এম এ কাদের : হবিগঞ্জ: হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরগুনা জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) হয়েও সহসাই বাহুবল ছাড়ছেন না ইউএনও সাইফুল ইসলাম। মন্ত্রনালয়ে কুটির জোড় থাকায় জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয় আদেশ করার পরও জেলা প্রশাসক সাবিনা আলমও রিলিজ দিচ্ছেন না তাকে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ১০ এপ্রিল জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয়ের এক আদেশে তাকে এডিসি পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়।
জানা যায়, ২০১৫ সালের মে মাসের শেষদিকে সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা থেকে বদলী হয়ে সাইফুল ইসলাম বাহুবল উপজেলার নির্বাহী অফিসারের দায়িত্বে যোগদান করেন। যোগদানের পর থেকেই দুই লাখ অধ্যুষিত লোকের এই উপজেলার মানুষের মাথায় ডান হাত রেখে প্রতারনা করে বাম হাতের থাবা দিয়ে হাওর থেকে শুরু করে পাহাড় এলাকা পর্যন্ত অবৈধ দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি টাকার মালিক হয়েছেন।
উপজেলা প্রশাসনের প্রতিটি বিভাগ থেকেই তিনি পাচ্ছেন নজরানা। ইজারা ছাড়াই অনন্ত ১০ স্থান থেকে বালু উত্তোলনে তিনি আদায় করছেন মাসে তিন লক্ষ টাকা।
উপজেলার মুগকান্দি এলাকায় ১টি বালু মহালের ইজারা চেয়ে আবেদন করেছিলেন আতাউর রহমান সেলিম। হাইকোর্টে মামলা থাকায় তাও বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হয়নি বালু তুলার কাজ। ইজারা ছাড়াই ইউএনও’কে মাসিক মাসোহারা দিয়ে হরিতলা, ডুবাঐ, পুটিজুরী, কল্যাণপুর, রশিদপুর, হিলালপুর, কালিছড়া, কালাকুলা, কামাইছড়া সহ প্রায় ১০ জায়গা থেকে বালু উত্তোলন করছেন বালু খোকোরা। তাদের কাছ থেকে মাসিক ৩০-৪০ হাজার টাকা করে উৎকোচ আদায় করছেন তিনি।
উপজেলার মহাশয়ের বাজার এলাকার খিলবামই থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন করা হয়। এনিয়ে কথা হয় মহাশয়ের বাজার এলাকার বাসিন্দা মনজুর হোসাইনের সাথে তিনি বলেন, তারা ইউএনও’কে মাসিক মাসোহারা দিয়েই বালু তুলছে পত্রিকায় লেখা লেখি করে লাভ নেই।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক জিতু মিয়া বলেন, বালুর ট্রাক্টরের কারনে আমার ছাত্ররা স্কুলে আসা যাওয়া করতে পারছেন না। বাতাসে বালু উড়ে ছাত্রছাত্রী ও পথচারীদের চোখে ডুকছে। এর প্রতিবাদ করার সাহস পাইনা আমরা। কারন ক্ষমতাসীন দলের লোকজন এটার সাথে জড়িত। খবর পেয়েছি ইউএনও স্যারকে ম্যানেজ করেই নাকি বালু উত্তোলন করা হয়।
উপজেলার সবচেয়ে বড় হরিতলা বালু মহালের ব্যবসায়ী আমির হোসেন জানালেন, লেখা লেখি করে কিতা করতায়রে বা উপরে ম্যানেজ করেই তো বালু তোলছি। তোমরার কিতা ক্ষতি করলাম আমরা। আমরা তো বালু তোলি আর না তুলি ইউএনওকে তো মাসিক টাকা দেওনই লাগে। আবার হবিগঞ্জ থেকেও মাঝে মাঝে আইয়া হামলা দেয় তখনও দেওন লাগে মোটা অংকের টাকা।
বাহুবলে ঘটে যাওয়া আলোচিত চার শিশু হত্যার স্মৃতি স্বরুপ পাঠাগার টেন্ডার ছাড়াই তৈরির নামে তিনি আতœসাৎ করেছেন ১৮ লক্ষ টাকা। চার শিশুর পরিবারকে ঘর বানানোর কথা বলে তাদের পুরাতন ঘরটি ভেঙ্গে দেন ইউএনও। খোলা আকাশের নিছে দিনাতিপাত করে নিহত শিশুর পরিবার। সেখান থেকেও তিনি আত্নসাৎ করেছেন তিন লক্ষ টাকা। ঘর তৈরির জন্য আনা ইউএনওর লোক সেলিম নিয়ে যায় রড সিমেন্ট। সে তার বাড়িতে তৈরি করে নতুন ঘর। এমনই একটি অভিযোগ চার শিশুর পরিবার প্রধানমন্ত্রীর বরাবরে প্রেরন করেছে। ইউএনও সেই অভিযোগটিও ম্যানেজ করেছেন উপরে লোক থাকার কারনে।
সম্প্রতি চাপের মুখে পড়ে তিনি ঘর তৈরির কাজে হাত দিয়েছেন। ১৫ ফুট লম্বা ৮ ফুট পাশের একটি ঘরের কাজ শেষ করেছেন। মোকাম ঘরের মত ঘরটিতে নেই কোন বারিন্দাও। একই ধরনের আরও দুটি ঘরের ষ্টাকচার তৈরি করেছেন ইউএনও। ৩ নং মানের কিছু ইট,রড সিমেন্ট এনে রেখেছেন। যা দিয়ে দুটি ঘরের চার ভাগের এক ভাগও কাজ হবেনা। আর একটি ঘর তৈরির কাজের তো খবরই নাই। এ রিপোর্ট লেখা কালে ঘরগুলির কাজ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
সূত্র জানায়, স্মৃতি স্বরুপ পাঠাগার তৈরির ৯ মাস যেতে না যেতেই ভবনে ফাঠল ধরে গেছে। সুন্দ্রাটিকি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ কেটে পাঠাগারের ভিট ভরাটের জন্য মাঠি কেটে নেন ইউএনও। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠটি অকেজো হয়ে পানি লেগে আছে। মাঠে খেলতে নাচতে পারছে না ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্কুলের এক শিক্ষক জানান, চার শিশুর স্মৃতি পাঠাগার তৈরির নামে ইউএনও আমাদের স্কুলের মাঠের মাটি কেটে পাঠাগার ভবনের নিচ ভরাট করে তিনি পুরো মাঠটিকে খেলার অনুপোযোগি করে তুলেছেন। একটু বৃষ্টি হলেই মাঠে পানি জমে থাকে।
যুব উন্নয়ন অফিস সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি যুব উন্নয়ন অফিসের আশ্রায়ণ প্রকল্পের জন্য আসা প্রশিক্ষণ না করেই বিল ভাউচার তৈরি করে প্রশিক্ষনের ৪ লাখ টাকাও তিনি আতœসাৎ করেছেন। আত্নসাৎ করেছেন মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা ও একটি বাড়ি একটি খামার অফিস দুই বছরে ৫০ হাজার টাকা টিএ ডিএ বিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অফিস সহকারী জানায়, স্যার আসার পরে টিএডিএর বিল পাইনি। বিলের জন্য হিসাব রক্ষন অফিসে ধর্ণা দিয়েছি এর ইয়াত্তা নেই। দুই বছরে আমরা এক টাকাও পেলাম না। এই মাসে না আগামী মাসে হয়ে যাবে বলে সময় পার করে দিচ্ছে হিসাব রক্ষন কর্মকর্তা। পরে জানলাম টাকা তুলে স্যার নিজেই নাকি ভক্ষন করেছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের অধিনে ৩শত ৫০ প্রকল্পে ১০ লক্ষ টাকা আত্নসাতের অভিযোগও রয়েছে ইএনওর উপর। অভিযোগ রয়েছে এমপিদের স্বাক্ষরিত পত্রে তিন টন চাল অথবা গম থাকলেও ইউএনও দিচ্ছেন ২ টন। তিনি হাতে রাখেন ১টন।
মিরপুর উন্নয়ন ফোরামের সাধারন সম্পাদক এম এ আজাদ জানান, আমাদের সংগঠনে সোলার প্যানেল স্থাপনের নামে আমরা তিন টন চাউল পেলেও আমাদেরকে দেওয়া হয় দুইটন। প্রথম তারিখে দেওয়া হয় দেড়টন পরে দেওয়া হয় আধাটন। এ বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আশীষ কুমার বলেন, ইউএনও স্যার আপনার কাজ দেখে বাকী একটন দিবে। পরে খবর পেলাম ইউএনও ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মিলে আমাদের এক টন তাদের পেটে হজম করেছেন। এমনি অভিযোগ রয়েছে হরাইটেকা গ্রামের সবুজ সংঘের। তারা জানালেন অফিস মেরামত বাবত দুই টন গম এমপি দিলেও ইউএনও আমাদের দিলেন দেড় টন। অভিযোগ রয়েছে বিহারীপুর যুব কল্যান সংগঠনেরও।
পত্রিকায় কোন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করে সম্প্রতি সাতকাপন ইউনিয়নের শিশু কল্যান ট্রাষ্টের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একজন প্রধান শিক্ষক দুই জন সহকারী শিক্ষক নিয়োগে তিনি হাতিয়ে নিয়েছেন ৯ লক্ষ টাকা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে তিনি ৫ লক্ষ টাকা আর সহকারী শিক্ষকের কাছ থেকে তিনি তিনি তিন লক্ষ টাকা আদায় করে চাকুরী দিয়েছেন। এমনকি এক সাংবাদিকের আত্নীয়ের কাছ থেকেও তিনি হাতিয়ে নিয়েছেন মোটা অংকের টাকা। চাকুরী না হওয়ায় আরেক সাংবাদিকের টাকা ফেরৎ দিয়েছেন বলেও জানান ঐ কর্মকর্তা।
একটি সূত্র জানায়, উপজেলায় এমপি কেয়া চৌধুরী, এমপি মুনিম চৌধুরী বাবু ও উপজেলা চেয়ারম্যানের সাথে বিরোধ লাগিয়ে রেখে উপজেলা নির্বাহী অফিসার বাহুবলকে লুঠে ফুটে খাচ্ছে। বর্তমানে তিন গ্রুপে রাজনীতি চলছে বাহুবলে।
মন্ত্রনালয়ে উনার লোক আছে বলে তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন দুর্নীতি। ঘোষখোর ইএনওর দাপটে মুখ খুলছে না কেউ। প্রমোশনের খবর পেয়ে মুখ খুলতে শুরু করেছে সাধারন জনগন। প্রশাসনের প্রতিটি কর্মকর্তা জিম্মি হয়ে পড়েছে ইএনওর কাছে।
ইউএনও অফিসের এক সহকারী জানান, স্যারের হাত বড় লম্বা আপনারা উনার দুর্নীতি নিয়ে লিখে কোন লাভ হবে না। স্যার ২ তারিখ সরকারী সফরে থ্যাইল্যান্ড যাচ্ছে। গত কয়েকদিন আগে ঢাকায় ট্রেনিং করে মন্ত্রনালয়ে গিয়ে সব ঠিক করে এসেছে। স্যার বাহুবলেই থাকবেন। জুনের আগে তিনি যাচ্ছেন না বলেও জানান তিনি। তিনি কথা প্রসঙ্গে বলেন স্যার উনার প্রমোশনটি ষ্টে করার ব্যবস্থা করছেন।
তিনি আরও বলেন স্যার ২ মে থেকে ৫ মে পর্যন্ত থাইল্যান্ড থাকার কথা থাকলেও স্যার ১৫ দিন ঘুরে আসবেন বলেও জানান তিনি।
গত ২৭ এপ্রিল জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয় থেকে এখনও কেন রিলিজ হচ্ছেন না এ নিয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। কাল বুধবার (৩ মে) মধ্যে রিলিজ না হলে স্ট্যান্ড রিলিজ বলে গন্য করা হবে বলেও আদেশে বলা হয়।
ইউএনও বলে বেড়াচ্ছেন জুনের আগে তিনি বাহুবল ছাড়ছেন না। পুরো উপজেলা জুড়ে গুঞ্জন শুরু হয়েছে ইউএনও কুটির জোড় কোথায়।
মিরপুর প্রেসক্লাবের সাধারন সম্পাদক ও মিরপুর পৌরসভা আন্দোলনের রুপকার দিদার এলাহী সাজু করাঙ্গীনিউজকে বলেন, উপজেলায় রাজস্ব খাতে মিরপুর বাজার এগিয়ে থাকলেও ই্উএনও আমাদের পক্ষে রিপোর্ট দিচ্ছে না। তিনি পরোক্ষভাবে এ বিষয়ে উৎকোচ দাবী করে আসছেন।
বাহুবল উপজেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সোহেল আহমদ কুঠি এক কথায় বলেন, আপদামস্তক একজন ঘোষখোর ইউএনওর বিরুদ্ধে বাহুবল উপজেলায় জনশ্রুতি রয়েছে বালু মহাল থেকে মাসিক মাসোহারা আদায় করে বালু তুলার ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন বালু খোকোদের। ঘোষ দুর্নীতির মূল হোতা ইউএনও চলে গেলে বাহুবলের মানুষ শান্তি পাবে।
তিনি আরও বলেন সাইফুল ইসলাম ফরিদপুরের এসিল্যান্ড থাকা অবস্থায় দুর্নীতির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা এখনও চলছে। সর্বশেষ ধর্মপাশা উপজেলার ইউএনও থাকা অবস্থায় ঘোষ দুর্নীতির অভিযোগে সাধারন জনতার রোষানলে পড়ে তাকে বাহুবল পাঠানো হয়।
বাহুবল প্রেসক্লাব সভাপতি সিনিয়র সাংবাদিক সৈয়দ আব্দুল মান্নান বলেন, ইজারা ছাড়াই উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাইফুল ইসলামের ইশারায় উপজেলার বেশ কয়েকটি স্থান থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। স্থানীয় পত্রিকায় কয়েকবার সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে। উপজেলার প্রতিটি সেক্টরেই উনার শক্ত হাত দিয়ে তিনি দুই হাতে টাকা কামাই করছেন।
বাহুবল উপজেলা ছাত্রলীগ সভাপতি জুনাঈদ আহম্মদ বলেন, ইউএনও একজন ঠিকাদার। তিনি ঠিকাদারীর মাধ্যমে সব কাজ থেকেই হাতিয়ে নিচ্ছেন মোটা অংকের টাকা। টাকা দিলেই উনার কাছে সব কাজ সঠিক বলেও মন্তব্য করেন ছাত্রলীগ সভাপতি।
বাহুবল উপজেলা চেয়ারম্যান ও আ’লীগের সাধারন সম্পাদক আব্দুল হাই বলেন, সরকারের কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে ইউএনওকে ম্যানেজ করে অবাধে বালু তুলছে বালু ব্যবসায়ীরা। তিনি আরও বলেন কোন মিটিং না করেই ইউএনও জলমহাল হাট বাজার নিজস্ব লোকদের মাধ্যমে মাসোহারা বা বাৎসরকি মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ইজারা দিচ্ছেন। এ নিয়ে আইন শৃঙ্খলা মিটিংয়েও কথা হয়েছে।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জানান, আমার উপর যে সব অভিযোগ আনা হয়েছে আদৌ সত্য নয়। বালুর উপর ভ্রাম্যমান আদালত বেশ কয়েকবার পরিচালনা করা হয়েছে। এখানে বালু উত্তোলন বর্তমানে সম্পূর্ণ বন্ধ আছে। আর চার শিশুর ঘরের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। আমি কারো কাছ থেকে কোন প্রকার মাসোহারা নেই না।
এ ব্যাপারে হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসক সাবিনা আলম বলেন, আমি কোন অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ ফেলে অবশ্যই তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি আরো বলেন, ইউএনও দু’এক দিনের মধ্যে থাইল্যান্ড সফরে যাচ্ছেন। সেখান থেকে ফেরার পরই রিলিজ দেয়া হবে।
স/এষ্

