ঝিনাইদহ প্রতিনিধি॥
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার পোড়াহাটি গ্রামের ঠনঠনে পাড়ায় জঙ্গী আস্তানার যে বাড়িটিতে আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অভিযান চালিয়ে অস্ত্র,গুলিসহ বিপুল পরিমান বিস্ফোরক উদ্ধার করেছিল সেই বাড়ীটির মালিক আব্দুল্লাহ। বর্তমানে সে এলাকায় জঙ্গী হিসেবে পরিচিত। আব্দুল্লাহর বয়স প্রায় ৪০/৪২ বছর। ৫ বছর আগে সমাতন ধর্ম ত্যাগ করে সে মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করে। তখন তার নাম ছিল প্রভাত কুমার। তার পিতার নাম চৈতন্য বাউতি। মা নাম সন্ধ্যা রানী। আব্দুল্লাহরা তিন ভাই। বড় ভাই দিলীপ বিশ্বাস, মেজ ভাই বিপুল বিশ্বাস ও সবার ছোট আব্দুল্লাহ। আব্দুল্লাহ মোট ৩ টি বিয়ে করেছে বলে এলাকাবাসী সূত্রে জানাগেছে।
ধর্মান্তিত হবার আগে সে একটি বিয়ে করে। সেই ঘরে তার একটি মেয়ে হবার পর তাকে ছেড়ে দেয়। পরে মেজ ভাই বিপুল বিশ্বাসের শ্যালিকার সাথে প্রেম করে তাকে দ্বিতীয় বিয়ে করে। সেই ঘরে ২ টি পুত্র সন্তান হবার পর তাকেও ছেড়ে দেয় আব্দুল্লাহ। ৫ বছর আগে আব্দুল্লাহ ধর্মান্তরিত হবার পর পরিবারের সদস্যরা তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়। এরপর সে সদর উপজেলার চুয়াডাঙ্গা গ্রামের আব্দুল লতিফের মেয়ে ফাতেমা ওরফে রুবিনাকে বিয়ে করে। এ ঘরে তার আয়েশা (২) নামের এক কন্যা সন্তান রয়েছে।
প্রতিবেশি আসলাম, ইউসুফ আলী ও চাঁদ আলী জানান, বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবার পর আব্দ্ল্লুাহ পোড়াহাটির ঠনঠনে পাড়ার ওয়াহেদ নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে ৬০ হাজার টাকার বিনিময়ে মাঠের মধ্যে জমি কিনেন। সেখানে একটি দুই রুমে টিন সেট বাড়ি করে সে বসবাস করছিল। আব্দুল্লাহ বাড়িতে কেউ যেত না। মাঝে মধ্যে মটর সাইকেলে অচেনা কিছু লোক তার বাড়িতে যাওয়া আসা করতো। বাড়িটি টিন দিয়ে চারিদিক ঘেরা ছিল। বাইরে থেকে কিছুই দেখা যেত না। বাড়িতে থাকলেও কেউ ডাকলে সাড়াও দিত না। সে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে চলাফেরা করতো।
প্রতিবেশি শিরিনা খাতুন জানান, আব্দুল্লাহর স্ত্রী ফাতেমা ওরফে রুবিনা কারো সাথে কথা বলতো না। সবসময় মুখ কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখতো। তার স্ত্রী কে কেউ দেখতে পারতো না। সব সময় বাড়ির গেট তালা লাগিয়ে রাখত।
গ্রামের টিপু জোয়ার্দ্দার জানান, ধর্মান্তরিত হবার আগে আব্দুল্লাহ পোড়াহাটির শরিফুল ইসলামের তেল পাম্পে ১৪/১৫ বছর ধরে শ্রমিকের কাজ করেছে। বর্তমানে সে আলমসাধু (স্যালো ইঞ্জিন চালিত যান) গাড়ী চালাতো। আলমসাধুতে সে কাঠের গুড়ি নিয়ে বিভিন্ন স্থানে দিত। মাঝে মধ্যে মটর সাইকেলে ঘুরতো। বিভিন্ন সময় তার সাথে মটর সাইকেলে অপরিচিত লোকদের আসতে দেখা যেত।
জামিরুল ইসলাম নামের গ্রামের আরেক ব্যক্তি জানান, আব্দুল্লাহ গ্রামের মসজিদে নামাজ পড়ত না। গ্রামের মসজিদে নাকি তার নামাজ হবে না তাই সে শহরের মারকাজ মসজিদে নামাজ পড়তে যেত। গ্রামের কোন লোকের সাথে সম্পর্ক ছিল এমন আমরা দেখিনি।
আব্দুল্লার জঙ্গী সম্পৃক্ততা কথা জানতে পেরে গ্রামের লোকজন হতবাগ হয়ে যায়। আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাকে গ্রেফতার করতে পারলে তারা বেশি খুশি হতেন বলেও জানান।
উল্লেখ্য গত শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৫ টার দিকে আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জঙ্গী আস্তানা সন্দেহে পোড়াহাটি গ্রামের আব্দুল্লাহর বাড়িটি ঘিরে রাখে। রাত সাড়ে ১০ টার দিকে পুলিশের খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি দিদার আহম্মেদ ভোর ৬ টা পর্যন্ত অভিযান স্থগিত ঘোষণা করেন। পরদিন অর্থাৎ গতকাল শনিবার সকাল সোয়া ৯ টা থেকে অপারেশন সাউথ প শুরু করেন। অপারেশন চলাকালে ওই বাড়ি থেকে থেকে ২০ ড্রাম হাইড্রেজেন পার অক্সাইড, ১৫ টি জিহাদী বই উদ্ধার করে। এ সময় ৫ দফায় ৫ টি শক্তিশালী বোমা নিস্ক্রিয় করে বোমা ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্য।
অপারেশনে কাউন্টার টেরোরিজম এন্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম, র্যাব, পুলিশ, পিবিআই, এলআইসি, বোমা ডিসপোজাল ইউনিট, খুলনা রেঞ্জ পুলিশসহ ৪ শতাধিক আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অংশ নেন।
অভিযান শেষে সেখান থেকে ২০ ড্রাম হাইড্রজেন পার অক্সাসাইড, ১০০ টি প্যাকেট লোহার বল, ৩টি সুইসাইডাল ভেষ্ট, ৯টি সুইসাইডাল বেল্ট, বিপুল পরিমান ইলেকট্রিক সার্কিট, ১৫ টি জিহাদী বই, ১ টি বিদেশী পিস্তল, ১টি ম্যাগজিন, ৭ রাউন্ড গুলি, ১টি মোটরসাইকেল, ১টি চাপাতি, বিপুল পরিমান বিস্ফোরক, ৬টি শক্তিশালী বোমা উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩টি সুইসাইডাল ভেষ্ট ও ২ টি বোম নিস্ক্রিয় করা হয় বলে ঘটনাস্থলে এক সংবাদ সম্মেলনে খুলনা রেঞ্জ ডিআইজি শেখ দিদার আহম্মেদ জানান। সংবাদ সম্মেলনের সময় খুলনা রেঞ্জের এডিশনাল ডিআইজি হাবিবুর রহমান, জেলা প্রশাসক মাহবুব আলম তালুকদার, পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আব্দুর রউফ মন্ডল, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আজবাহার আলী শেখ, কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের কর্মকর্তা, বোম ডিস্পোজাল ইউনিটের প্রধানসহ গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
স/ এষ্

