বাংলাদেশে সোনা-ডায়মন্ডের বিশাল বাজার রয়েছে। এই বাজার নিয়ন্ত্রণ হয় পুরোটাই অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়। সব খাতের ব্যবসায় সরকারি নীতিমালা থাকলেও সোনা-ডায়মন্ডের ক্ষেত্রে কোনো নীতিমালা নেই। নেই কোনো বৈধ আমদানি নীতিমালাও। ভারতসহ পার্শ্ববর্তী সব দেশেই সোনা-ডায়মন্ড ব্যবসার নীতিমালা থাকলেও ব্যতিক্রম বাংলাদেশ। ফলে দেশের মোট চাহিদার মূল্যবান ধাতুর জোগানের বড় উৎস বর্তমানে চোরাচালান। প্রতিবছর শত শত কোটি টাকার চোরাচালান হয় এ খাতে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে সোনা ক্রয়-বিক্রয়ের নীতিমালা করার দাবি জানালেও সরকার তা করছে না। জানা গেছে, বর্তমানে বাংলাদেশে কয়েক হাজার কোটি টাকার বাজার রয়েছে সোনা-ডায়মন্ড খাতে। সারা দেশে প্রায় ১০ হাজার জুয়েলারি ব্যবসায়ীকে সোনার উৎস হিসেবে তিনটি পদ্ধতির ওপর নির্ভর করতে হয়। এগুলো হচ্ছে অভ্যন্তরীণ উৎস বা রিসাইক্লিং ও ব্যাগেজ রুলস। এই দুই পদ্ধতিতে চাহিদার পুরোটা পাওয়া যায় না। ফলে তাদের নির্ভর করতে হয় তৃতীয় পদ্ধতি চোরাচালানের ওপর। বর্তমান আমদানি নীতিমালায় ঋণপত্র খুলে সোনা আনা গেলেও সেখানে শুল্ক দিতে হয় দেড়শ শতাংশ। আর ঋণপত্রে মাধ্যমে সোনা আনতে গেলে ব্যবসায়ীদের পরিমাণ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়, যা চাহিদার তুলনায় খুবই অপ্রতুল। ফলে কোনো ব্যবসায়ী ঋণপত্রের মাধ্যমে সোনা আমদানি করতে চান না। সোনা চোরাচালান ভয়াবহ রূপ লাভ করেছে গত কয়েক বছরে। বিশেষ করে ২০১৩ সালের পর মণকে মণ স্বর্ণ চোরাচালান হয়েছে। অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালে অবৈধ পথে আসা সোনা ধরা পড়েছে মাত্র পাঁচ কেজি। ২০১৩ সালে ধরা পড়ে ৫৬৫ কেজি। প্রতিবছরই এ হার বৃদ্ধি পেয়েছে। গত চার বছরে অবৈধ পথে আনা সোনা ধরা পড়েছে ১১০০ কেজির বেশি। ধরা পড়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জমা রাখা হয় এসব সোনা। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে প্রায় পাঁচ হাজার কেজি স্বর্ণ রয়েছে। এর অর্ধেকেরই মালিকানা কেউ দাবি করেনি। বাকি কিছু অংশের মালিকানা নিয়ে মামলা চলছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিলামের মাধ্যমে সোনা বিক্রি করে থাকে। বাংলাদেশে সর্বশেষ ২০০৮ সালে নিলাম হয়েছিল। এরপর আর কোনো নিলান হয়নি। ফলে প্রতিবছরই বাড়ছে চোরাচালানের পরিমাণ। বর্তমানে দেশে সোনা ক্রয়-বিক্রয়ের বড় বাজার রাজধানীর পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার এলাকা। সেখানকার পুরনো ব্যবসায়ীরা এটি নিয়ন্ত্রণ করেন। তাঁতীবাজার এলাকায় ব্যবসায়ীরা সাধারণ মানুষদের কাছ থেকে সোনা কেনেন। কোনো ধরনের কাগজপত্র ছাড়াই এই বিনিময় চলে। ক্রেতা-বিক্রেতার কারোই কোনো কাগজপত্র থাকে না। তবে বড় অংশই আসে অবৈধ পথে। এই সোনাই আবার সারা দেশের ব্যবসায়ীরা ক্রয় করেন, যা চলে যায় দেশের বিভিন্ন এলাকায়। ঢাকার বড় বড় জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানও তাঁতীবাজার এলাকা থেকে সোনা কেনেন। সোনা ক্রয়-বিক্রয়ের ওপর সরকারি ভ্যাট-ট্যাক্স দিতে হয়। তবে সেটি শুধু গয়নার ওপর। কাঁচা সোনা বা সোনার বারের লেনদেনের ওপর ভ্যাট-ট্যাক্স দেওয়া হয় না। কারণ কাঁচা সোনা ক্রয়-বিক্রয় করতে হলে উৎস দেখাতে হয়। সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কেনা সোনায় উৎস দেখানো যায় না। কারণ তাদের হাতেও কোনো কাগজপত্র থাকে না। এর ফলে স্বর্ণ ব্যবসার পুরোটা চলে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে বা নীতিমালার বাইরে। এ ছাড়া বর্তমানে তিন-চারজন ব্যবসায়ী খুব সামান্য পরিমাণ ডায়মন্ড আমদানি করেন। তবে গ্রাহকদের কাছ থেকে কাগজপত্র ছাড়াই পুরনো হীরা বা ডায়মন্ড কেনেন ব্যবসায়ীরা। বর্তমানে ব্যাগেজ রুলসের মাধ্যমে কিছু সোনা দেশে আসে। এ রুলসের আওতায় বিদেশ থেকে একজন যাত্রী ১০০ গ্রাম (৮.৫৭ ভরি) পর্যন্ত সোনার অলঙ্কার বিনা শুল্কে এবং ২৩৪ গ্রাম সোনার বার আনতে পারবে। সোনার বারের ক্ষেত্রে প্রতি ১১.৬৬৪ গ্রামে তিন হাজার টাকা শুল্ক পরিশোধ করতে হয়। অন্যদিকে ব্যবসায়ী পর্যায়ে দুটি পৃথক এইচএস কোডে প্রতি ১১.৬৬৪ গ্রাম (এক ভরি) সোনার জন্য ৩ হাজার টাকা এবং ৪ শতাংশ অগ্রিম ব্যবসায় মূসক (এটিভি) দেওয়ার বিধান রয়েছে। ব্যাগেজ রুলসের মাধ্যমে যে সোনা আসে তার দামও দেশীয় বাজারের তুলনায়, এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের স্থানীয় বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক বেশি। রাজধানীর তাঁতীবাজার এলাকায় প্রায় ২০০ ব্যবসায়ী রয়েছেন, যারা সারা দেশে সোনা ব্যবসার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করেন। দেশের বড় বড় জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানের সোনাও এই ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু সোনা ক্রয়-বিক্রয়ের বৈধ কোনো পদ্ধতি তাদেরও নেই। আলাপকালে তাঁতীবাজার এলাকার একাধিক ব্যবসায়ী বলেন, ‘সোনা ক্রয়-বিক্রয় পুরোটাই অস্বচ্ছ। আমাদের সোনার মূল উৎস সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কেনা। এগুলো গলিয়ে আমরা বার তৈরি করি। সেটি বিক্রি হয় সারা দেশে। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কেনা সোনার উৎস বৈধ হিসেবে দেখানোর সুযোগ নেই। তারা তো আমাদের কোনো কাগজপত্র দেন না। আমরা চাই স্বচ্ছভাবে ব্যবসা করতে। বর্তমান নীতিমালায় সোনা আমদানির প্রক্রিয়া জটিল ও ব্যয়বহুল। বহুদিন ধরে সরকারের কাছে বৈধভাবে সোনা বিক্রির ব্যবস্থা করার দাবি করলেও শুনছে না। ’ জানতে চাইলে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির সভাপতি গঙ্গা চরণ মালাকার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমরাও চাই সোনা চোরাচালান বন্ধ হোক। বৈধ পথে এ ব্যবসা হোক। একটা নীতিমালা সরকার করুক। কিন্তু ২০ বছর ধরে আমরা একটা নীতিমালা দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি করছি। একাধিকবার বিষয়টি নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছি। কিন্তু তারা কিছুই করেনি। ’ তিনি বলেন, ‘ঋণপত্র খুলে কোনো ব্যবসায়ী সোনা আমদানি করেন না। প্রক্রিয়াটি খুবই জটিল ও সময়সাপেক্ষ। দামও বেশি পড়ে। আবার ব্যাগেজ রুলসে সোনা আনলে দাম বেশি পড়ে। পাশের দেশ ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনুমোদিত এজেন্টের মাধ্যমে সোনা বিক্রি করে। এমন একটা ব্যবস্থা করার জন্য ২০ বছর ধরে দাবি করছি আমরা। সরকারকে কোটি কোটি টাকা ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়ে আসছি। তাই হঠাৎ করে বললেই হবে না আমাদের ব্যবসা অবৈধ। সমস্যার মূলটা বুঝে সেটি সমাধানের চেষ্টা করুন। ’ জানতে চাইলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. আবদুল মজিদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বাংলাদেশে স্বর্ণ-ডায়মন্ডের বাজার পুরোপুরি অস্বচ্ছ। এটা নিয়ন্ত্রণে আনা খুবই জটিল। তবে দেশের চাহিদা মেটাতে বা দেশীয় বাজার ঠিক রাখতে সুনির্দিষ্ট কিছু পদ্ধতি মেনে চলা উচিত। এ জন্য সরকারের নীতিমালার চেয়েও প্রতিশ্রুতি থাকা দরকার। আমরা এটা ঠিক করতে চাই। সবাই মিলে যদি এ খাত নিয়ে কাজ করে, তাহলে হয়তো কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। ’ ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন—এফবিসিসিআইর সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘যে কোনো ব্যবসা একটা নীতিমালার ভিত্তিতেই চলা উচিত। জুয়েলারি শিল্পেও নীতিমালা থাকা উচিত। ব্যবসায়ীরা যদি মূল্য সংযোজনক কর (মূসক বা ভ্যাট) ও আয়কর দিয়ে থাকেন, তাহলে হয়রানি কাম্য নয়। অনেক জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানে নগদ ক্যাশেই লেনদেন হয়। সেখানে চেক বা ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন হয় না। এসব ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলায় এখনই নীতিমালা করা উচিত। ’ শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমদানি-নীতি আদেশেই সোনা আমদানির কথা বলা আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিয়ে ঋণপত্র বা এলসি খুলে ব্যবসায়ীরা সোনা আমদানি করতে পারেন। বাংলাদেশ ব্যাংক যাতে অনুমোদন দেয়, তা নিশ্চিত করতে গতকাল বুধবারই একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। ’
স/এষ্

