আমরা চাই না। তারপরও কিছু কিছু করে ইভিএম চালু করা হয়েছিল। এবারও আমরা ৩০০ আসনে চেয়েছিলাম। ইভিএমে কোনো ঝামেলা নেই। যারা ইভিএমকে ভয় পায়, আমি জানি না তারা জনগণের ভোট নিরপেক্ষ হোক, কারচুপিমুক্ত হোক-এটা চায় কি-না।
১৫০ আসনে ইভিএমে ভোট করার নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখান করে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ভোট হবে সম্পূর্ণ ব্যালটে। মির্জা ফখরুল বলেন, এই নির্বাচন কমিশন তারা শুধুমাত্র সরকারের ইচ্ছা পালন করবার জন্যে, তাদের যে লক্ষ্য আছে সরকার গঠন করবার, সেই লক্ষ্যকে চূড়ান্ত রুপ দেয়ার জন্যই ইসি ইভিএমের কথা আবারো বলেছে। আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, এটা কখনোই জনগণ গ্রহণ করবে না, আমরাও গ্রহণ করছি না। এটাকে পুরোপুরিভাবে আমরা এটাকে প্রত্যাখান করছি।
তিনি বলেন, বিএনপির দাবি খুব পরিস্কার, বিএনপির দাবি হচ্ছে যে, নির্বাচনকালীন সময়ে একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া এদেশে কোনো নির্বাচন হবে না ।দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে জনগনের দাবি প্রতিফলিত হবে না, জনগনের যে রায় সেই রায় প্রতিফলিত হবে না। সুতরাং আমরা যেটা পরিস্কার করে বলে এসেছি যে, অবিলম্বে এই সরকারকে তাদের ব্যর্থতার জন্য পদত্যাগ করতে হবে এবং পদত্যাগ করে তাদেরকে একটা নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।
তিনি বলেন, সংসদ বিলুপ্ত করতে হবে এবং নতুন করে গঠিত নির্বাচন কমিশনের পরিচালনায় একটা অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন সকল দলের কাছে গ্রহণযোগ্য একটা পার্লামেন্ট নির্বাচন করতে হবে এবং জনগনের সরকার গঠন করতে হবে। ভোট হবে সম্পূর্ণ ব্যালেটে।
তিনি আরও বলেন, আমরা বিশ্বাস করি সরকার যদি পরিবর্তন না হয় নির্বাচনকালীন সময়ে সেখানে কোনো নির্বাচন কমিশনের পক্ষেই সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব না।
তিনি বলেন, আজকে প্রমাণিত হলো যে, এই নির্বাচন কমিশনও যে এই সরকারেরই যে একটা অঙ্গসংগঠন।কারণ ওরা(আওয়ামী লীগ) তিন‘শ আসনে ইভিএম চেয়েছে। আর ওরা(নির্বাচন কমিশন) এখন অফার করেছে দেড়‘শতে। একটা রফা-সলভ কম্প্রোমাইজ সরকারের সঙ্গে। তারা তিন‘শ, দেড়‘শ।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী দৈনিক খোলা কাগজকে বলেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশন নিয়ে বিএনপি কোনো আগ্রহ নেই। বিএনপি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি আদায়ে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। এ দাবি আদায় করে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করে সুষ্ঠু ভোটের মাধ্যমে সরকার গঠন করবে বিএনপি।
ইভিএম এর বিষয়ে নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল। তিনি বলেছেন, সংলাপে ইভিএম নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষে-বিপক্ষে মতামত থাকলেও তাদের বক্তব্য মুখ্য বিবেচনায় আসেনি। আমরা নিজেরাই (সর্বোচ্চ দেড়শ আসনে ইভিএম ব্যবহারের) সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সুষ্ঠুভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগের কথা বিবেচনায় ইভিএমের বিষয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ইভিএম বিতর্কের মধ্যে আগামী নির্বাচনে কোনো সংকট হবে না ইঙ্গিত দিয়ে সিইসি বলেন, এ নিয়ে আগাম ভবিষ্যৎ বাণী করা যাবে না। ২০১৪ ও ২০১৮ সালেও সংকটের কথা বলা হয়েছে। এখন দেখা যাক কী হয়।
হাবিবুল আউয়াল বলেন, ইভিএমে যাওয়ার একটা বড় সিদ্ধান্ত আমাদের নিজেদের। ভোট সামলাবে ইসি, রাজনৈতিক দল নয়। ইসির এটা বড় দায়িত্ব- নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। ভোট যেন আরও স্বাচ্ছন্দ্য, আরও সুষ্ঠু হতে পারে তা নিশ্চিত করবে ইসি। যারা ভোট দিতে আসবেন, সেটা আমাদের মুখ্য বিবেচনায় এসেছে। রাজনৈতিক দলগুলো কে কী বলেছে, সেটা আমাদের মুখ্য বিবেচনায় আসেনি। কিন্তু বক্তব্যগুলো বিবেচনায় নিয়েছি। একইসঙ্গে লাখ লাখ কোটি কোটি ভোটারের ভোটাধিকার প্রয়োগে কেন্দ্রে আসেন, তারা যেন আরও ভালোভাবে ভোট দিতে পারেন, তা বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
এদিকে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেছেন, আমার কাছে মনে হলো, এখনও উনারা (সিইসি ও চার নির্বাচন কমিশনার) শুনতে চান। আউয়াল সাহেবের একটা গুণ হলো উনিতো জজ ছিলেন, অপর পক্ষের বক্তব্য শুনতে চান। আমি এখনও আশাপ্রদ যে, আমি আশাহত হবো না, উনি নিশ্চয় সফল হবেন। শক্ত থাকবেন। আমি মনে করি, জনস্বার্থবিরোধী কিছু হলে মেরুদণ্ড শক্ত রেখে উনি পদত্যাগ করবেন।
তিনি বলেন, কমিশন খুব কঠিন অবস্থার মধ্যে চলছে। সরকারের উচিত হবে কিছুটা গিভ অ্যান্ড টেক করে সুষ্ঠু নির্বাচন করা। এটা করতে হলে আগ বাড়িয়ে কথা বলা বন্ধ করতে হবে।
স/এষ্

