প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধের যে সমাজনীতি সেটি প্রতিষ্ঠিত আজও হয়নি, শোষকের শ্রেণির দল সবকিছুকে বাণিজ্যিকরণ ফেলেছে
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-র সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, আমরা এখন যে রকম সমাজ ও রাষ্ট্রে আছি পাকিস্তান আমলেও একই রকম ছিল। আমরা সেই সময় সেøাগান দিয়েছি। আমাদের মেধাবীদের বঞ্চিত করা হতো। তখন আমরা আইয়ুবের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। সংগ্রাম করেছি। মুক্তিযুদ্ধ অর্জন করেছি। কিন্তু সত্যিকার মুক্তিযুদ্ধের যে সমাজনীতি সেটি প্রতিষ্ঠিত আজও হয়নি। ওখানে শোষকের শ্রেণির দল সবকিছুকে বাণিজ্যিকরণ ফেলেছে। বাণিজ্যিকরণের কালো আঁধারে ঢেকে গেছে। আমাদের রাষ্ট্র, সমাজকে ঘুষের জালে দুুষিত করা ফেলা হয়েছে। এ ঘুষ-দুর্নীতির জাল বাজারজাতকরণ-বাণিজ্যিককরণের সাথে সম্পৃক্ত, তার সাথে আরো ভয়ঙ্কর বিপদে নিয়ে যাচ্ছে সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদ।
২০ এপ্রিল বৃহস্পতিবার বেলা ১২টায় ‘ঘুষ ছাড়া চাকরি চাই’ সহ ৭দফা দাবীতে বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নের উদ্যোগে জাতীয় যুব সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নের সভাপতি যুবনেতা হাসান হাফিজুর রহমান সোহেলের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সুজন-র সম্পাদক ডক্টর বদিউল আলম মজুমদার।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হাফিজ আদনান রিয়াদের সঞ্চালনায় সমাবেশে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন অভিনেত্রী সুমনা সোমা, জাতীয় যুব মৈত্রীর সভাপতি সাব্বাহ আলী, জাতীয় যুব জোটের সভাপতি রোকনুজ্জামান, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিনের সভাপতি জিএম জিলানী শুভ, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ আবদুল মান্নান, সাংগঠনিক সম্পাদক শিশির চক্রবর্তী, নারী বিষয়ক সম্পাদক জোনাকি জাহান, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন ও কেন্দ্রীয় নেতা খান আসাদুজ্জামান মাসুম।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান-চিকিৎসা-শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। এটা সংবিধানে রচিত অধিকার। এ অধিকার রক্ষা করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। ঘুষ ছাড়া চাকরি পাওয়াটাও একটি মৌলিক অধিকার। ৩০ লক্ষ রক্তের বিনিময়ে এ মৌলিক অধিকার আমরা মুক্তিযুদ্ধে লাভ করেছি। এ অধিকার রক্ষার লড়াই ৩০ লক্ষ শহীদের মর্যাদা রক্ষার লড়াই। এখানে কেউ ভিক্ষা চাইতে আসেনি। যুবকরা কাজ করতে চায়, ন্যায্য মজুরি চায়। আমাদের যুবকরা দেশকে এগিয়ে নিতে চায়। কিন্তু শোষকের শ্রেণির দল, যারা লুটপাট কাজের সাথে আছে, তারা এদেশকে এগিয়ে নিতে চায় না। ঘুষ-দুর্নীতি একটা রোগ আমাদের মাথার মধ্যে। এ রোগ ছড়িয়ে পড়ছে লুটপাটের রোগে। তাহলে বুঝে নিন আমাদের কী অবস্থা!
তিনি আরো বলেন, একদিন আমরা সাম্রাজ্যবাদী লুটেরাজদের বিরুদ্ধে ভাষা আন্দোলন করেছি, শিক্ষা আন্দোলন করেছি, মুক্তিযুদ্ধ করেছি, গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছি। বৈষম্য বাড়ছে। আমরা একসময় লড়াই করেছিলাম কেউ খাবে তো, কেউ খাবে না, তা হবে না, তা হবে না। বৈষম্য এখনও বাড়ছে। আজ যুবকদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তাদের অধিকার আদায়ে লড়াই করে যেতে হবে। আমরাও লড়াইতে থাকবো। ঘুষ-দুর্নীতি-সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদ এ তিন মহাবিপদ আমাদেরকে আঁকড়ে ফেলছে।
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ষাটের দশকের দিকে আমরা একটা সেøাগান দিতাম, ‘বাঁচার মতো বাঁচতে চাই’, এ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ অর্জিত হয়েছে। কিন্তু এ সেøাগানের আরেকটি সেøাগান আমাদের সাথে যুক্ত হয়েছে ‘ঘুষ ছাড়া চাকরি চাই’।
তিনি বলেন, সমতা, সমধিকার-এসব আমাদের মৌলিক অধিকার। আইন করে এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। অতীতেও দেখেছি এ আইনকে অবজ্ঞা করা হয়েছে। বর্তমানেও এ আইনকে পাশ কাটানো হচ্ছে।
যুব ইউনিয়নের দাবির সাথে একাত্মতা প্রকাশ তিনি স্বজনপ্রীতি ও ঘুষ দিয়ে বদলী বন্ধ করার দাবিকেও যুক্ত করার আহবান জানান।
তিনি আরো বলেন, একজন ব্যক্তিকে যদি ঘুষ চাকরি পেতে হয়, বদলী হতে হয়, দলীয় কিংবা স্বজনপ্রীতি দিয়ে চাকরি করতে হয় তাহলে সেই ব্যক্তি দেশকে কি দিবে, দলকে কি দিবে। আগে আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করতাম, সেখানে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ হতো, এখন সেখানে লেনদেনের মাধ্যমে হয়। এসবের ফলে জাতি-রাষ্ট্র মেধাশূন্য হয়ে পড়ছে। শুধু যুব ইউনিয়ন নয়, সকল শুভমনা ব্যক্তিকে এ আন্দোলনে এগিয়ে আসতে হবে।
সাম্প্রতিক জঙ্গিবাদ বিরোধী পুলিশের ভূমিকা প্রশংসা করে বলেন, পুলিশ বাহিনীকে আরো চৌকষ হতে হবে। সেই সামর্থ্য তাদের আছে। তাদের মধ্যে অর্থের প্রভাব বন্ধ করতে হবে।
জাতীয় যুব সমাবেশে বক্তারা বলেছেন, ঘূষ ছাড়া বর্তমানে সরকারী চাকরি হয় না। পদ ও পদবী ভেদে ২ লক্ষ থেকে ২০ লক্ষ টাকা ঘুষ লেনদেনের খবর দেশের পত্র-পত্রিকায় বিভিন্ন সময় ছাপা হলেও এ বিষয়ে কোন সরকারই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। একজন সাধারন যুবক তার শিক্ষা জীবনের পরীক্ষা প্রস্তুতির পাশাপাশি, শিক্ষা শেষে চাকরি পেতে আর্থিক প্রস্তুতিও গ্রহণ করেছে। জায়গা-সম্পত্তি বিক্রি করে, সুদে টাকা নিয়ে হলেও চাকরি পাওয়ার জন্য বাধ্য করা হচ্ছে। একদিকে কর্মহীন বেকার যুবকদের ব্যাপকতা, অন্যদিকে নিয়োগপূর্ব ঘুষ লেনদেন, এই সংকটকে আরো তীব্র করেছে।
সমাবেশ শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ‘ঘুষ ছাড়া চাকরি চাই’ দাবির সমর্থনে সারাদেশের পাঁচ লক্ষাধিক গণস্বাক্ষরসহ প্রধানমন্ত্রীকে স্মারকলিপি প্রদান করতে গেলে পুলিশ শাহবাগে শিশু পার্কের সামনে বাঁধা দেয়। পরে বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নের সভাপতি হাসান হাফিজুর রহমান সোহেলের নেতৃত্বে হাফিজ আদনান রিয়াদ, শেখ আবদুল মান্নান, মসরুর আমান মুখর, শিশির চক্রবর্তী, ত্রিদিব সাহা, খান আসাদুজ্জামান মাসুম ও আশিকুল ইসলাম জুয়েল প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে স্মারকলিপি প্রদান করেন।

