প্রস্তাবিত ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে ভোক্তা, সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী, ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ কেউই খুশি নয়। নতুন আইনে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আদায় বিতর্ক আর ব্যাংক হিসাবের লেনদেনে আবগারি শুল্ক বৃদ্ধি আলোচনার ভিড়ে চাপা পড়ে গেছে প্রস্তাবিত বাজেটের অন্য ইতিবাচক দিকগুলো। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, নতুন আইনে ১৫ শতাংশ ভ্যাট বহাল থাকলে একদিকে জিনিসপত্রের দাম বাড়বে; অন্যদিকে ব্যাংক হিসাবের লেনদেনের ওপর আবগারি শুল্ক প্রায় দ্বিগুণ করায় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা এক ধরনের আতঙ্কে রয়েছেন। এর ফলে মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখতে নিরুৎসাহিত হবেন। বিশেষ করে ১ লাখ টাকার ওপরে যাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে থাকবে তাদের ৮০০ টাকা শুল্ক দিতে হবে। আবার যাদের ১ কোটি টাকা থাকবে তাদের দিতে হবে মাত্র ১ হাজার ৫০০ টাকা। এটা অত্যন্ত বৈষম্যমূলক আইন বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। এতে শুধু ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীই নয়, সাধারণ মানুষও ব্যাংক-বিমুখ হয়ে পড়বে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ দুটি ইস্যুই সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে প্রস্তাবিত ২০১৭-১৮ বাজেটে। অথচ নতুন বাজেটে অনেকগুলো ইতিবাচক দিক রয়েছে যেগুলো চাপা পড়ে গেছে ভ্যাট ইস্যুতে। এর মধ্যে অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ খাতের মেগা আট প্রকল্পের জন্য ৩৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। মেগা প্রকল্প পদ্মা সেতু প্রকল্পে ৫২৪ কোটি ৩৬ লাখ টাকা, মেট্রোরেলে ৩৪২৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা, পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্পে ৭৬০৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্রে ৬৭৭৯ কোটি ৪ লাখ টাকা, মাতারবাড়ী ১২০০ মেগাওয়াট আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কোল ফায়ারড বিদ্যুৎ প্রকল্পে ২২২০ কোটি টাকা। দোহাজারী হতে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু হতে মিয়ানমারের কাছে ঘুমধুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ ট্র্যাক নির্মাণ প্রকল্পে ১৫৬১ কোটি ২৪ লাখ টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন এডিপিতে মোট প্রকল্প ১৩১১টি। এর মধ্যে নতুন প্রকল্প ৯০টি। বাকিগুলো চলমান। এসব নিয়েও আলোচনা হতে পারত বলে মনে করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। এগুলো চলমান প্রকল্প। সামাজিক নিরাপত্তার আওতা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু বাজেটে সাধারণ মানুষের জন্য ইতিবাচক তেমন কিছু নেই বলে তিনি মনে করেন। এ ছাড়া পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য চাল, ডাল, ভোজ্যতেলসহ ১০৪৩টি পণ্যকে ভ্যাট রেয়াত দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসজিডি) অর্জনের জন্য ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে সব ধরনের বিড়ি-সিগারেটের ওপর কর ও আমদানি শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। উচ্চ প্রবৃদ্ধির জন্য সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির পদক্ষেপ হিসেবে আগামী অর্থবছরে সরকারি খাতের বিনিয়োগ ৮ শতাংশে এবং বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ২৩ শতাংশে উন্নীত করার অঙ্গীকার করেছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি আরও বলেছেন, প্রস্তাবিত বাজেটে দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য ৫৪ দশমিক ১৭ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। জেন্ডার সমতায় ২৮ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য পৃথক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। শিক্ষা খাতের সম্প্রসারণে সারা দেশের ১২০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং ২৮৫টি বেসরকারি কলেজকে সরকারিকরণের ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে অর্থনীতির মূল ধারায় আনতে সামাজিক নিরাপত্তা খাতের সুবিধাভোগীদের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি ভাতার পরিমাণও বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বছরে দুটি উৎসব ভাতা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। মুক্তিযোদ্ধাদের উন্নত আবাসন সুবিধা সৃষ্টির লক্ষ্যে সারা দেশে ১০ হাজার ফ্ল্যাট নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত বাজেটে প্রাণঘাতী ক্যান্সার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোকে প্যারালাইজ ও জন্মগত হৃদরোগীদের চিকিৎসা সহায়তায় বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। এসব রোগের চিকিৎসায় ৫০ হাজার টাকা করে অর্থ সহায়তা দেবে সরকার। এ জন্য আগামী ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে ২০ কোটি টাকা থেকে বরাদ্দ বাড়িয়ে ৫০ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। আগামী বছর থেকে করদাতাদের উৎসাহিত করতে দীর্ঘ সময় ধরে কোনো পরিবারের সব সদস্য কর দিলে সে পরিবারকে ‘কর বাহাদুর’ পরিবার হিসেবে ঘোষণা করার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। দেশের বিচার ব্যবস্থার সংস্কারের অংশ হিসেবে দুর্ধর্ষ ও দাগি আসামিদের আদালতে হাজির না করে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিচারকার্য সম্পন্ন করার বিষয়টি আগামীতে বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় দুর্গম এলাকায় ১ হাজার ৮৫৫ কিমি মহাসড়ক নির্মাণের জন্য একগুচ্ছ প্রকল্প গ্রহণের পরিকল্পনার কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রায় ৩৭৩ কিমি জাতীয় মহাসড়ক চারলেনে উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বাস, রেল, নৌযান ও চুক্তিবদ্ধ বেসরকারি বাসে জনগণের যাতায়াত সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্য করতে ই-টিকিটিং সিস্টেম প্রচলনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। রাজধানী ঢাকার যানজট পরিস্থিতির উন্নয়নে শান্তিনগর হতে ঢাকা-মাওয়া রোডে প্রায় ১২ কিমি দীর্ঘ একটি ফ্লাইওভার নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। ব্যবসা-বাণিজ্যের বিকাশের জন্য করপোরেট কর হার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। পরিবেশ রক্ষার জন্য পোশাক শিল্পের গ্রিন বিল্ডিংয়ের ব্যবহার বাড়াতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। এ খাতের যেসব কোম্পানি গ্রিন বিল্ডিং ব্যবহার করতে আসছে বা করবে তাদের ১৪ শতাংশ কর হ্রাস করার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। এই উদ্যোগ শুধু তৈরি পোশাক খাতেরই নয় দেশের পরিবেশ রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। ভারী প্রকৌশল শিল্প এবং রপ্তানি খাতের ন্যায্য স্বার্থ সংরক্ষণ ও দেশীয় শিল্প বিকাশ ও প্রতিরক্ষণের লক্ষ্যে স্থানীয়ভাবে নির্মিত রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার, এলপিজি সিলিন্ডার এবং পাম অয়েল ও সয়াবিন উৎপাদন এবং ব্যবসায়ী পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা ২০১৯ সাল পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে বাজেটে।
স/এষ্

