নীরব সৌন্দর্যের দ্বীপ মনপুরা, মন পড়ে থাকে ফিরে আসার পরও
মনপুরা ঘুরে এসে আহমাদুল্লাহ ।। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে, মেঘনার মোহনায় সজীব হয়ে আছে একটি দ্বীপ—নাম তার মনপুরা । এই দ্বীপের নাম শুনলেই সিনেমাপ্রেমীদের মনে পড়ে যায় ২০০৯ সালের বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘মনপুরা’র কথা। সিনেমার ক্যামেরার গুণে যেন দেশের মানুষের চোখে প্রথমবারের মতো ধরা দেয় এক নিভৃত প্রকৃতির সৌন্দর্য। কিন্তু বাস্তবের মনপুরা সিনেমার চেয়েও গভীর, আরও বেশি বিস্ময়কর।
যদিও মনপুরা এখনো ‘পর্যটন শহর’ হয়ে ওঠেনি, তবে প্রকৃতিপ্রেমী ও নির্জনতা খোঁজার যাত্রীদের কাছে এটি হয়ে উঠেছে এক গোপন আশ্রয়। ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ শহর জীবন থেকে দূরে, যান্ত্রিক শব্দের বাইরে এই দ্বীপ যেন প্রকৃতির এক অব্যক্ত ভাষায় ডাকে।
নামেরপেছনেরগল্প
মনপুরা নামের নেপথ্যে আছে দু’টি জনশ্রুতি। স্থানীয়রা বলেন, এই দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও এখানকার খাবারের স্বাদ এতই আকর্ষণীয় যে, যারা একবার এসেছেন, তাদের মন এখানেই পড়ে থাকে—তাই ‘মনপুরা’। আবার অনেকে বলেন, অতীতে এই দ্বীপ ছিল বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। একবার ‘মন গাজী’ নামক এক ব্যক্তি বাঘের আক্রমণে নিহত হন, তার নামেই দ্বীপের নাম হয় মনপুরা।
প্রকৃতিরআশীর্বাদেগড়া
ভোলা জেলার অন্তর্গত এই দ্বীপ ঘিরে আছে বঙ্গোপসাগরের নোনা জল আর মেঘনার নদীতরঙ্গ। দ্বীপটি গঠিত চারটি ইউনিয়ন নিয়ে, যার মূল চরগুলো হলো চর মুজাম্মেল, চর নিজাম, লালচর, চর পিয়াল ইত্যাদি। শীতকালে এসব চর অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখর থাকে।
সবচেয়ে মন কাড়ে মনপুরার সবুজ ম্যানগ্রোভ বন। রাস্তার পাশে হরিণের অবাধ বিচরণ এখানকার অন্যতম বিস্ময়। কখনো কখনো হরিণের দল রাস্তা পার হতে গেলে আপনাকে থেমে যেতে হবে, আর সেই মুহূর্তগুলো হয়ে উঠবে আজীবনের স্মৃতি।
সূর্যাস্ত, সাইক্লিংওনির্জনতা
কুয়াকাটার মতো এখানেও একসাথে দেখা যায় সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত। মনপুরা ল্যান্ডিং স্টেশন থেকে নদীজলে লাল আভা ছড়িয়ে যখন সূর্য অস্ত যায়, মনে হয় সময় থেমে গেছে।
সাইক্লিংপ্রেমীদের জন্য মনপুরা এক স্বপ্নদ্বীপ। দ্বীপজুড়ে সাইকেল চালিয়ে ঘোরা, নির্জন সৈকতে তাঁবু খাটিয়ে রাত কাটানো—এসব কিছু মিলে মনপুরা হয়ে ওঠে অভিজ্ঞতাপূর্ণ এক অভিযাত্রা।
যাত্রাপথওথাকারব্যবস্থা
ঢাকা থেকে সরাসরি মনপুরা যেতে চাইলে সদরঘাট থেকে হাতিয়া রুটের লঞ্চে ওঠা যায়। সন্ধ্যায় রওনা দিয়ে সকালে পৌঁছায় মনপুরা। ভাড়া সাধারণ ডেকে ৪০০ টাকা থেকে শুরু করে কেবিনে ২০০০–২৫০০ টাকা পর্যন্ত।
অথবা আপনি ঢাকা থেকে ভোলা হয়ে তজুমদ্দিন ঘাট পর্যন্ত গিয়ে সি-ট্রাকে উঠতে পারেন। দ্বীপের ভেতরে চলাচলের জন্য মোটরসাইকেল, রিকশা, অটো রিকশা এবং সাইকেল ভাড়া পাওয়া যায়।
থাকার ব্যবস্থাও মোটামুটি সহজলভ্য। উপজেলা ডাকবাংলো, পানি উন্নয়ন বোর্ডের রেস্ট হাউস কিংবা সাধারণ মানের হোটেল—সবই রয়েছে। তবে সরকারি রেস্টহাউসে থাকতে হলে আগে থেকে অনুমতি নিতে হয়।
রসনাররাজ্যে
মনপুরার খাবারও মনে দাগ কেটে যায়। এখানকার মহিষের দুধের দই, তাজা ইলিশ, গলদা চিংড়ি, হাঁসের মাংস ভুনা কিংবা বোয়ালের ঝোল—সবই যেন খাদ্যপ্রেমীদের জন্য এক অপূর্ব আয়োজন।
ভ্রমণকবেকরবেন?
নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি—এই শীতকালই মনপুরা ভ্রমণের উপযুক্ত সময়। আবহাওয়া আরামদায়ক, সড়ক ও নৌপথ সহজ। অতিথি পাখিদের আগমনে দ্বীপে প্রাণ ফিরে আসে। তবে বর্ষাকালে যাতায়াত কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ।
একবারগেলেবারবারযেতেমনচায়
প্রকৃতির নিস্তব্ধতা, মানুষজনের আন্তরিকতা আর নির্জনতায় মোড়ানো এক দ্বীপ—মনপুরা। এখানে নেই কোনো ডিজে পার্টি, নেই কনক্রিটের হোটেল কিংবা দামী রিসোর্ট। আছে শুধু প্রকৃতি, যেটা একান্ত নিজের করে পাওয়া যায়।
মনপুরা একবার গেলে মন পড়ে থাকে সেখানেই। এবং আপনি বুঝে যাবেন—নামটি সত্যিই উপযুক্ত।