বগুড়ায় নবান্নে বাহারি মাছের পসরা, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি
বাদশা আলম , বগুড়া ।। কবি সুকান্ত’র ভাষায় যেন-‘নতুন ফসলের সুবর্ণ যুগ আসে।’ ‘এই হেমন্তে কাটা হবে ধান, আবার শূন্য গোলায় ডাকবে ফসলের বান’। নবান্নের বর্ণনা তিনি তাঁর ‘এই নবান্নে’ কবিতায় এভাবেই বর্ণনা দিয়েছেন। হেমন্ত ঋতুর দিন-রাতের অবিশ্রান্ত শ্রমে কৃষকের ঘরে ওঠে সোনার ধান। বাংলার গ্রাম-গঞ্জ মেতে ওঠে নবান্নের উৎসবে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পঞ্জিকামতে অগ্রহায়নের প্রথম দিনে একটি হলো নবান্ন উৎসব।
এ উৎসব উপলক্ষে বগুড়ার বিভিন্ন উপজেলার সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নবান্নের আনন্দে মেতে উঠে। ঐতিহ্যবাহী এ উৎসবের প্রধান আকর্ষণ মাছের মেলা। এই উৎসবকে কেন্দ্র করেই প্রতিবছর মাছের সবচেয়ে বড় মেলা বসে বগুড়ার শিবগঞ্জের উথলীতে।
এছাড়াও মাছের মেলা বসে জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার মহাস্থান, মোকামতলা, নন্দীগ্রাম উপজেলার ওমরপুর, রনবাঘা, হাটকড়ই, ধুন্দার ও দাসগ্রাম, দুপচাচিয়ার সিও অফিস বাসস্ট্যান্ড এলাকা এবং শেরপুর উপজেলার বারদুয়ারীহাট, সকালবাজার, গোশাইপাড়া(কাচারী) মোড়সহ বিভিন্ন স্থানে।
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অনুযায়ী হিন্দুরা নবান্ন উৎসব জেলার শিবগঞ্জের উথলী হলেও রথবাড়ি, ছোট ও বড় নারায়ণপুর, ধোন্দাকোলা, সাদল্লাপুর, বেড়াবালা, আকনপাড়া, গরীবপুর, দেবীপুর, গুজিয়া, মেদেনীপাড়া, বাকশন, গনেশপুর, রহবল প্রায় ২০ গ্রামের মানুষের ঘরে ঘরে চলে উৎসব।
এই নবান্ন মেলার উদ্যোক্তা হলেও আশপাশের গ্রামের সকল সম্প্রদায়ের মানুষ এখানে কেনাকাটা করতে আসে। এসব মাছের মেলার কথা বলা হলেও ক্ষেত থেকে নতুন তোলা শাক-সবজির পসরাও সাজানো হয় মেলা চত্বরে। এছাড়াও সেখানে নাগরদোলা, শিশু-কিশোরদের খেলনার দোকানও বসেছে। সেই সঙ্গে মিষ্টান্ন ও দইয়ের একটি বড় বাজারও বসানো হয় মেলা চত্বরে।
মেলায় আগন্তক স্থানীয়রা জানান, মেলাটি শুধু বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে নয়, বরং তাদের সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের এক জীবন্ত উদাহরণ হিসেবে কাজ করে। তাদের বিশ্বাস, এই ঐতিহ্য গত তিন শতাব্দী ধরে সজীবভাবে বেঁচে রয়েছে এবং আগামীতেও তা সংরক্ষিত থাকবে। নবান্ন উৎসবের এই মেলা স্থানীয় কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনের পরিচয়ও তুলে ধরে, যা অনেকের কাছে একটি ভিন্নধর্মী আকর্ষণ হয়ে ওঠে।
জনশ্রুতি রয়েছে ‘নবান্ন’ উপলক্ষে নতুন চালের তৈরি পায়েশ-পোলাও, পিঠা-পুলিসহ রকমারি খাদ্য-সামগ্রী পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন সবাইকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়ানো হয়। সামাজিকভাবে প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী পালন করা হয় এবং ধর্মীয় রীতি-নীতি অনুযায়ী নানা আচার-অনুষ্ঠান। হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী অন্ন লক্ষ্মীতুল্য। তাই তারা এ দেবীর উদ্দেশ্য পূজা-অর্চনার আয়োজন করে। এছাড়া, নবান্ন অনুষ্ঠানে নতুন অন্ন পিতৃপুরুষ, দেবতা, কাঁক ইত্যাদি প্রাণীকে উৎসর্গ করে এবং আত্মীয়জনকে পরিবেশন করার পর গৃহকর্তা ও পরিবারবর্গ নতুন গুড়সহ নতুন অন্ন গ্রহণ করেন।
নতুন চালের তৈরি খাদ্যসামগ্রী কাঁককে নিবেদন করা নবান্নের অঙ্গ একটি বিশেষ লৌকিক প্রথা। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, কাঁকের মাধ্যমে ওই খাদ্য মৃতের আত্মার কাছে পৌঁছে যায়। এই নৈবেদ্যকে বলে ‘কাঁকবলী’। অতীতে পৌষ সংক্রান্তির দিনও গৃহদেবতাকে নবান্ন নিবেদন করার প্রথা ছিল। হিন্দু শাস্ত্রে নবান্নের উল্লেখ ও কর্তব্য নির্দিষ্ট করা রয়েছে। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, নতুন ধান উৎপাদনের সময় পিতৃৃপুরুষ অন্ন প্রার্থনা করে থাকেন।
এই কারণে হিন্দুরা পার্বণ বিধি অনুসারে নবান্নে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করে থাকেন। শাস্ত্র মতে, নবান্ন শ্রাদ্ধ না করে নতুন অন্ন গ্রহণ করলে পাপের ভাগী হতে হয়। বাংলাদেশে বসবাসকারী অন্যান্য ধর্মাবলম্বী এবং আদিবাসী সমাজেও নিজ নিজ ধর্মীয় রীতি-নীতি, বিশ্বাস ও প্রথা অনুযায়ী নবান্ন উৎসব পালন করা হয়।
এছাড়াও মুসলিম কৃষক সমাজে নতুন ফসল ঘরে ওঠার জন্য মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের উদ্দেশ্য বাড়ি বাড়ি কোরানখানি, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল, মসজিদ ও দরগায় শিরনির আযোজন করা হয়। তবে নবান্নের এই মেলাটি শিবগঞ্জের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, ঐতিেহ্য পরিণত হয়েছে জেলার দুপচাঁচিয়া, নন্দীগ্রাম, আদমদীঘি, শেরপুর, শাজাহানপুর সহ অন্যান্য উপজেলায়।
মঙ্গলবার (১৮ নভেম্বর) ভোর থেকেই মেলাপ্রাঙ্গণে মানুষের ভিড় চোখে পড়ে। আগের রাত থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বড় বড় মাছ নিয়ে ব্যবসায়ীরা উথলি বাজারে পৌঁছাতে শুরু করেন। মাছ বিক্রেতারা জানান, নদী, হাওর ও বিল থেকে ধরা বিশাল আকৃতির নানা প্রজাতির মাছ সাজিয়ে বেচাকেনা করতে তারা বছরের এই দিনটির অপেক্ষায় থাকেন।
সকাল থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত সরেজমিনে জেলার নন্দীগ্রাম উপজেলার ওমরপুর, রনবাঘা, শিবগঞ্জের উথলী ও শেরপুরের বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, সারিবদ্ধভাবে বসা মাছের দোকান গুলোতে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে রুই, কাতলা, মৃগেল, চিতল ও সিলভার কার্পসহ নানা প্রজাতির মাছ। এবার মেলায় এক কেজি থেকে শুরু করে ১৮ কেজি ওজনের মাছ পাওয়া যাচ্ছে।
মেলায় আকারভেদে রুই মাছ কেজিপ্রতি ৩০০-৭০০ টাকা, কাতল ৪০০-৬৫০ টাকা, বোয়াল ৫৫০-৬৫০ টাকা, ব্রিগেট ৩০০-৪০০, সিলভার কার্প ২৫০-৫০০, চিতল ৫০০-১০০০, বাঘাইড় ৫০০-১২০০ টাকায় বিক্রি হয়। নবান্ন উপলক্ষে নতুন আলুও ছিল বেশ জনপ্রিয়, যার দাম ছিল কেজিপ্রতি ৩০০-৪০০ টাকা।
উথলী মাছের মেলার পাশের নারায়ণপুর গ্রামের বাসিন্দা নিতাই চন্দ্র সরকার বলেন, প্রায় দুইশ বছরের ঐতিহ্যবাহী মেলাটি যেমন মাছের জন্য বিখ্যাত, তেমনি মেলার দিন নতুন শাক-সবজিতেও ভরপুর থাকে। এ কারণে আশপাশের লোকজন মেলায় ছুটে আসে।
মেলায় মাছ কিনতে এসে বেড়াবালা গ্রামের আশরাফুল ইসলাম ও গণেশপুর গ্রামের প্রদীপ বর্মন বলেন, উথলীর নবান্ন মেলায় বিক্রির জন্য আশপাশের এলাকার পুকুরগুলোতে সৌখিন চাষিরা মাছ মজুদ করে রাখেন।
নন্দীগ্রামের নামুইট গ্রামের মাছ বিক্রেতা মিন্টু মিয়া জানান, নবান্নকে কেন্দ্র করে অনেকেই বাড়ির পুকুরে বিশেষভাবে মাছ চাষ করেন। বড় মাছগুলো এ সময় বাজারে বেশি দামে বিক্রি হয়। তবে ক্রেতাদের সামর্থ্যের কথা চিন্তা করে দাম যতটা সম্ভব কম রাখা হয়।
মাছ বিক্রেতা মোকাব্বর হোসেন বলেন, “মাছের আকার ভেদে একটি মাছ ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
দাসগ্রামের মাছ ক্রেতা বাদল চন্দ্র জানান, “রুই ৪৮০, বিগহেড ৫৫০ ও চিতল ৯০০ টাকা কেজি দরে কিনেছি। মোট ৯৫০০ টাকার মাছ নিয়েছি।”
মাছ কিনতে আসা নাটোরের সিংড়ার অমর কুমার বলেন, “বিগহেড, সিলভার কার্প, রুই, কাতলার দাম মোটামুটি ঠিক আছে। তবে চিতল আর বোয়াল একটু বেশি। তবে এত বড় বড় মাছ দেখে মনটা ভরে গেছে।
এ প্রসঙ্গে উথলী মেলা কমিটির ইজারাদার বুলবুল ইসলাম বলেন, ‘নবান্নকেন্দ্রিক এই আয়োজন করতে আমাদের যথেষ্ট খরচ হয়। সে কারণে যথোপযুক্ত হারে ফি নেওয়া হয়েছে।’
দুপচাঁচিয়া সিও অফিস বাসস্ট্যান্ড মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক ও বিসমিল্লাহ মৎস্য আড়ৎ-এর পরিচালক উমর ফারুকের জানান,“নবান্নের এ মেলায় প্রতিবছর প্রায় ৩ থেকে ৪ কোটি টাকার মাছ কেনাবেচা হয়। এবারও মাছের আমদানি প্রচুর হবে বলে আশা করছি। দামও থাকবে ক্রেতাদের নাগালের মধ্যেই।”
নন্দীগ্রামের রনবাঘা হাটের ইজারাদার শফিকুল ইসলাম শিরু বলেন, এ হাটে প্রতিবছর নবান্ন উপলক্ষে অতুল মাছ ওঠে, প্রায় অর্ধ কোটির উপরে মাছ বিক্রি হয় এ মেলাতেই।
মেলায় আগত স্থানীয়রা জানান, প্রায় ২’শ বছরের পুরনো এ মেলায় প্রতি বছরই প্রায় কোটি টাকার মতো মাছ বেচাকেনা হয়। এবার মেলায় ৩০ কেজি ওজনের কাতলাসহ বড় বড় মাছ এসেছে মেলায়। বিক্রিও হচ্ছে ৩০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি দরে। মেলায় নানা জাতের বিভিন্ন ধরনের মাছ আনা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিবগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান বলেন, নবান্নের মেলা এই এলাকার একটি বিশেষ ঐতিহ্য। গ্রামে গ্রামে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। মেলায় কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা যেন না হয় সে জন্য প্রশাmসনের তরফ থেকে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।