আর্জেন্টিনা জাতীয় ফুটবল দলের মধ্যে এমনকিছু কঠিনতা আছে, যেটা দিয়ে কখনো সফলতা সম্ভব নয়। যদিও তাদের দলীয় সাফল্যের দৃষ্টিকোণকে অস্বীকার না করে উপায় নেই। এই দৃষ্টিকোণ থেকে যদি হয় ইতিবাচক তাহলে বলতে হবে, সেটা সাধারণ দর্শকদের মর্মউপলব্ধি করতে না পারা। নেতিবাচক কিছু হলে সেটা ঐ দর্শকরা খুব সহজে বিষয়টি ধরে নেয়। ধরার বিষয়টি নিয়ে আর যাইহোক, বিশ্বস্তরের ফুটবল দর্শকদের জ্ঞানগম্যি গ-ির মধ্যে পড়ার কথা নয়। বিশেষ করে আর্জেন্টিনার স্থানবদলের কথা লিখতে হলে সুপরিসরে অনেক বড় হবে, তাই সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা তুলে ধরাই যথেষ্ট হবে না।
১৯৮৬ বিশ্বকাপ মঞ্চে একবার এ রকম একটা ঘটনা ঘটেছিল আর্জেন্টিনা বনাম উরুগুয়ে। সেই খেলার বিবরণ দিয়ে বোঝা যাবে দলটা কেমন ছিল? আজেন্টাইনের সেন্টার ফরোয়ার্ড ভ্যালডানো প্রতিপক্ষ উরুগুয়ের ডানদিকে থ্রুব্রেকে মাঝখানে দৌঁড়ে যাওয়া জিউইস্তিকে ওয়াল পাস দেন। ওভাবে বের হয়ে যাচ্ছিলেন সেই জিউইস্তি। এমন পরিস্থিতির মধ্যে এর চিত্র পাল্টানো সম্ভব সেটা বুঝেছিলেন জিইউস্তি স্বয়ং নিজেই। ব্যক্তি নয়, দলের স্বার্থেই ফুটবলের সহাবস্থান তৈরি করা-এই উপলব্ধি তার মাথায় আসে বটে। কিন্তু সেটা ঐ মুহুর্তে অসম্ভব একটা পরিস্থিতি চাপে পড়েছিলেন সেই ভ্যালভানো আর জিউইস্তি। এভাবে খেলার মধ্যে পড়ে কেউ চৌকস হয় না। গোল তৈরি করতে হলে নিজেদের ঝালাইয়ের যোগ্যতা গড়ে নিতে সময় লাগে না। সেই ফিরিস্তি ছিল অসম্ভবের পর্যায়ে। যা অনেক দেশগুলোর খেলোয়াড়দের মাঝে কিসের কেন যেন প্রবল আপত্তি!
প্রতিপক্ষ উরুগুয়ের রক্ষণভাগের খেলোয়াড়রা বুঝতে পারছিল না, কি করা উচিত? কিংবা এমনো আভাস পাচ্ছিল যে, আজেন্টাইনের সিঙ্গেল খেলোয়াড়কে রুখে দিতে উরুগুয়ানের ৩ ডিফে-ারই যথেষ্ট। জিউইস্তিকে ঠেকাতে তিন পজিশনের চোরাগুপ্তা বের করেছে ঐ তিন খেলোয়াড়। কি সাংঘাতিক ব্যাপার, তাই না?
ভ্যালডানোর থ্রুব্রেককে আটকানোর উদ্দেশ্য নিয়ে ঐ জিউইস্তিকেও ওয়ালস্ট্রিট বা খোলা রাস্তাকে বন্ধ করতে চাওয়ার মধ্যে এক মুহূর্তেও সময় বের করে নিতে হয় না তা কে জানতো! যা কেউ ভাবেইনি যেভাবে ঘটার কথা সেভাবে হওয়ার নয়। কিন্তু ঘটে গেছে দৈবাৎ শক্তির আধারের নিঃসীমের ছন্দে। জিউইস্তি বুঝে যান, কি করতে হবে? ভ্যালডানোর কক্ষে জিউইস্তি ঐ ছোট্ট একটি ক্ষুদে টোকা দেন। সেই বল চলে যায় সকল খেলোয়াড়ের মাথার উপর। উড়ন্ত বলটাকে না দেখে দৌড়ে যান ভ্যালডানো। কি অবাক কা-!!
গতিপথটা সোজা মাপার মধ্যে বল চলে গেছে ভ্যালডানো’র কাছে। আর কিনা সোজা গোলপোস্টের জালে জড়িয়ে দেন তিনি। আপসে যোগাযোগ কিনা? মন্ত্রণায় বলে-বল অনুশীলনে সেভাবে হয় না। আসল খেলায় ঘটে। একেবারে ওয়ান টু টাচ। তর্ক করে লাভ নেই। শোনা কথাইয়ের কাছে এঁরা আসলে কিছুই না। তাই প্র্যাকটিসে এমন এমন যদি হয়, তাহলে অন্যকিছু তো হয় না। তবে খেলোয়াড়দের সাধনার কোনো বিকল্প নেই।
ঈশ্বরের প্রদত্ত কোনো বান্দা এভাবে যাদুর ছোঁয়ার পরশ দিয়ে দেন খেলোয়াড়ের পায়ে পায়ে। অবশ্য জানিয়ে রাখা ভালো, প্রথম বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা সেমিফাইনাল পর্যন্ত উঠে। এই ঘটনার পর দীর্ঘদিন আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপের সাফল্যের ফল্গুধারা হতে অনেক দূরে ছিল। সহসা একদিন এমন ঘটনা ঘটে ১৯৭৮ বিশ্বকাপ মঞ্চে।
এখন বিষয়টা অন্য প্রসঙ্গে চলে যেতে হচ্ছে। বাংলাদেশের ক্রীড়ামোদীরা আর্জেন্টিনাকে খুব ভালো করে জানতে পারেন ১৯৭৮ সালের পরবর্তী ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে। ১৯৭৮ ও ১৯৮৬ বিশ্বকাপের আর্জেন্টিনা জাতীয় দল তাদের চূড়ান্ত টপ ফর্মের স্বাভাবিক খেলা সকলকে মুগ্ধ করেছিল এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
’৮৬ মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত অধিকাংশ ফুটবলবোদ্ধাদের মন্তব্য-‘একমাত্র দিয়েগো ম্যারাডোনার নেতৃত্ব এমনটি উদাহরণ ঘটানো সম্ভব হয়েছে যা বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়নের খেতাবটি পাওয়া।’ শুধু তাই নয়, এও বলতে শোনা যায়, ‘ম্যারাডোনা গ্রেট ফুটবলার।’ তাঁর যোগ্যতা প্রমাণিত। ম্যারাডোনা ছাড়া বিশ্বের দরবারে তার মতো খুব কম বিরল প্রতিভা খেলোয়াড়কে দেখা গেছে। ঈশ্বর প্রেরণকৃত দেবদূতধারী ম্যারাডোনা ১৯৮২ সালে ১২তম বিশ্বকাপ হতে ১৯৯৪ সালে ১৫তম বিশ্বকাপ পর্যন্ত একাই টেনেটুনে দলটিকে এতদূর নিয়ে যান। এর মধ্যে তার সময়ে সেরা টপফর্মের ১৯৮৬ সালে ১৩তম বিশ্বকাপ ফিফা কাপ ট্রফির মতো দুর্লভ পুরস্কার আর্জেণ্টিনাবাসীদের দরবারে পৌঁছানোর মিশন ছেদ করেন।
৭৮’র ১১তম বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ম্যারিও কেম্পেস, বার্তোনি, প্যাসারেলা, বুরুচাগা, ভ্যালডানো, জিউয়িস্তি (১৯৮৬) প্রমুখ চমৎকার প্রতিভাময়ী একদল ফুটবলারের সমাবেশে কি চমৎকার বিশ্বকাপের পর্দায় ফুটবল খেলে ফুটবলবোদ্ধাদের মন জয় করেন। বিগত বিশ্বকাপে আর্জেণ্টিনার কৌশলগত দিক দিয়ে খুব ভালো ফুটবলার দলে ছিল, এ কথা কে বলবে?
বর্তমান চলমান প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশজুড়ে চারদিকে আর্জেন্টিনার সমর্থকের বহর বেশ বড়। বাংলাদেশের অধিকাংশ আর্জেন্টিনার সমর্থকরা দিয়েগো ম্যারাডোনা ও দেশকে চেনেন। কিন্তু বেশ কয়েকবছর আগে এক সাংবাদিক ফুটবল গ্রেট ম্যারাডোনাকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘বাংলাদেশে আপনার অনেক ভক্ত আছে। ১৯৯৪ সালে আপনার পক্ষে বাংলাদেশের ভক্তরা সুপ্রিমকোর্ট পর্যন্ত মামলা দায়ের করেছিল, এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য ও অনুভূতি কি?’ ম্যারাডোনা এই প্রশ্নটি শুনে নাকি খুব আশ্চর্য হন। আর বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ কোন্ দেশ? আমি বাংলাদেশকে চিনি না।’ পরে ঐ সাংবাদিক একটি মানচিত্র এনে ম্যারাডোনাকে দেখিয়ে দেন বাংলাদেশের অবস্থান। তিনি রাগতকণ্ঠে বললেন, ‘মানচিত্রের বুকে বাংলাদেশের নাম আমি কোনোদিনও শুনিনি।
বাংলাদেশ নামে যে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র আছে বলে আমার ক্ষুদ্রজ্ঞানে জানা নেই।’ তাহলে দেখুন, কি লজ্জার কথা তিনি বললেন? একে তো স্বয়ং অহংকারী ম্যারাডোনা, তার উপর আবার বাংলাদেশকে চেনেন না। বাংলাদেশের অধিকাংশ আর্জেন্টিনার ভক্তরা না বুঝে আর্জেন্টিনাকে সমর্থন দিচ্ছে? খুবই আফসোসের কথা।
অথচ যেখানে পেলের মতো ব্রাজিলের বিশ্বখ্যাতি তারকা পেলের মতো ক্ষুদ্র এক গরীব বাংলাদেশকে চিনেন। আর বলেছিলেন, ‘আমার জানামতে, ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে সরাসরি বাংলাদেশকে চিনি।’ আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে এখন যারা খেলেন, তারা ঐ আগের অবস্থানে নেই। আছে ফুলঝুড়ি বিশ্বমানের খেলোয়াড়। তবে জিউইস্তি আর ভ্যালডানোর মতো সুদক্ষ খেলোয়াড়ের ছন্দময়ী খেলা আজকাল চোখে পড়ে না। এমনকি মেসিরও না। কারণ, তিনি বাইয়া খেলোয়াড়, পূর্ববর্তী খ্যাতনামা ম্যারাডোনার স্টাইলই আলাদা। তার তুলনাই হয় না।
আরআর

