জযনু আক্তার।।
ভ্রমণপ্রিয় মানুষদের কাছে খুব পছন্দের গন্তব্য সিকিম। সিকিম মানেই, গ্যাংটক, ছাঙ্গু-লেক, বাবামন্দির, নাথু-লা, রাবাংলা, পেলিং এবং আরও কতকিছু । ছুটি পেলেই মন চায় ছুটে যেতে সিকিমে।
ভারতের শিলিগুড়ি থেকে ১২৩ কিমি দূরে পশ্চিম সিকিমের পাহাড়ের কোলে লুকিয়ে থাকা মিষ্টি একটি গ্রাম তাডং (১৬৯৯মি )।গ্রামের উত্তরে নীল আকাশের ক্যানভাসে ১৮০ ডিগ্রি কোণ জুড়ে অবস্থান করছে হিমালয়ের নামজাদা শৃঙ্গের দল। বরফের মুকুট পরা কাঞ্চনজঙ্ঘা (৮৫৮৬ মি), ফ্রে পিক (৫৮৩০ মি ) ,কাব্রূ,(৭৩১৬মি) , সিনিওলচু(৬৮৮৮মি) রাতং(৬৬৭৮ মি ) , তালুং(৭৩৪৯মি ) ,কোকতাং(৫৭৮১মি ) , পাণ্ডিম(৬৬৯১ মি ), সিমভো(৬৮৫৫ মি )। গ্রামের যেকোনো অংশ থেকে এই অবিস্মরণীয় দৃশ্যের সাক্ষী হতে পারেন আপনি। তাডং গ্রামের সুপ্রাচীন শ্যাওলা ধরা ভিজে ভিজে সুগন্ধী পাহাড়ের পাইন, ওক, ম্যাপল, বার্চ , সিলভার ফার গাছের মাথায় কুয়াশার চাদর আপনাকে নেশা ধরিয়ে দেবে । স্রেফ, পায়ে হেঁটে এদিক ওদিক ঘুরুন। পাকদণ্ডি পথে উঠে যান নেমে যান ছোট ছোট পাহাড়ি হ্যামলেট গুলোতে ভালবাসা পাবেন হাসিখুশি মানুষগুলোর কাছে।
তাডং কে বেসক্যাম্প করে তিনদিনে ঘুরে নিন কালুক, রিংচেনপং, রিংচেনপং মনাস্ট্রি,ওল্ড ব্রিটিশ বাংলো বা রবীন্দ্র স্মৃতি বাংলো (রবি কবির পদধূলিপ্রাপ্ত)। দেখুন রিসাম গুম্ফা আর মহাকালী মন্দির । বনপথে ঝাণ্ডিদাঁড়া পর্যন্ত ছোট্ট একটা ট্রেক করতে পারেন । কালুক বাজার থেকে গাড়ি ভাড়া করে একবেলায় ঘুরে আসতে পারেন , দুটি সুপ্রাচীন পাহাড়ি যমজ গ্রাম হী এবং বার্মিওক(১৫০০ মি )
হী গ্রামের আরেক দ্রষ্টব্য, সুন্দরী ছায়াতাল। তার টলটলে জলে, আসেপাশের পাহাড়ের জলছবি দেখেই কয়েক ঘন্টা কাবার হয়ে যাবে। পরিষ্কার আবহাওয়ায় , সবুজ পাহাড়ের পিছন থেকে উঁকি মেরে আপনাকে দেখবে রুপসী কাঞ্চনজঙ্ঘা। বার্মিওক যাবার পথে দেখে নিন স্থানীয়দের পবিত্র তীর্থ শ্রীজোংগা মন্দির ।
একদিন গাড়ি নিয়ে সকালে বেরিয়ে বেলাবেলি ঘুরে আসতে পারেন ভুটান , তিব্বত, ভারত ও নেপাল সীমান্ত লাগোয়া সিকিমের বা ভারতের শেষ গ্রাম উত্তরে (২০১১ মি )। একই দিনে দেখে নিতে পারেন ডেন্টাম ভ্যালী, সিনসোর ব্রীজ (এশিয়ার দ্বিতীয় উচ্চতম সাসপেনশন গর্জ্ ব্রীজ )দেখে ।উত্তরের প্রধান আকর্ষণ তার অবস্থান ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য । এছাড়া আছে কাগজু গুম্ফা ,ছোটা কালী মন্দির একই চত্বরে ।
যদি হাতে দিন বেশি থাকে, কালুক থেকে গাড়িতে হিলে চলে যান । ভোরে বেরিয়ে, হিলে থেকে দেড় দুঘন্টায় সাড়ে চার কিমি ট্রেক করে পৌঁছে যান সিঙ্গালীলা রেঞ্জে অবস্থিত সপ্নীল ভার্সে ভ্যালীতে । রডোডেনড্রন স্যাংচুয়ারি নামে সারা বিশ্বে বিখ্যাতভার্সে ভ্যালী । সহজ ট্রেক রুটের দুপাশে , প্রিমুলা, ম্যাগ্নোলিয়া নামের ভাই বোনদের নিয়ে যাত্রাপথকে রাঙ্গিয়ে দিয়েছে এপথের সেরা আকর্ষণ , রডোডেনড্রন। প্রকৃতি দেবতা বুঝি বিশ্বের সব রঙের আবীর এখানে উজাড় করে দিয়েছেন । ভাগ্য ভাল থাকলে লাজুক রেড পান্ডারও দেখা মিলতে পারে।যাত্রা পথে , আবহ সঙ্গীতের দায়িত্বে নেবে জানা অজানা কয়েকশ প্রজাতির পাখি ।
ভিসা প্রসেস শেষ করে ভারতে ঢুকুন সামর্থ্য মতো। প্লেনে, বাসে বা ট্রেনে যেভাবে আপনার ইচ্ছে। চলে যান শিলিগুড়ি। এনজেপি বা শিলিগুড়ি থেকে সরাসরি রিজার্ভ গাড়িতে , সেবক – মেল্লি -নয়াবাজার -সরেং -কালুক – রিংচেনপং হয়ে পাঁচ ঘন্টায় তাডং আসুন। শেয়ার গাড়ি তে জোরথাং এসে, আবার শেয়ার গাড়িতেও তাডং আসতে পারেন। ফিরবেন একই ভাবে। স্থানীয় গাড়ী সব সময়ে কালুক বাজার থেকে নেবেন। রেজিস্টর্ড এজেন্সী থেকে নেবেন,ঠকবেন না।
তাডং এ থাকার একমাত্র জায়গা হল তামু হোম-স্টে । তাডং তো বটেই , সম্ভবত সারা সিকিমে ঘরে বসে হিমালয়ের সূর্যোদয় ও সুর্যাস্ত দেখার সেরা ঠিকানা এই হোমস্টে । হোম-স্টের , তিনতলার খোলা বারান্দা কাম ডাইনিং স্পেস টি অতুলনীয়। অর্গানিক সিকিমিজ বা বাঙালি কুইজীন খেতে খেতে হিমালয়ের সৌন্দর্য উপভোগ করুন । রসিক রা বাঁশের চোঙ্-এ টেমবো নিয়ে বারান্দায় বসুন, বাঁশের স্ট্র দিয়ে পান করুন । আরেকটু কড়া পানীয় সাংগ্রীলার স্বাদ নিতে পারেন পাহাড়ী শাকপাতার পকোড়া নয়ত লিভার কারী দিয়ে।
স/এষ্

