পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে হাজার একরেরও বেশি পরিমাণ এলাকাজুড়ে চলছে দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও বিশাল এক উন্নয়নযজ্ঞ। সেখানে এখন বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলছে জোরেশোরে।
এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩০ নভেম্বর এ প্রকল্পের প্রথম কংক্রিট ঢালাই কাজের উদ্ধোধন করেন, যার মাধ্যমে বিশ্বে নিউক্লিয়ার ক্লাবের গর্বিত সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
বাংলাদেশ ছাড়াও এ প্রকল্পের নকশা বাস্তবায়নকারী দেশ রাশিয়া ও প্রকল্প নির্মাণে সহযোগী দেশ ভারতের বিশেষজ্ঞ দল একত্রে গড়ে তুলছে এক বৃহৎ স্থাপনা। রাত-দিন চলা বিশাল এই কর্মযজ্ঞের জন্য এরই মধ্যে রূপপুর ও আশপাশের এলাকা বদলে যেতে শুরু করেছে। এ প্রকল্পের কাজে অংশ নিয়ে কর্মসংস্থান হয়েছে এলাকার বহু শ্রমিকের।
সরেজমিন প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বিশাল এলাকাজুড়ে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলায় গোটা এলাকার দৃশ্য পাল্টে গেছে। সেখানে তৈরি করা হয়েছে প্রকল্পের অফিস, রাস্তাঘাট প্রভৃতি অবকাঠামো। শুরু হয়েছে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের কাজও। সেই চুল্লির চারপাশে এরই মধ্যে শুরু হয়েছে কংক্রিটের কাজ। প্রকল্প এলাকার বিপজ্জনক স্থানগুলোতে বেষ্টনী দিয়ে ঘিরে দেয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে জায়গায় জায়গায় বসানো হয়েছে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশিকা।

প্রকল্পের প্রধান প্রকৌশলী ইউরিক মিখাউল খোসলেভ জানান, রি-অ্যাক্টর বিল্ডিংয়ের মূল পারমাণবিক স্থাপনা তৈরির প্রস্তুতি হিসেবে সাব-বেইজ তৈরি করা হয়েছে। অবকাঠামো ছাড়াও আরো অনেক কাজ এগিয়ে চলেছে। মূল স্থাপনার কাজ শুরু হলে ৬৮ মাসের মধ্যেই এ প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হবে।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের প্রকৌশল বিভাগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আলেকজেন্দার খাজিন বলেন, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি কমিশনের পোস্ট ফুকুশিমা মানদণ্ড বজায় রেখেই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের রি-অ্যাক্টর তৈরি করা হয়েছে। এটি রাশিয়ায় এখন পর্যন্ত ব্যবহৃত সবচেয়ে শক্তিশালী রি-অ্যাক্টর। এর মধ্যে ব্যবহৃত অ্যাকটিভ ও প্যাসিভ নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণে এটি টর্নেডো, ভূমিকম্প বা বিমান দুর্ঘটনার পরও নিরাপদ থাকবে।
রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ জানান, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি হতে যাচ্ছে।
রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালক ড. মোহাম্মদ শৌকত আকবর বলেন, ‘এ প্রকল্পে ব্যবহৃত পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা-বলয়ের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় কোনো দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকবে না। এরপরও যদি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, এর তেজস্ক্রিয় পদার্থ সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে যাবে না।’
বর্তমানে বিশ্বে ৩১টি দেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। আর বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বে এখন আরো ছয়টি দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন। এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্পেন্ট ফুয়েল বা বর্জ্য ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশ ও রাশিয়া ফেডারেশনের মধ্যে চলতি বছর ৩০ আগস্ট এক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম বলেন, নিউক্লিয়ার এনার্জি হচ্ছে ‘গ্রিন এনার্জি’ বা পরিবেশবান্ধব জ্বালানি। প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে এই কেন্দ্রে যে জ্বালানি (ইউরেনিয়াম-২৩৫) ব্যবহৃত হবে, তা কয়লা ও তেলের চেয়ে তুলনামূলক সাশ্রয়ী। আর এ প্রকল্পে যে অর্থ খরচ হবে তা কেন্দ্র নির্মাণের ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যেই উঠে আসবে।

পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান এম আলী জুলকারনাইন বলেন, ‘বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য পারমাণবিক শক্তি ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। তবে এ কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আমাদের দক্ষ জনবল ও বিশেষজ্ঞ কর্মী বাহিনীর প্রয়োজন আছে।’
রোসাটমের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বিদ্যুৎকেন্দ্রেটি নির্মাণে আধুনিক জেনারেশন থ্রি-প্লাস প্রযুক্তির ভিভিইআর-১২০০ নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর ব্যবহার করা হচ্ছে। অর্থনৈতিকভাবে এ প্রযুক্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন সাশ্রয়ী। এছাড়া এটি পরিচালনা করতে তুলনামূলক কম জনবল লাগে। এ প্রযুক্তিতে পারমাণবিক জ্বালানি হিসেবে ইউরেনিয়াম বেশি ব্যবহৃত হয়। ফলে দীর্ঘ সময়ের জন্য বিদ্যুৎও বেশি উৎপাদিত হবে।

স/এষ্

