ঢাকারবিবার , ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  1. Bangla
  2. chomoknews
  3. English
  4. অপরাধ
  5. অভিনন্দন
  6. আমাদের তথ্য
  7. কবিতা
  8. কর্পরেট
  9. কাব্য বিলাস
  10. কৃষি সংবাদ
  11. খুলনা
  12. খোলামত
  13. গল্প
  14. গাইড
  15. গ্রামবাংলার খবর
আজকের সর্বশেষ

প্রবাসে থেকেও শেকড়ের টানে কৃষি ও খামারে স্বপ্ন বুনছেন যশোরের তন্ময়

admin
সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬ ৭:৫৯ অপরাহ্ণ
Link Copied!

প্রবাসে থেকেও শেকড়ের টানে কৃষি ও খামারে স্বপ্ন বুনছেন যশোরের তন্ময়

আজম খাঁন, বাঘারপাড়া (যশোর) ।। প্রবাসজীবনের ব্যস্ততা, হাজার মাইল দূরের কর্মস্থল আর জীবিকার তাগিদ—কোনোটিই থামাতে পারেনি নিজের শেকড়ের প্রতি টান। কৃষির প্রতি ভালোবাসা আর স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্নকে সঙ্গে নিয়ে প্রবাসে থেকেও গ্রামের বাড়িতে গড়ে তুলেছেন ছোট্ট এক খামার ও সবুজ বাগান। পতিত জমিকে করেছেন আবাদযোগ্য, বাড়ির আঙিনাকে সাজিয়েছেন নানা জাতের ফলজ ও বনজ গাছে।

তিনি যশোর সদর উপজেলার এনায়েতপুর গ্রামের তরুণ তন্ময়, খালিকুল ইসলামের বড় ছেলে। তার গল্পটা শুরু হয়েছিল একেবারেই ছোট পরিসরে—শখের বশে এক জোড়া কবুতর পালন দিয়ে। সেই ছোট্ট শখই সময়ের সঙ্গে পরিণত হয়েছে ভালোবাসায়, আর ভালোবাসা থেকে তৈরি হয়েছে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় এক জোড়া কবুতর কিনেছিলেন তন্ময়। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে কবুতরের সংখ্যা। বর্তমানে তার খামারে রয়েছে ২০ জোড়ারও বেশি কবুতর। পরিবারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে কবুতর বিক্রি করে বাড়তি আয়ের সুযোগও তৈরি হয়েছে।

তবে তন্ময়ের উদ্যোগ কেবল কবুতর পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বাড়ির পাশে পড়ে থাকা প্রায় দুই শতক পতিত জমিকে কাজে লাগিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন সবজির বাগান। সেখানে চাষ করছেন মূলা, পালং শাক, পুঁইশাক, ঢেঁড়স, লাউ, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া, মরিচ, কাঁচা কলা, পেঁপেসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি। নিজের হাতে গড়ে তোলা সেই বাগানের উৎপাদিত সবজি পরিবারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি তাকে দিচ্ছে আত্মতৃপ্তি।

প্রবাসে থেকেও কীভাবে সম্ভব?
প্রশ্নটির উত্তরও তন্ময়ের জীবনযাপনের মধ্যেই রয়েছে। তিনি বর্তমানে কাতারপ্রবাসী। প্রতি বছর ছুটিতে দেশে ফিরে গ্রামের বাড়িতেই সময় কাটান। ছুটির সময়টুকু কাজে লাগিয়ে নিজের হাতে বীজ বপন করেন, চারা রোপণ করেন, গাছ লাগান এবং খামার ও সবজি বাগানের প্রয়োজনীয় কাজ করে যান। এরপর প্রবাসে ফিরে গেলেও তার উদ্যোগ থেমে থাকে না। নিয়মিতভাবে এসবের দেখাশোনা করেন তার মা।

তন্ময় বলেন, “প্রবাসে থাকলেও গ্রামের প্রতি আমার আলাদা একটা টান আছে। ছুটি শেষ করে কাতারে ফিরে যাওয়ার পরও আম্মুর সঙ্গে ফোনে কথা বলে আমার খামার, গাছপালা ও সবজি ক্ষেতের খোঁজ নিই। দূর থেকে নিজের গাছপালা ও খামার দেখতে পারলে সত্যিই সারাদিনের ক্লান্তি দূর হয়ে যায়।”

বাড়ির আঙিনাকেও সবুজের সমারোহে সাজিয়েছেন তন্ময়। সেখানে রয়েছে আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, লেবু, জলপাই, আশফল, কদবেল ও নারিকেলসহ বিভিন্ন ধরনের ফলজ ও বনজ গাছ। সম্প্রতি তিনি সৌদি খেজুরের গাছও রোপণ করেছেন।

তন্ময়ের কৃষিপ্রেম শুধু দেশের মাটিতেই সীমাবদ্ধ নয়। কাতারে যে বাসায় থাকেন, সেখানেও তিনি বিষমুক্ত সবজি চাষ করেন। নিজের হাতে উৎপাদিত সবজি ব্যবহারের কারণে বাজার থেকে নিয়মিত সবজি কেনার প্রয়োজন হয় না বলেও জানান তিনি।

প্রবাসী বাবা-ছেলের শেকড়ের টান
তন্ময়ের বাবা খালিকুল ইসলামও কাতারপ্রবাসী। বাবা-ছেলে দুজনের কর্মস্থলই কাতার হলেও দেশের মাটি, গ্রামের পরিবেশ ও শেকড়ের প্রতি তাদের টান যেন আরও গভীর। প্রবাসজীবনে ব্যস্ত থেকেও দেশের বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রেখেছেন তারা।

ইতোমধ্যে তন্ময় মালয়েশিয়া, ওমান ও কাতার ভ্রমণ করেছেন। ভবিষ্যতে সৌদি আরব ভ্রমণের ইচ্ছাও রয়েছে তার।

শিক্ষাজীবনেও রয়েছে তন্ময়ের ধারাবাহিকতা। তিনি খাজুরার ঐতিহ্যবাহী চণ্ডিপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ২০১৮ সালে বাণিজ্য বিভাগে এসএসসি এবং খাজুরা সরকারি শহীদ সিরাজুদ্দীন হোসেন কলেজ থেকে ২০২০ সালে একই বিভাগে এইচএসসি পাস করেন। পরবর্তীতে যশোর শহরের সরকারি মাইকেল মধুসূদন দত্ত কলেজ (এমএম কলেজ)-এর মার্কেটিং বিভাগে বিবিএ অনার্সে অধ্যয়নরত অবস্থায় প্রবাসে পাড়ি জমান।

দুই ভাইয়ের মধ্যে তন্ময় বড়। তার ছোট ভাই স্থানীয় একটি হাফেজিয়া মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছেন।

প্রবাসের মাটিতে জীবিকার জন্য ছুটে চললেও দেশের বাড়িতে তার স্বপ্নের বীজ যেন প্রতিনিয়ত বেড়ে উঠছে। একদিকে কবুতরের খামার, অন্যদিকে পতিত জমিতে সবজির চাষ; বাড়ির আঙিনায় সারি সারি ফলজ ও বনজ গাছ—সবকিছু মিলিয়ে তন্ময়ের উদ্যোগ এখন কেবল পারিবারিক শখ নয়, বরং স্বাবলম্বী হওয়ার এক বাস্তব প্রয়াস।

তার এই উদ্যোগে একদিকে যেমন পতিত জমি উৎপাদনের আওতায় আসছে, অন্যদিকে পরিবারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রবাসে থাকা তরুণরাও চাইলে নিজেদের গ্রামের বাড়ির জমি ও আঙিনাকে কাজে লাগিয়ে কৃষি ও ক্ষুদ্র খামার গড়ে তুলতে পারেন—তন্ময়ের উদ্যোগ যেন তারই একটি জীবন্ত উদাহরণ।

হাজার মাইল দূরে থেকেও শেকড়ের সঙ্গে এই নিবিড় সম্পর্কই তন্ময়ের গল্পকে আলাদা করে তুলেছে। প্রবাসের আয় দিয়ে শুধু নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নয়, গ্রামের মাটি, গাছপালা, কৃষি আর ছোট্ট খামারকে ঘিরেও তিনি বুনছেন স্বপ্ন। তার কাছে এই সবুজ বাগান আর কবুতরের খামার কেবল সম্পদ নয়—এ যেন নিজের শেকড়ের কাছে ফিরে আসার এক টুকরো আনন্দ, ভালোবাসা আর স্বাবলম্বী জীবনের স্বপ্ন।