খাইরুল ইসলাম, ঝালকাঠি প্রতিনিধি: রমজানে ঝালকাঠির নলছিটি, রাজাপুর ও কাঠালিয়া উপজেলার ২০টির অধিক গ্রামে চলছে মুড়ি ভাজার উৎসব। ক্ষতিকারক কোন উপাদান ছাড়াই শুধু লবন পানি মিশ্রিত চাল হাতে ভেজে তৈরি করা হচ্ছে এই সুস্বাদু মুড়ি। দেশি পদ্ধতিতে চুলায় ভাঁজা সুস্বাধু এ মুড়ি রমজানে দণিাঞ্চলের চাহিদা মেটানোর পর বরিশাল বিভিাগসহ দেশের বিভিন্নস্থানে সরবরহ করা হচ্ছে। রপ্তানী হচ্ছে বিদেশেও। এখান থেকে রমজান মাসে বিক্রি হবে প্রায় ১০ কোটি টাকার মুড়ি। গ্রামের পরিচয় হারিয়ে বর্তমানে এ গ্রামগুলো মুড়িগ্রাম নামেই অধিক পরিচিত।
ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার দপদপিয়া ইউনিয়নের রাজাখালি, দপদপিয়া, তিমিরকাঠি, ভরতকাঠি, জুরকাঠি, গোয়ালকাঠি, চরাদি, বাখরকাঠি, রাবনাহাট ও কুমারখালী এই ১০টি গ্রামের অধিকাংশ মানুষের প্রধান পেশা মুড়ি ভাজা। অপরদিকে রাজাপুর উপজেলার মেডিকেল মোড়, কাঠিপাড়া, মনহরপুর, লেবুবুনিয়াসহ ১০টির অধিক গ্রামে এই মুড়ি ভাজার উৎসব চলে। এছাড়াও কাঠালিয়া উপজেলার আমুয়া বন্দেরের বেশ কিছু গ্রামে এই সুস্বাদু মুড়ি ভাজা হয়।
যুগযুগ ধরে এই গ্রামগুলোর প্রতিটি ঘরে গভীর রাত থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে মুড়ি ভাজার উৎসব। রমজানে এ উৎসবে নতুনমাত্রা যোগ হয়। তাই গ্রামগুলোর প্রতিটি ঘরে চলে মুড়ি ভাজার ব্যস্ততা। নারী, পুরুষ এমনকি শিশুরাও মুড়ি ভাজার কাজে শ্রম দিচ্ছে। দুই শ্রেনীর লোক এখানে মুড়ি ভাজে। যারা একটু স্বচ্ছল তারা চাল কিনে সড়াসরি মুড়ি ভাজে আরা গরীব শ্রেনীর লোকেরা অন্যের কাছ থেকে চাল নিয়ে পারিশ্রমিকের বিনিময় মুড়ি ভাজে। এ গ্রামগুলোতে যে মুড়ি ভাজা হয়, তার বেশীর ভাগই দেশী মোটা চালের মুড়ি বা নাখোচি ধানের মুড়ি। মুড়ি বিক্রি করেই চলছে তাদের সংসার। মুড়ি তৈরির চালসহ অন্যান্য সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধির ফলে পরিশ্রমের সঠিক মজুরি পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ মুড়ি পেশা সংশ্লিষ্ঠদের। বর্তমানে দেশের বিভিন্নস্থানে মেশিনে তৈরি হচ্ছে অস্বাস্থ্যকর চিকন মুড়ি। যাতে ক্ষতিকারক মেডিসিন ব্যবহার করা হয়। তবে হাতে ভাজা মুড়িতে কোন মেডিসিন নেই তাছাড়া খেতেও সুস্বাদু। সরকারি ভাবে আর্থিক সহযোগীতা পেলে আরো বেশি স্বচ্ছলতা বয়ে আনতে পারবে বলে আশা করে এখানকার মুড়ি তৈরির কারিগর ও ব্যবসায়ীরা।
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের পাইকারদের কাছে প্রতিদিন বিক্রি হচ্ছে কয়েক লক্ষ টাকার মুড়ি। ম্যশিনে ভাজা মুড়ির চেয়ে হাতে ভাজা মুড়ির স্বাদ বেশী হওয়ায় এখানকার মুড়ির চাহিদা অনেক বেশী। এখানকার মুড়ি ৭৫ টাকা কেজি দরে পাইকারি ও ৮৫ টাকা খুজরা বিক্রি হয়। মুড়ি বিক্রির জন্য এখানে গড়ে ওঠেছে আড়ৎ। মুড়ি ভাজার কারিগররা আড়ৎদারদের কাছ থেকে বিনা মূল্যে চাল নিয়ে তারা মুড়ি ভেজে আড়তে দিয়ে আসেন। এতে আড়তদাররা তাদের মুড়ি ভাজার মজুরী দেন। মজুরী হিসেবে তারা পান মনপ্রতি দেড়শো টাকা, যা তুলনামূলক খুবই সামান্য।
সরেজমিনে নলছিটি উপজেলার তিমিরকাঠির মুড়ি আড়তদার মো. গিয়াসউদ্দিন খান জানান, এক সময়ে দেশের অণ্য ১০ টি গ্রামের মতই এ গ্রামের লোকেরা নিজেদের প্রয়োজনে মুড়ি ভাজতেন। ১৯৮৫ সালে পার্শ্ববর্তী গ্রাম জুরকাঠির বাসিন্দা আমজেদ মুড়ি ভেজে তা বাজারে বিক্রি শুরু করলে তিমিরকাঠির বেশকিছু পরিবার সংসারের বাড়তি আয়ের জন্য মুড়ি ভেজে বিক্রি শুরু করে।
মুড়ি তৈরীর কারিগর দেলোয়ার ও খাদিজা জানান, এ এলাকায় মুড়ির জন্য উপযোগী মোটা, নাখুচী ও সাদা মোটা নামের ৩ প্রজাতির ধান ভাল ফলে বলে মুড়ি উৎপাদন করতে ভাল হয়। বানিজ্যিকভাবে মুড়ি ভাজার সঙ্গে ৩ যুগ ধরে জড়িত ভুইয়া বাড়ির ৪২ ঘরের সবাই মুড়ি ভাজার পেশায় নিয়োজিত। দৈনিক গড়ে ১শ’ কেজি মুড়ি ভাজতে পারলে খরচ বাদ দিয়ে ৭/৮শ’ টাকা লাভ হয়। তবে নিজেরা ধান কিনে সিদ্ধ করে শুকিয়ে মুড়ি ভেজে শহরে নিয়ে বিক্রি করলে দ্বি-গুন লাভ হয়। তাই স্বল্প পূজিঁ খাটালে একজন বিক্রেতা শুধুমাত্র রমজান মাসে ১৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা আয় করতে পারে বলে জানান।
ঝালকাঠি বিসিকের সহকারি মনিটরিং ও মান নিয়ন্ত্রন কর্মকর্তা মো. আল-আমিন জানিয়েছেন, মুড়ি ভাজার সাথে জড়িতদের বিসিকের পক্ষ থেকে আর্থিক ভাবে সহযোগীতা করা হবে। খাদ্য তালিকায় প্রতিনিয়ত নতুন নতুন খাবার যোগ হলেও এই মুড়ি রমজান মাসের ইফতারের অন্যতম উপাদান।
স/এষ্

