নিউ লাইফ ওয়েল্ডিং ট্রেনিং সেন্টারের আড়ালে মানবপাচার সিন্ডিকেট
তায়েবুর রহমান ।। রাজধানীর দক্ষিণখান বাজারে নিউ লাইফ ওয়েল্ডিং ট্রেনিং সেন্টারের আড়ালে একটি সুসংগঠিত মানবপাচার চক্র গড়ে উঠেছে। অভিযোগ, আব্দুর রহমান জনি ও তার সহযোগীরা ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর নামে যুবকদের থেকে জন প্রতি চার থেকে পাঁচ লক্ষ টাকা করে প্রায় কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। নিউ লাইফ ওয়েল্ডিং ট্রেনিং সেন্টারের চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান জনি বিশেষ কায়দায় অনেককে ম্যানেজ করে এই প্রতারনা চালিয়ে যাচ্ছেন। রাজধানীর দক্ষিণখান বাজারে নিউ লাইফ ওয়েল্ডিং ট্রেনিং সেন্টারে প্রশিক্ষণ দেবার জন্য রয়েছে বেশ কয়েকটি ওয়েল্ডিং কেন্দ্র। বিদেশ যাবার প্রত্যাশায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দু’চোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে অছেন বেশকিছু শিক্ষার্থী। প্রতি ব্যাচে ২০ থেকে ৩০ জন শিক্ষার্থী থাকলেও ইউরোপ নয় মধ্য প্রাচ্যের দেশে যাবার সুযোগ হয় হাতে গোনা কয়েক জনের। অভিযোগ আছে বাকিদের টাকা পুরোটাই মেরে দেন আব্দুর রহমান জনি। ভুক্তভোগীরা সাবধান হতে বলেছে এই নিউ লাইফ ওয়েল্ডিং ট্রেনিং সেন্টার থেকে।
সংবাদ প্রকাশের পর নিউ লাইফ ওয়েল্ডিং ট্রেনিং সেন্টারের চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান জনি এই প্রতিবেদককে হুমকি দেয়। সেই হুমকি।
শিকার ধরার জন্য প্রথমে ফেসবুক, ইউটিউব ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে চটকদার বিজ্ঞাপন। রোমানিয়া, পোল্যান্ড, লিথুনিয়া, পর্তুগাল, ইতালি, সার্বিয়া, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, দুবাই, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, রাশিয়া, ইউক্রেন বিভিন্ন দেশের ভুয়া ওয়ার্ক পারমিট সহ ভিসা সাকসেস এর রিভিউ দেওয়া হয়। যা পুরোটাই বানানো।
এইসব লোভনীয় বিজ্ঞাপন দেখে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের যুবকেরা উন্নত জীবনের আশায় ইউরোপ যাওয়ার জন্য জনি মিয়া সঙ্গে যোগাযোগ করে। ট্রেনিং ভর্তি নামে সর্বপ্রথম ৩৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা প্রথমেই হাতিয়ে নেওয়া হয়।
পাসপোর্ট জমার সময় আরও এক লাখ। পরে ভুয়া ভিসা/ওয়ার্ক পারমিট দেখিয়ে চার–পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করেন অনেক ভুক্তভোগী।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই চক্রের প্রধান নিউ লাইভ ট্রেনিং সেন্টারে মালিক জনি মিয়া ও সহ এই চক্রের আরো বেশ কয়েকজন সদস্য আছে।
ফেসবুক, ইউটিউব ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে বিজ্ঞাপনে দাবি করা হয়, অল্প খরচে ইউরোপ আকর্ষণীয় চাকরির সুযোগ মিলবে। কিন্তু ভুক্তভোগীদের বক্তব্য অনুযায়ী অগ্রিম টাকা নিয়ে প্রতিশ্রুত অনুযায়ী ইউরোপ পাঠানো হয় না।
ভুক্তভোগী মো. শামীম হোসেন, পিতা খাদেম মোল্লা, গ্রাম চাকির তালুক, থানা গোয়ালন্দ জেলা রাজবাড়ি জানান পোল্যান্ড যেতে ১০ লক্ষ টাকা খরচ হবে বলে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
তিন থেকে চার মাসের মধ্যে ভিসা হবে। ইন্ডিয়ান ভিসা খরচ এবং ইন্ডিয়া যাতায়াতের খরচ সম্পূর্ণ জনি মিয়া বহন করবে। কিন্তু প্রথম শর্ত হচ্ছে তার ট্রেনিং সেন্টারে ট্রেনিং করতে হবে যার জন্য খরচ হবে ৩৫ হাজার টাকা। আমি তার কথায় ট্রেনিং সেন্টারে ভর্তি হয়ে যায় ৩৫ হাজার টাকা দিয়ে। এরপরে পাসপোর্ট জমা নেয়ার সময় আরো এক লক্ষ টাকা। পরবর্তীতে ওয়ার্ক পারমিট দিয়ে বিভিন্ন নামে সর্বমোট ৪ লক্ষ ৫ হাজার টাকা আমার কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়। পরবর্তীতে দেখা যায় ওয়ার্ক পারমিট ভুয়া।
এরপরে জনি মিয়া কাছে আমরা টাকা ফেরত চাইলে নানা বাহানা করতে থাকে। এর পরবর্তীতে সিঙ্গাপুর পাঠাবে বলে আবার অন্য একটি ট্রেনিং করতে বলে। এইভাবে সে আমাকে গত দুই বছর ধরে ঘোরাতে থাকে। এদিকে আমি একজন বেকার ছেলে হিসেবে আমার বাবা-মা অনেক কষ্টের ঋণ করে এই টাকাগুলো আমার হাতে তুলে দেয়। এই টাকা জনি মিয়ার কাছ থেকে উদ্ধার না করার কারণে আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। আমি বর্তমানে অনেক কষ্টে দিন পার করছি।
অন্য আরেকজন ভুক্তভোগী মো. আসাদুল হক জানান আমার কাছ থেকেও একই উপায়ে চার লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে জানি মিয়া গত দুই বছর ধরে বিভিন্নভাবে ঘোরাচ্ছে। টাকা চাইতে গেলে উলটো হুমকি ধমকি এবং মাস্তান বাহিনী দিয়ে আমাকে শাসানো হয়। বলা হয় টাকা দেবো না, তোরা আমার কিছুই করতে পারবি না।
অন্য আরেকজন ভুক্তভোগী মো. জাহিদুল ইসলাম জানান আমার কাছ থেকেও জনি মিয়া প্রতারণার মাধ্যমে ৪ লক্ষ টাকা নেন, পরবর্তীতে ট্রেনিং খরচ ও ভিসা খরচ বাদ দিয়ে গত ছয় মাস আগে চেক প্রদান করেন কিন্তু গত পাঁচ মাস ধরে চেক একাধিকবার ব্যাংকে দিলেও সেটা নগদায়ন হয়নি চেকটি ডিজঅনার হয়। বাধ্য হয়ে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছি। জনি মিয়া একজন প্রতারক, তার জন্য আমার জীবনের মূল্যবান সময় নষ্ট হয়েছে এবং অনেক টাকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।
অন্য আরেকজন ভুক্তভোগী জানান আমাকে ইউরোপ পাঠানোর কথা বলে টাকা নিয়ে পরবর্তীতে দুবাইতে পাঠিয়েছে, বলা হয়েছিল দুবাইয়ে ভালো চাকরি দেবেন। এজন্য আমি প্রায় ৩ লাখ টাকা দিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে পৌঁছে দেখি চাকরি নেই, আমাকে জোর করে শ্রমিকের কাজ করতে বাধ্য করা হয়।
একই অভিযোগ অন্য একজন প্রবাসী করেন বলা হয়েছিল সৌদি আরবের ভালো চাকরি দেবেন। কিন্তু এখানে এসে আমাকে মরুভূমির মধ্যে শ্রমিকের কাজ করতে হচ্ছে।
শেখ ফরহাদ মুন্না নামে ভুক্তভোগী জানান আমার কাছেও জনি ১ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ঘোরান। পরবর্তীতে বিভিন্ন সালিশ বিচার করে আমি এক লক্ষ বিশ হাজার টাকা উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। এখনো ২০ হাজার টাকা জনির কাছে আমি পাব।
এছাড়া রাতুল, মারুফ, মনির, ইত্যাদি অনেকে অভিযোগ করেন তাদের কাছ থেকেও জনি মিয়া বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে প্রতারণার মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছিলেন পরবর্তীতে তারা বিভিন্ন বিচার সালিশ করে টাকা উদ্ধার করতে পারলেও জনপ্রতিপ্রায় ৫০ থেকে ১ লক্ষ টাকা কম দেওয়া হয়েছে। জীবনের মূল্যবান সময় এবং আমাদের স্বপ্ন নিয়ে জানি খেলা করেছে।
অনেক চাপে অনেকের কিছু কিছু টাকা ফেরত দিতে রাজি হলেও মনে করা হচ্ছে এগুলো তার সাজানো নাটক। দিনের পর দিন ভুক্তভোগীদের ঘোরানোই তার নেশা। আর বিদেশ পাঠানোর নামে টাকা আত্মসাৎ তার পেশা।
জনি মিয়া নিজে কোন রকম নামটা লিখতে পারলেও প্রাথমিক বিদ্যালয় পড়াশোনা শেষ করতে পারেনি। অথচ ইউরোপ সহ বিভিন্ন দেশের স্টুডেন্ট ভিসা সহ বিভিন্ন ধরনের ভিসার প্রলোভন দেখিয়ে মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়েছে, তার ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড AC-20506170100016311 ও ডাচ বাংলা ব্যাংক লিমিটেড AC-20241024003287 এ ছাড়াও বেশ কিছু মোবাইল ব্যাংকিং লক্ষ লক্ষ টাকা ভুক্তভোগীরা পাঠিয়েছে।

শিক্ষার্থীদের রঙ্গীণ স্বপ্ন দেখাতে ব্যাস্ত আব্দুর রহমান জনি।

